অন্ধকারের ছায়া – ২

দুই

 

বারান্দার সামনে দাড়িয়ে শীতে হুহু করে কাঁপছিলো শাহজাহান। ধানের চারা তুলে বিলে ধুতে গিয়ে সেও দু একটা ডুবে দিয়ে এসেছে। ভেজা কাপড় ছাড়লেও শীত তার পিছু ছাড়ছেনা। নারকেল গাছটায় ওধারে একটু রোদ পড়েছে। সরে সেখানে দাঁড়াল সে। ভুঁইয়ার কাছে সে কিছু টাকা পায়। বড় মেয়ে ফুলমতী মারা যাবার পর আরও তিনটি মেয়ে হয় শাহজাহানের। বড় দুটোয় বিয়ে হয়ে গেছে। বড়টার নিলক্ষা।মেঝোটার কাছেই। মনিপুরা বাজারের পেছনে নতুন যে ইটের ভাঁটা হচ্ছে সেখানে। সোমবার আজ। মনিপুরার হাট। বাজারে কিছু কাজ ছিলো , সেইসাথে মেয়েটাকেও দেখে আসার ইচ্ছে আছে তার।
দুপুর পড়ে এসেছে। গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে উশখুশ করে শাহজাহান। ভুঁইয়া গেছে বাজারে। পুরনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর উঠছে তার। ময়মনসিংহ থেকে ভাড়া করে মিস্ত্রি এনেছেন। সে এক বিরাট ব্যাপার। গাঁয়ের লোক এসে দলবেঁধে মিস্ত্রিদের কাজ দেখে যায়।
ভুঁইয়ার নাম ইমান উদ্দিন। পুঁটি হাজির দ্বিতীয় পক্ষের বউ এর দু সন্তান হয়। বড়জনের নাম জালাল। জালাল ভুঁইয়ার সংসারে মন নেই। বাড়ি আসে বছরে দু একবার। যাত্রার দলে দলে ঘুরে বেড়ায় সে। কয়েকটা যাত্রা লিখে নামও কামিয়েছি বেশ।
টাকার টান পড়লে বাড়ি আসে , ভাইয়ের কাছে জমি বন্ধক রেখে আবার গায়েব।
ভুঁইয়া বাড়ির কর্তা এখন ইমান উদ্দিনই।
ব্যবসায় মার খেয়ে শাহজাহান যখন দু চোখে অন্ধকার দেখছিল , সেসময় একদিন ভুঁইয়া তাকে ডেকে বলল ,
: শাজান মিয়া ,হুনলাম ব্যবসায় মন নাই ? ব্যবসা নাকি কমতি ?
: হ , ভুঁইয়া সাব।ভাল্লাগেনা ।
উদাসভাবে বলেছিল শাহজাহান ।ভুঁইয়া শুনে মুচকি হাসেন। ঘন কলপ দেয়া দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন ,
: ব্যবসা ভাল্লাগেনা তো কি করবা ?
শাহজাহান চুপ করে থাকে । কথা বলেনা ।
: কাম করবা ? খেতের কাম ?
শেষে ভুঁইয়াই বলেন। শাহজাহান মাটি খুড়ে। কি বলবে ভেবে পায়না।
: শরম পাইলা নাকি ? শরমের কি আছে মিয়া ,কাম করবা ভাত খাইবা ।কামে শরম নাই। কাল থেইক্কা লাইগা যাও ।
শাহজাহান সেদিন , আইচ্ছা বলে ভুঁইয়ার খেতের কাজে শামিল হয়ে গেল।
: শাজান মিয়া কহন আইলা ?
ভুঁইয়ার কথায় চমকে উঠে সে।
: এই অহনই ..
: ভাত খাইছ ?
: হ , সাইফুল দিলো ।কইল আফনে বাজারে ।
: কিছু বাজার সদাই ছিল।
ভুঁইয়া ঘরে ঢুকে যান। শাহজাহানের চিন্তা আরও বেড়ে যায়। সে নারিকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে উশখুশ করে।টাকাটা তার খুব দরকার। একবার ভাবে ডাকে। কিন্তু মন সায় দেয়না। পরক্ষনে আরেকটা কথা মাথায় আসে তার। করিম মিয়ার কাছে কিছু টাকা পায় সে। অবশ্য না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অবশ্য একবার চেয়ে দেখা যায়। শাহজাহান মনস্থির করে ফেলে। কিন্তু ফেরা আর হয়না। দু পা বাড়াতেই…
: শাজান মিয়া ঘরে আস!
ভুঁইয়ার ডাক ভেসে আসে ঘর থেকে। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে ।
ঘরে ঢুকতে ভুঁইয়া বলেন ,
: তোমার মন অয় কিছু লেনদেন আছে। ভাইঙ্গা ফালায় কি কও ?
শাহজাহান মুচকি হেসে খাটের পাড় ধরে নিরীহের মত দাড়িয়ে থাকে।

মেয়ের বাড়িতে থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায় শাহজাহানের। মনিপুরার বড় রাস্তা পেরিয়ে একটা খেতের আইল ধরে এগোয় ও। দু পাশে বিস্তীর্ণ খোলামাঠ। আকাশে আবার আজ একটা চাঁদ উঠেছে। শাহজাহান চড়া গলায় গান ধরে ,
নীরব প্রেমের আগুন জলে
ঝরে আগুন নেভেনা
বন্ধু তোরে না দেখিলে
আমার যে রাত কাটেনা ..
কেরানীর পুকুরটা পেরিয়ে জংলা রাস্তাটার কাছে আসতেই পেছন থেকে যেন কে ডেকে উঠে ।
: শাজান ভাই খাড়াও ..
শাহজাহান দাড়িয়ে পড়ে । একটা ছায়ামূর্তি দেখা যায়। চাঁদের আলোয় ঠিক কে ঠাওর হয়না শাহজাহানের।
: কে ডারে ? মতি নি ?
অনুমানের উপর বলে সে ।
: হ ভাই। খাড়াও আমিও যামু।
: কই গেছিলি ?
মতি মিয়া দৌড়ে শাহজাহানের কাছাকাছি আসতেই বলে শাহজাহান।
: শশুর বাইত গেছলাম ভাই। বউডা পোয়াতি। দোয়া কইর ভাই , এবার যেন একটা পোলা অয়।
: হ ..দোয়া ত আছেই।
শাহজাহান কেমন উদাস হয়ে পড়ে। ছেলের আশায় তিনটা মেয়ে নিয়ে মহা বিপাকে পড়েছিল সে। বাজারের ঘরটা আর চরের একটা টুকরো জমি বিক্রি করে দুটোকে ঘাড় থেকে নামাতে পাড়লও শেষেরটা এখনও ঘাড়েই ঝুলে আসে।
: শাজান ভাই তুমি কই গেছিলা ?
: মনিপুরা ।
: মাইয়ার বাইত ? মাইয়ার সুখশান্তি কিমুন ?
: আর সুখ শান্তি ..
শাহজাহান কথার মাঝখানে থেমে একটা বিড়ি ধরায়। তারপর ফুক এক করে একটান মেরে বলে ,
: হাওরিডা বড়ই দজ্জাল। দিনরাইত মাইডারে খাডায়।
শুনে আফসোস করে মতি ।
: জামাই ফিরছে বিদেশতে ?
: নাহ! দাওয়ার সম আইবার কথা ।
শুনে এবার নিজের কথা শুরু করে মতি।
: বড়ডার লাইগ্গা একটা সমন্ধ আনছে গাজি মিয়া ।
: জামাই কিয়ারে ? বাড়ি কই ?
: কইলত মেটিক পাশ। নসুন্দি নাকি কিয়ে চাকরি করে।ওরা কয় বোশেখেই তারিখ ফাইনাল ।
: মাইয়া কি কয় ?
বিড়িটা সদ্য রোপা ধানের খেতে ছুড়ে ফেলে শাহজাহান ।
: মাইয়া কয় লেখাপড়া কইরব। আল্লার রহমত মাইয়ার আমার মাথা ভালা ।সিক্সে উঠছে ইবার । মাষ্টাররা সুনাম কয়।
কথাটা বলে কেমন যেন উদাস হয়ে যায় মতি মিয়া ।হয়ত লেখাপড়া আর বিয়ে নিয়ে ভাবে। কোনটা ভাল হবে ?
: কি কও ভাই , বিয়া দিয়া দিমু ? না লেহাপড়া করামু ?
শেষে শাহজাহানকেই জিজ্ঞেস করে বসে সে।
: মাইয়া মানু , এত লেহাপড়ার দরকার কি ?
শাহজাহানের কথায় আনমনে মাথা নাড়ে মতি মিয়া।
আর কথা এগোয়না ওদের। বিলপাড়ের পাশ দিয়ে দুটো রাস্তা এগিয়েছে দুদিকে। মতি মিয়ার বাড়ির ঐ রাস্তার পাশের মসজিদের কাছেই।
সে দ্বিতীয় রাস্তা ধরে চলে যেতেই আবার একা হয়ে পড়ে শাহজাহান ।
একটু এগিয়ে রাস্তাটা আবার একটা পুকুরের পাড় ঘেঁসে মোড় নেয় । পুকুরটা পাড়ে ঘন ইওরের ঝুপ। হঠাত্ থমকে দাড়িয়ে পড়ে শাহজাহান। চাঁদের আলো পুকুর পাড়ে একটা ছায়ামূর্তির মত কি যেন একটা দৌড়াদৌড়ি করছে। তারপর সেটা ঝুপের আড়ালে গিয়ে যেন শূন্যে মিলিয়ে যায়। কেমন যেন একটু ভয় ভয় করে শাহজাহানের। ওটাকি কোন মানুষ ছিল ?
নাকি …
সাহস করে আরেকটু সামনে এগোয়। ঝুপটা এখনও তীরতীর করে নড়ছে। ঝুপের মাঝ দিয়ে চলে গেছে সরু রাস্তাটা ।
রাস্তাটায় কি যেন একটু পড়ে আছে। জায়গাটায় চাঁদের আলো তেমন পড়েনি ।ঝুপটা ঘিরে রেখে তিনপাশে। শাহজাহান আন্দাজে হাত বাড়ায়।হাতে নরম মত কি যেন একটা ঠেকে।
ঝুপ থেকে দ্রুত বেড়িয়ে বড় রাস্তায় উঠে চাঁদের আলোয় চোখের সামনে মেলে ধরে সে ওটা। একটা মাফলার। এখনও বেশ গরম ঠেকে এক পাশটা। তারমানে ছায়াটা কোন মানুষেরই ।
কিন্তু কে হতে পারে মানুষটা ?
শাহজাহান ভেবে পায়না । কিংবা ভাবেওনা। এই দুর্মূল্যের বাজারে একটা মাফলার কুড়িয়ে পাওয়াকেই সহসা বড় মনে হয় তার কাছে।

যে বইগুলো কিনতে পারেন ডিস্কাউন্ট রেটে থেকে:

Loading books...