একটি দেশি মুরগি এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড

• ১০ মিনিটের পাঠ

ভোরবেলা কুয়াশা ভেদ করে সূর্য ওঠার আগেই কবির মিয়ার ঘুম ভেঙেছিল। ঘুম ভাঙার পর মনটা বেশ ফুরফুরে থাকার কথা ছিল, কারণ উঠোনের কোণে কাঠের খোয়াড়ে রাখা পাঁচখানা দেশি মুরগি গত সপ্তাহ থেকেই ডিম দিতে শুরু করেছে। দিনকাল বড় আকালের। বাজারে চালের কেজি আশি টাকা, তেলের বোতলে হাত দিলে ছ্যাঁকা লাগে। এই দুর্দিনে সকালে খোয়াড় থেকে উষ্ণ দুটো ডিম কুড়িয়ে নেওয়া কবির মিয়ার জীবনে এক পরম সান্ত্বনার মতো ছিল।

কিন্তু খোপের ডালা খুলতেই কবির মিয়ার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। খোয়াড় একদম ফাঁকা। একটা ভাঙা মাটির খুরি উল্টে পড়ে আছে, আর নিচে ছড়িয়ে আছে কয়েকটা তাজা লালচে পালক।

চুরি! মাত্র ডিম দেওয়া শুরু করা পাঁচটি তাগড়া দেশি মুরগি এক রাতেই উধাও!

কবির মিয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তবে চোর খুঁজতে তাকে বেশি বেগ পেতে হলো না। গ্রামের পাতি চোররা মুরগি চুরি করলে রাতারাতি ভ্যান ডেকে দূরের হাটে চালান করে দেয়, কিন্তু এই চুরির ধরন অন্যরকম। একটু খোঁজখবর নিতেই পাড়ার ছোকরারা ফিসফিস করে আসল খবর ফাঁস করে দিল।

ঘটনা ঘটেছে গত মধ্যরাতে। ইউনিয়নের সরকারি দলের বড় নেতা মোতালেব মাতব্বরের বৈঠকখানায় মদের আসর বসেছিল। দূরদূরান্ত থেকে চার-পাঁচজন ক্ষমতাধর চেলাচামুণ্ডা এসেছিলেন নেতার মেহমান হয়ে। বাংলা আর বিলিতি মদের টান যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ নেতার শখ চাপল, দেশি মুরগির তাজা বারবিকিউ খেতে হবে। কিন্তু রাত তখন পৌনে দুটো। এই গভীর রাতে এতগুলো জ্যান্ত দেশি মুরগি কোথায় পাওয়া যাবে?

মুশকিল আসান করল এক একনিষ্ঠ কর্মী। সে মাতব্বরকে বলল, “নেতা, চিন্তা কইরেন না। কবির মিয়ার খোয়াড়ে পাঁচটা হৃষ্টপুষ্ট দেশি মুরগি আছে, দিনরাত খালি কক-কক করে।”

ব্যাস, সমাধান হয়ে গেল। রাজার দেশে তো প্রজার সম্পদে রাজার জন্মগত হক থাকেই। জমিজমা, খালবিল যেখানে নেতার নামে চলে, সেখানে পাঁচটা মুরগি তো কোন ছাড়! কর্মীরা গিয়ে নিঃশব্দে রাতের আঁধারে খোয়াড় সাফ করে নিয়ে এসেছিল।

সকাল আটটার দিকে বুক ফুলিয়ে মোতালেব মাতব্বরের বাড়ির দিকে রওনা হলো কবির মিয়া। ভেবেছিল একটা বিহিত হবে। কিন্তু নেতার বাড়ির উঠোনে পা দিতেই কবির মিয়ার চোখ স্থির হয়ে গেল। উঠোনের এককোণে ছাইয়ের পাশে তখনও তার মুরগির পালকগুলো ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। তার খাঁটি দেশি লাল মোরগের লেজের সেই তেকোনা লম্বা পালকটা তো দেখলেই চেনা যায়। এমনকি নেতার বাড়ির ঝাড়ুদার ছাইয়ের ভেতর থেকে হাড়গোড় কুড়াতে কুড়াতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “কালকে রাতের বারবিকিউর স্বাদ নাকি খাসা হইছিল কবির ভাই!”

সাক্ষ্য-প্রমাণের কোনো অভাব রইল না। রাগে কবির মিয়ার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। সে সোজা ছুটল থানায়।

থানার ডিউটি অফিসারের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কবির মিয়া যখন কাঁপাকাঁপা গলায় মোতালেব মাতব্বরের নামে মুরগি চুরির অভিযোগ করল, তখন সেখানে উপস্থিত চার-পাঁচজন কনস্টেবল আর উপ-পরিদর্শক সাহেব প্রথমে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ গমগম করে পুরো থানা কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করলেন। যেন তাদের গোটা চাকরিজীবনে এমন কৌতুক আর শোনেননি।

টেবিলে রাখা ফাইলের ওপর এক চাপড় মেরে দারোগা বললেন, “কবির মিয়া, বয়স তো কম হইলো না। বুদ্ধি কি মাথায় একটুও নাই? তোমার মুরগি চুরি গেছে, তুমি ভালোয় ভালোয় বাড়ি যাও। মুরগি গেছে, কয়দিন পর আবার কিনতে পারবা। কিন্তু বাড়াবাড়ি কইরা জীবনটা যদি যায়, জীবন ক্যাডা ফিরায়া দিব কও?”

কবির মিয়া মাথা নিচু করে থানা থেকে বের হয়ে এলো। বুকের ভেতর এক দলা অপমান আর বিরস মন নিয়ে সে বাজারের পথ ধরল।

বাজারে গিয়ে সে দেখল, মোড়ের চায়ের দোকানে রাখা টেলিভিশনটার সামনে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। টেলিভিশনের রঙিন পর্দায় তখন প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ চলছে। কী শান্ত, কী স্নেহময় গম্ভীর কণ্ঠস্বর! জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি কেমন মায়ামাখা চোখে তাকাচ্ছেন, দেশের গরিব মানুষের এক ইঞ্চি জমিও কেউ কেড়ে নিতে পারবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় জানাচ্ছেন।

চা-দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কবির মিয়া হাঁ করে সেই ভাষণ শুনল। শুনে তার চোখের কোণায় প্রায় পানি এসে যাওয়ার দশা হলো। কবির মিয়া মনে মনে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, “আহা! মানুষটা কী ভালো! জনগণের জন্য কী অসম্ভব দরদ তার অন্তরে! কিন্তু কপাল খারাপ, এমন খাঁটি আর দরদী নেত্রীর নিচে জুটেছে যত সব ডাকাত, চোর আর বদমাশ নেতাকর্মী। এই ফেরেশতা মার্কা মানুষটা যদি জানত তার নিচের চামচারা সাধারণ মানুষের মুরগি পর্যন্ত চুরি করে খায়, তবে নিশ্চয়ই এদের আস্ত রাখত না!”

মনটা কিছুটা হালকা করে কবির মিয়া বাড়ি ফিরছিল। হাতে তখন আধাসের লবণ আর এক পোয়া ডালের একটা পাতলা পলিথিনের ব্যাগ। কিন্তু গ্রামের নির্জন মেঠোপথ ধরে ঢালুতে নামতেই হঠাৎ কোত্থেকে চার-পাঁচজন ষণ্ডা মার্কা জোয়ান ছেলে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তাদের চোখেমুখে তাজা মাদকের লালচে আভা।

সামনে এসে একজন কবির মিয়ার শার্টের কলারটা এক টানে মুচড়ে ধরল।

“কিরে শালার পুত, থানায় গিস্লি নাকি?”

কবির মিয়া কিছু বলার আগেই সপাং করে একটা চড় এসে পড়ল তার গালে। তারপর শুরু হলো কিল, লাথি আর বাঁশের চ্যালা দিয়ে বেধড়ক পেটানি। কবির মিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু সেই শুনশান মেঠোপথে বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না। মারতে মারতে যখন কবির মিয়ার মুখ দিয়ে রক্ত আর লালা একসাথে বের হতে লাগল, তখন একজন তার বুকের ওপর বুট জুতো চেপে ধরে বলল, “নেতার নামে এই গ্রামে গুজব ছড়ালে তোর লাশটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, মনে রাখিস। এবারকার মতো মাপ পাইলি।”

ওরা চলে যাওয়ার পর কবির মিয়া বুঝতে পারল তার বাজারের ব্যাগটা কোথায় ছিটকে গেছে তার কোনো হদিস নেই। মাথাটা অসাড় হয়ে আছে। কপাল বেয়ে টপটপ করে গরম রক্ত ঝরছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, কপালের একপাশটা ফেটে আলুর মতো ফুলে গেছে।

যন্ত্রণা আর অপমানে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে বাজারের একটি ফার্মেসিতে গিয়ে তিনটে সেলাই আর সাদা ব্যান্ডেজ জড়াল সে। কিন্তু মাথা ফাটানোর এই আঘাত কবির মিয়ার ভেতরের সহজ-সরল মানুষটাকে যেন একরোখা এক জেদি মানুষে পরিণত করল। সে আবারও থানায় হাজির হলো।

এবার ডিউটি অফিসারের রুমের টেবিলের ওপর হাত রেখে কবির মিয়া চিৎকার করে বলল, “স্যার! আপনারা বললেন মুরগির মায়া ছাড়তে। মুরগির মায়া ছেড়ে বাড়ি ফিরছিলাম, কিন্তু দেখেন ওরা আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে! এবার তো আপনারা কিছু একটা করবেন?”

এবার অবশ্য কেউ হাসল না।

ভেতরে বসা বড় কর্মকর্তা মুখে একদলা জর্দা দেওয়া পান পুরে দিয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন কবির মিয়ার ব্যান্ডেজ করা রক্তাক্ত মাথার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে পান চিবিয়ে, পিক ফেলার ডাস্টবিনে লাল পিক ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “কবির মিয়া, এই কেস নেওয়ার ক্ষমতা এই থানার কোনো অফিসারের নাই।”

কবির মিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। “কেন স্যার?”

কর্মকর্তা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি মিয়া নেতার সাথে পাঙ্গা নিতে পারবা না। বড়লোকের সাথে গরিবের লড়াই হয় না। তুমি বরং এক কাজ করো, নেতার পায়ে গিয়ে ধরো, একটা আপস করো। উনি দুনিয়ার কালো টাকার মালিক, হাজার কোটি টাকা ওনার ডান হাতের ময়লা। হয়তো মেজাজ ভালো থাকলে তোমার ওপর দয়া করে মুরগির দাম আর চিকিৎসার টাকাটা ছুড়ে দিয়েও দিতে পারেন। বুঝলা?”

কবির মিয়া আবারও থানা থেকে বের হয়ে এলো। তার মাথা ঘুরছিল। দুপুরের প্রখর রোদে রক্তাক্ত শরীরটা যেন আর টানতে পারছে না। তবে এই চরম বিপদের মাঝেও তার অবচেতন মনে আবারও সেই টিভির কথা মনে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী যদি এই অবিচারের কথা এক নজর জানতেন, তবে এই দারোগা আর এই নেতার কি কোনো নিস্তার থাকত? নিশ্চয়ই সঠিক বিচার হতো!

কবির মিয়ার সংসারে নিজের বলতে আর কেউ ছিল না। অনেক বছর আগে এই একটিমাত্র মেয়ের জন্ম দিতে গিয়েই তার বউ পেটের ব্যথায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। সেই থেকে মেয়েটাই কবির মিয়ার পৃথিবী। নাম ময়না, বয়স সবে সতেরোয় পড়েছে। অভাবের সংসারে বাবার সাথে হাসিমুখে দিন কাটায়।

কিন্তু বাড়ি ফিরে উঠোনে পা দিতেই কবির মিয়ার বুকটা হিম হয়ে গেল।

ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে ভাত রাঁধার অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটা উল্টে পড়ে আছে উঠোনে। ময়না ঘরে নেই।

প্রতিবেশীদের এক বুড়ি ফিসফিস করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কবির, তুমি থানায় যাওয়ার পরেই মাতব্বরের চার-পাঁচটা ছেলে মোটরসাইকেল নিয়া আইসা ময়নারে জোর কইরা তুইলা নিয়া গেছে!”

মাথার ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে ফেলার মতো এক উন্মাদ আক্রোশে কবির মিয়া উন্মত্তের মতো ছুটল নেতার বাড়ির দিকে।

নেতার সদর দরজায় পৌঁছাতেই কবির মিয়ার পা দুটো যেন মাটির সাথে পেরেক দিয়ে আটকে গেল।

খোলা বারান্দার এক কোণে গুটিসুটি মেরে মেঝেতে বসে কাঁদছে ময়না। তার গায়ের জামাটা শতচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে আছে, ওড়নাটা কোথায় নেই, আর শরীরের উন্মুক্ত জায়গায় কালসিটে দাগ।

কবির মিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। রাগে, ঘৃণায় আর চরম অপমানে সে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। পৃথিবীর সব আলো যেন নিভে গেছে।

বারান্দার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক চ্যালা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কবির মিয়ার মুখের ওপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “জীবন বাঁচাইতে চাইলে মেয়েটারে নিয়া এই গ্রাম ছেড়ে আজকেই পালাও। নেতার খুব রাগ হইছিল তোমার ওপর। তবে নেতার মনটা বড় দয়ালু, মায়ার শরীর, তাই তোমার বেশি কিছু করে নাই। জাস্ট একটা শিক্ষা দিল।”

কবির মিয়া অশ্রুসজল চোখে টলতে টলতে মেয়ের কাছে গেল। মেয়েটা মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। কবির মিয়া তখন কাঁপতে কাঁপতে নেতার ঘরের খোলা দরজার ভেতর একবার চোখ ফেলল।

ঘরের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঠাণ্ডা হাওয়ায় খালি গায়ে লুঙ্গি পরে গা এলিয়ে বসে আছেন মোতালেব মাতব্বর। আর তার ঠিক মাথার ওপর দেয়ালে সোনা দিয়ে বাঁধানো বিশালাকার একটি ফ্রেম। সেই ফ্রেমে প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে পরম স্নেহে দাঁড়িয়ে আছেন মাতব্বর, আর দুজনের মুখেই আলো ছড়ানো উজ্জ্বল হাসি।

কবির মিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর অন্ধ ভক্তির শেষ কাঁচের টুকরোটিও সেই মুহূর্তে চুরমার হয়ে ভেঙে গেল।

মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে কবির মিয়া শেষবারের মতো আবারও থানায় নিয়ে গেল। তার বিশ্বাস ছিল, মুরগির বিচার না হোক, মারধরের বিচার না হোক, একটা মেয়ের ইজ্জত হরণের বিচার তো এই দেশে হবেই।

কিন্তু থানার ওসি পুরো ঘটনা শুনে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ তুলে তাকালেন না।

টেবিলের ওপর রাখা সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে ওসি অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও স্বাভাবিক গলায় বললেন, “কবির মিয়া, এটা আঠারো কোটি মানুষের একটা বিশাল দেশ। এত বড় একটা দেশে এইরকম দুই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ধর্ষণ তো হইতেই পারে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কিছু নাই। চেপে যাও।”

কবির মিয়ার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল ওসির দিকে।

ওসি বললেন, “আমি তোমার ভালোর জন্যই বলি, তুমি নেতার কথা শোনো। এই এলাকা ছেড়ে সোজা ঢাকা কিংবা অন্য কোথাও পালিয়ে যাও। কারণ এই নেতা খোদ প্রধানমন্ত্রীর খাস লোক, বন্ধুস্থানীয় মানুষ। তার মাথার একটা চুল ছোঁয়ার মতো ক্ষমতাও এই দেশের কোনো পুলিশের নাই।”

কবির মিয়ার যা বোঝার, তা এক লহমায় খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা হয়ে গিয়েছিল।

সে আর কোনো কথা বলল না। কোনো কাকুতি-মিনতি করল না। মেয়ের হাত ধরে নিঃশব্দে থানা থেকে নেমে এলো।

ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, মুরগির ভাঙা খোয়াড়, সব ফেলে রেখে সন্ধ্যার মুখে মেয়েকে সাথে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল কবির মিয়া।

পথটা ছিল অত্যন্ত নির্জন। গ্রামের শেষ সীমানায় বিশাল এক ফাঁকা মাঠ, আর মাঠের ঠিক মাঝখানে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এক সুবিশাল বটগাছ। চারপাশে মাইলের পর মাইল আর কোনো মানুষ নেই, কোনো বসতি নেই, কোনো পুলিশ নেই, কোনো নেতা নেই। আছে শুধু মুক্ত হাওয়া আর গোধূলির রক্তিম আকাশ।

সেই বটগাছের নিচে এসে কবির মিয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।

মেয়ের হাতটা ছেড়ে দিয়ে সে শূন্য আকাশের দিকে তাকাল। যে শরীরে সারাদিনের মারের দাগে রক্ত জমে আছে, যে বুকে আজ তার জীবনের সবটুকু মর্যাদা লুট হয়ে গেছে, সেই বুক ভরে সে শেষবারের মতো মুক্ত বাতাস টেনে নিল।

তারপর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে, জীবনের সমস্ত ঘৃণা আর ধিক্কার একত্র করে সে খোলা বাতাসে বুনো পশুর মতো চিৎকার করে উঠল:

“আমাদের নেতাগুলো সব শুয়োরের বাচ্চা! আর এমন জানোয়ারগুলোকে যে মাথায় তুলে রাখে, সেই প্রধানমন্ত্রীও একটা মস্ত বড় শুয়োরের বাচ্চা!”

খোলা মাঠের বাতাসে সেই চিৎকারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেল। চারপাশ আবার আগের মতোই নিস্তব্ধ হয়ে রইল।


পরদিন দেশের প্রথম সারির সমস্ত জাতীয় দৈনিকের শেষ পাতায় এক কলামের একটি ছোট্ট সংবাদ ছাপা হলো:

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কটূক্তি ও গুজব ছড়ানোর দায়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনে কবির মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। বিজ্ঞ আদালত তার পাঁচ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।’