কাঠুরে ও পরীর গল্প

এক ছিলো গ্রাম, নাম তার শান্তিপুর। নদীর তীরে বয়ে চলা সবুজের সমারোহ, ধানখেতের মাঝে ছড়ানো কুঁড়েঘর, আর দূরে পাহাড়ের ছায়া—এই ছিলো শান্তিপুরের রূপ। সেখানে বাস করতো রঘুনাথ, গ্রামের একমাত্র কাঠুরে। রঘু ছিলো লম্বা, শক্তিশালী, কিন্তু মনটা তার ছিলো নরম মাটির মতো। প্রতিদিন ভোর হলেই সে তার পুরোনো কুড়ুল আর একটি শুকনো ঝুড়ি নিয়ে জঙ্গলে চলে যেতো। কাঠ কেটে, গ্রামের মানুষের জন্য জ্বালানি জোগাড় করে, এভাবেই তার দিন কাটতো।

এক শীতের সকালে, যখন কুয়াশা জঙ্গলের গাছগুলোকে ঢেকে রেখেছিলো, রঘু কাঠ কাটতে গিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলো। গভীর জঙ্গলের মাঝে, একটি প্রাচীন বটগাছের নিচে, এক পরী পড়ে আছে। তার পরনে ঝকঝকে সাদা পোশাক, চুলে আলোর ঝিলিক, কিন্তু একটি ডানা ভাঙা, আরেকটি ক্ষতবিক্ষত। পরীটি কাঁদছিলো, তার কান্নায় জঙ্গলের পাখিরাও যেন থমকে গিয়েছিলো। রঘু কাছে গিয়ে নরম স্বরে বললো, “কে তুমি? কেন এমন অবস্থায় পড়ে আছো?”

পরীটি চোখ তুলে তাকালো। তার চোখে ছিলো এক অদ্ভুত মায়া। সে বললো, “আমি পরীদের রাজ্য থেকে এসেছি। আমার নাম লীলাবতী। আকাশে উড়তে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে আমার একটি ডানা ভেঙে গেছে। এখন আমি আর ফিরতে পারছি না। তুমি যদি আমার বাকি ডানাটিও কেটে দাও, তাহলে আমি মানুষের মতো হয়ে এখানে বাঁচতে পারবো।” রঘু প্রথমে ইতস্তত করলো। একটি পরীর ডানা কাটা মানে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। কিন্তু লীলাবতীর কাতর মিনতি আর অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে সে রাজি হলো। সে তার ধারালো কুড়ুল দিয়ে লীলাবতীর বাকি ডানাটি কেটে ফেললো। তারপর তাকে কোলে তুলে গ্রামে ফিরে এলো।

গ্রামে লীলাবতীকে দেখে প্রথমে সবাই অবাক হলো। তার রূপ ছিলো অপার্থিব—চাঁদের আলো যেন তার মুখে ঝরে পড়তো। কিন্তু রঘু যখন বললো, “এ আমার পরিচিত, জঙ্গলে আহত অবস্থায় পড়েছিলো,” গ্রামের মানুষ তাকে মেনে নিলো। দিন কাটতে লাগলো। রঘু আর লীলাবতীর মধ্যে গড়ে উঠলো এক গভীর বন্ধন। লীলাবতী রঘুর ছোট্ট কুঁড়েঘরে থাকতে শুরু করলো। সে রান্না করতো, গল্প বলতো, আর তার মিষ্টি হাসিতে রঘুর কঠিন জীবনটা যেন রঙিন হয়ে উঠলো। গ্রামের বুড়ো পঞ্চায়েত প্রধান হরিদাস একদিন বললো, “রঘু, এই মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলো। তোমাদের জুটি দেখে মনে হয়, স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে।” সবার সম্মতিতে রঘু আর লীলাবতী বিয়ে করলো।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের ঘরে এলো এক ফুটফুটে শিশু। ছেলেটির চোখে ছিলো লীলাবতীর মায়া, আর শরীরে রঘুর শক্তি। নাম রাখা হলো শশী—চাঁদের মতো উজ্জ্বল। শশীকে দেখে গ্রামের মানুষ বলতো, “এ ছেলে যেন পরী আর মানুষের মিলনের ফল।” লীলাবতী শশীকে নিয়ে মেতে থাকতো। সে তাকে গান শোনাতো, পরীদের রাজ্যের গল্প বলতো—আকাশের ওপারে সোনার প্রাসাদ, মেঘের ভেলায় ভাসা বাগান, আর রংধনুর সেতু। রঘু কাঠ কাটতে যেতো, আর ফিরে এসে দেখতো তার সংসার যেন স্বপ্নের মতো।

এভাবে ১২টি বছর কেটে গেলো। শশী বড় হলো, তার বয়স হলো ১২। সে বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেতো, কাঠ কাটতে সাহায্য করতো। লীলাবতীও গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো। কিন্তু পরীদের জগতে একটি গোপন নিয়ম ছিলো, যা লীলাবতী কাউকে বলেনি। ১২ বছর পর তাদের ডানা আবার গজায়। এক পূর্ণিমার রাতে, যখন চাঁদ আকাশে ঝকঝক করছিলো, লীলাবতী তার পিঠে একটি চাপ অনুভব করলো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো, তার পিঠ থেকে নতুন ডানা গজিয়ে উঠছে—সাদা, ঝকঝকে, শক্তিশালী। তার মন ভারী হয়ে গেলো। সে বুঝলো, এখন তার ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে।

লীলাবতী ভাবলো, “যদি গ্রামের মানুষ আমার ডানা দেখে ফেলে, তাহলে কী হবে? তারা হয়তো আমাকে বন্দি করবে, বা ভয়ে কিছু করে বসবে। আর রঘু আর শশী? তাদের ছেড়ে যেতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।” কিন্তু পরীদের নিয়ম ভাঙার উপায় ছিলো না। সে রাতে, যখন রঘু আর শশী গভীর ঘুমে, লীলাবতী তাদের কপালে শেষ চুমু দিলো। তারপর জানালা খুলে, নতুন ডানায় ভর করে আকাশে উড়ে গেলো। চাঁদের আলোয় তার ছায়া একবার মাটিতে পড়লো, তারপর মিলিয়ে গেলো।

সকালে রঘু ঘুম ভেঙে দেখলো, লীলাবতী নেই। শশী ছুটে এসে বললো, “বাবা, মা কোথায়?” রঘু চারপাশে খুঁজলো, কিন্তু কিছুই পেলো না। শুধু জানালার কাছে একটি সাদা পালক পড়ে ছিলো। সে বুঝলো, লীলাবতী ফিরে গেছে তার নিজের জগতে। গ্রামের মানুষও খবর পেয়ে এলো। কেউ কেউ বললো, “ও তো পরী ছিলো, এমনই হওয়ার কথা।” কেউ বললো, “ওর ভালোবাসা তোমাদের কাছে রেখে গেছে।”

তারপর থেকে প্রতি পূর্ণিমার রাতে, রঘু আর শশী নদীর ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। শশী বলে, “বাবা, মা কি আজ ফিরবে? আমি তার গল্প শুনতে চাই।” রঘু চুপ করে চাঁদের দিকে তাকায়, তার চোখে জল চিকচিক করে। গ্রামের বুড়িরা বলে, “ওরা অপেক্ষা করে, কারণ ভালোবাসা কখনো হারায় না। পরী চলে গেলেও, তার ছায়া এখানেই রয়ে গেছে।”

এভাবে, কাঠুরে রঘু আর পরী লীলাবতীর গল্প শান্তিপুরের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো। কেউ কেউ বলে, পূর্ণিমার রাতে নদীর ওপর একটি সাদা ছায়া উড়তে দেখা যায়। আর শশী, সে বড় হয়ে একদিন বললো, “আমি মায়ের জগৎ খুঁজে বের করবো।” কিন্তু সে গল্প আরেকদিনের।

যে বইগুলো কিনতে পারেন ডিস্কাউন্ট রেটে থেকে:

Loading books...