বৃষ্টির দিনে দেখার মতো ১০টি চিন্তা জাগানো সিনেমা

বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাঁচে পানির রেখা গড়িয়ে পড়ছে, বাইরে সবকিছু ঝাপসা, ভেজা, ধীর। এমন দিনে মনটাও কেমন যেন ধীর হয়ে যায়। হুট করে হালকা কোনো কমেডি বা অ্যাকশন সিনেমা দেখতে ইচ্ছা করে না। বরং চাই এমন কিছু, যা মনকে নাড়া দেবে, নতুন প্রশ্ন জাগাবে, আর সিনেমা শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসিয়ে রাখবে।

বৃষ্টির দিন আর চিন্তা জাগানো সিনেমার মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল আছে। দুটোই আমাদের ভেতরের শব্দহীন জায়গাগুলোতে গিয়ে পৌঁছায়। আজকের এই তালিকায় থাকছে এমন দশটি সিনেমা, যেগুলো বৃষ্টির বিকেল বা সন্ধ্যায় দেখলে মনে হবে, পর্দার আলো নিভে গেলেও ভাবনাটা থেমে নেই।

১. Blade Runner 2049 (২০১৭)

ব্লেড রানার ২০৪৯ সিনেমার কায়োটি গাড়িতে রিয়ান গসলিং

ডেনিস ভিলনভ পরিচালিত ‘Blade Runner 2049’ (২০১৭) আধুনিক সাই-ফাই সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য মাস্টারপিস। ভিজ্যুয়াল মাস্টার রজার ডিকিনসের সিনেম্যাটোগ্রাফি এবং হ্যান্স জিমারের ভারী সাউন্ডট্র্যাকের মেলবন্ধনে তৈরি এই ছবি। বৃষ্টির ধারা, নিয়ন আলোর শহর, ধূসর বিষণ্নতা আর নিঃসঙ্গতার এক ধীরগতির অথচ গভীর আবহ তৈরি করে। মূল চরিত্র অফিসার ‘K’ (রায়ান গসলিং), যিনি একজন রেপ্লিক্যান্ট (কৃত্রিমভাবে তৈরি মানুষ), যার কাজ পুরনো মডেলের রেপ্লিক্যান্টদের খুঁজে বের করে রিটায়ার করা।

বৃষ্টির দিনে জানালা দিয়ে পানি পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে এই সিনেমাটি উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। লস অ্যাঞ্জেলেসের অবিরাম বৃষ্টি এবং কৃত্রিম নিয়ন আলোর আবহে তৈরি হয় এক স্তব্ধ পরিবেশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? স্মৃতি কি সত্যিই আমাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি, নাকি কোনো তৈরি করা মিথা? ভালোবাসা কি কেবল অনুভূতি, নাকি রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর কোনো আত্মিক টান, এই প্রতিটি প্রশ্ন গল্পটিকে নতুন মাত্রা দেয়।

সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর এর ধীরগতির আবহ এবং নিয়ন আলোর মায়াজাল দীর্ঘক্ষণ মাথায় ঘুরেফিরে আসে। এটি শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন সিনেমা নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান।

২. Arrival (২০১৬)

অ্যারাইভাল (২০১৬) সিনেমার পোস্টার ও এমি অ্যাডামস

ট্রেডিশনাল মহাজাগতিক এলিয়েন আক্রমণের গল্পকে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন পরিচালক ডেনিস ভিলনভ তাঁর ‘Arrival’ (২০১৬) সিনেমায়। পৃথিবীর ১২টি ভিন্ন স্থানে হুট করেই আবির্ভূত হয় বিশাল রহস্যময় পাথর আকৃতির ভিনগ্রহী মহাকাশযান। বিশ্বজুড়ে যখন যুদ্ধ ও আতঙ্কের দামামা বাজছে, তখন মার্কিন সেনাবাহিনী ভাষা বিশেষজ্ঞ লুইস ব্যাঙ্কসকে (এমি অ্যাডামস) দায়িত্ব দেয় এলিয়েনদের প্রতীকী ভাষা অনুবাদ করে তাদের আসার আসল কারণ বের করার জন্য।

বৃষ্টির দিনে বাইরে যখন মেঘের ঘনঘটা আর ঠান্ডা বাতাস বয়, তখন ‘Arrival’-এর ধীরগতির রহস্যময় সংগীত ও কুয়াশাবৃত মেজাজ দর্শককে এক ভিন্ন জগতের অনুভূতি দেয়। সিনেমাটিতে দেখায় কীভাবে একটি ভাষা মানুষের চিন্তাভাবনা ও সময় অনুভূতির ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। সাপির-ওয়ার্ফ হাইপোথিসিস নির্ভর এই গল্পটি শুধু সায়েন্স ফিকশন নয়, বরং যোগাযোগহীনতা ও মানুষের পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির ওপর এক নীরব আক্ষেপ।

সিনেমাটি দেখার পর মাথায় যে প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে, আমরা যদি আগেই জানতাম আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কতটা কষ্টদায়ক হবে, তবুও কি আমরা সেই পথেই হেঁটে যেতাম এবং প্রতিটি মুহূর্তকে ভালোবাসতাম?

৩. Her (২০১৩)

Her (২০১৩) সিনেমার থিওডোর চরিত্রে হোয়াকিন ফিনিক্স

স্পাইক জোন্সের পরিচালনায় নির্মিত ‘Her’ (২০১৩) আধুনিক নগরায়ন, প্রযুক্তি এবং মানুষের গভীর মানসিক একাকীত্বের এক অনন্য দলিল। গল্পের মূল চরিত্র থিওডোর (হোয়াকিন ফিনিক্স) পেশায় একজন চিঠি লেখক, অন্যদের আবেগ অনুভূতির কথা সুন্দর শব্দে সাজিয়ে দেওয়া যার কাজ, অথচ নিজের জীবনটাই বিচ্ছেদের বেদনায় ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। এমন সময় সে ‘সামান্থা’ নামের একটি সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (OS) ব্যবহার শুরু করে, যার কণ্ঠে রয়েছে স্কারলেট জোহানসনের অসামান্য উষ্ণতা।

বৃষ্টির দিনে জানালা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার মুহূর্তে এই সিনেমাটি দেখা এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে। প্রযুক্তি আমাদের বিশ্বকে কত কাছাকাছি এনে দিয়েছে, অথচ আমরা ব্যক্তিগতভাবে কতটা দূরে সরে গেছি, এই সত্যটি সিনেমাটিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সামান্থা ও থিওডোরের সম্পর্ক শুধু কোনো সায়েন্স ফিকশন কৌতূহল নয়, বরং মানুষের সাথে ভালোবাসার ও সংযোগের সত্যিকারের সংজ্ঞা কী, তা নিয়ে নতুন করে ভাবায়।

সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ মনে প্রশ্ন ঘুরতে থাকে: আমরা কি সত্যিই ভালোবাসার কোনো শারীরিক অস্তিত্ব খুঁজি, নাকি শুধু এমন কাউকে চাই যে আমাদের না-বলা কথাগুলো নিঃশব্দে অনুভব করতে পারবে?

৪. Eternal Sunshine of the Spotless Mind (২০০৪)

ইটারনাল সানশাইন অফ দ্য স্পটলেস মাইন্ড সিনেমায় জিম ক্যারি ও কেট উইন্সলেট

মিশেল গন্ড্রির পরিচালনায় এবং চার্লি কাউফম্যানের দূরদর্শী চিত্রনাট্যে তৈরি ‘Eternal Sunshine of the Spotless Mind’ (২০০৪) ভালোবাসার জটিলতা ও মানব স্মৃতির ওপর তৈরি অন্যতম সেরা কাল্ট-ক্লাসিক। গল্পের কেন্দ্রে জোয়েল (জিম ক্যারি) এবং ক্লেমেন্টাইন (কেট উইন্সলেট)। ভালোবাসার সুমিষ্ট অধ্যায় শেষে যখন বিচ্ছেদের চরম তিক্ততা আসে, তখন ক্লেমেন্টাইন একটি নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে জোয়েলের সমস্ত স্মৃতি নিজের মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলে। প্রতিশোধ ও কষ্টের চোটে জোয়েলও একই প্রক্রিয়া শুরু করে, কিন্তু স্মৃতি মোছার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সে বুঝতে পারে, বেদনাদায়ক হলেও এই স্মৃতিগুলোই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।

বৃষ্টির দিনে জানালা দিয়ে পানির ফোঁটা ঝরে পড়ার মুহূর্তে এই সিনেমাটি দর্শকের মনে এক অদ্ভুত কোমল কষ্টের আবহ তৈরি করে। জিম ক্যারির বিষণ্ন অভিনয় এবং কেট উইন্সলেটের প্রাণবন্ত চঞ্চলতা প্রেমের দ্বৈত রূপ ফুটিয়ে তোলে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা এবং মিষ্টি স্মৃতিগুলোই তো আমাদের বর্তমান সত্তাকে গড়ে তোলে। স্মৃতি মুছে ফেললেও কি হৃদয়ের টান সত্যি মুছে ফেলা সম্ভব?

সিনেমাটি দেখার পর প্রতিটা দর্শক নিজেকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: আমরা কি কষ্টের ভয়ে অতীত ভালোবাসার স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইব, নাকি সমস্ত ভুলত্রুটি ও কষ্টসহ সেই স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইব?

৫. The Tree of Life (২০১১)

জীবন, মৃত্যু, সৃষ্টি আর ক্ষমা। এই বড় বড় বিষয়গুলোকে টেরেন্স ম্যালিক দেখিয়েছেন এক কাব্যিক ভাষায়। সিনেমা দেখতে দেখতে মনে হয় যেন কোনো দীর্ঘ কবিতা পড়া হচ্ছে। বৃষ্টির দিনের নীরবতার সঙ্গে এই ছবির ছন্দ আশ্চর্যরকম মানানসই।

৬. Perfect Days (২০২৩)

পারফেক্ট ডেস (২০২৩) সিনেমায় কোজি হিরোয়ুকি কাসোমাতসু

বিখ্যাত জার্মান পরিচালক ভিম ভেন্ডার্সের জাপানি ড্রামা ফিল্ম ‘Perfect Days’ (২০২৩) দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ রূপকে অনন্য সুন্দর এক শিল্প হিসেবে তুলে ধরেছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার প্রাপ্ত কোজি ইয়াকুশো এই ছবিতে ‘হিরায়ামা’ নামের টোকিওর একজন পাবলিক টয়লেট ক্লিনারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। হিরায়ামার জীবনে বড় কোনো নাটকীয়তা বা উচ্চাশা নেই; সকালের সূর্য ওঠা দেখা, কাজের ফাঁকে পুরনো ক্যাসেট ফিতায় ক্লাসিক রক শোনা, ফিল্ম ক্যামেরায় গাছের পাতার আলোর খেলা (কমোরেবি) ধরে রাখা আর রাতে বই পড়াই তার গোটা জগৎ।

বৃষ্টির দিনের শান্ত স্নিগ্ধ মেজাজের সঙ্গে ‘Perfect Days’-এর সুর আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায়। আধুনিক ব্যস্ত শহর টোকিওতে সবাই যখন আরও বেশি পাওয়া ও দৌড়ঝাঁপের পেছনে ছুটছে, হিরায়ামা তখন কমের মধ্যেও পরিপূর্ণ তৃপ্তি খুঁজে নিচ্ছে। তার এই নীরব জীবনযাপন দর্শককে থামতে বাধ্য করে এবং আমাদের চারপাশের ছোট ছোট অনাকাঙ্ক্ষিত সুন্দর মুহূর্তগুলোকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখায়।

সিনেমাটি দেখার পর আপনার মনে হতে পারে: জীবনের প্রকৃত সুখ কি আসলেই বড় কোনো অর্জনে নিহিত, নাকি প্রতিদিনের চেনা রুটিন ও বর্তমান মুহূর্তটাকে ভালোবেসে বেঁচে থাকার মাঝেই লুকিয়ে আছে আসল শান্তি?

৭. Past Lives (২০২৩)

দুই মানুষের মধ্যে সময়ের ব্যবধান, না-বলা কথা আর “যদি অন্যভাবে হতো”, এই অনুভূতিগুলো নিয়ে তৈরি এই ছবি। বৃষ্টির দিনে দেখলে মনে হয়, আমাদের জীবনের অনেক পথই বৃষ্টির মতো, একবার ভিজে গেলে আর আগের মতো শুকনো হয় না।

৮. Drive My Car (২০২১)

ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা শোকের এক গল্প। চেখভের নাটক, দীর্ঘ নীরবতা আর মানুষের ভেতরের না-সারা ক্ষত নিয়ে তৈরি এই ছবি ধৈর্য দাবি করে, কিন্তু শেষে যে অনুভূতি রেখে যায়, তা সহজে মুছে যায় না।

৯. The Killing of a Sacred Deer (২০১৭)

দ্য কিলিং অফ আ স্যাক্রেড ডিয়ার সিনেমায় কলিন ফারেল ও নিকোল কিডম্যান

গ্রীক অদ্ভুত তরঙ্গের (Greek Weird Wave) প্রখ্যাত গ্রীক পরিচালক ইয়োরগোস লান্থিমোসের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ‘The Killing of a Sacred Deer’ (২০১৭) আধুনিক সিনেমার অন্যতম অস্বস্তিকর ও গভীর রচনা। ইউরিপিডিসের ক্লাসিক্যাল গ্রীক ট্র্যাজেডি ‘ইফিজেনিয়া ইন অলিস’-এর উপকথা থেকে অনুপ্রাণিত এই গল্প। সফল কার্ডিওভাসকুলার সার্জন স্টিভেন (কলিন ফারেল) এবং তার স্ত্রী অ্যানার (নিকোল কিডম্যান) নিখুঁত সুখী পরিবারে কালো ছায়া হয়ে আসে মার্টিন ( ব্যারি কিওগান) নামের এক এতিম কিশোর।

বৃষ্টির দিনে বাইরে যখন মেঘলা আলো আর দমকা বাতাস বইতে থাকে, তখন এই সিনেমার বরফ-শীতল হসপিটাল করিডোর, ব্যাকগ্রাউন্ডের উচ্চমাত্রার ক্লাসিক্যাল ক্লাস্টার কর্ড এবং নির্লিপ্ত অভিনয় দর্শককে এক হিমশীতল আতঙ্কের মুখে দাঁড় করায়। ভুল কাজ বা অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কীভাবে কোনো যুক্তির তোয়াক্কা না করে অলৌকিক অভিশাপের মতো ফিরে আসতে পারে, লান্থিমোস তা নিষ্ঠুর সূক্ষ্মতায় দেখিয়েছেন।

সিনেমাটি দেখার পর আপনার মনে নৈতিকতার এক গভীর দ্বন্দ্ব দেখা দেবে: পরিবারকে বাঁচাতে কি কোনো অমানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জায়েজ, নাকি অতীতের ভুলের মাশুল গুণতেই হবে?

(এই ছবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পড়ুন আমাদের পূর্ণাঙ্গ রিভিউতে: The Killing of a Sacred Deer সিনেমা রিভিউ)

১০. Annihilation (২০১৮)

প্রকৃতি, পরিবর্তন আর আত্মধ্বংসের এক অদ্ভুত যাত্রা। রঙ, শব্দ আর নীরবতা মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয় যে বৃষ্টির দিনে দেখলে মনে হয় বাইরের জগৎটাও যেন একটু বদলে গেছে।

শেষ কথা

বৃষ্টি একসময় থেমে যাবে, জানালার কাঁচও শুকিয়ে যাবে। কিন্তু এই সিনেমাগুলো দেখার পর যে ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে, সেগুলো অত সহজে শুকায় না।

সিনেমা শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়। কখনো কখনো তা বৃষ্টির মতোই: ভেজায়, ঠান্ডা করে, আর ভেতরটা একটু পরিষ্কার করে দেয়।

আপনি বৃষ্টির দিনে কোন সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন? কমেন্টে জানান।