সময়ের মারপ্যাঁচ ও মানুষের স্মৃতি: ক্রিস্টোফার নোলানের ‘মেমেন্টো’ ও ‘ইন্টারস্টেলার’-এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

৪ মিনিটের পাঠ

হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমার ক্যানভাসে সবচেয়ে শক্তিশালী যে চরিত্রটি বারবার উঠে আসে, তা কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়; তা হলো ‘সময়’। সময়কে কেবল ঘড়ির কাঁটার টিপটিপ শব্দ কিংবা বিজ্ঞানের কোনো পরিমাপক হিসেবে দেখেন না নোলান। তার কাছে সময় হলো মানুষের স্মৃতি, বিষাদ, ভালোবাসা আর নিজের অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে রাখার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার।

নোলানের দুই কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘মেমেন্টো’ (Memento) এবং ‘ইন্টারস্টেলার’ (Interstellar) সময়ের এই দুটি ভিন্ন রূপকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করে। এক জায়গায় সময় মানুষকে ভুলিয়ে দেয় নিজের সত্তা, আর অন্য জায়গায় মহাবিশ্বের সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে সময়কে ভালোবাসার সেতু বানিয়ে তোলে।


১. সময়ের আয়নায় মেমেন্টো: বিকৃত স্মৃতি ও আত্মপ্রবঞ্চনা

২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মেমেন্টো’ সিনেমায় নোলান প্রথম দেখান কীভাবে মানুষের স্মৃতি এবং সময় হাত ধরাধরি করে ছলে-বলে আমাদের প্রতারিত করে। সিনেমার মূল চরিত্র লিওনার্ড শর্ট-টার্ম মেমরি লস বা স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত। তার জীবনের প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা বা ঘটনা মাত্র ১৫ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপরই তার মস্তিষ্ক সব মুছে ফেলে রিসেট হয়ে যায়।

স্ত্রীর হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে লিওনার্ড পোলারয়েড ছবি, শরীরে আঁকা ট্যাটু এবং ছোট ছোট চিরকুটের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু নোলান এই সিনেমাটির গল্প যেভাবে বলেছেন, তা সিনেমার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরীক্ষা। সিনেমাটি দুটি বিপরীতমুখী টাইমলাইনে চলে: একটি রঙিন গল্প যা পেছনের দিকে যায়, আর অন্যটি সাদা-কালো গল্প যা সামনের দিকে এগোয়।

নোলান আমাদের বোঝাতে চান যে, মানুষ যা মনে রাখতে চায়, মস্তিষ্ক কেবল সেই সত্যটুকুই তৈরি করে নেয়। লিওনার্ডের জীবন আমাদের দেখায় যে আমরা প্রায়শই নিজেদের কাছেই মিথ্যা বলি, যাতে আমাদের বেঁচে থাকার একটি উদ্দেশ্য থাকে। এখানে সময় কোনো সরলরেখা নয়, বরং এটি আত্মপ্রবঞ্চনার এক বিভ্রান্তিকর চক্র।


২. ইন্টারস্টেলার: আপেক্ষিকতা, সময় ধস ও ভালোবাসার মাত্রা

মেমেন্টো যেখানে ছিল একজন মানুষের ভেতরের সংকীর্ণ মনস্তাত্ত্বিক রাজ্য, ২০১৪ সালের ‘ইন্টারস্টেলার’ সেখানে আমাদের নিয়ে যায় মহাবিশ্বের অসীম ব্যাপ্তিতে। কুপার যখন তার ছোট মেয়ে মারফকে রেখে পৃথিবীর বাইরে যাত্রা করেন, তখন সময় কেবল একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে তাদের বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় শত্রু।

ব্ল্যাকহোল গারগানটুয়া এবং মিলারের গ্র্যাভিটেশনাল টাইম ডাইলেশনের কারণে কুপারের জন্য মহাকাশের মাত্র এক ঘণ্টা, পৃথিবীতে মারফের সাতটি বছরের সমান। কুপার যখন একটি অভিযান শেষ করে জাহাজে ফিরে আসেন এবং ২৩ বছরের জমানো বার্তাগুলো দেখতে থাকেন, সেখানে তার ছেলের বড় হওয়া এবং বৃদ্ধ হওয়ার দৃশ্য দেখে তার কান্না পুরো পৃথিবীর দর্শককে স্তব্ধ করে দেয়।

পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী সময় একটি ভৌত মাত্রা। কিন্তু নোলান সেই বিজ্ঞানকে মেলান মানুষের আবেগের সাথে। ফাইভ-ডাইমেনশনাল টেসারেক্ট বা পঞ্চমাত্রিক স্থানে কুপার আবিষ্কার করেন যে, একমাত্র ভালোবাসা এমন একটি শক্তি যা মহাবিশ্বের স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করে সংকেত পাঠাতে পারে।

“ভালোবাসা এমন কোনো কিছু নয় যা আমরা উদ্ভাবন করেছি। এটি স্থান ও কালের সীমারেখা পার হয়ে পৌঁছাতে পারে।”


৩. মেমেন্টো বনাম ইন্টারস্টেলার: সময়ের দুটি বিপরীতমুখী দর্শন

এই দুটি সিনেমার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে নোলানের দর্শনের দুটি চমৎকার দিক ফুটে ওঠে:

  • মেমেন্টোতে সময় হলো জেলখানা: সেখানে অতীতে আটকে থাকা মানুষটি বর্তমানকে মুছে ফেলে নিজের গড়া এক মায়াজালে ঘুরপাক খায়। সময় এখানে মানুষকে ধ্বংস করে।
  • ইন্টারস্টেলারে সময় হলো সেতু: সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী বা কয়েক আলোকবর্ষ দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও সময়কে হারিয়ে বাবার সাথে মেয়ের যোগাযোগ ঘটে। সময় এখানে আশার প্রতীক।

উপসংহার

ক্রিস্টোফার নোলান আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ঘড়ির সময় হয়তো সামনের দিকেই এগিয়ে যায়, কিন্তু মানুষের অনুভূতি সবসময় অতীতে ফিরে যেতে চায় কিংবা ভবিষ্যতে ডানা মেলতে চায়। মেমেন্টোর লিওনার্ড কিংবা ইন্টারস্টেলারের কুপার, দুজনেই সময়ের কাছে হার মেনেছিলেন আবার একই সাথে জয়ীও হয়েছিলেন।

সিনেমার পর্দা যখন অন্ধকার হয়ে যায়, তখন পাঠক ও দর্শকের মনে একটাই প্রশ্ন জেগে থাকে: আমরা কি সত্যি সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি সময় আমাদের স্মৃতি আর ভালোবাসার গল্প সাজিয়ে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে?