খিচুড়ির হাজার বছরের ইতিহাস: ঋকবেদ থেকে মুঘল দরবার হয়ে বাঙালির বর্ষার চিরন্তন সঙ্গী

• ৯ মিনিটের পাঠ

বাইরে মেঘের অবিরাম গর্জন। আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা আর জানালার কপাটে ঝুম বৃষ্টির মাতাল ছন্দ। ঠিক এমন এক বর্ষার দিনে বাঙালির অবচেতন মন এক অদ্ভুত স্মৃতিকাতরতায় ভেসে যায়। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতে থাকে ফোড়ন দেওয়া গরম গাওয়া ঘি, আদা আর ভাজা মুগ ডালের মায়াবী সুবাস। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঁসার থালায় এসে পড়ে ধোঁয়া ওঠা সোনালী রঙের নরম খিচুড়ি, পাশে মুচমুচে কড়া করে ভাজা রূপালী ইলিশের টুকরো, তেলে চকচক করা ডুমো ডুমো বেগুন ভাজা আর বয়াম থেকে তুলে দেওয়া পুরনো আম-তেলের ঝাঁঝালো আচার।

বাঙালির কাছে এটি কেবল কোনো এক বেলার খাবার নয়, এটি এক পরম অনুভূতি। কিন্তু এই যে চাল আর ডালের পরম যুগলবন্দি, এর বয়স কত?

ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা যায়, খিচুড়ি কোনো সাধারণ রান্না নয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের টিকে থাকা প্রাচীনতম জীবিত ঐতিহ্যের একটি। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সাধারণ পদটি হেঁটে গেছে মানব ইতিহাসের বিচিত্র সব পথ ধরে। বৈদিক যুগের হোমকুণ্ডের আগুনের শিখা থেকে মহাভারতের অলৌকিক আখ্যান, প্রাচীন গ্রিক রাজদূতের সফরনামা থেকে ইবনে বতুতার ডায়েরি, কিংবা মুঘল বাদশাহদের জৌলুশপূর্ণ রাজকীয় দরবার পেরিয়ে সুদূর ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের অভিজাত ক্লাবের সকালের নাশতা: খিচুড়ি তার নিজস্ব স্বাদে মাতিয়ে রেখেছে পুরো বিশ্বকে।


১. যজ্ঞকুণ্ডের পবিত্রতা ও দ্রৌপদীর অক্ষয়পাত্র

খিচুড়ির জন্মবৃত্তান্ত খুঁজতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আড়াই থেকে তিন হাজার বছর আগের বৈদিক ভারতবর্ষে। তখন এর নাম ছিল বড় গাম্ভীর্যপূর্ণ: ‘কৃশর’ বা ‘কৃশরান্ন’। সংস্কৃত ভাষায় যার অর্থ ছিল চাল, ডাল আর তিলের এক সুষম মেলবন্ধন।

প্রাচীন ঋকবেদ ও উপনিষদের যুগে কৃশরান্নকে দেখা হতো দেবতাদের পরম পবিত্র হব্য হিসেবে। যজ্ঞের আগুন প্রজ্বলিত করে ঘিয়ের সাথে চাল ও ডালের এই রান্না উৎসর্গ করা হতো দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য। বৃহদারণ্যক উপনিষদে ঋষিরা লিখেছেন কীভাবে গৃহস্থের সুখ ও সন্তানের কামনায় চাল, মাষকলাই বা তিল মিশিয়ে পরম যত্নে এই পদ তৈরি করতে হতো।

মহাভারতে দ্রৌপদীর অক্ষয়পাত্র থেকে কৃষ্ণের চাল ডালের কণা ভক্ষণ
মহাভারতের বনপর্বে দ্রৌপদীর অক্ষয়পাত্রের তলানিতে লেগে থাকা বৈদিক কৃশরান্ন গ্রহণ করছেন শ্রীকৃষ্ণ।

মহাভারতের পাতাতেও খিচুড়ি হাজির হয়েছে এক মহাজাগতিক সংকটের ত্রাণকর্তা হিসেবে। কাম্যক বনে তখন পঞ্চপাণ্ডব তাদের স্ত্রী দ্রৌপদীকে নিয়ে নির্বাসনে দিন কাটাচ্ছেন। বনের ভেতর শত শত অতিথি ও সাধু-সন্ন্যাসীদের সেবা করতে গিয়ে পাণ্ডবরা যখন দিশেহারা, তখন সূর্যদেব দ্রৌপদীকে দান করেছিলেন এক অলৌকিক তামার পাত্র, যার নাম ‘অক্ষয়পাত্র’। নিয়ম ছিল, দ্রৌপদীর আহার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই পাত্রে খাবারের কোনো অভাব ঘটবে না।

একদিন চরম দুর্বিষহ মুহূর্তে ক্রোধী ঋষি দুর্বাসা তার সহস্র শিষ্য নিয়ে আশ্রমে এসে হাজির হলেন দুপুরের ভোজনের প্রত্যাশায়। কিন্তু হায়, দ্রৌপদী ততক্ষণে নিজের আহার শেষ করে পাত্রটি ধুয়েমুছে তুলে রেখেছেন! আশ্রমে আর একটি দানাও অবশিষ্ট নেই। ঋষির অভিশাপের ভয়ে কাঁপতে থাকা দ্রৌপদী যখন শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করলেন, অন্তর্যামী কৃষ্ণ এসে পাত্রটি পরীক্ষা করে দেখলেন। পাত্রের একেবারে তলানিতে তখনো শুকিয়ে লেগে ছিল চাল ও ডালের একটিমাত্র ক্ষুদ্র কণা, সেই বৈদিক কৃশরান্ন।

শ্রীকৃষ্ণ সেই কণাটি পরম তৃপ্তিতে মুখে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, “এই এক কণাতেই পুরো জগতের ক্ষুধা নিবৃত্ত হোক।” কৃষ্ণের সেই তৃপ্তিতেই মুহূর্তের মধ্যে দুর্বাসা মুনি ও তার হাজার শিষ্যের পেট এতই পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যে তারা নদীতে স্নান সেরেই নিঃশব্দে প্রস্থান করেছিলেন।

সাধারণ চাল-ডালের সেই পদটিই প্রাচীন ভারতবর্ষে এভাবেই মিশে গিয়েছিল দেব-মাহাত্ম্যের সাথে। কালক্রমে মুখের ভাষার পরিবর্তনে প্রাকৃতের হাত ধরে ‘কৃশর’ রূপ নেয় ‘খিচ্চা’ কিংবা ‘খিস্সারী’তে, যা মধ্যযুগের বাংলায় এসে সহজ ও আপন হয়ে ওঠে ‘খিচুড়ি’ নামে।


২. বিদেশি পরিব্রাজকদের বিস্ময়

খিচুড়ির সারল্য ও পুষ্টিগুণের মুগ্ধতা শুধু এই ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমুদ্র আর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে যেসব বিদেশি পর্যটক ভারতে এসেছিলেন, তাদের চোখও আটকে গিয়েছিল এই পদের জাদুতে।

খ্রিস্টপূর্ব তিনশো অব্দে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পাটলিপুত্রের রাজসভায় গ্রিক দূত হিসেবে এসেছিলেন মেগাস্থিনিস। তিনি তার বিখ্যাত ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে ভারতবর্ষের বিচিত্র জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছিলেন, এখানকার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই চাল ও ডাল একসাথে মিশিয়ে এক অপূর্ব পুষ্টিকর খাবার তৈরি করে, যা মানুষের শরীরে অদ্ভুত শক্তি জোগায়।

এর বহু শতাব্দী পর, ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার মরক্কো থেকে ঘোড়ায় চড়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ভারতে এসে পৌঁছান বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে গ্রামীণ সরাইখানায় তিনি বারবার একটি খাবারের মুখোমুখি হন।

“এই দেশের মানুষ প্রতিদিন সকালে মুগ ডাল ও চাল একসাথে ফুটিয়ে তার ওপর খাঁটি ঘি ছড়িয়ে এক আশ্চর্য খাবার আহার করে। স্থানীয়রা একে বলে ‘কিশরি’। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এমনকি রাজকীয় ঘোড়াগুলোকে দ্রুতগামী ও শক্তিশালী রাখার জন্যও অত্যন্ত পুষ্টিকর এই চাল-ডালের খাবার নিয়মিত খেতে দেওয়া হতো।”

ইবনে বতুতা, দ্য রিহলা (১৩৩৪)

এরপর পঞ্চদশ শতকে সুদূর রাশিয়ার ব্যবসায়ী আফানাসি নিকিতিন যখন ভারতের মাটিতে পা রাখেন, তিনিও তার ডায়েরিতে ভারতীয়দের এই পরম প্রিয় খিচুড়ির কথা লিখে রাখতে ভোলেননি।


৩. মুঘল বাদশাহদের শাহী দস্তরখানে খিচুড়ি

খিচুড়ি মূলত ছিল সাধারণ মেহনতি মানুষের এক হাঁড়ির সহজ আহার। কিন্তু এই সাদামাটা খাবারটি রাজপ্রাসাদের মার্বেল পাথরে মোড়ানো শাহী বাবুর্চিখানায় প্রবেশ করে এক অভাবনীয় রাজকীয় রূপ লাভ করে মুঘলদের হাত ধরে।

মুঘল দরবারে রাজকীয় দস্তরখান ও ভোজের ঐতিহাসিক মিনিয়েচার চিত্রকর্ম
মুঘল দরবারের রাজকীয় ভোজ ও দস্তরখানের ঐতিহাসিক মিনিয়েচার চিত্রকর্ম (বাবুরনামা ও আকবরনামা যুগের পাণ্ডুলিপি)।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ভারত বিজয়ের পর যে কয়টি স্থানীয় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে খিচুড়ি ছিল অন্যতম। কিন্তু একে প্রকৃত আভিজাত্যের শিখরে পৌঁছে দেন তার পৌত্র, সম্রাট আকবর। আকবর ছিলেন একাধারে যুদ্ধজয়ী সম্রাট এবং খাদ্যরসিক। আকবরের প্রধান উজির আবুল ফজল তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’-তে রাজকীয় হেঁশেলের যে চোখ ধাঁধানো বিবরণ দিয়েছেন, তাতে দেখা যায় সম্রাটের জন্য তৈরি হওয়া পদের তালিকায় খিচুড়ির স্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে।

রাজকীয় পাচকেরা সমপরিমাণ সুগন্ধি চাল ও ভাজা ডালের সাথে মেশাত খাঁটি গাওয়া ঘি, জাফরান, লবঙ্গ, ছোট এলাচ আর মিষ্টি ঘ্রাণের দারুচিনি। আকবরের এতটাই প্রিয় ছিল এই খাবার যে সপ্তাহে একাধিক দিন তিনি কোনো মাংস স্পর্শ না করে কেবল এই সুবাসিত খিচুড়ি খেয়েই দিন কাটাতেন। আকবরের রাজসভার নবরত্নদের অন্যতম চতুর বীরবলের বহু উপাখ্যানের সাথেও জড়িয়ে আছে এই খিচুড়ি। দূর থেকে সামান্য আগুনের আঁচে হাঁড়ি ঝুলিয়ে রেখে বীরবল কীভাবে সম্রাটকে বুঝিয়েছিলেন যে শীতের রাতে যমুনার জলে দাঁড়িয়ে থাকা গরিব ব্রাহ্মণের কষ্ট কতটা বাস্তব, সেই গল্প আজও আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে অমলিন।

আকবরের পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর খিচুড়ির স্বাদকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যান। গুজরাট অভিযানের সময় স্থানীয় মানুষের রান্না করা মসলাদার ও তুলতুলে খিচুড়ি খেয়ে জাহাঙ্গীর এতটাই মোহিত হয়ে পড়েন যে তিনি তার রাজকীয় পাচককে আদেশ দেন প্রতিদিন এই পদটি তার খাদ্যতালিকায় রাখতে। জাহাঙ্গীর এই পদের একটি চমৎকার ফার্সি নাম দেন: ‘লজিজান’, যার অর্থ হলো “স্বর্গীয় সুস্বাদু”। বাসমতী চাল, সোনালী ভাজা মুগ ডাল, পেস্তা, কিশমিশ এবং কাশ্মীরি জাফরানের সুবাসে তৈরি সেই লজিজান ছিল জাহাঙ্গীরের অসুস্থতার দিনের পরম সান্ত্বনা।

এমনকি কঠোর প্রকৃতির সম্রাট ঔরঙ্গজেব, যিনি রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে সাদামাটা জীবন পছন্দ করতেন, তিনিও খিচুড়ির মায়াজাল এড়াতে পারেননি। দাক্ষিণাত্য অভিযানের দীর্ঘ দিনগুলোতে তিনি পাচককে বলতেন মাছ আর ডিমের টুকরো দিয়ে এক বিশেষ খিচুড়ি রাঁধতে, যা পরবর্তীকালে দিল্লির দরবারে ‘আলমগীরি খিচুড়ি’ নামে খ্যাতি পায়।


৪. সাত সমুদ্র তেরো নদী পার: ব্রিটিশ কেজরি ও মিসরের কোশারি

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব শুরু হলো, ইংরেজ সাহেবরাও খিচুড়ির প্রেমে পড়তে সময় নেননি। তবে ব্রিটিশরা কোনো মসলাদার খাবার সরাসরি গ্রহণ করতে পারত না। তারা ভারতীয় বাবুর্চিদের দিয়ে খিচুড়ির মধ্যে এনে দিল এক বড়সড় পরিবর্তন। ডাল ও চালের সাথে তারা যুক্ত করল তাদের নিজস্ব পছন্দের ডিম সিদ্ধ, তাজা মাখন, পার্সলে পাতা এবং সমুদ্রের স্মোকড হ্যাডক মাছের কুচি।

খিচুড়ির ব্রিটিশ রূপান্তর ভিক্টোরিয়ান কেজরি ডিম ও স্মোকড মাছের পদ
খিচুড়ির ভিক্টোরিয়ান ব্রিটিশ রূপান্তর: সিদ্ধ ডিম, মাখন ও স্মোকড মাছ সহযোগে প্রস্তুত ঐতিহ্যবাহী কেজরি (Kedgeree)।

তৈরি হলো এক নতুন পদ, যার নাম দেওয়া হলো ‘কেজরি’ (Kedgeree)। উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে এই ভারতীয় পদটি ইংল্যান্ডে এতটাই তীব্র আলোড়ন তোলে যে লন্ডনের অভিজাত জেন্টলমেন্স ক্লাব থেকে শুরু করে খোদ রাজপরিবারের রাজপ্রাসাদে সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে গরম কেজরি পরিবেশন করা এক ফ্যাশনে পরিণত হয়। আজও যুক্তরাজ্যের বহু ঐতিহ্যবাহী হোটেলে সকালের নাশতায় এই কেজরি পরিবেশন করা হয়।

ঠিক একইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর অধীনে যেসব ভারতীয় সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন, তাদের রান্নার হাঁড়ি দেখে মিসরীয়রা অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করে তাদের বর্তমান জাতীয় খাবার ‘কোশারি’ (Koshari)। চাল, মসুর ডাল, পাস্তা আর ভাজা পেঁয়াজের ওপর টক-ঝাল টমেটো সসের এই মেলবন্ধন আসলে আমাদের খিচুড়িরই এক মধ্যপ্রাচ্যীয় রূপান্তর।


৫. বাঙালির আত্মায় বর্ষা ও খিচুড়ির মিলনকাব্য

পৃথিবীর বহু দেশেই হয়তো চাল আর ডাল একসাথে রান্না করা হয়, কিন্তু বাঙালির মতো করে খিচুড়িকে কেউ এমন নিখাদ প্রেম আর কবিতায় রূপ দিতে পারেনি। বাঙালির জীবনে বর্ষা আর খিচুড়ি যেন একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আকাশ মেঘলা হলেই বাঙালির মন কেন এমন উদভ্রান্তের মতো খিচুড়ির জন্য হাহাকার করে ওঠে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রাম-বাংলার জীবনব্যবস্থার গভীরে। বর্ষার দিনে যখন অবিরাম ধারায় বৃষ্টি নামত, মেঠো পথগুলো ডুবে যেত পানিতে, তখন হাটে যাওয়া ছিল অসম্ভব। মাটির তৈরি উঠানের উনুন ভিজে একাকার হয়ে যেত। এমন দিনে গৃহিণীদের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল ঘরের মাটির হাঁড়িতে জমিয়ে রাখা আতপ বা আউশ চাল আর ঘরের কোণে থাকা মুগ কিংবা মসুর ডাল। দাওয়ায় বসে উঠোনের কলাগাছ থেকে দুটি কলাপাতা কেটে এনে এক হাঁড়িতে চাল-ডাল আর একটু হলুদ-লবণ ফুটিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যেত পরম পুষ্টিকর আহার।

এর সাথে যোগ হয়েছিল বাংলার নদীমাতৃক রূপালী ফসল: ইলিশ। বর্ষাকালে পদ্মা-মেঘনার উথালপাথাল ঢেউ পেরিয়ে যখন তাজা ইলিশ এসে পৌঁছাত হেঁশেলে, তখন হলুদ মাখানো সোনালী খিচুড়ির সাথে সরিষার তেলে কড়া করে ভাজা ইলিশের সেই যুগলবন্দি রূপ নেয় এক অমর ঐতিহ্যে।

খিচুড়ির আরেকটি বড় মহিমা হলো এর সর্বজনীন সাম্য। দুর্গাপূজার মণ্ডপে যখন শাঁখ আর ঘণ্টার ধ্বনির মাঝে মাটির সরায় গোবিন্দভোগ চাল আর সোনামুগ ডালের সুবাসিত নিরামিষ ভোগের খিচুড়ি পরিবেশন করা হয়, তখন জাত-পাত বা ধনী-গরিবের কোনো দেয়াল থাকে না। ঠিক তেমনি বর্ষার সন্ধ্যায় কোনো সুফি দরগাহর লঙ্গরখানায় বা শবেবরাতের রাতে যখন বড় তামার ডেগচিতে খিচুড়ি রান্না হয়, সেখানেও সবাই এক কাতারে বসে একই থালায় তৃপ্তি খুঁজে নেয়। রাজা হোক কিংবা প্রজা, খিচুড়ির কাছে সবাই সমান।


আজকের ফাস্টফুড, পিৎজা আর আধুনিক রেস্তোরাঁর রঙিন ভিড়েও খিচুড়ির আবেদন একবিন্দুও মলিন হয়নি। বরং কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি শেষে কিংবা কোনো নিঃসঙ্গ মেঘলা দুপুরে এক বাটি গরম খিচুড়িতে এক চামচ গাওয়া ঘি ঢেলে যখন প্রথম লোকমাটি মুখে তোলা হয়, তখন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার বছরের এক অচেনা ভারতবর্ষ।

খিচুড়ি তাই কেবল উদরপূর্তির কোনো সাধারণ পদ নয়। এটি বৈদিক ঋষিদের যজ্ঞের পবিত্র হোমশিখা, মেগাস্থিনিস আর ইবনে বতুতার ডায়েরির বিস্ময়, সম্রাট আকবর আর জাহাঙ্গীরের রাজকীয় শৌখিনতা, আর সবশেষে বৃষ্টিভেজা বাংলায় মায়ের আঁচলের নিচে বসে পরম শান্তিতে পেট ভরে খাওয়ার এক অমর আবেগ।