‘দ্য ওডিসি’ রিভিউ: নোলানের লেন্সে এক অনুতপ্ত মানুষের মহাযাত্রা

৬ মিনিটের পাঠ

সিনেমার নাম: দ্য ওডিসি 

পরিচালনা: ক্রিস্টোফার নোলান

অভিনয়: ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথওয়ে, টম হল্যান্ড, জ়েন্ডায়া, রবার্ট প্যাটিনসন, লুপিতা নুওঙ্গো, শার্লিজ় থেরন প্রমুখ

“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…”

সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে বেড়ানো ক্লান্ত যে পথিকের ছবি এঁকেছিলেন জীবনানন্দ, সে হয়তো ইথাকার রাজা ওডিসিয়ুস। কিংবা গৃহত্যাগী বা গৃহকাতর প্রতিটি মানুষের আরেক নাম।

সিনেমার শুরুতে টম হল্যান্ডের মুখে “Where is my dad?” শুনে খানিকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল, এই আধুনিক সংলাপের ভেতর হোমারের সেই প্রাচীন মহাকাব্যের আবহ কতটা টিকে থাকবে? পরে সমালোচকদের প্রশংসা শুনে আবার সিনেমাটির সামনে বসি। একটা সময় পর মনে হচ্ছিল এই আধুনিক ইংরেজি সংলাপে আসলে সিনেমার রং খুব একটা হারায় নি। ওই আদিম গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেভাবেই বলুক, গল্প তো গল্প ই। নোলান আদতে ওডিসিয়ুস এর গল্প দিয়ে চির – চেনা জীবন যুদ্ধে পোড় খাওয়া মানুষের ছবি এঁকেছেন। গ্রীক বীর ওডিসিয়ুস কে মহানায়কের চেয়ে যুদ্ধ ফেরত একজন সৈন্য হিসেবে দেখিয়েছেন- যার গায়ে এখনো ট্রয়ের পোড়া গন্ধ, মৃত সহযোদ্ধাদের নীরব মুখ, আর সেই যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া অগণিত নিরপরাধ মানুষের অদৃশ্য ঋণ। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে হোমারের ওডিসিয়ুস বীরদর্পে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য পাড়ি জমায়। নোলান সেখানে ওডিসিয়ুসের মাথায় জয়ের মুকুট না পরিয়ে কাঁধে চাপিয়ে দেন পাহাড়সম অপরাধবোধ। যুদ্ধ শেষে নিজের সহযোদ্ধাদের নিয়ে ইথাকায় ফিরতে তাকে টানা দশ বছর সমুদ্রে বিপজ্জনক যাত্রা করতে হয়। অকূল পাথারের সেই যাত্রায় সমুদ্র কখনো তাকে দেখায় দেবতার ক্রোধের মুখ, কখনো দানবের গুহা, কখনো মানুষখেকো জাতির অন্ধ উল্লাস। পোসাইডন ঝড় পাঠান, সাইক্লোপস অন্ধকার, লেসট্রিগোনিয়ানরা মৃত্যু, আর ওডিসিয়ুস প্রতিবারই আস্তে আস্তে নিজের সহযাত্রীদের হারাতে থাকেন। ওডিসিয়ুসের আর বুঝতে বাকি থাকে না কতবড় পাপ তিনি করেছেন।নোলানের ‘ Oppenheimer’ আর ‘ওডিসি’ ঠিক এখানটায় আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়! রবার্ট ওপেনহাইমার আর ওডিসিয়ুস দুজনই অরিজিনাল সিন(Original Sin)-সম অপরাধ করেন। একজন পরমানু বোমা আবিষ্কার করে গোটা একটা প্রজন্মকে ধ্বংসের  মুখে ঢেলে দেন, আর অন্যজন জিউসের ল’ অমান্য করে একটা গোটা নগরী নিশ্চিহ্ন করে দেন। দান্তের Inferno-তে ওডিসিয়ুসের স্থান নরকের ৮ম স্তরে-  যে স্তরটি প্রতারণাকারীদের জন্য বরাদ্দ! কারন, ট্রয়ের যুদ্ধে ওডিসিয়ুসের বুদ্ধিতেই ‘কাঠের ঘোড়া’র কৌশলে(প্রতারণায়) তারা ট্রয় নগরী ধ্বংস করে। কাঠের ঘোড়া বা ‘ট্রোজেন হর্স’ মূলত গ্রীকরা যুদ্ধ শেষে দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে উপহার হিসেবে রেখে যায়; আদতে এর পেটের মধ্যে গ্রীক যোদ্ধারা লুকিয়ে থাকে। ট্রয়বাসীরা একে শহরে নিয়ে এলে এর ভেতর লুকিয়ে থাকা যোদ্ধারা রাতের আঁধারে আক্রমণ করে।  

পলিটিকাল গল্প নাকি মানবিক ট্র‍্যাজিডি?

নোলান মূলত একজন পলিটিক্যাল ডিরেক্টর।ব্রিটিশ-আমেরিকান এই পরিচালক আমেরিকার পেটের মধ্যে থেকেই এমন সূক্ষ্ম যুদ্ধ-বিরোধী মেসেজ দিয়ে চলেছেন। যুদ্ধ নিয়ে এমন এন্টি-রোমান্টিক এপ্রোচ জর্জ বার্নার্ড শ’য়ের লেখায় পাই- যুদ্ধকে অহেতুক গ্লোরিফাই না করা, হিরো আর সাধারণ মানুষের মধ্যকার লাইন ব্লার করে দেয়া- এ সবই তাঁর লেখায় দেখতে পাই। নোলান ও যুদ্ধের নামে গণহত্যাকে গ্লোরিফাই না করে, তার প্রোটাগনিস্টকে বীরের চেয়ে একজন  মানুষ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। 

ওডিসিয়ুস তাই মহান বীর নন, বরং একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত যোদ্ধা যে তার ঘরে ফিরতে চায়। দু-দন্ড শান্তির আশায় উত্তাল সমুদ্রের সাথে পাঞ্জা লড়তে প্রস্তুত। ‘ওডিসি’ পড়তে গেলে কোলরিজের ‘The Rime of the Ancient Mariner’ এর সে বৃদ্ধ নাবিকের কথা মনে পড়ে; সমুদ্র যাত্রায় যে একটি আলবাট্রস পাখিকে মেরে ফেলে। আর তার ওপর অভিশাপ নেমে আসে।তার সাথে থাকা নাবিকরা এ কাজে সায় দেয়ার কারণে একে একে মারা যায়, আর সে একা বিশাল সমুদ্রের মাঝে নিজের অপরাধের ভার নিয়ে বেঁচে থাকে। তার গলায় ঝুলে থাকে সেই মৃত আলবাট্রস। ওডিসিউসের সঙ্গীরা দেবতাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সূর্যদেবতা হেলিওসের পবিত্র গরু জবাই করে খায়। শাস্তিস্বরূপ দেবতা জিউসের পাঠানো ঝড়ে ওডিসিউস ছাড়া সবাই মারা যায়। ওডিসিউস তাঁর জাহাজ, সঙ্গী ও সবকিছু হারিয়ে একা সমুদ্রে ভেসে অপ্সরা ক্যালিপ্সোর দ্বীপে পৌঁছান। লোটাস(পদ্ম) খেয়ে বিস্মৃতিতে ভুগেন। সব ভুলে সেখানে ৭ বছর কাটান। মূল বইয়ে ওডিসিউসের কিছু সঙ্গী এমন এক ফুল খেয়ে ঘরে ফেরার কথা ভুলে বসে। সিনেমায় ওডিসিয়ুস নিজেই লোটাস খেয়ে নিজের উদ্দেশ্য ভুলে যান। নোলান মূলত ওডিসিয়ুসকে সাধারণ মানুষের মতো দেখাতে চেয়েছেন- কারণ কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। 

দ্য ওডিসি রিভিউ: সময়, স্মৃতি ও অনুতাপের নন-লিনিয়ার নির্মাণ

বরাবরের মতই ক্রিস্টোফার নোলান সময় নিয়ে খেলেছেন। স্মৃতি-বিস্মৃতি, পাপ-অনুতাপ, আশা-আক্ষেপ-কে পুঁজি করে নোলান একটা নন-লিনিয়ার বা অসমান্তরাল গল্প টেনেছেন। পর্দায় ফ্ল্যাশব্যাকে ‘ট্রোজেন হর্স’ দেখিয়ে অতীতের পাপ আর বর্তমান অনুতাপ বা guilt দেখিয়েছেন, জলপরী ক্যালিপ্সোর সাথে ওডিসিয়ুসের কথপোকথনের মাঝেই গল্প এক সময়কাল থেকে অন্য সময়কালে বয়ে চলে। ঢেউয়ের মতো অতীতের পুরনো স্মৃতি সমুদ্রের তীরে আছড়ে পড়ে যেন। কখনো চোখে ভবিষ্যৎ যাত্রার আশা, আবার কখনো পুরনো স্মৃতি- নোলান সময়কে ভাঙেন, জোড়েন, আবার একই মুহূর্তকে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বাঁচিয়ে ও রাখেন।

 অবিশ্বাস্য ভিজ্যুয়ালঃ সিনেমাটগ্রাফিতে নোলানের মুন্সিয়ানা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিস্ময়কর সেট, সমুদ্রের বাস্তব দৃশ্যায়ন, CGI-র উপর অকারণ নির্ভর না করে এমন মহাকাব্যিক পৃথিবী গড়ে তোলার সাহস—এসব তাঁকেই মানায়। পর্দা জুড়ে ঢেউ ওঠে, মাস্তুল দোলে, আকাশের নিচে মানুষকে ক্ষুদ্র মনে হয়। চোখ মুগ্ধ হয়, বিস্ময় থামে না। সাইক্লোপস এর গুহার অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের দৃশ্যায়ন চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সংকীর্ণ গুহা, মৌমাছির চাক, ৪০ টি আসল ভেড়া, হাজারের ওপর সৈন্য- কোন দৃশ্যেই CGI ব্যবহার করেননি।

চরিত্র নির্মানে অগভীরতাঃ পর্দার এই বিশালতার ভিড়ে চরিত্রের গভীরতা হারিয়েছে। সবাই যার যার যায়গায় ভালো অভিনয় করলেও চরিত্রগুলির নির্মান খুবই অগভীর ছিল। যুদ্ধফেরা, সময়দগ্ধ, ক্ষতবাহী যে ওডিসিয়ুসকে দেখি; তার জন্য কোথাও হাহাকার তৈরি হয় না। ওডিসিয়ুস আর পেনেলোপি’র দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানেও কোন catharsis অনুভূত হয়না। বিশ বছর ধরে অপেক্ষা করা একজন মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলন—এটি মহাকাব্যের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তগুলোর একটি। অথচ সেই দৃশ্যে চোখ ভিজে ওঠেনি। ওডিসিয়ুসকে relatable করার চেষ্টা করা হয়েছে ঠিক ই। তবু, তার জটিল মনস্তত্ত্বের জায়গায় শুধু অনুতপ্ত যোদ্ধাকে বেশি চোখে পড়েছে।

দ্য ওডিসি রিভিউ - ক্রিস্টোফার নোলানের The Odyssey সিনেমা
দ্য ওডিসি রিভিউ – ক্রিস্টোফার নোলানের The Odyssey সিনেমা

হোমারের ‘দ্য ওডিসি’র নোলানিফিকেশন

সবশেষে, ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমা মূলত হোমারের আড়াই হাজার বছরের পুরনো মহাকাব্যের নোলানিফিকেশন বা নোলানীয় সংস্করণ। নোলানের আধুনিক লেন্সে পৌরাণিক দেব-দেবীর অতিপ্রাকৃতিক জগৎ হয়ে ওঠে মানুষের পৃথিবী। হোমারের Odyssey-তে দেবতারা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। পোসাইডনের ক্রোধ, অ্যাথেনার আশীর্বাদ—ওডিসিয়ুসের যাত্রা বারবার দেবতাদের ইচ্ছায় মোড় নেয়। নোলান অলৌকিক শক্তির বদলে গুরুত্ব দেন মানুষের স্মৃতি, অপরাধবোধ, শোক ও নৈতিক সংকটকে। ফলে ওডিসিয়ুসের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ আর পোসাইডন নন; তার নিজের বিবেক। আধুনিক লেন্সে দেখলে, সাইক্লোপস, ঘূর্ণিস্রোত কিংবা দেবতাদের ক্রোধ যেন যুদ্ধফেরত সৈনিকদের পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসের (PTSD) বহিঃপ্রকাশ—যুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধ পরবর্তী ট্রমা তারা বয়ে বেড়াচ্ছে। The Odyssey আসলে ট্রয়, সাইক্লপস কিংবা দেবতাদের গল্প নয়। নিজের ভেতরের অন্ধকার পেরিয়ে আসার গল্প। ওডিসিয়ুস অনুতপ্ত এক মানুষ যিনি স্বেচ্ছায় নিজের গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছেন অদৃশ্য এক আলবাট্রস। দেবতাদের দেওয়া অমরত্বের বর ফিরিয়ে দিয়ে যিনি ক্ষণস্থায়ী মানুষ হওয়ার পথই বেছে নেন।নিজ রাজ্যে ফিরেও সিংহাসন ছেড়েছুড়ে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। 

“তবু যে যার কাঁটার কাছে ফিরে যায় একদিন, /একদিন যে যার নিঃসঙ্গতার কাছে”।