ধারাবাহিক জঙ্গলে মঙ্গল নেই - 1 পর্ব (4)

এক

ফোনে কথা বলতে বলতে ওপর থেকে নেমে এলেন অমিতাভ চ্যাটার্জী।কথার ফাঁকে ফাঁকে হো..হো..হা..হা.. করে হাসির একটা ঢেউ খেলে গেলো তার মুখে।মানুষটা সব সময় একটু গোমট টাইপ হয়ে থাকলেও কথার ছলে লোকের মনোরঞ্জনে খুব এক্সপার্ট। তিনি বাংলাদেশ বন বিভাগের একজন উপরস্থ কর্মকর্তা।সাথে কিছু সংগঠনের গুরু দায়িত্বে আছেন।কর্ম ব্যস্ততার গলাচাপা ধকলের কারণেই, সময় মতো বিয়েটা করা হয়নি।চাকরির সুবাদে ঢাকায় আসা।আর ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য গাজীপুরের কোথাও এক বিঘা জমির ওপর একটি বাড়ি কিনে নেন।তিন তলা এই আলিসান বাড়িতে মাত্র দু’জনের বসবাস। অমিতাভ আর ভানু ।পূর্ব-পুরুষগণ সবাই ছিলেন কোটিপতি সেই সূত্রে কোন কিছুর অভাব নেই তার।আম,জাম,কাঁঠাল থেকে শুরু করে এমন কোন ফল গাছ নেই যা এ বাড়িতে নেই। এতো গাছ তিনি লাগিয়েছেন যে, তার বাড়িতে সূর্যের আলো তো দূরের কথা হয়তো সূর্য নিজেই ভুলে গেছে এখানে এক সময় একটা বাড়ি ছিলো।তবে পুরো বাড়িটা এমন ভাবে সাজানো, যে কেও বলতে বাধ্য হবেন অসাধারণ! বাড়ির চারদিকে ফুল বাগান আর সবুজ ঘাস মাদলের মতো করে বিছিয়ে আছে।সামনের দিকটায় একটা ছোট পুকুর আছে।তাতে শাপলা ফোটে।সব মিলিয়ে বাড়িটা বেশ দৃষ্টি নন্দন।

গাড়িটা আজ সকাল থেকেই গণ্ডগোল করছিলো।স্টার্ট নিচ্ছে না।কেমন যেন কুতকাত করে কুতিয়ে উঠে আবার স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়, মাঝে মাঝে ইঞ্জিনে ধাক্কা লেগে বেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে। পুরোনো গাড়ি বললে ভুল হবে না,তবে এতো পুরোনোও নয়।পুরনো আর আধুনিক এর মাঝেই কিছু একটা হবে।কান থেকে ফোনটা নামিয়ে রাখতে জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন অমিতাভ।কিরে ভানু কতদূর? আমার হাতে একদম সময় কম।বাপের বাড়িতো আর মুখের কথা না।অনেকটা পথ যেতে হবে। আজ্ঞে মশাই একটু সবুর করুন এইতো হয়ে গেছে।কিছুটা কাচুমাচু করে বলল, ভানু।টেকো মাথা আর আধঝোলা ভুড়ি ওয়ালা বেটে লোকটা নাম ভানু দাস।অমিতাভের বাড়ির অন্যতম সদস্য। পুরনো ড্রাইভার হওয়ায় এ গাড়ির নাড়িনক্ষত্র তার জানা।গতরাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল।হয়তো কোথাও কোন ফুটো ছিল আর তাতে পানি ঢুকে পড়েছে।তেলের টেঙ্কে পানি ঢুকলে-ও এমন হয়।বহু কসরত করে তেল পাল্টে নতুন তেল ভরে গাড়ি স্টার্ট দিলো ভানু।

চলতি পথে তেমন ঝামেলা হলো না শুধু মাত্র চুরচুরে একটা শব্দ ছাড়া।হয়তো কোন পার্স বদলে নিতে হবে।সে না হয় নেয়া যাবে কিন্তু ভানুর ভ্রু বাঁক ধরেছে অন্য কারণে। পুরোটা পথই গাড়ি কেমন হেলেদোলে চলছে। যদি মাঝ পথে ইঞ্জিন বিগড়োয় তবে এতখানি রাস্তা অমিতাভ বাবুকে ঘাড়ে করে নিতে হবে।যাই হোক কোন মতে পৌঁছাতে পারলেই হলো।সামনে একটা তেল পাম্প দেখা যাচ্ছে। ভানু একটু ইতস্তত করে বলল, বলছি কি মশাই সামনের ওই পাম্পে আমরা থামবো,তেল নিতে হবে আর কিছুক্ষন বিশ্রাম করে তারপর না হয় আবার ছুটবো।অমিতাভ ঘড়ির দিকে চেয়ে বললেন,হুম।পাম্পে এসে ব্রেক কষতেই একটা চাকা ফুস শব্দ করে বসে পড়লো।বেশ ঘন্টা খানিক সময় ধরে চলছে মেরামত কাজ।অমিতাভ রাগে ফুস ফুস করে ফুসছেন,কিছুটা গ্যাস বেলুনের মতো।দাঁতে দাঁতি মেরে বিরবির করে ভানুকে তুলোধুনো করতে গিয়েও ফিরে এলেন।গাড়িটা নষ্ট হওয়ার আর সময় পেলো না।যত্তসব আমড়া কাঠের ঢেঁকি।

পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথধরে এগিয়ে চলছে তারা।গন্তব্য বলিগাঁও।ঘন বন-জঙ্গল আর সরু একটা নদী চলছে তাদের সাথে।আধমরা এ নদীর এক মাথা সোজা বলিগাঁও গিয়েছে আর অন্য মাথা মিলেছে বঙ্গপোসাগরে।ঝর্ণার পানিতেই এ নদীর প্রাণ যাই যাই করে টিকে আছে।এখনো অনেকটা পথ বাকি।তখন গাড়িটা ঠিক করে নেওয়ায় এখন আর সেই চুরচুরে শব্দটা হচ্ছে না।মনে মনে সস্তি পেলো ভানু।প্রতি মাসে অন্তত একবার হলেও অমিতাভ এখানে আসেন।জরুরী ব্যপার হলেও বার কয়েক আসা হয়।বাপ দাদার ভিটা তিনি ভুলতে পারেন না।এক সময় এ গ্রামে চ্যাটার্জী বংশের বেশ নাম ডাক ছিলো।অমিতাভের বাবা রবিতাভ,রবিতাভের বাবা হরিতাভ চ্যাটার্জী। পুরোগাঁও জুড়ে কিছু হিন্দু,বৌদ্ধ ও গাড়োদের বসবাস ছিলো।ক্ষমতার সিংহভাগই থাকতো আদিবাসীদের হাতে।তবুও চেটার্জীদের মর্যাদা ছিলো আলাদা।
সন্ধ্যা নামতেই তার লেজ ধরে নেমে আসে গভীর রাত।এ সময় বনের গভীরে দেখা মিলে সাধু,তান্ত্রিকদের অগ্নি মন্ডপ।নানা তন্ত্রের সাধনা করে তারা।অমাবস্যা,পূজাও পূর্নিমায় এখানে নর বলি দেয়া হয়।

বলিগাঁও পৌঁছাতে রাত তিনটা বেজে গেলো।অমিতাভ বললেন,আরো পাঁচ মাইল পথ।ভাববেন না বাবু।পৌঁছে যাবো,ভানু বললো।বলিগাঁও থেকে চেটার্জী বাড়ির পথ এতোটা সুবিধার নয়।এবড়োখেবড়ো রাস্তা আর খুবই নির্জন। চুরি ডাকাতির বদনাম আছে।তবে অমিতাভ এখন আর এসবে ভয় পান না।গাড়ির শব্দ পেয়ে মজিবর দৌড়ে এসে মেইন গেটের তালা খুলে দিয়ে হাত জোড় করে কুঁজো হয়ে রইলো। গাড়িটা সোঁ সোঁ শব্দ করে স্বজোরে ভেতরে চলে গেলো।এই প্রাসাদের মতো চ্যাটার্জী মহলে আজকাল কেও থাকে না। শুধু অমিতাভ আর ভানু মাঝেমধ্যে আসেন।এর একাংশে মন্দির তৈরী হয়েছে। মজিবরই সবটা দেখে রাখে।চাঁদের আলো আস্তে আস্তে ক্ষিন হতে লাগলো।পূবের আকাশে হল্কা আলোর ছটা ফুটছে।

এক গাল হাসি নিয়ে সূর্যটা পাতাল থেকে আকাশে ওঠে এসেছে।বলিগাঁও এখন আলো ঝলমলে হয়ে উঠছে। বাড়ির দুই পাশে ঘন বন এক পাশে ধানিজমি আর অন্য পাশে বয়ে চলা সেই নদী।অমিতাভের দাদা হরিতাভ চ্যাটার্জী এই নদীকে ধনু নদী বলে নাম করণ করেছেন।ধনুকের মতো বেঁকে চলা এই নদীর জলেই একসময় তার সবকিছু ধুয়েমুছে গিয়েছিল।একথা ভাবতেই চোখ ভিজে উঠে তার।ভোর হতেই ভানু গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরে।মজিবর নাস্তা নিয়ে এসেছে।একটা ট্রেতে এক গ্লাস লাল শরবত ও মাংসের কিমা আর চর্বিতে ভাজা পরটা।অমিতাভ হাসি মাখা মুখে বললেন,মজিবর এ জন্যই তোমার প্রতি আমার এতো দূর্বলতা।লাল শরবত,মাংসের কিমাও চর্বির পরটা আমার খুব পছন্দ। তবে এসব আমি ছড়াতে চাচ্ছি কিন্তু পারছি না।বসয় হয়েছে ঠিকই কিন্তু লোভ একটুও কমেনি।শহরে এসব এমন করে কেও খাওয়ায় না।বাহিরের আলোতে তার চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে। এজন্যই হয়তো তিনি আলো সহ্য করতে পারেন না।মজিবর কথা না বাড়িয়ে বাহিরে বেড়িয়ে এলো।এতক্ষণে ভানু ফিরে এসেছে। অমিতাভের হাতে লাল শরবত দেখে তার চোখ চকচক করছে।মাংসের কিমার লোভে জিব ঝুলে পরবে পরবে ভাব।আর চর্বির পরটার জন্য জীবন যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে।

নাস্তার পর্ব মাত্রই শেষ হলো।সবুজের মায়াময়রূপ আর গাছের ছায়ার আলো আঁধারীতে নিরবে নিবৃত্তে হেঁটে চলেছেন অমিতাভ আর ভানু।পিছনে পা টিপে টিপে কুঁজো হয়ে এগুচ্ছে মজিবর।ঘন জঙ্গলের শেষদিকটায় একটা পাহাড় সোজা উপরে ওঠে গেছে।বেশ খাড়া পাহাড়।সেখানে ঝর্ণা আছে।ঝর্ণার পানি ধনু নদীর একাংশ জুড়ে বয়ে চলে।বিশেষ কোন পূজা ছাড়া এখানে কেউ একটা আসে না।পুরোনো বটের মূলে শিব দেবতার মূর্তি আছে।কাছাকাছি আসতেই নাক বাঁকিয়ে ঝেড়ে অন্য দিক চলে গেলেন অমিতাভ।কিছুটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন বোধহয়।আসলে তিনি শিব দেবতার পূজারী নন।তিনি অন্য এক দেবতার পূজা করেন।এবার নদীর দিকে এগুতেই কি যেনো ভেবে হো..হো.. করে হেসে উঠলেন।আজতো পূর্নিমা তাই না? রাতে পূজায় বেশ আনন্দ হবে বলেই হো..হো.. করে উঠলেন।তবে ভানু ও মজিবর কে চমকে দিয়ে তিনি বললেন এখানের পরিবেশটা দেখতে দারুণ হয়েছে। নদী ঘেঁষে একটা সরকারি গেইস্ট হাউজ বানালে কেমন হয়? তাছাড়া জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। এখানে খুব সহজেই শিকার ধরা যাবে।এই কথার শেষের রেশটা ধরেই অস্ফুটে একটা হাসি দিলেন অমিতাভ।

দুই দিন পর পূজার প্রচলন সেড়ে ঢাকায় চলে এলেন অমিতাভ।সেই সাথে বাংলোর একটা অদৃশ্য ছক।এদিকে অফিসে পুরোদমে কাজ চলছে।চারিদিক থেকে কম্পোজের শব্দ শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে একসঙ্গে একশো নয় আরো বেশি আঙুল কট কট শব্দে কিবোর্ডের শরীর টিপে দিচ্ছে।অন্যদিকে একগাদা ফাইলে নাক ডুবিয়ে বসে আছে আসিফ।কোথায় কি করতে হবে,বিভিন্ন জেলায় চলমান বনজ কাজ কতদূর হয়েছে, নতুন করে কবে কোথায় কাজ ধরবেন তার নকশা করা থেকে শুরু করে হাজারটা কাজ তিনি করে থাকেন।তবে তার বেশির ভাগ কাজ হয় বান্দরবন, রাঙামাটি পার্বত্য এলাকা ও ঘন জঙ্গল কেন্দ্রিক।কাজের চাপ খুব সহজে সামলে নেয়ার মতো অসামান্য প্রতিভা আছে তার।তালুকদার বংশের ছেলে বলে একটু বুক ফুলা ভাবও আছে।সময় সুযোগ বুঝে পুরো অফিস জুড়ে নিজের প্রশংসা নিজেই করে বেড়ান।ঠোঁটে এক ফালি হাসি লেগেই থাকে।মনে হয় সুপার গ্লু দিয়ে একদম ফিক্সট করে রেখেছেন।
বসের রুমে হুট করে ডাক পরলো আসিফের।জরুরী তলব বলে মনে হলো।অমিতাভ আসিফের নিষ্ঠা ও সততার প্রশংসা করে বললেন, তুমি কালই একবার চট্টগ্রামের বলিগাঁও থেকে ঘুরে আসো।ওখানে আমার একটা পুরনো বাড়ি আছে।তুমি সেখানেই থাকবে আমি বলে দিয়েছি।তার পাশে একটা খালি জমি আছে।আমি উপর মহলে ইমেইল করেছি, ফোনে কথাও হয়েছে,হয়তো খুব দ্রুতই পারমিড হয়ে যাবে।আমরা সেখানে একটা গেইস্ট হাউজ করতে চাই। জায়গাটা আমার খুব ভালো লেগেছে।

চলবে…

Series Navigationজঙ্গলে মঙ্গল নেই – দ্বিতীয় পর্ব >>

মতামত জানান