এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে আমরা প্রায় সকলেই “হ্যাকার” শব্দটির সাথে পরিচিত। বইয়ের ভাষায় বলতে গেলে, হ্যাকার হচ্ছে এমন ব্যাক্তি যে কীনা কোন ডিভাইস বা নেটওয়ার্কে অনধিকার প্রবেশ করে বা করতে পারে। সুতরাং অর্থগতভাবেই “হ্যাকার” শব্দটির সাথে একটা  “অনধিকার”  চর্চার ব্যাপার জড়িত আছে। সুতরাং হ্যাকারকে সবাই খুব একটা ভালো চোখে দেখেনা।
তবে আদতে সব হ্যাকারই কিন্তু মন্দ নয়। হ্যাকারদের কাজের উপর ভিত্তি করে মূলত তাদেরকে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়।

১। হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারঃ   হ্যাকারদের মধ্যে যারা ভালো কাজে তাদের মেধাকে কাজে লাগায় তারা এই দলভুক্ত। এরা মূলত ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের বিপরীতে কাজ করে।

২। গ্রে হ্যাট হ্যাকারঃ এই দলবদ্ধ হ্যাকার মূলত নিছক মজা করার জন্য হ্যাকিং করে থাকে।

৩। ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারঃ  হ্যাকারদের মধ্যেই এরা মূলত ক্ষতিকারক শ্রেনীর। এরা ব্যাবহারকারীর অজ্ঞাতে তার সিস্টেমে ঢুকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিসাধন করে। অনেকসময় তারা ব্যবহারকারীর ডেটা জব্দ করে তা ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে অর্থও দাবী করে থাকে। তবে এই শ্রেনীর অনেক হ্যাকার বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থে বিভিন্ন গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়ার জন্য বেশ বিশ্বজুড়ে বেশ আলোচিত।
আজকে আমরা এমনি কিছু আলোচিত ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের সম্পর্কে জানব।


কেভিন মিটনিক(Kevin Mitnick)

যদিও কেভিন মিটনিক কখনও নিজেকে একজন হ্যাকারের দলবদ্ধ করতে ইচ্ছুক নন, তারমতে তিনি নিছকই একজন সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু ইতোমধ্যেই  বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং কার্যকলাপের দরুন যুক্তরাষ্ট্র সরকার  তাকে “দেশের ইতিহাসের সেরা সাইবার ক্রিমিনাল” হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কেভিন মিটনিক হ্যাকিং জীবন পৃথিবীজুড়ে এতোটাই আলোচিত/সমালোচিত হয়েছে যে, তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে ইতোমধ্যে হলিউডে “Track Down” নামে একটা চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

Digital Equipment Corporation এর নেটওয়ার্কে অবৈধভাবে প্রবেশ করার জন্য একবছরের কারাদণ্ড শেষে তাকে তিনবছরের জন্য নিরীক্ষণে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু এই তিন বছর নিরীক্ষণে থাকাকালীণ সময়ের প্রায় শেষ দিকে এসে, ঠিক আড়াই বছরের মাথায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরপত্তা সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে অবৈধভাবে এক্সেস নেন এবং প্রচুর গোপন তথ্যাবলী সংগ্রহ করে নেন।

এই অপরাধের  জন্য তাকে পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য কারাদন্ড দেয়া হয়।  পাঁচ বছরের কারাদন্ড শেষে বেরিয়ে এসে তিনি নিজেকে অনেকটাই শোধরে নেন। বর্তমানে তিনি  Mitnick Security Consulting, LLC নামে কম্পিউটারের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি প্রতিষ্ঠান চালান।

 

জনাথন জেমস(Jonathan James)

হ্যাকার হিসেবে জনাথন জেমস মূলত  “c0mrade,” সাংকেতিক নামেই বেশি পরিচিত। খুব ছোটকাল থেকে হ্যাকিং শুরু করা এই ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্যে অবৈধভাবে এক্সেস নেয়ার জন্য কারাদন্ড ভোগ করেছেন।

এমনকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা’র প্রায় $1.7 মিলিয়ন ইউ এস ডলারের সমমূল্যের সোর্স কোড চুরি করে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র এটা বুঝার জন্য যে  International Space Station  ঠিক কিভাবে কাজ করে!
তাঁর এই কৃত কর্মের দরুন নাসাকে প্রায় তিন সপ্তাহের মতো তাদের পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ রেখে তদন্ত চালাতে হয়, যাতে করে আরো প্রায় $41,000 ইউ এস ডলার এর মতো খরচ হয়।

২০০৭ সালে বেশকিছু বড় মাপের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সাইবার আক্রমনের স্বীকার হলে তারা এরজন্য জনাথন জেমস কে দায়ী করে। যদিও জনাথন জেমস প্রত্যেকবারই এসব অভিযোগের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টটা অস্বীকার করেন। ক্রমশ যখন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা বেড়েই চলছিল, তখন তিনি অনেকটাই মানুষিকভাবে অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলসরূপ ২০০৮ সালে তিনি আত্নহত্যা করেন ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

আলবার্ট গঞ্জালেজ(Albert Gonzalez)

আলবার্ট গঞ্জালেজ ছিলেন ShadowCrew নামের একটি হ্যাকার সংগঠনের দলনেতা। বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করা ছাড়াও আলবার্ট গঞ্জালেজদের এই প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য বীমা কার্ড, জন্ম নিবন্ধন  এবং পাসপোর্ট বানানোর সাথেও জড়িত ছিল।
ধারনা করা হয় দুইবছরের মধ্যে আলবার্ট গঞ্জালেজ প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করেছিলেন। এছাড়াও তিনি TJX Companies এবং Heartland Payment Systems এর ডেটাবেজে প্রবেশ করে তাদের সংগ্রহে থাকা প্রায় সমস্ত ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করে নেন।

এসব অপরাধের শাস্তিস্রুপ তাকে বিশ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ তার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

কেভিন পলসেন(Kevin Poulsen)

কেভিন পলসেন  পরিচিত “Dark Dante,”  নামে।  নিজেকে এমন আজগুবী নামে পরিচিত করা এই লোকটির কাজকারবারও আজগুবী ধরনের। টেলি নেটওয়ার্কিং এর উপর দক্ষ এই ব্যাক্তি একবার একটি রেডিও চ্যানেলের কোন একটি  প্রতিযোগীতার ফোনলাইন হ্যাক করে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে সিলেক্ট করে দিয়েছিলেন।  সচরাসচর বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে “Hannibal Lecter of computer crime” বা “কম্পিউটার অপরাধের হেনবিবল লেকটার”  নামে অভিহিত করে থাকে।
যদিও শুধুমাত্র একটি রেডিও শো এর টেলিফোন লাইন হ্যাক করার কারনে তাঁর এতো নামডাক বা কুখ্যাতি না। তিনি মূলত সকলের দৃষ্টিতে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সিস্টেম থেকে তথ্য চুরি করে।  FBI তাকে “Most wanted” ঘোষণা করার অনতিকাল পরেই তিনি একটি সুপারমার্কেট থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
পরবর্তীতে তাকে ৫১ মাসের কারাদন্ড এবং প্রায় $56,000 ইউ এস ডলার জরিমানা করা হয়।

১৯৯৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কেভিন পলসেন নিজেকে অনেকটাই বদলে ফেলেন এবং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। ২০০৬ সালে MySpace একটি সৌশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে  তিনি প্রায় ৭৪৪ জন  যৌন অপরাধীকে ধরিয়ে আবারো বেশ আলোচিত হন ।
বর্তমানে তিনি Wired ম্যাগাজিনে সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ(Julian Assange)

মাত্র ১৬ বছর বয়স থেকে হ্যাকিং শুরু করা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন গোপন তথ্য ফাঁস সংক্রান্ত ওয়েবসাইট উইকিলিকস এর জন্য বিশ্ব জুড়ে বেশ আলোচিত। হ্যাকিং জগতে তিনি মূলত “Mendax”  নামটি ব্যবহার করেন।  হ্যাকিং জীবনের শুরুতেই প্রায় চার বছর ধরে তিনি বিভিন্ন কর্পোরেট ও সরকারী প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজে এক্সেস করেন এবং প্রচুর পরিমাণে গোপন তথ্য চুরি করে নেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে  Pentagon, NASA, Lockheed Martin, Citibank, এবং Stanford University এর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
২০০৬ সালে  জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ উইকিলিকস একটি গোপন তথ্য ফাঁস করার প্লাটফরম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং একে একে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গোপন তথ্যাবলী গোপন সূত্র থেকে প্রকাশ করতে শুরু করেন।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁর বিরুদ্ধে  তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও দায়ের করা হয়।

বর্তমানে তিনি লন্ডনে অবস্থিত Ecuadorian embassy, যুক্তরাষ্ট্র দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য অনেকটা  গৃহবন্দি জীবন যাপন করছেন।

 

মতামত জানান