পৃথিবীর পাঁচটি রহস্যময় ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ

পৃথিবীর চারদিকে বিশাল সমুদ্রের মধ্যে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ। কিছু দ্বীপ তাদের সুন্দর প্রকৃতির জন্য বিখ্যাত, আবার কিছু দ্বীপ মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। কোথাও দেখা যায় অদ্ভুত আকৃতির গাছ, কোথাও বিরল পাখি ও প্রাণী, আবার কোথাও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ বাস করে। এমনই পাঁচটি আশ্চর্য দ্বীপ হলো সোকোত্রা, লর্ড হাউ, ফৌলা, কুক দ্বীপপুঞ্জ এবং ট্রিস্টান দা কুনহা

১. সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জ – অদ্ভুত গাছ ও বিরল প্রাণীর জন্য বিখ্যাত

সোকোত্রা ইয়েমেনের অন্তর্ভুক্ত একটি দ্বীপপুঞ্জ। এটি আরব সাগরের কাছে অবস্থিত। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এখানে এমন অনেক গাছ ও প্রাণী তৈরি হয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোনো জায়গায় দেখা যায় না।

সোকোত্রার সবচেয়ে বিখ্যাত গাছ হলো Dragon Blood Tree বা ড্রাগন ব্লাড গাছ। গাছটির আকৃতি অনেকটা উল্টো ছাতার মতো। এর কাণ্ড থেকে লাল রঙের এক ধরনের রস বের হয়। এই লাল রসের কারণেই এর নাম Dragon Blood Tree হয়েছে।

সোকোত্রার পাহাড়, পাথুরে এলাকা, গুহা, সমুদ্রসৈকত ও নীল সমুদ্র দেখতে খুবই সুন্দর। এখানকার অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী শুধু এই দ্বীপেই পাওয়া যায়। তাই সোকোত্রাকে অনেক সময় “ভারত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস” বলা হয়।

সোকোত্রার প্রকৃতি এতটাই অদ্ভুত যে এর ছবি দেখলে অনেকের মনে হয়, এটি যেন পৃথিবীর কোনো জায়গা নয়, বরং অন্য কোনো গ্রহের দৃশ্য। প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বের কারণে ২০০৮ সালে সোকোত্রা UNESCO World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি পায়।


২. লর্ড হাউ দ্বীপ – অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত

Lord Howe Island অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের অন্তর্ভুক্ত একটি ছোট দ্বীপ। এটি তাসমান সাগরে, অস্ট্রেলিয়ার পূর্বদিকে অবস্থিত। দ্বীপটি আকারে ছোট হলেও এখানে অনেক ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী পাওয়া যায়।

দ্বীপটির চারপাশে রয়েছে নীল সমুদ্র, সুন্দর সৈকত, পাহাড় ও প্রবালপ্রাচীর। সমুদ্রের নিচেও রয়েছে অসাধারণ জীববৈচিত্র্য। এখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ, প্রবাল এবং সামুদ্রিক প্রাণী দেখা যায়।

লর্ড হাউ দ্বীপের অন্যতম বিখ্যাত প্রাণী হলো Lord Howe Woodhen। এটি একটি উড়তে না-পারা পাখি। এছাড়াও এখানে Lord Howe Island Phasmid নামে একটি বড় stick insect পাওয়া যায়। একসময় এই পোকাটিকে বিলুপ্ত বলে মনে করা হয়েছিল। পরে আবার এর সন্ধান পাওয়া যায়।

দ্বীপটির প্রকৃতি ও বিরল প্রাণীদের রক্ষা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৯৮২ সালে Lord Howe Island UNESCO World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি পায়।


৩. ফৌলা দ্বীপ – খুব কম মানুষ এবং প্রচুর সামুদ্রিক পাখির জন্য বিখ্যাত

Foula স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের একটি ছোট ও প্রত্যন্ত দ্বীপ। এটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত। দ্বীপটি এতটাই দূরে যে এখানে পৌঁছানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন।

ফৌলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অসংখ্য সামুদ্রিক পাখি। দ্বীপটির পাহাড় ও সমুদ্রের ধারে হাজার হাজার পাখি দেখা যায়। এখানে puffin, fulmar, guillemot এবং skua-এর মতো বিভিন্ন পাখি রয়েছে।

ফৌলায় মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এখানে মাত্র কয়েক ডজন মানুষ বসবাস করেন। ফলে দ্বীপটির পরিবেশ খুব শান্ত ও নিরিবিলি। এখানকার মানুষ অনেকটা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন।

দ্বীপটির চারপাশে রয়েছে উঁচু পাহাড়, সবুজ ঘাসের মাঠ এবং বিশাল সমুদ্র। দূর থেকে ফৌলার পাহাড়গুলোকে সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল প্রাচীরের মতো মনে হয়।

ফৌলার পুরোনো Norse নাম Fugla-ey, যার অর্থ “Bird Island” বা “পাখির দ্বীপ”। দ্বীপটির বিপুলসংখ্যক পাখির কারণে এই নামটি খুবই উপযুক্ত।


৪. কুক দ্বীপপুঞ্জ – নীল সমুদ্র, সুন্দর lagoon, সৈকত ও Māori সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত

Cook Islands দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ১৫টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। এখানকার সমুদ্রের পানি নীল ও স্বচ্ছ, সৈকত সুন্দর এবং চারপাশে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রকৃতি।

কুক দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে পরিচিত দ্বীপগুলোর একটি হলো Rarotonga। এটি দ্বীপপুঞ্জের প্রধান ও সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ। Rarotonga-তে পাহাড়, সবুজ বন, সমুদ্রসৈকত এবং নীল lagoon রয়েছে।

আরেকটি বিখ্যাত দ্বীপ হলো Aitutaki। এর সুন্দর lagoon এবং ছোট ছোট দ্বীপের জন্য এটি বিশেষভাবে পরিচিত। পানির রং অনেক জায়গায় এত পরিষ্কার ও নীল যে ওপর থেকে দেখলে মনে হয় নীল কাঁচের ওপর ছোট ছোট দ্বীপ ভেসে আছে।

এখানকার মানুষের সংস্কৃতিতে Māori ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ। গান, নাচ, পোশাক, খাবার ও বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি প্রকাশ পায়।

কুক দ্বীপপুঞ্জ নিজস্ব সরকার দ্বারা পরিচালিত একটি স্বশাসিত অঞ্চল, যার নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বিশেষ free association সম্পর্ক রয়েছে। তাই এটিকে সাধারণ অর্থে নিউজিল্যান্ডের একটি প্রদেশ বলা ঠিক নয়।


৫. ট্রিস্টান দা কুনহা – পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনবসতিপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ হিসেবে বিখ্যাত

পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জনবসতিগুলোর কথা বললে Tristan da Cunha-এর নাম অবশ্যই আসে। এটি দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত দ্বীপপুঞ্জ।

এটি আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। কাছাকাছি অন্য বড় জনবসতিও অনেক দূরে। ফলে এখানকার মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বিচ্ছিন্নভাবে জীবনযাপন করেন।

মূল দ্বীপে একটি ছোট বসতি রয়েছে। এর নাম Edinburgh of the Seven Seas। এখানে বাড়িঘর, স্কুল, গির্জা, দোকান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। জনসংখ্যাও খুব কম।

Tristan da Cunha মূলত একটি আগ্নেয় দ্বীপ। দ্বীপের মাঝখানে রয়েছে একটি বড় আগ্নেয় পাহাড়। ১৯৬১ সালে এই আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়। তখন দ্বীপের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে অনেকেই আবার নিজেদের দ্বীপে ফিরে আসেন।

দ্বীপটির চারপাশের সমুদ্র ও পাহাড়ি পরিবেশ খুব সুন্দর। এখানে বিভিন্ন সামুদ্রিক পাখি ও প্রাণীও দেখা যায়। মানুষের কাছ থেকে এত দূরে থাকার কারণে Tristan da Cunha পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য ও রহস্যময় দ্বীপ হিসেবে পরিচিত।