পুরাণ, পাপ ও প্রতিশোধের নীরব বৃত্ত—The Killing of a Sacred Deer রিভিউ

মুভির নাম: The Killing of a Sacred Deer
পরিচালনা: Yorgos Lanthimos
ভাষা: ইংরেজি
মুক্তির বছর: ২০১৭

পুরস্কার: সেরা চিত্রনাট্য (কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল২০১৭)

আধুনিক সভ্যতার চকচকে আবরণ ভেদ করে যখন কোনো প্রাচীন অন্ধকার নিঃশব্দে উঠে আসে, তখন মানুষ বুঝতে পারেসময় বদলায়, কিন্তু নিয়তির স্বরূপ বদলায় না Yorgos Lanthimos এর ২০১৭ সালের চলচ্চিত্র The Killing of a Sacred Deer ঠিক এমনই এক অদ্ভুত শীতল অন্ধকারের গল্প ছবির প্রধান চরিত্রে রয়েছেন Colin Farrell (স্টিভেন মার্ফি), তার স্ত্রীর ভূমিকায় Nicole Kidman (অ্যানা), এবং রহস্যময় কিশোর মার্টিনের চরিত্রে Barry Keoghan

গল্পের শুরুতে সবকিছুই স্বাভাবিক একজন সফল কার্ডিয়াক সার্জন, তার পরিপাটি পরিবার, নিয়ন্ত্রিত জীবন কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই যেন কোথাও জমে থাকে এক অদৃশ্য ফাটল সেই ফাটল ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, যখন স্টিভেনের জীবনে প্রবেশ করে মার্টিন এক কিশোর, যার উপস্থিতি প্রথমে নিরীহ মনে হলেও ক্রমে তা হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর, তারপর ভয়ঙ্কর

ছবির গতি ধীর, প্রায় স্থির কিন্তু এই স্থিরতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি একে একে স্টিভেনের পরিবারের ওপর নেমে আসে এক অদ্ভুত অভিশাপ যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, কোনো যুক্তি নেই চিকিৎসাবিজ্ঞান এখানে অসহায়, যুক্তিবোধ নিষ্প্রভ তখন মনে হয়, আমরা আর আধুনিক পৃথিবীতে নেই; আমরা ফিরে গেছি কোনো প্রাচীন পুরাণের ভেতর

সিনেমাটির নাম ‘দ্য কিলিং অফ এ সেক্রেড ডিয়ার’ হবার কারণ এটি গ্রীক পুরাণ থেকে অনুপ্রাণিত।মাইসেনিয়ার রাজা আগামেমনন ও তার কণ্যা ইফিজেনিয়ার কাহিনী।   ইফিজেনিয়া ছিলেন মাইসেনির রাজা Agamemnon ও রানি Clytemnestra-এর কন্যা। সে সময় গ্রীসজুড়ে প্রস্তুতি চলছে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে যাওয়ার। অসংখ্য জাহাজ, যোদ্ধা, অস্ত্র সবই প্রস্তুত; কিন্তু হঠাৎ করেই থেমে যায় সমুদ্রের হাওয়া। জাহাজ আর এগোয় না, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সবকিছু থেমে যায়

এই অদ্ভুত বিপদের কারণ জানাতে এগিয়ে আসেন ভবিষ্যদ্বক্তা Calchas। তিনি জানান, শিকার ও বনভূমির দেবী Artemis ক্রুদ্ধ হয়েছেন। কারণ, রাজা অ্যাগামেমনন তার পবিত্র হরিণ হত্যা করেছিলেন—অথবা কোনো কোনো কাহিনিতে বলা হয়, দেবীর সঙ্গে অহংকারপূর্ণ তুলনা করেছিলেন। এই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ দেবী বাতাস থামিয়ে দিয়েছেন।

এই ক্রোধ প্রশমিত করার একমাত্র উপায়, অ্যাগামেমননকে নিজের কন্যা ইফিজেনিয়াকে দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দিতে হবে।

পিতার সামনে তখন এক ভয়ংকর দ্বিধা। একদিকে যুদ্ধ, দেশের সম্মান, অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা; অন্যদিকে নিজের কন্যার জীবন। অবশেষে তিনি এক নির্মম সিদ্ধান্ত নেন। ছল করে ইফিজেনিয়াকে ডেকে পাঠান—বলা হয়, বীর যোদ্ধা Achilles-এর সঙ্গে তার বিয়ে হবে। আনন্দে, স্বপ্নে ভরা মনে ইফিজেনিয়া আসে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারসহ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে জানতে পারে এ বিয়ের আয়োজন নয়, এটি তার বলিদানের স্থান।

এরপর কাহিনির দুটি ভিন্ন পরিণতি পাওয়া যায়।

একটি মতে, ইফিজেনিয়াকে সত্যিই বলি দেওয়া হয়। তার মৃত্যুর পরই দেবী সন্তুষ্ট হন, সমুদ্রের হাওয়া ফিরে আসে, আর গ্রীক বাহিনী ট্রয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

অন্য একটি মতে, বলিদানের শেষ মুহূর্তে দেবী আর্টেমিস দয়া করেন। তিনি ইফিজেনিয়াকে অদৃশ্য করে দেন এবং তার স্থলে একটি হরিণ রেখে দেন। ইফিজেনিয়াকে তিনি দূর দেশে নিয়ে গিয়ে নিজের মন্দিরে পুরোহিত্রী হিসেবে স্থাপন করেন।

  গ্রীক পুরাণে যেমন পিতাকে নিজের কন্যাকে বলি দিতে হয়েছিল, এখানেও স্টিভেনের সামনে এসে দাঁড়ায় এক নির্মম সিদ্ধান্ত, নিজের পরিবার থেকেই কাউকে উৎসর্গ করতে হবে, নইলে সকলের মৃত্যু অবধারিত

এই পুরাণের কাহিনী আরেকটি ধর্মীয় কাহিনির কথাও মনে করিয়ে দেয়, কুরবানির ইতিহাস নবী ইব্রাহিম (.)-এর সেই পরীক্ষার মুহূর্ত, যেখানে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আর সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য মুখোমুখি দাঁড়ায়, সেই দ্বন্দ্বও এক গভীর মানবিক সত্যের প্রতীক যদিও সেখানে শেষ মুহূর্তে দয়া নেমে আসে, কিন্তু পরীক্ষার ভার অমোচনীয় থেকে যায় The Killing of a Sacred Deer সেই দয়ার জায়গাটা মুছে দিয়ে আমাদের ঠেলে দেয় এক নির্মম বাস্তবতায়, যেখানে সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতেই হবে

বাস্তবেও এমন এক ঘটনার শিকার হোন বলিউড অভিনেতা সালমান খান বলছিলাম  ব্ল্যাকবাক শিকারের ঘটনাটি যেখানে একটি হরিণ হত্যার অভিযোগ ঘিরে দীর্ঘ আইনি লড়াই হয় সালমান খান হত্যা করে চিংকার হরিণকে যাকে বিশনয় সম্প্রদায় পবিত্র হিসাবে গণ্য করে। এই হরিণকে তারা বলতে গেলে পুজো করে। এই কৃষ্ণ হরিণের উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন হিন্দু পুরাণে যে এরা ভগবান কৃষ্ণের রথ টানতো। চিংকারকে বাতাস এবং চাঁদের বাহন মানা হয়। রতো পবিত্র মানা হয় বলে আজও সালমান খানকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এখানে দেবতার ক্রোধ নেই, আছে আইনের বিচার; তবু মূল প্রশ্নটি একই মানুষ কি তার কর্মফল থেকে মুক্তি পায়?

অভিনয়ের দিক থেকে The Killing of a Sacred Deer ছবিটি একেবারেই আলাদা মাত্রার Colin Farrell তার চরিত্রে এক ধরনের যান্ত্রিক শীতলতা নিয়ে এসেছেন—যা প্রথমে দূরত্ব তৈরি করলেও শেষে সেটাই হয়ে ওঠে চরিত্রটির আসল শক্তি তার চোখে, তার নীরবতায় ধরা পড়ে এক অসহায় মানুষের ভাঙন অন্যদিকে Nicole Kidman অত্যন্ত সংযত অভিনয়ে এক মায়ের আতঙ্ক, ক্ষোভ ও বাঁচার তাগিদকে ফুটিয়ে তুলেছেন আর Barry Keoghan-এর মার্টিন চরিত্রটি—নিঃসন্দেহে ছবির সবচেয়ে ভৌতিক উপস্থিতি তার শান্ত কণ্ঠ, অদ্ভুত স্থিরতা, এবং আবেগহীন আচরণ এক গভীর অস্বস্তি তৈরি করে

পরিচালক Yorgos Lanthimos ছবিটিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য যেন হিসেব করে সাজানো ক্যামেরার ধীর গতির মুভমেন্ট, moody টোন, এবং সংলাপের অস্বাভাবিক টোন সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অচেনা, প্রায় অতিপ্রাকৃত পরিবেশ এই স্টাইলটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু ছবির মূল ভাবকে বোঝাতে এটি অপরিহার্য

ভাষার দিক থেকেও ছবিটি এক ধরনের নীরব কবিতা এখানে আবেগ প্রকাশ পায় না উচ্চস্বরে; বরং তা জমে থাকে স্তব্ধতার ভেতর 

The Killing of a Sacred Deer মূলত আর্ট হাউজ ঘরনার ফিল্ম এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ যতই আধুনিক হোক, তার ভেতরে সেই প্রাচীন ভয়, সেই প্রাচীন দায় এখনো বেঁচে আছে পুরাণ, ধর্ম আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই চলচ্চিত্র একটাই কথা বলে কর্মফল থেকে পালানোর কোনো পথ নেই