সারিহিল আমার প্রিয় মহল্লা।
সপ্তাহে একদিন যাই। দরকার হোক বা না এমনিতেই। বেশি দূরে না। ক্লিভল্যান্ড সড়কটা ধরে নাক বরাবর হেঁটে গেলেই সারিহিল। ডানে বামে পুরানো ধাঁচের দো-তলা কয়েকটা বাড়ি। বেশির ভাগের রঙ বিবর্ণ হলুদ ।ফিকে সবুজ। বা রঙজ্বলা ফিরোজা। কাঠের দরজা। পাল্লায় লোহার হরফে বাড়ির নাম্বার। সব বাড়ির সামনে এক ফালি বাগান। কিছু গোলাপের ঝাড়।
রাস্তার খানিক পর পর মোটা এক একটা গাছ বিনীত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছের নাম নাকি পেপারব্যাক ট্রি। কারন আর কিছুই না। একটা মৌসুমে গাছের গোঁড়া থেকে স্তরে স্তরে পাতলা কাগজের মত বাকল উঠে আসে। মনে হয় অনেক পুরানো বাতিল কোন পেপারব্যাক বই। এইজন্য।
সারিহিলকে মশকরা করে অনেকে ইনডিয়ান পাড়া বলে। এক রাস্তার মধ্যেই পাঁচটি ভারতীয় মুদির দোকান। আছে চারটে ইনডিয়ান খাবারের দোকান। একটা মিষ্টির দোকান। সবাই রমরমা ব্যবসা করছে। একটা মিষ্টির দাম ৩ ডলার। ভেতরে বড় টিভিতে গান বাজছে- নিবুরা ,নিবুরা, নিবুরা। আরে কাঁচা কাঁচা ছোটা ছোটা নেবুরা আনে দাও।’ খারাপ কি ?
মুদি দোকানের বাইরে চলতি হিন্দি সিনেমার বড় বড় বিকট সাইজের পোস্টার। খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসে তন্দুরি রুটি আর বাটার চিকেনের মনোলোভা ঘ্রান। ভেতরে হিন্দি গানের ঝংকার। মুদি দোকানের ভেতরে বসে মশলা চিবুয় দোকানের মালিক। মুখভর্তি লাল পিচকি নিয়ে জড়ানো গলায় বলে- ‘পাইসাব ক্যায়া চাইয়ে আপ কো ?’
সারাক্ষণ জমজমাট এই এলাকা পাড়ি দিলেই পরের অংশটা নিঝঝুম। ছোট ছোট বাক্স বাড়ি। একটা বাড়ির বারান্দায় দেখি বসে থাকে এক জোড়া বুড়ো বুড়ি। ওদের বয়স হিসাব করা মুশকিল। বুড়ো বুড়ি কথা বলে না। চেয়ে চেয়ে রাস্তার লোক দেখে। বুড়ি একটা সোয়েটার না কি মাফলার কি যেন বানানোর চেষ্টা করে। আপেল রঙা উলের গোল্লা দেখি চেয়ারের পাশে। সারাক্ষণ রাস্তায় নজর ওদের।
বেশ কয়েকদিন দেখা হল। শেষে এক বিকেলে মিচকি হেসে বললাম- ‘ কেমন আছেন ? দিনটা কিন্তু দারুন।’
ডাহা মিথ্যা কথা। দিনটা ঠাণ্ডা। কুয়াশা পড়বে খানিক পর। নিজেকে এসকিমো মনে হচ্ছিল। কিন্তু কথা বললাম। এগুলোকে খেজুরে আলাপ বলে।
দুইজনেই দারুন খুশি হয়ে হাসল। বুড়ির হাসিটা বেশি সুন্দর। বয়স যখন কম ছিল বুড়ি দেখতে নিশ্চয়ই পারুলের মত ছিল ? আরে ওই যে পারুল- যার সাত ভাই আছে। সৎ মা ভীষণ খারাপ। হেন তেন।
সেই থেকে সপ্তাহে একবার করে দেখা হত পারুল ইয়ে মানে বুড়ি আর বুড়োর সাথে। এরা মনে হয় সারাদিন বারান্দায় বসে থাকে। টিভি দেখে না ? বিক্রি করে ফেলেছে নাকি চুরি হয়ে গেছে ?
আমাকে দেখলে ওদের গল্প বলার মুড এসে যায়। বেশির ভাগ সেইদিনের আবহাওয়া । মাছের দাম কত সস্তা ছিল আগে। চাইনিরা আসার পর সিডনিতে সস্তায় জ্যাকেট পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে মাত্র একটা মিট পাইয়ের দোকান ছিল। এখন গণ্ডায় গণ্ডায়। কিন্তু স্বাদ এত বিচ্ছিরি মনে হয় পাইয়ের ভেতরে মরা ঘোড়ার মাংস বা লাদা দিয়ে ঠেসে দেয়।
তো আমরা খেজুরে আলাপ পারি।
এক বিকেলে হাঁটতে গিয়ে দেখি বুড়ো থমথমে মুখে বসে আছে। জানতে পারলাম তিন দিন আগে বুড়ি তাকে ছেড়ে চলে গেছে ঈশ্বরের কাছে। খারাপ লাগল। মাত্র কয়দিন আগে না কথা হল। সামান্য বোতাম হারালে আমার খারাপ লাগে। আর এ তো আস্ত একটা বুড়ি। বুড়িকে হারিয়ে বেশিদিন কষ্ট পেল না বুড়ো। মাত্র মাস খানেক পর সেও মারা গেল দুঃখে। কি করুন। চল্লিশ বছরের বেশি ছিল এক সাথে।
আমার অবস্থা খারাপ। ওখান দিয়ে হেঁটে গেলেই বারান্দায় চোখ যায়। শূন্য লোহার চেয়ার দুটো দেখলে মনটা কেমন করে।
মাত্র মাস খানেক পর দেখি চেয়ার নেই। কেউ সরিয়ে ফেলছে। ভাল কথা। পরের সপ্তাহে দেখি তাগড়া এক যুবক এক গাদা পুরানো দিনের কলের গানের রেকড নিয়ে ফেলছে বাড়ির বাইরে। যুবকের চেহারা কেমন যেন পরিচিত লাগল।
‘ ফেলছেন কেন এই সব ?’ অবাক হলাম।
‘ বাতিল জিনিস।’ জবাব দিল তাগড়া। ‘ হারামজাদা বাপ আর বুড়ি মা রাজ্যের বাতিল জিনিস দিয়ে বাড়ি ভর্তি করে রেখেছে। ফেলে খালি করছি। রঙ করা হলেই বাড়ি বিক্রি করে ফেলব। আমার গার্লফ্রেন্ড এই পুরানো বাড়ি পছন্দ করে না। আমরা কুইন্সল্যান্ড চলে যাব। ওখানে বাগদা চিংড়ী বেশ ফাটাফাটি।’
কালো রেকডগুলোতে হাত বোলালাম। খাঁজকাটা। ভারি। মাঝে লাল, নীল, হলুদ কাগজের গোল লেবেল। অ্যালবামের আর গানের নাম লেখা। গড ফাদারের থিম সং পেলাম। এলভিস প্রিসলির দুর্লভ অ্যালবাম পেলাম।
‘ আমি নেব ?’ জানতে চাইলাম।
‘ না করলো কে ?’ জবাব দিল তাগড়া।
বিশটা রেকড নিয়ে ফিরে এলাম। পরের সপ্তাহে ফেলে দিল বই, পেইন্টিং আর পুরানো সোফা। রঙ করা হল বাড়ি । লাল হলুদ for sale নোটিশ সাঁটানো হল।
মাস খানেক পর তরুণ এক জোড়া দম্পতি উঠে এলো। এরা শনিবার রাতে বারান্দায় বসে কদাচিৎ। সামনে বেগুনি মোমবাতি। লেভেনডারের সৌরভ। ওদের সামনে সবুজ অয়াইনের বোতল। প্রচুর সালামি আর পনীর দেয়া কয়েকটা পিজ্জার ফালি । ওরা গল্প করে। একদিন যেখানে বুড়ো বুড়ি ছিল। মনে হয় টাইম মেশিনে গিয়ে বুড়ো বুড়ির অতীত দেখছি।
একদিন এই তরুণ দম্পতি চলে যাবে। নিয়ম। ওদের বাচ্চা কাচ্চা অনাদরে ফেলে দেবে ওদের জমানো সব স্মৃতি। কেউ মনে রাখে না তো এইসব। কে আগলে রাখে পুরানো হাওয়ার ঘ্রান ? সব বাতিল হয়ে যায়। কে খোঁজ নেবে জিনিসগুলো আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা কত আবেগ আর ভালবাসা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছিল।
যে এলভিস প্রিসলির রেকড আমি কুড়িয়ে নিয়েছি ওটা প্রথম ডেটিঙে বুড়ো দিয়েছিল পারুল বুড়িকে। ওরা বলেছিল আমাকে।

মতামত জানান