ধারাবাহিক দুঃস্বপ্নের খেলা - 1 পর্ব (1)
  • দুঃস্বপ্নের খেলা
এক
ক্যাসিনোর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো যুবক ।
বয়স ত্রিশ। লম্বা একহারা। মাথা ভর্তি কালো কুচকুচে চুল। ঘন নীল শার্ট আর হাতির দাঁতের রঙের প্যান্ট পরনের। গলায় টকটকে লাল টাই । সব মিলিয়ে চোস্ত একটা ভাব।
সতর্ক চোখে ক্যাসিনোর ভিতরটা জরিপ করলো আগন্তুক।
রাত সাড়ে দশটা। প্যারাডাইস ক্যাসিনোর এই কামরাতে রুলেত টেবিল আছে মাত্র তিনটে । সব সময় উঁচু বাজিতে খেলা হয়। সর্বনিন্ম বাজি চল্লিশ হাজার টাকা। বোকা টুরিষ্ট আর বিচ্ছিরি ধরনের ধনী লোকজনেরাই খেলতে আসে ক্যাসিনোর এই অংশে।
আগন্তকের নাম জাফর। মেয়েদের কাছে নিজের পরিচয় দেয় লাকি নামে। অপরাধ জগতে হারামি জাফর নামে সবাই চেনে। কামরার ভেতরে সন্ধানী চোখে চেয়ে নতুন শিকার খুঁজছিল সে। নতুন শিকার দরকার, যে তার টাকার লোভ মেটাতে পারবে।
তিন দিন ধরে এই শহরে আছে জাফর। মোটা , রূপহীন, বয়স্কা মহিলা তার পছন্দের শিকার। এদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে বিছানায় যায়। তারপর টাকা দাবি করে। বিগত যৌবনা মহিলাগণ তাদের জীবনের শেষ রোমাঞ্চ হিসাবে লাকিকে খুবই পছন্দ করে। টাকা পয়সা ঢালতে কার্পণ্য করে না। জীবনটা বেশ মাখনের মালাইয়ের উপর যাচ্ছে লাকি ওরফে হারামি জাফরের।
একটাই সমস্যা ওর। ভীষণ বেহিসাবি। বিলাসী জীবন যাপন করে। ফলে জমার খাতা শূন্য। কিছু টাকা ছিল। বোকামি করে জুয়া খেলতে গিয়ে হেরে গেছে। এখন নতুন শিকারের খোঁজে প্যারাডাইস ক্যাসিনোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আশাবাদী, শিকার পাওয়া যাবে।
খানিকদূরে একটা টেবিলের সামনে মোটামত একটা মহিলা বসে আছে। ওটার সাথে চেষ্টা করা যেতে পারে। মহিলার অনামিকায় হিরের আংটি আছে। মানে মালপানির আগমন ভালই হবে। পাশেই রোগামত কালো এক মহিলা। উনার গলায় রুবি আর পান্না ভর্তি আকর্ষণীয় নেকলেস। দুইজনকেই দেখে মনে হল একঘেয়েমি আর নিঃসঙ্গতায় ভুগছে।
লোভের মাথায় শেষ চল্লিশ হাজার টাকা বাজি ধরে ফেলল জাফর। ওই মহিলা দুইজনই ওর টাকাটা জিতে ফেলল, মুখচোখের ভাব বদলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। খুশি।
বিরক্ত হয়ে কামরার অন্য মাথায় চলে গেল জাফর। পকেট থেকে সোনার সিগারের কেস আর রত্নখচিত দামী লাইটার বের করলো। অতীতে দুই মক্কেলের কাছ থেকে বাগিয়ে নিয়েছিল।
‘জাফর সাহেব না ?’ তীক্ষ্ণ গলায় কে যেন ডাক দিল পিছন থেকে।
ফিরে তাকাল জাফর। ওর সমান লম্বা লোকটা। বয়স পঞ্চাশ। মাথায় কদমছাট চুল।
পেশাগত কারনেই মানুষ দেখলে সাথে সাথে জাত চিনে ফেলে জাফর। দেখেই বুঝল বড় মাপের লোক। রাঘব বোয়াল। ঠাণ্ডা থম্থমে চেহারা। কালো রঙের যে স্যুট গায়ে চাপিয়েছে, বানাতে মেলা পয়সা লেগেছে। লোকটার চাকচিক্যের সামনে নিজের জামাকাপড় সার্কাসের ক্লাউনের মত লাগছে।
‘ আমিই জাফর। আগে কোথাও মোলাকাত হয়েছিল আমাদের ?’ সাবধানে কথা চালু করলো সে।
‘ আমার সাথে এক পাত্র ড্রিংক নেবেন আপনি ? ’ শান্ত নিচু মাপা গলায় বলল লোকটা। ‘সামান্য আলোচনা ছিল। ব্যবসা সংক্রান্ত। আপনার বেশ লাভই হবে।’
লাভ হবে কথাটা পছন্দ হল জাফরের।
উগ্র পারফিউমের মত টাকার ঘ্রাণ ভেসে আসছে লোকটার শরীর থেকে । কেন জানি একবার সতর্ক হবার প্রয়োজন বোধ করলো। সেই সাথে লোভের হাতছানি।
‘ শুনে বেশ আনন্দিত হলাম।’ বিশ্বভোলানো একটা হাসি উপহার দিল জাফর। বেশির ভাগ সময় এই হাসিতে জাফরের মহিলারা কাত হয়ে যায়। এই বয়স্ক লোকটার কোন হোলদোল হল না। তোম্বা মুখে চেয়ে রইল। ‘ আর আপনি ? নামটা জানতে পারি ?’
‘আমরা বারে বসি ? নিরিবিলিতে কথা বলা দরকার আমাদের।’ বলেই ঘুরে লোকটা হাঁটা ধরল। রুলেত রুম পার হয়ে বারান্দার শেষ মাথায় সিঁড়ি বেয়ে বারের সামনে চলে গেল।
সদ্য পরিচিত লোকটাকে পোষা কুকুরের মত অনুসরণ করলো জাফর।
ভেতরে ভেতরে কৌতূহলে ফেটে পড়ছিল। লোকটা আর যাই হোক খেজুরে আলাপ করার জন্য ওকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে না।
কোনার দিকে একটা টেবিল বেছে বসলো ওরা। আশে পাশে টেবিলে দুইচার জন মাতাল বসে বসে জুয়ায় হেরে যাওয়া নিজেদের মন্দভাগ্য নিয়ে আক্ষেপ করছিল।
ওরা বসতে না বসতেই বারম্যান এগিয়ে এলো ।
লোকটা জানতে চাইল – ‘ কি নেবেন ?
‘স্কচ।ধন্যবাদ। ’
‘আমাকেও স্কচ । ডাবল।’
‘ আপনার নামটা জানা হয়নি এখনও।’ সিগারেটটা ছাইদানিতে ঠুসে বলল জাফর।
জবাব না দিয়ে লোকটা নিলিপ্ত ভাবে কামরার অন্য দিকে চেয়ে রইল। বিব্রত বোধ করতে লাগল জাফর। বারম্যান পানীয় নিয়ে ফিরে আসতেই স্বস্তি ফিরে পেল।
‘ আপনার ব্যাপারে আমি সবই জানি জাফর সাহেব।’ শান্ত নিচু সুরে বলতে লাগল লোকটা। ‘ আপনি আমার চোখে একটা শকুন। বোকা মহিলাদের ফাঁদে ফেলে তাদের কাছ থেকে পয়সা আদায় করেন। টাকার জন্য পারেন না এমন কোন কাজ দুনিয়ায় নেই।’
এক লহমায় শরীরটা শক্ত হয়ে গেল জাফরের। রক্ত উঠে গেল মুখে। ‘ আমি জানি না আপনি কে ? তবে ফাজলামো করার জন্য ভুল মানুষ বেছে নিয়েছেন।’
‘নাটক না করলে খুশি হব হারামি জাফর ।’ হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মত একটা ভঙ্গি করল লোকটা। ‘ তোমার মত হারামি লোক দরকার আমার। সামান্য কাজ। পাঁচ লাখ টাকা পাবে।’
জাফরের দম বন্ধ হয়ে এলো। পাঁচ লাখ টাকার জন্য আরও খারাপ ব্যবহার সহ্য করতে রাজি আছে। আরাম করে বসলো ।‘শুনতে ভাল লাগছে , স্যার।’
হাসলো।
‘ আমার বউকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। এটাই তোমার কাজ।’
শরীর শিথিল করে দিল হারামি জাফর। এটা কোন কাজই না। অতীতে মোটা টাকা খেয়ে অমন ধনী লোকের দুইচারটা ডিভোর্স করিয়ে দিয়েছে। পানির মত সোজা কাজ।
‘কোন ব্যাপারই না। আপনি বিবাহ বিচ্ছেদ চাইছেন ? হয়ে যাবে ।’
‘বিবাহ বিচ্ছেদের কথা কখন বললাম ?’ লোকটার কাঁটা কাঁটা কথা শুনে আবারো নার্ভাস ফিল করলো জাফর। ‘ তোমাকে টাকা দেব। বদলে আমার বউকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।’
লোকটার শক্ত নির্মম মুখের দিকে চেয়ে শিহরণ অনুভব করলো জাফর। ‘ একটু ঝেড়ে কাশুন তো ভাই। আপনার কথার ভাব সম্পসারণ করুন । কথার মাথা মুথা ক্লিয়ার না।’
‘ আমি চাই , তুমি একটা নিখুঁত দুর্ঘটনার আয়োজন করবে। এবং আমার গিন্নি মারা যাবে। বদলে পাঁচ লক্ষ টাকা পাবে। নগদ। ’ বলল লোকটা।
দুর্ঘটনার আয়োজন !
‘ আপনার সাথে নেই আমি।’ সাফ সাফ বলল জাফর। ‘ আপনি আমাকে খুবখারাবি করতে বলছেন ? ‘
‘ মোটেই না।’ চকচকে চোখে ওর দিকে চেয়ে বলল লোকটা। ‘ দুর্ঘটনার আয়োজন করতে বলছি। কাউকে খুন করতে বলছি না।’
ঢোক গিলল জাফর। ‘মেরে ফেলতে চাইছেন ?’
‘ এইতো লাইনে এসেছ।’
পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল।তারপর এক ঢোকে গ্লাসের সব স্কচ গিলে বলল,’ আপনি সিরিয়াস ?’
অধৈয়্য হয়ে হাত নাড়ল লোকটা। ‘ আমি হ্যাঁ অথবা না শুনতে চাই ।’
জাফরের চালু আর ধূর্ত মাথাটা সাথে সাথে ফুল স্প্রিডে কাজ শুরু করলো। খুনখারাবি টাইপের কাজ আগে কখনও করেনি। বোকা ধনী মহিলাদের সাথে নাটক করে টাকা খাওয়া এক কথা। কিন্তু খুন ? একদম খালাস।বাপরে ।
পরক্ষণেই মনে পড়লো বাজারে ওর অনেক ধার দেনা। শেষ টাকাগুলো লোভের ফাঁদে পরে জুয়ায় হেরেছে। পাঁচলক্ষ টাকা হাতে পেলে কয়েকটা মাস নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। লোভ জাগল মনে ।
‘ হ্যাঁ,নাকি না ? জানতে চাইল লোকটা।
‘ মনে হচ্ছে আপনার কাজে লাগতে পারব।’ সামান্য ইতস্তত করে শান্ত গলায় বলল হারামি জাফর।
এই প্রথম বিচ্ছিরি বাঁকা একটা হাসি দেখা গেল লোকটার মুখে।
‘ কিন্তু আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিতে হবে।’ দম নিয়ে আগের মতই শান্ত গলায় বলল জাফর। ‘ কাজটা আমি নিজে করব না। লোক দিয়ে করাব। আড়ালে থাকব আমি। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ? ’
‘ তুমিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ নিখুঁত একটা প্ল্যান চাই আমি। দুর্ঘটনা হবে। আমার গিন্নি একদম চলে যাবে আমার জীবন থেকে। একশত ভাগ নিখুঁত কাজ চাই।কোথায় উঠেছ তুমি ? ’
‘ স্টার মোটেল।’
‘ পরশুদিন দেখা হবে। সকাল এগারটার সময়। আশা করব আমাকে খুশি করার মত আয়োজন এর মধ্যেই করে ফেলবে।’ উঠে দাঁড়ালো লোকটা । ‘ শুভরাত্রি।’
হনহন করে হাঁটা ধরল । বারের পাশের গলি দিয়ে চলে গেল বাইরে।
তিন মিনিট পর একই গলি দিয়ে বের হয়ে এলো জাফর। দারোয়ান ওকে দেখে সালাম ঠুকে বিনয়ের সাথে জানতে চাইল- ‘ ট্যাক্সি ডেকে দেব স্যার ?’
ওয়ালেট থেকে একশো টাকার নোট বের করলো জাফর ।
‘ লাগবে না।’ নোটটা ভাঁজ করলো জাফর। ‘ এইমাত্র একজন ভদ্রলোক বের হয়ে গেলেন। চেহারাটা চেনা চেনা লাগল । চেন নাকি তুমি ?’
‘উনি তো বেলায়েত হোসেন খান সাহেব। কেন স্যার ?’ একশো টাকার নোটের দিকে লোভী চোখে চেয়ে উত্তর দিল দারোয়ান।
‘ আমিও তাই ভেবেছি ।’
নোটটা হাত বদল হল। কার পার্কিঙের দিকে চলে গেল জাফর । ভাড়া করা মার্সিডিজ এল ২০০ নিয়ে হুশ করে বড় রাস্তায় চলে গেল।
দুই
তখন ক্যাসিনোর ভিআইপি কার পার্কিঙে নিজের রুপালি রোলস রয়েস গাড়িতে বসে ছিলেন বেলায়েত হোসেন খান মজলিস। একা। মাথাটা দারুন কাজ করছে ।
কাজ শুরু হয়ে গেছে। ভাবছেন তিনি। এখন দেখা যাক হারামি জাফর কতটুকু কি করতে পারে। জাফরের মত লোভী নিচু বদমায়েশ টাইপের মানুষের সাথে কাজ করা বেশ কঠিন। কিন্তু সরাসরি পেশাদার কোন খুনির সাথে যোগাযোগ নেই তার। এক বয়স্কা হতাশাগ্রস্থ মহিলার কাছ থেকে জাফরের খোঁজ পেয়েছিলেন তিনি। মহিলা বলেছিল- টাকার জন্য জাফর সব কাজ করতে পারে।
মনে হচ্ছে ভুল হয়নি ।
নিজেকেও সাবধানে রাখতে হবে। পুলিশের ঝামেলা চান না। নিখুঁত এক্সিডেন্ট মনে হতে হবে ঘটনাটা।
স্ত্রী শিরিনের কথা একবার মনে হল। বিয়ের আট বছর চলছে। মেয়েটার একটা ভাল গুন হচ্ছে সুন্দরী। এবং বিশ্বস্ত। দক্ষতা আর মায়া দিয়ে সংসার চালায়।সব কর্মচারীরা শিরিনের ভক্ত। ফলে ব্যবসায় আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারত বেলায়েত হোসেন। বাকি দিন সব হয়তো ভালই যেত। একটার পর একটা মিসক্যারেজ হবার পর একটু একটু করে ওদের সম্পর্কটা কেমন যেন ঝুলে গেছে। গত বছর মনে হচ্ছিল এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সাত মাসের প্রেগন্যানট অবস্থায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গেল শিরিন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার জানা গেল বাচ্চাটা মারা গেছে। খোকা ছিল ওটা।
মরা বাচ্চাটাকে দেখে নিজেকে ভীষণ অসহায়, ব্যর্থ আর দিশেহারা মনে হয়েছিল বেলায়েত হোসেনের । অথচ এই বাবুর আশায় কতদিন ছিল। বিরক্ত হয়ে দুই সপ্তাহ ব্যবসার কাজের অজুহাত দেখিয়ে বাইরে বাইরে রইল।
শিরিনের প্রতি বিম্বিসা আর বিরক্তি জন্মাতে লাগল যখন দেখল বাচ্চা নিতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না সে। এত কিছুর পর সে নিজের শখ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি যায়। দিনরাত বই পড়ে। একটা গুন আছে মেয়েটার। দারুন রকমের বেহালা বাজাতে পারে। নানান অনুষ্ঠানে বেহালা বাজিয়েছে সে। দেশের বাইরেও গেছে দুই একবার। খোদ নিউইয়র্ক পর্যন্ত। অথচ বেহালার সুর একদম বিরক্তকর মনে হয় বেলায়েত হোসেনের কানে। কোন রকম গান বাজনা রস তৈরি করে না তার মনে। শিরিন একাই চলে যায় বেহালা বাজানোর অনুষ্ঠানে। আবার ব্যবসায়ীদের ককটেল পার্টিতে শিরিন উপস্থিত হতে চায় না। সময় কাটাতে নাইট ক্লাব গুলোতে গিয়ে বসে থাকতো বেলায়েত হোসেন।
বিরক্তকর। আজকাল ওরা দুইজন একসাথে সকালের জলখাবারটা পর্যন্ত একসাথে খায় না। খুব দ্রুত তাদের দাম্পত্য জীবন শেষ হবার কথা।
এক সন্ধ্যায়, ব্যবসায়ীদের এক ককটেল পার্টিতে বেলায়েত হোসেনের সাথে তানিয়ার পরিচয় হয়েছিল ।
পার্টিতে নামকরা এক ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে কথা বলছিলেন বেলায়েত হোসেন। তখনই ম্যানেজারের পিছনে লম্বা, শ্যামলা মেয়েটাকে দেখে বুকটা ধক করে উঠলো। দামী গাউনে অপূর্ব লাগছিল। চিত্ত চঞ্চল করা শারীরিক গঠন।
‘ভদ্রমহিলাকে চেনেন ?’ ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলেন বেলায়েত হোসেন।
‘চিনব না কেন ? আমাদের ব্যাংকের ক্লায়েন্ট।’ হাসি মুখে জবাব দিল ম্যানেজার। ‘ নাম তানিয়া আক্তার। সফল ফ্যাশন ডিজাইনার। কাজের সুনাম আছে। আমিই উনাকে বলেছি ব্যবসায়িদের পার্টিতে নিয়মিত আসা যাওয়া করতে। অনেক ক্লায়েন্টের সাথে পরিচয় হওয়া যাবে। ব্যবসায়ের সার্কেল বাড়ে ওতে। তিনটে বুটিকের দোকান আছে। দারুন চলে।’
‘ আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন ?’ তানিয়ার রেশমের মত মসৃণ চুল দেখতে দেখতে আবদার জানালেন বেলায়েত।
পরিচয় করিয়ে দিল ম্যানেজার।
বেলায়েত হোসেন খান সফল ব্যবসায়ি হিসাবে নাম করেছেন অনেক আগেই । ভদ্রলোক এবং টাকার কুমির হিসাবে কম বেশি সবাই চেনে । পরিচিত হবার সময় মিষ্টি করে হাসল তানিয়ে। প্রায় মারা গেলেন বেলায়েত হোসেন। মেয়েটার বয়স মাত্র ত্রিশের কোঠায়।
কি অদ্ভুত ভাবে দুইজন দুইজনের প্রেমে পড়ে গেল। দুইজনের রসায়ন বিচ্ছিরি ভাবে অমন অনুভূতি দিল যেন একে অপরকে হাজার বছর ধরে খুঁজছিল।
এক বছর আগের কথা এইসব।
সেই থেকে মাসে দুইবার দুইজনে গোপনে দেখা করে । দামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে খায়। তবে শহরের বাইরে। নিজের জীবনের সব কিছু তানিয়ার কাছে খুলে বলছিলেন বেলায়েত হোসেন । শহরতলির বাইরে পাঁচ কামরার একটা অ্যাপার্টমেনট গোপনে কিনেছিলেন বেলায়েত হোসেন। ওখানেই গোপনে সময় কাটাতো। তানিয়া জানিয়েছিল, ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিয়ে করার সুযোগ পায়নি এতদিন।
দুই সপ্তাহ আগে নামকরা এক সিফুড রেস্টুরেন্টে রাতের খাওয়া শেষ করে চাঁদের আলো দেখতে দেখতে তানিয়া বলল- আমার মনে হয় না তোমার বউ তোমাকে ডিভোর্স দেবে। আর গোপনে তোমার সাথে দেখা করতেও খারাপ লাগে। আজ সকালে রোম থেকে ফোন পেয়েছি । এক পরিচিত তৈরি পোশাকের ব্যবসায়ি আমাকে চাকরি দিতে চান। চীফ ডিজাইনার। আমার জন্য বিরাট সুযোগ। বড় অঙ্কের বেতন দেবে। সাথে ফ্রি অ্যাপার্টমেনট। চিন্তা করার জন্য এক মাস সময় দিয়েছে।’
‘ আচ্ছা অমন যদি হয় আমার স্ত্রী আমাকে ডিভোর্স দেয়। তাহলে তুমি কি আমার বাচ্চার মা হয়ে আমার ব্যবসা সামলাতে পারবে ?’ তানিয়ার হাত মুঠোয় নিয়ে বললেন বেলায়েত হোসেন।
‘ পারব।’ মিষ্টি হেসে বলল তানিয়া।
‘ ঠিক আছে। তাহলে আমাকে মাত্র একমাস সময় দাও।’
‘ আজ থেকে গুনতি শুরু ?’
‘ ডান।’
ক্যাসিনোর সামনে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ভাবলেন বেলায়েত হোসেন – কাজ শুরু গেছে। শিরিন মারা গেলেই সব সমস্যার সমাধান।
————–
রাত ১১.৩০।
জাফরের জন্য মাত্র বিকেল। ক্যাসিনো থেকে বের হয়ে দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় চলে এলো। সব অফিস বন্ধ। পরিচিত এক দালানের পনের তলায় চলে এলো। ‘ ভোরের খবর’ পত্রিকার অফিস। এত রাতে আর কাউকে না পেলেও শরাফ আলী থাকবে। ভোরের খবরের গসিপের পাতা শরাফ আলী দেখে। রাজ্যের খবর ওর কাছেই পাওয়া যায়। এই দেশে কে কোথায় কি করছে সব জানে এই সাংবাদিক ব্যাটা।
ভেতরেই পাওয়া গেল। ডেস্কের উল্টো দিকে বসে কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। অনেক বছর ধরে দুইজনে একটা টিম হিসাবে কাজ করছে ওরা। দারুন রসাল সব কেচ্ছা কাহিনি শরাফ আলীকে সাপ্লাই দিত জাফর। বিনিময়ে জাফরকে টাকা পয়সা ভালই দিত ।
শরাফ আলীর বয়স ষাট। প্রায় বাঁধাকপির মত মোটা। জামার বুকের কয়েকটা বোতাম খুলে বসে আছে। চশমার কাচ কালো। চোখ দেখা যায় না।
‘ আরামেই আছ ?’ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল জাফর।
‘ কি ভাগ্য আমার। হারামি জাফর যে। অনেকদিন দেখা নেই , ভাবলাম জেলে হাজতে আছ বোধহয় ? ’ কৃত্রিম খুশি খুশি গলায় বলল বুড়ো সাংবাদিক।
হাসল জাফর। রেগুলার কৌতুক ।
সামনের চেয়ার টেনে বসে পড়লো । সিগারেট কেস থেকে সিগারেট বের করে অফার করলো শরাফ আলীকে।
‘শেষের বুড়িটার কাছ থেকে আদায় করেছিলে জিনিসটা ?’ ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল শরাফ আলী।
‘ খানিক হেল্প লাগবে আমার।’
‘এইজন্য এসেছ ? দূর হও। খিদে পেয়েছে আমার। বাসায় যেতে হবে।’
‘যদি শোন, শহরের এক অভিজাত ভদ্রলোকের মেয়ে আগামী সপ্তাহে ক্লিনিকে গিয়ে গোপনে অ্যাবরশন করবে কেমন হয় খবরটা ?’
শরাফ আলীর চেহারাটা ঝিকিমিকি করে উঠলো। মনে মনে হেড লাইন ও লিখে ফেলল। ‘ পুরোটা বলে ফেল হে।’
‘ফ্রি করব না। বদলে কিছু দিতে হবে। তথ্য। বেলায়েত হোসেন খান সাহেব। উনার সম্পর্কে বেশ মোটা তথ্য চাই আমি।’
মুহূর্তের জন্য থমকে গেল বুড়ো সাংবাদিক।
যখন কথা বলল মনে হল বহু দূর থেকে বলছে, ‘ বড় শক্ত পাল্লার সাথে টক্কর দিতে যাচ্ছ খোকা। আমি তোমাকে পছন্দ করি না। আবার চাই ও না বেঘোরে মারা যাও। বেলায়েত হোসেন খুব টাফ লোক । একদম টিকতে পারবে না।’
‘ আরে ধ্যাত। তুমি শুধু ওর ব্যাপারে খানিক তথ্য দাও আমাকে।’
‘ব্যাবসায়ি। নতুন না। বাপের ব্যবসা ছিল। নিজের মেধা দিয়ে সেইসব বাড়িয়ে দশগুন করে ফেলছে। খান অ্যান্ড কোং নাম শুনেছ ? উনার।তেলের ব্যবসা আছে, ইলেক্ট্রনিক্স আর কম্পিউটরের ব্যবসায় ঝুঁকেছে আজকাল। টাকার অভাব নেই। বাড়ি আছে বেশ কয়েকটা। নিষ্ঠুর ক্ঠিন মানুষ। রাজনৈতিক ভাবে সব দলেই উনার ইয়ার দোস্ত দিয়ে ভর্তি। মন্ত্রী পর্যায়ের। দেশের সেরা দশজন প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন। এবং বিপদজনক।’
লোভীর মত শুনছিল জাফর। জানতে চাইল -‘ টাকা পয়সা আছে কি রকম ?’
‘কে জানে ?’ স্রাগ করল শরাফ আলী । ‘ যেভাবে তুমি এক প্যাকেট সিগারেট কেন , উনি সেইরকম করে দামী গাড়ি কেনেন ।’
বাপরে। খুশি না হয়ে পারলো না হারামি জাফর। অমন পাগল এক টাকার কুমির সোজা চলে এসেছে ওর কাছে ? তাও কি না নিজের বউকে খুন করার জন্য।
‘ভদ্রলোকের স্ত্রী সম্পর্কে কিছু বল বুড়ো খোকা ।’
‘উনার স্ত্রী !’ দুই চোখ গোল্লা গল্লা বানিয়ে ফেলল সাংবাদিক। ‘ ভুলেও উনার দিকে তোমার কুনজর দিও না খোকা। জানে মারা পড়বে। বেলায়েত হোসেনের ক্ষমতা সম্পর্কে তোমার কোন ধারনাই নেই।’
‘ জাস্ট কিছু তথ্য লাগবে আমার। আর কিছু না।’
বিচিত্র ভঙ্গিতে দুই কাঁধ ঝাঁকাল বুড়ো , ‘ সরল সহজ একটা মেয়ে। ভাল বেহালা বাজায়। শিক্ষিতা। বেলায়েত সাহেবের সংসার ভাল সামাল দেয়। তবে কোন কালো দাগ নেই। পরকীয়া বা গোপন প্রেমিক। উহু। একদম ক্লিয়ার।’
‘আর বেলায়েত হোসেন ?’
‘উনি যদি তলে তলে বোরহানি খান দুনিয়ার কেউ ধরতে পারবে না। তানিয়া নামে এক মেয়ের সাথে অনেকবার নানান জায়গায় দেখেছি । মেয়েটা ফ্যাশন ডিজাইনার। কিন্ত আমি প্রমাণ করতে পারব না দুইজনের মধ্য কোন রকম লেপটা লেপটি টাইপের সম্পর্ক আছে ।’ চেয়ারে গা ছেড়ে শরাফ আলী বলল ‘ আর কিছু ?’
খানিক কিছু ভাবল হারামি জাফর। ওর সেই বিখ্যাত হাসি উপহার দিয়ে বলল, ‘ আপাতত না। তুমি রাতের খাবার সেরে নাও। আমি বিদায় নিচ্ছি।’
দরজার দিকে পা বাড়াল ।
‘ দাঁড়াও।’ পিছন থেকে খেঁকিয়ে উঠলো শরাফ আলী। ‘ তুমি না বললে সামনের সপ্তাহে কোন ভদ্রলোকের মেয়ে গোপনে বাচ্চা খালাস করবে ?’
‘অনেকেই করবে।’ বেহায়ার মত হাসিমুখে জবাব দিল জাফর। ‘ কিন্তু কারো নাম জানি না।’ বলেই ভেগে গেল।
গাড়ি চালিয়ে স্টার মোটেলে দিকে চলল।
ভাবছে।
ব্যাপারটার মধ্যে হালকার উপর ঝাপসা প্যাঁচ আছে। কাজটা করতে পারলে পাঁচ লক্ষ টাকা পাবে, ভাল কথা। কিন্তু খুব সহজ মনে হচ্ছে না। কেন খুন করতে চাইছে ? ডিভোর্স দিলেই হয় । শরাফ আলী বলেছে, খান বিপদজনক। খুব সাবধানে চাল দিতে হবে ওকে। বেলায়েত খান যদি ওকে ব্ল্যাকমেইল করে ? নিজের নিরাপত্তার জন্যই অমন কিছু করতে পারে সে । কাজ শেষ, আর গুনে পয়সা দিয়ে বিদায় করে দেবে ওকে ?
ওর নিরাপদ ডেরা স্টার মোটেলে ফিরে গোসল করে পায়জামা পরে বিছানায় যাবার পরও মনটা সুস্থির হলো না।
খুন খারাবির মত নোংরা কাজে হাত দেবে না জাফর। হারামি হলেও খুনি না ও। তবে ভাড়াটে খুনি জোগাড় করতে সমস্যা হবে না । এক সময় শহরের অনেক পেশাদার খুনির সাথে মাখামাখি ছিল ওর। এখন নেই। ওরা সবাই নির্দয় আর ঘাগু অপরাধী। বেশির ভাগই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। চট করে রাজার কথা মনে পড়লো।
রাজা।
অপরাধ জগতের এক আতংক। আড়ালে জাদুকর বলে ডাকে অনেকে। লোকমুখে শুনেছে কুড়িটার মত খুন করেছে সে। আরও বেশি হতে পারে। রাজনৈতিক খুন সহ। অদ্ভুত রকমের শীতল মগজ। নিখুঁত পরিকল্পনা করে কাজে হাত দেয়। ব্যর্থতা শব্দটা রাজার জন্য অপরিচিত বাজে শব্দ। কোন পুলিশি রেকর্ড নেই। নারায়ণগঞ্জে তিন রুমের এক এপার্টমেনটে থাকে।
জাফর মনে মনে স্বীকার করলো রাজার সামনে কোন কারন ছাড়াই নার্ভাস ফিল করে সে। বেশ কয়েকবার শহরের নানান নাইট ক্লাবে দেখা হয়েছে দুইজনের। মদ তদ গিলেছে এক টেবিলে। তবে সব সময় রাজাকে বিপদজনক একটা চরিত্র মনে হয়েছে হারামির। বেলয়েত খানকে সামাল দেয়ার জন্য রাজা একদম সঠিক চীজ।
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত বোধ করলো হারামি। বিছানা থেকে উঠে এড্রেস বুকটা খুঁজে বের করলো। রাজার নাম্বার পেল। আবার কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করল। শেষে নাম্বার ডায়াল করলো। ওই পাশে রিং হচ্ছে।

মতামত জানান