রসায়ন শাস্ত্রের জনক কে? বা অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ের জনক সম্পর্কে সার্চ করলে পাওয়া যায় পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের নাম। কারণ খুব সন্তর্পণে মুসলিমদের নামগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ বিজ্ঞান, গবেষণা শুরুই হয়েছে মুসলিমদের হাত ধরে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের চিন্তা ও গবেষণা তাঁদের সময়কে ছাড়িয়ে বহু শতাব্দী পরেও মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে থাকে। জাবির ইবনে হাইয়ান তাঁদেরই একজন। তিনি ইসলামী বিশ্বের আলকেমি ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। ইউরোপে তিনি Geber নামে পরিচিত ছিলেন। জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন রসায়ন শাস্ত্রের জনক। তিনি একাধারে ছিলেন কেমিস্ট, অ্যালকেমিস্ট, অ্যাস্ট্রোলজার, ইঞ্জিনিয়ার, জিওগ্রাফার, ফিলোসফার, ফার্মাসিস্ট, ফিজিসিস্ট ও ফিজিশিয়ান।
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, জাবির ইবনে হাইয়ান আনুমানিক ৭২১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান হিসেবে খোরাসানের তুস (Tus)-এর নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল হাইয়ান। কিছু জীবনীতে বলা হয়, তাঁর পিতা হাইয়ান ছিলেন একজন আত্তার, অর্থাৎ ঔষধি ও সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবসা বা প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি। এই কারণে ছোটবেলা থেকেই জাবির বিভিন্ন পদার্থ, উদ্ভিদ, ঔষধি উপাদান ও রাসায়নিক ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এমন একটি বর্ণনা প্রচলিত আছে। তবে তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে সব তথ্য সমানভাবে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়।
জাবিরের শৈশবের সময়টি ছিল ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানচর্চার দ্রুত বিকাশের সময়। চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং আলকেমি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা চলছিল। প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, তাঁর পরিবার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে একসময় ইয়েমেনে চলে যায়। সেখানে তিনি পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে আব্বাসীয়দের উত্থানের পর তিনি আবার কুফায় ফিরে আসেন। তাঁর শিক্ষার ক্ষেত্র শুধু একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সঙ্গে আলকেমি, চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ফার্মেসি-সংক্রান্ত জ্ঞানচর্চার সম্পর্কের কথা বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। কিছু ঐতিহ্যগত বর্ণনায় তাঁকে ইমাম জাফর আল-সাদিক (রহ.)-এর শিষ্য বলা হয়েছে। তবে এই দাবির ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিত তথ্যের বদলে প্রচলিত জীবনীমূলক তথ্য হিসেবে উল্লেখ করাই নিরাপদ।
পরবর্তী জীবনে জাবিরের সঙ্গে কুফার সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কুফা তখন জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। জাবিরের আগ্রহ ছিল পদার্থের প্রকৃতি ও পরিবর্তন বোঝার দিকে। কোনো পদার্থকে উত্তপ্ত করলে কী ঘটে, এক পদার্থের সঙ্গে অন্য পদার্থ মেশালে কী পরিবর্তন হয়, কীভাবে কোনো পদার্থকে পরিশোধন করা যায় এসব প্রশ্ন তাঁকে আকৃষ্ট করত। এই ধরনের কাজের কারণে তাঁকে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চাকারী হিসেবে নয়, বরং পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণনির্ভর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একজন আলকেমিস্ট হিসেবে দেখা হয়।
জাবিরের সময়ে আজকের মতো আধুনিক Chemistry বা রসায়ন আলাদা বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তখন পদার্থ নিয়ে গবেষণাকে মূলত আলকেমি বলা হতো। আলকেমির গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ ধাতুর প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করতেন, কেউ মূল্যবান ধাতু তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতেন, আবার কেউ বিভিন্ন পদার্থের পরিবর্তন ও পরিশোধন নিয়ে পরীক্ষা করতেন।
জাবিরের নামে প্রচলিত রচনাগুলোতে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে পাতন, স্ফটিকীকরণ, বাষ্পীভবন, ঊর্ধ্বপাতন ও ক্যালসিনেশন-এর মতো প্রক্রিয়ার আলোচনা রয়েছে। এই কারণে রসায়নের ইতিহাসে তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাবিরের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো পরীক্ষা করে দেখা। তাঁর নামে প্রচলিত জাবিরীয় রচনায় পদার্থকে পর্যবেক্ষণ, পৃথক করা, পরিশোধন করা এবং পরিবর্তন করার বিভিন্ন পদ্ধতি পাওয়া যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো পদার্থকে উত্তপ্ত করার পর তার বৈশিষ্ট্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়, কোনো তরল থেকে অন্য উপাদান কীভাবে পৃথক করা যায়, অথবা কোনো পদার্থকে বারবার প্রক্রিয়াজাত করলে তার বৈশিষ্ট্যে কী পরিবর্তন আসে এসব বিষয় তাঁর সঙ্গে যুক্ত রচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। এই পরীক্ষামূলক প্রবণতাই পরবর্তী যুগের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে।
জাবিরের নামের সঙ্গে আলেম্বিক (Alembic) নামের একটি পাতনযন্ত্রের সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। পাতন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তরল পদার্থকে উত্তপ্ত করে তৈরি বাষ্পকে আবার ঠান্ডা করে তরলে পরিণত করা হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন উপাদান আলাদা করার সুযোগ তৈরি হয়। জাবিরের নামে প্রচলিত লেখাগুলোতে পাতন ও বিভিন্ন পরীক্ষাগার-প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। এ কারণে তাঁকে পরীক্ষামূলক আলকেমির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জাবিরের কাজ শুধু আলকেমির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর নাম চিকিৎসা ও ঔষধ প্রস্তুতির ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর সময়ে বিভিন্ন উদ্ভিদ, খনিজ ও অন্যান্য পদার্থ থেকে ঔষধি উপাদান প্রস্তুত করা হতো। আলকেমির বিভিন্ন পরিশোধন ও পৃথকীকরণ পদ্ধতি ঔষধ তৈরির ক্ষেত্রেও কাজে লাগত। এই কারণে পরবর্তী কিছু গবেষণায় তাঁকে আরবি রসায়ন ও প্রাথমিক ফার্মেসির বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
জাবির কয়েকশ বা হাজারেরও বেশি বই লিখেছিলেন। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় বিষয়টি এত সরল নয়। কিছু পুরনো সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি দর্শন, যন্ত্রবিদ্যা, সামরিক প্রযুক্তি ও আলকেমি নিয়ে বিপুলসংখ্যক বই লিখেছিলেন। কিন্তু গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন করছেন এই সব গ্রন্থ কি সত্যিই একই ব্যক্তির লেখা?
গবেষক Paul Kraus যুক্তি দিয়েছিলেন যে জাবিরের নামে প্রচলিত বিশাল গ্রন্থসম্ভার আসলে পরবর্তী সময়ের একটি জ্ঞানচর্চার গোষ্ঠীর রচনা হতে পারে। অন্যদিকে Fuat Sezgin এই মত প্রত্যাখ্যান করে জাবিরকে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর নামে প্রচলিত রচনাগুলোর পক্ষে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। আরেকটি মধ্যপন্থী মত হলো কিছু লেখা ঐতিহাসিক জাবিরের হতে পারে, কিন্তু তাঁর নামের অধীনে পরবর্তী কয়েক শতকে আরও অনেক লেখা যুক্ত হয়েছে।
মধ্যযুগে আরবি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ইউরোপে পৌঁছাতে শুরু করলে জাবিরের নামও ইউরোপীয় জ্ঞানজগতে পরিচিত হয়ে ওঠে। সেখানে তাঁর নামের রূপ হয় Geber। জাবিরের নামে প্রচলিত কিছু রচনা লাতিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং ইউরোপীয় আলকেমির বিকাশে সেগুলোর প্রভাব পড়ে। ফলে বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় আলকেমির ইতিহাসে “Geber” একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।
জাবিরের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্ভবত তাঁর পরীক্ষামূলক মানসিকতা। শুধু কোনো পুরনো বক্তব্য বিশ্বাস না করে পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং ফলাফল নথিভুক্ত করার প্রবণতা তাঁর নামে প্রচলিত সাহিত্যকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, জাবির ইবনে হাইয়ান দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন এবং আনুমানিক ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর স্থান হিসেবে সাধারণত কুফা অথবা কিছু রচনায় তুস-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর মৃত্যুর স্থান ও জীবনের শেষ সময়ের কিছু বিবরণ নিয়েও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে।

