মালিন কুন্দাং: মাকে অস্বীকার করা এক সন্তানের করুণ পরিণতি

৬ মিনিটের পাঠ

ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রা অঞ্চলের একটি বিখ্যাত লোককথা হলো মালিন কুন্দাংয়ের কাহিনী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গল্পটি ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মধ্যে প্রচলিত। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে একজন দরিদ্র মা, তার একমাত্র সন্তান মালিন কুন্দাং, দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক তরুণের সাফল্য এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মাকে অস্বীকার করার করুণ পরিণতি।

অনেক বছর আগে পশ্চিম সুমাত্রার সমুদ্রের কাছাকাছি একটি ছোট গ্রামে মাণ্ডে রুবায়াহ (Mande Rubayah) নামে এক দরিদ্র নারী বসবাস করতেন। তার একমাত্র সন্তান ছিল মালিন কুন্দাং (Malin Kundang)।মালিনের পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। তার মা অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতেন এবং ছেলেকে বড় করতেন। কখনো খাবারের অভাব, কখনো অর্থের অভাব নানা কষ্টের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন চলত।

কিন্তু মাণ্ডে রুবায়াহ তার সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। তিনি চাইতেন, তার ছেলে একদিন ভালো মানুষ হবে এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। মালিনও ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান ছিল। কিন্তু দারিদ্র্য তার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সে প্রায়ই ভাবত, কীভাবে একদিন এই দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে মায়ের জীবন বদলে দেবে।

মালিনের গ্রামের মানুষদের অনেকেই সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দূরদেশ থেকে বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ আসত এবং ব্যবসায়ীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য নিয়ে যেত। একদিন মালিন একটি বড় জাহাজ দেখতে পেল। জাহাজটি দেখে তার মনে নতুন স্বপ্ন জাগল। সে ভাবল, “আমি যদি এই জাহাজে কাজ করতে পারি, তাহলে হয়তো দূরদেশে যেতে পারব। সেখানে কাজ করে অর্থ উপার্জন করব। একদিন অনেক ধনী হয়ে মায়ের কাছে ফিরে আসব।”

কিন্তু যখন সে মাকে তার ইচ্ছার কথা জানাল, মা ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “বাবা, তুমি এত দূরে চলে গেলে আমি একা হয়ে যাব। সমুদ্রযাত্রা খুব বিপজ্জনক। তুমি যদি আর ফিরে না আসো?”

মালিন মাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। সে বলল, সে অর্থ উপার্জন করে একদিন মায়ের কাছে ফিরে আসবে। অনেক অনুরোধের পর মা শেষ পর্যন্ত ছেলেকে যেতে দিলেন। বিদায়ের সময় মাণ্ডে রুবায়াহ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। তিনি তাকে বললেন, “বাবা, তুমি যেখানেই যাও, আমাকে ভুলে যেও না। জীবনে যত বড়ই হও, নিজের মাকে কখনো অস্বীকার করো না।”

মালিন মাকে কথা দিল, সে অবশ্যই ফিরে আসবে। মালিন জাহাজে করে নিজের গ্রাম ছেড়ে দূরদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। তার মা সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে ছেলের জাহাজটি যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর জাহাজটি ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেল। সেদিন থেকে মাণ্ডে রুবায়াহ প্রতিদিন ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা করতে লাগলেন।

অন্যদিকে মালিনের জীবনও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। জাহাজে কাজ করার সময় সে ব্যবসা, বাণিজ্য এবং সমুদ্রযাত্রার নানা বিষয় শিখতে লাগল। সে ছিল পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই সে অন্যদের নজরে পড়ে। বছরের পর বছর কেটে গেল। মালিন ধীরে ধীরে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করল। তার ভাগ্য পরিবর্তিত হলো। একসময় সে নিজেই একজন সফল ও ধনী ব্যবসায়ীতে পরিণত হলো। মালিনের জীবনে তখন আর আগের দারিদ্র্য ছিল না। তার সুন্দর পোশাক, অর্থ-সম্পদ এবং বড় ব্যবসা ছিল। সে সমাজে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হয়ে উঠল।একসময় সে একটি ধনী পরিবারের তরুণীকে বিয়ে করল। তার স্ত্রীও জানতেন না মালিনের শৈশবের দারিদ্র্যের কথা। 

মালিন নিজের পুরোনো জীবন সম্পর্কে খুব কম কথা বলত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনে অর্থ ও সম্মান যত বাড়তে লাগল, তার মধ্যে অহংকারও বাড়তে লাগল। যে ছেলে একদিন মাকে কথা দিয়েছিল “আমি ফিরে আসব”

সে ধীরে ধীরে নিজের অতীতের কথা ভুলে যেতে শুরু করল। একদিন ব্যবসার কাজে মালিনের জাহাজ পশ্চিম সুমাত্রার সেই অঞ্চলের কাছাকাছি এসে পৌঁছাল, যেখানে তার শৈশব কেটেছিল। গ্রামের মানুষ দূর থেকে একটি বড় ও সুন্দর জাহাজ দেখতে পেল। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।অনেকে জাহাজটি দেখতে সমুদ্রতীরে ছুটে গেল।

মাণ্ডে রুবায়াহও খবর পেলেন যে বহু বছর আগে যে ছেলে তাকে ছেড়ে দূরদেশে চলে গিয়েছিল, সে নাকি ফিরে এসেছে। মায়ের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ উঠল। তিনি ভাবলেন, “আমার মালিন ফিরে এসেছে!”

বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য দ্রুত সমুদ্রতীরের দিকে ছুটে গেলেন। মাণ্ডে রুবায়াহ দূর থেকে মালিনকে দেখতে পেলেন। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বহু বছরের অপেক্ষা, কষ্ট ও ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে চোখের পানিতে প্রকাশ পেল। তিনি মালিনের কাছে গিয়ে তাকে নিজের সন্তান বলে ডাকলেন।

তিনি বললেন, “মালিন! আমার বাবা! তুমি ফিরে এসেছ!”

কিন্তু মালিন মাকে দেখে খুশি হওয়ার পরিবর্তে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তার সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী এবং জাহাজের লোকজন। মালিনের মা ছিলেন দরিদ্র ও বৃদ্ধ। তার পোশাকও ছিল সাধারণ। মালিন ভয় পেল, তার স্ত্রী ও সঙ্গীরা যদি জানতে পারে যে এই দরিদ্র বৃদ্ধা তার মা, তাহলে তার সম্মান নষ্ট হতে পারে।

মাণ্ডে রুবায়াহ ছেলের কাছে এসে বললেন, “বাবা, আমি তোমার মা। তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না?”

কিন্তু মালিন তাকে নিজের মা হিসেবে স্বীকার করল না। সে বলল, এই বৃদ্ধা তার মা হতে পারেন না।

মা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তিনিই মালিনের মা। তিনিই তাকে ছোটবেলা থেকে কষ্ট করে বড় করেছেন। কিন্তু মালিন তার কথা শুনল না। বরং সে মাকে দূরে সরিয়ে দিল এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করল। মায়ের হৃদয় যেন ভেঙে গেল। যে ছেলেকে তিনি নিজের জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে বড় করেছিলেন, সেই ছেলে আজ তার পরিচয় স্বীকার করছে না। তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।মালিন যখন জাহাজে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন তার মা সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তার সন্তান তাকে এভাবে অস্বীকার করেছে। বহু বছর তিনি ছেলের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।তার কষ্ট, ভালোবাসা এবং অপমান সবকিছু মিলিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার প্রার্থনা করলেন।

লোককথার প্রচলিত সংস্করণ অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন যে যদি এই মানুষটি সত্যিই তার সন্তান হয় এবং তাকে নিজের মা হিসেবে অস্বীকার করে থাকে, তাহলে সৃষ্টিকর্তা যেন এর বিচার করেন।

মালিন তার জাহাজ নিয়ে সমুদ্রের দিকে রওনা দিল। প্রথমে সমুদ্র শান্ত ছিল। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ আকাশের অবস্থা বদলে গেল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলো। সমুদ্রের ঢেউ ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠল। মালিন ও তার সঙ্গীরা বুঝতে পারল, বড় ধরনের ঝড় আসছে। জাহাজটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে লাগল। তারা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঝড়ের শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রবল। শেষ পর্যন্ত মালিন তীরে এসে পড়ে।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, মাকে অস্বীকার করার শাস্তি হিসেবে মালিন কুন্দাং ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হয়। তার শরীর, নৌকা এবং আশপাশের কিছু জিনিসও পাথরে পরিণত হয় বলে লোককথায় বলা হয়। এভাবেই একজন দরিদ্র মায়ের সন্তান, যে একদিন সফল ও ধনী হয়েছিল, নিজের মাকে অস্বীকার করার কারণে করুণ পরিণতির শিকার হয়।

পশ্চিম সুমাত্রার পাদাং (Padang) শহরের কাছে Air Manis Beach-এর সঙ্গে মালিন কুন্দাংয়ের কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে। সেখানে একটি পাথরের আকৃতিকে স্থানীয়ভাবে মালিন কুন্দাংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আশপাশে নৌকা ও অন্যান্য আকৃতির পাথর/স্থাপনাও রয়েছে। প্রতি বছর বহু মানুষ এই স্থান দেখতে যায়। তাদের কাছে এটি শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়; এটি একটি পুরোনো লোককথার স্মৃতিও বহন করে।