এক

একদুপুর নদীতে ডুবিয়ে চোখ লাল করে পাড়ে উঠে রোকন। খোকন তখনও ডুবিয়েই চলেছে। দেখে মনে হচ্ছে সহসাই উঠার কোন ইচ্ছা তার নেই। গা গতর বছর মুছে নদীর পাড়ে যেখানটাতে রোদ পড়েছে শীতে কাপতে কাপতে গিয়ে সেখানটাতে দাঁড়ায় রোকন। খোকনকে ডাকে, ভাই এইবার উইঠা আয়, দেড়ি করলে মায় মারবো।
খোকনের অবশ্য তাতে খুব একটা হুশ হলোনা। সে দ্বিগুণ উৎসাহে পানির মধ্যে হাপুশ করে ডুব দিতে দিতে বলে, মারুকগা; প্রতিদিন কি আহি?
খোকনের কথাই তো ঠিক। প্রতিদিন দিন আর নদীতে গোসলের ভাগ্য হয় ওদের? ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে নদীটা গেছে সেটা এখন শুকিয়ে খাক।  ভরা বর্ষা বাদলের দিনেও হাটু অবদি পানি জমেনা সেখানে। এক সময়ের ভয়াবহ স্রোতের নদীকে দেখলে মানুষ আজকাল খাল ভাবতেও দ্বিধা করে।   
আর তাই বছরান্তে যে  দু একবার মায়ের সাথে নানু বাড়ি আসে ওরা, কেবল তখুনি নদী মিলে ওদের । আর সে সুযোগটা হেলায় ফেলায় এড়িয়ে যেতে পারেনা খোকন। যত বেশি মজা একবারে নিয়ে যাওয়া যায় তত ভালো। সে ডুবিয়েই চলে।
পাড়ে দাঁড়িয়ে এবার জন্য রোকনেরও এতো দ্রুত উঠে পড়ায় একটু একটু আফসোস লাগতে শুরু করে। আবার নামবে কীনা ভাবে সে। কিন্ত রোদের ওম পেয়ে শীতের ভয় ঝেকে ধরেছে ওকে। তাই আবার পানিতে নামার কথাটা পরক্ষনেই বাদ দেয় সে।
কিন্তু ওদিকে ওর ভাই ওর চেয়ে বেশি মজা করে ফেলছে এটাও যেন মেনে নিতে পারেনা। তাই খোকনকে উঠানোর জন্য ভয় দেখিয়ে বলে, ভাই উঠ, দেখ মামা আইতাছে লাঠি নিয়া।
রোকনের কথায় ধরফর করে পাড়ে উঠে খোকন।  তড়িঘড়ি করে কাপড় চোপর পড়ে নিয়ে রোকনের কাছে গিয়ে দাড়ায়।  
জিজ্ঞেস করে, কই? মামা না আইতাছে কইলি?
রোকন হাসে। খিলখিল করে হাসে। বলে, মিছা কইয়া উঠাইছি তরে।
মুহূর্তেই পুরো ব্যাপারটা ধরতে পারে খোকন। ছোট ভাইয়ের কথায় বোকা বনে গিয়ে একটু যেন লজ্জাও পায় সে। আর তারপরেই সে লজ্জা গিয়ে পরিণত হয় রাগে। মুখ শক্ত করে বলে, মিছা কস আমার লগে! বিকালে কইছিলা না মেলায় নিয়া যামু? এহন আর নিমুনা তোরে!
রোকন বলে, না নে! আমি মামার লগে যামু!
কথাটা শুনে যেন এক মুহূর্তের জন্য মিইয়ে পড়ে খোকন। আর তারপরেই কি যেন একটা কথা মনে আসতে আমার মুখ উজ্জল হয়ে উঠে ওর।
“ যা দেখি মামার  লগে, মামা যে সহালে ডিউটিত গেলো মনে নাই?”
কথাটা শুনেই মুখ শুকিয়ে যায় রোকনের। সত্যিই তো, আজতো মামা সকাল সকাল ই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেছে। কোথায় যেন কাজ আছে। সন্ধার আগে বাড়ি ফেরার কোন আশা-ই নেই। কথাটা একেবারেই মনে ছিলনা ওর। মনে থাকলে কি আর এমন করে খোকনে রাগিয়ে দিতো ও। ভয়ানক আফসোস হয়। এবার যদি সত্যি সত্যিই খোকন কে মেলায় না নিয়ে যায়?
ভোল পালটে গেছে দুজনের। এতোখন হাসতে থাকা রোকনের মুখ এখন শুকনো। খোকনের মুখ হাসি  হাসি। সে গামছাটা কাধে ঝুলিয়ে বাড়ির পথে হাটতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। তার পিছু পিছু পুলিশের কাছে সারেন্ডার হওয়া অপরাধীর মতো মুখ করে রোকনও হাঁটে।

দুই

রোকন কান্নার স্বরে বলে, মা ভাইরে কওনা আমারে নিয়া যাইতে! 
মা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। তিনি সেখান থেকেই চেচিয়ে বলেন, এই খোকন, রোকনরে লগে নিয়া যা!
নতুন কাপড় পড়ে, চুলে চপচপে করে তেল দিয়ে আয়নার সামনে চিরুনি বুলিয়ে নিচ্ছিলো খোকন। তার পেছনেই দরজায় রোয়াকে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোকন। চুলে চিরুনি বুলাতে বুলাতে একবার সেদিকে ফিরে তাকায় খোকন। মাথা ঘুরিয়ে বলে, মারে কইলে কি অইব? তোরে আমি লগে নিমুনা!
রোকন এবার দ্বিগুণ জুড়ে চেচায়, ও মা… নিবনা নাকি কয়…।
মায়ের উত্তর আসার আগেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ে খোকন। পিছু নেয় রোকনও । মায়ের কাছে বিচার দিয়ে যে আর কিছু হবেনা সেটা এতোখনে বুঝে গেছে সে। তাই ভাইয়ের পিছু পিছু গিয়ে অনুনয় করে এবার, “ও ভাই, নিয়া যা না আমারে!”
খোকন হাটতে হাটতে মুখ শক্ত করে বলে, “না!”
“আল্লা কসম আর মিছা কথা কমুনা। কোরান শরীফের কিরা”
খোকনের তাও মন গলেনা। সে হাটতেই থাকে। একদম মিয়া পাড়ার জঙ্গলা জায়গাটার কাছে এসে দাঁড়ায় সে । রোকনও আসে তাঁর পিছু পিছু।
ভাইয়ের চোখে সহসা খুব মায়ার চোখে তাকায় খোকন। একটা দিকে হাত তুলে নরম স্বরে বলে, রোকন দেখ ঐইডা  কি?
বাড়িয়ে বাড়ানো হাতের নির্দেশিত দিকে চোখে ফিরিয়ে তাকায় রোকন। একটা খালি পথ, কিছু গাছ আর ধূলোর মধ্যে গড়াগড়ি খেতে থাকা কিছু চড়ুই পাখি বাদে আর তেমন কিছুই চোখে পড়েনা ওর।

ফিরে ভাইকে জিজ্ঞেস করতে যাবে, দেখে ভাই ততোক্ষনে লাপাত্তা। খোকনযে ওকে ফাকি দিয়ে পালিয়েছে সেটা বুঝতে বাকি থাকেনা আর। সশব্দে চিৎকার  করে উঠে। দৌড়ে ঢুকে যায় জঙ্গলের পথটা দিয়ে। চেচাতে থাকে, “অই ভাই নিয়া যা আমারে… অই ভাই…। ”

 

রোকনের গলার আওয়াজ কমে যেতে ঝুপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে আসে খোকন। রোকনটাকে পিছু ছাড়াতে পেরে ভারি একটা আনন্দ হয় ওর।  এবার নিশ্চিন্তে মেলায় যাওয়া যাবে। ফুরফুরা মন নিয়ে হাটতে থাকে সে। জঙ্গলা পথটা পেরিয়ে গিয়ে বড় রাস্তায় উঠে। বড় রাস্তা পেরোলে পড়ে চুনা দিঘির পাড়, সে পাড় ধরে খানিকটা পেরোলেই চোখে পড়ে একটা বিশাল মাঠ। অন্য সময় এখানে ধান লাগানো। কিন্তু এখন ধান কেটে ফেলায় বিশালটা মাঠটা একদম খালি। সে মাঠেরই এক কোনে কাপড়ের প্যান্ডেল টানিয়ে মেলা বসেছে। খোকন যত কাছে এগোচ্ছে ততো ভিড় বাড়ছে। শয়ে শয়ে লোক, শয়ে দোকান আর শয়ে শয়ে আজব সব জিনিস। হই হট্টগোল যেন লেগেই আছে। মেলায় ঢুকার গেইট পেরোতেই শুরু হয়ে যায় পসরা সাজিয়ে বসা দোকানের লাইন। কোথাও জিলাপি ভাজছে তো কোথাও মিষ্টি সাজিয়ে বসেছে। কোথাও মাটির ঘোড়া, হরিণ, বাঘ আবার কোথাও মেয়েদের মনহরী পণ্য। হাটতে হাটতে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে খোকন। দোকানটাতে হরেক রকম প্লাস্টিকের জিনিসপত্রে ভরা। ওর নজর গিয়ে পড়ে একটা চাইনিজ বন্দুকের উপর। একটা খেলনা বন্দুকের অনেকদিনের শখ ওর। সেই পাড়ায় একবার বাবলুর হাতে দেখেছিলো। কি সুন্দর লাল নীল রঙ করা। ট্রিগারে টিপ দিলে আবার “ঠেই… ঠেই” করে গুলির আওয়াজ হয়। অনেকদিন ধরে পয়সা জমিয়েছে সে। এবার না কিনে ফিরবেনা ও।

তিন

সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেছে। মা খালারা দাওয়ায় বসে চুলে বিলি কাটছিলেন। এমন সময় বাড়িতে “ঠেই ঠেই” করে বন্দুক চালিয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়িতে এলো খোকন।
ঢুকেই বললো, “মা দেহ কি আনছি…রোকন কই?”
মা অবাক হয়ে বললেন, রোকন না তোর লগেই মেলায় গেলো?
মায়ের কথা দাঁড়িয়ে পড়ে খোকন। বন্দুকের “ঠেই ঠেই” বন্ধ হয়ে যায়। একবার আস্তে করে বলে,  “অই এহনও বাড়ি আহে নাই?”
উত্তরের অপেক্ষা করেনা আর। এক দৌড়ে আবার বেড়িয়ে যায় বাড়ি থাকে। সোজা গিয়ে থামে মিয়া বাড়ির জঙ্গলের কাছে। হাপিয়ে উঠেছে সে। তাই দাঁড়িয়ে খানিকটা জিরিয়ে নেয় ও। জঙ্গলের মুখে চিৎকার করে ডাকে, “রোকন… অই রোকন…”
কোন উত্তর আসেনা। এতোখনে রাত নেমে এসেছে। ঘন অন্ধাকারে ঢেকে রেখেছে জায়গাটে। ভূত প্রেতের আড্ডাখানা এই জঙ্গলের কাছে অন্যদিন হলে এই রাতের বেলায় আসার চিন্তাও করতে পারতোনা খোকন। কিন্তু আজ অন্য ব্যাপার। দ্রুত পায়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে সে। ভয় করেনা। গা ও ছমছম করেনা। তাঁর মাথায় এখন একটাই চিন্তা। ভাইকে খুঁজে বের করা।
কিছুদুর এগিয়ে আবার ডাকে সে, “রোকন… ঐ রোকন”।
জঙ্গলের প্রতিধ্বনি তুলে ওর ডাক। কিন্তু কোন উত্তর আসেনা। সহসা একটা শব্দ এসে কানে বিঁধে ওর। যেখানে ও এখন দাঁড়িয়ে আছে, তাঁর থেকে খানিকটা এগুলেই একটা প্রকান্ড বট গাছে। সে বটগাছের নীচে বসে কে যেন জিরিয়ে জিরিয়ে কাদছে। পেত্নি নাকি?
হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে যায় খোকন। একবার ভাববে পালিয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষনেই আবার খানিকটা সাহস সঞ্চার করে। কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে যায় বটগাছটার দিকে। কাছাকাছি যেতে এবার ছায়াটা ভালো করে চোখে পড়ে ওর। কে যেন হাটু মুড়ি দিয়ে বসে আছে।
“রোকনা না?” রোকনইতো। কাছে যেতেই স্পষ্ট হয়ে উঠে খোকনের কাছে। মেলায় যেতে না পেরে এই অন্ধাকারেও অভিমান করে বসে আছে সে।
খোকন বলে, “অই রোকন বাড়ি চল”। রোকন গুঙ্গিয়েই চলে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “না… যামুনা। তুই আমারে মেলায় নেস নাই।”
খোকন হাত ধরে টানাটানি করে। রোকন উঠেনা।
শেষে  সদ্য কেনা বন্দুকটা এগিয়ে দেয় ছোট ভাইয়ের হাতে।
“দেখ মেলারতনে তোর লাইগা কি আনছি।”। ট্রিগার চাপতেই লাল নীল আলো জ্বলে উঠে বন্দুকে। সেই নিশ্চুপ বনে “ঠে ঠে ” করে আওয়াজেই ফাকে খিল খিল হেসে উঠে রোকন। বলে, “হাছা হাছাই এইডা আমার? পরে আবার নিয়া নিবিনাতো?”


চার   

খোকন বলে, এই সুন্দর লালফুলটা আমার।
রোকনে বলে, এই দেশের যত লালফুল আছে সব আমার।
– তাইলে এই বিশ্বভর্তি যত ফুল আছে সব আমার।
– সৌদি, মালোশিয়া, এণ্ডিয়ার, আম্রিকার সব ফুল আমার।
– দেখ গাধায় কয় কি। বিশ্ব হইছে সব চাইতে বড়।  সৌদি, মালোশিয়া, এণ্ডিয়ার, আম্রিকার চাইতেও বড়।
– আইচ্ছা তাইলে, তুই যত কবি তার চাইতে এক বেশি ফুল আমার।
– হ… কইছে। তোর থেইক্কা একশো বেশি, হাজার বেশি, লাখ লাখ কোটি কোটি বেশি ফুল আমার।
ভাইয়ের কথায় এবার যেন খানিকটা চিন্তায় পড়ে যায় রোকন। কোটির চেয়ে আর বড় কোন সংখ্যা আছে কীনা তার জানা নেই। কিন্তু ভাইয়ের কাছে হারতেও যেন সে রাজি নয়। তাই অনেক ভেবে চিনতে বলে, তুই যত কবি তার থেকে কোরান বেশি, হাদিস বেশি, আল্লা বেশি আমার।
খানিকটা থমকে যায় খোকন। কোরআন, হাদিস, আল্লাহর চেয়ে আর বেশি কিছু ভাবতে পারেনা সে। কিছু বললেও আবার পাপ হতে পারে। খানিকটা যেন মিইয়ে যায় সে। তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ধুম করে বার কয়েকটা কিল বসিয়ে দেয় রোকনের পিঠে। ছোট ভাইয়ের কাছে আবারও হেরে গিয়ে রাখে যেন ফেটে পড়ে সে। বলে, “যেনে হেনে আল্লার নাম লস। গোনা হইবনা তোর?”
রোকন আকস্মিকতায় কিছু বুঝে উঠতে পারেনা। কিল খেয়ে একবার ক্রদ্ধ চোখে খোকনের দিকে তাকায়। কিন্তু পরক্ষনের চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে ওর। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমারে মারছস! মার কছে বিচার দিমু”
খোকন আমার তেড়ে আসে। রোকনের ঘাড় ধরে ধাক্কা সজোরে ধাক্কা মারে সে। “যা, দে গিয়া বিচার।” । টাল সামলাতে না পেরে উল্টে পড়ে রোকন। তারপর উঠে সজোরে চিৎকার করতে করতে বাড়ির দিকে ছুটে সে।
রোকন চলে যেতে রাস্তার পাড়টাতে বসে পড়ে খোকন। পথটা লাল বনফুলে ছেয়ে আছে। ওদের ধাপাধাপিতে অবশ্য কয়েকটা ফুল থেতলে গেছে। সেদিকে একবার তাকায় খোকন। তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। মনে মনে ভাবে,”বজ্জাতটারে গতকাল  বন্দুকটা দেয়াই ভুল হইছে। মহাভুল! ”

মতামত জানান