All the Empty Rooms: নীরব ঘরের আর্তনাদ

ডকুমেন্টারির নাম: অল দ্য এম্পটি রুমস (All the Empty Rooms)
পরিচালনা: জোশুয়া সেফটেল
চিত্রগ্রহণ: ম্যাট পরওয়ল
সময়কাল: ৩৩ মিনিট
দেশ: যুক্তরাষ্ট্র
ভাষা: ইংরেজি
পুরস্কার: একাডেমি এওয়ার্ড (অস্কার) মনোনয়ন (২০২৫), হ্যাম্পটনস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল জয়ী (২০২৫)

একটা টুথপেস্টের খোলা ঢাকনা, ফেরত না দেওয়া লাইব্রেরির বই, আধোয়া কাপড়ের স্তুপ, পড়ে থাকা খেলনার সেট— যেন এখনই কেউ এসে গুছিয়ে দিয়ে যাবে। অথচ, ঘরে ঢুকতেই স্পষ্ট আদেশ, ধরা যাবে না কিছুই।এই আধোয়া কাপড়গুলোতে যে তার গন্ধ লেগে!
দৃশ্যগুলি ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর Netflix-এ মুক্তি পাওয়া ডকুমেন্টারি All the Empty Rooms- এর। ডকুমেন্টারিটির কেন্দ্রীয় মুখ Steve Hartman—CBS News–এর সেই পরিচিত প্রতিবেদক, যিনি তাঁর মানবিক গল্পগুলোর জন্য সুপরিচিত। সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ও ফটোগ্রাফার Lou Bopp আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল শুটিংয়ে নিহত শিশুদের বাড়িতে গেছেন আর তাদের রুমগুলিকে ক্যামেরাবন্দী করেছেন। বপ আটটি ঘরের ছবি তুলেছিলেন, যার মধ্যে চারটি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে। শিশুদের বয়স ছিল ৯ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। মৃত্যুর পরও তাদের শোবার ঘরগুলিতে বাবা-মায়েরা হাত দেন নি; ঠিক শেষদিন স্কুল যাবার আগে যেটা যেখানে ছিল তেমন ই আছে।
ডমিনিক ব্ল্যাকওয়েল, গ্রেসি মিউলবার্গার, হ্যালি স্ক্রাগস, জ্যাকি কাগারেস— এদের নিয়ে বলতে গিয়ে বপ বলেন, প্রতিটি ঘরে ঢুকলেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসত।
তিনি বলেন,“আমি হাইপারভেন্টিলেট করতে শুরু করতাম। কারণ আপনি এমন একটি পরিবারের ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে শিশুটি আর নেই। প্রতিটি ঘর আলাদা—একেবারে ব্যক্তিগত। সেটাই ছিল তাদের নিরাপদ জায়গা।”

চারটে ফাঁকা ঘর: রেখে যাওয়া স্মৃতি
২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক স্কুলে গুলির ঘটনায় প্রাণ হারায় ডমিনিক ব্ল্যাকওয়েল। ১৪ বছর বয়সী ডমিনিক খেলাধুলা ও স্পঞ্জবব ভালোবাসতো। তার বিছানায় সারি সারি স্পঞ্জবব খেলনা, দরজার পেছনে ঝোলানো ফুটবল মেডেল। ঘরের কোণে এখনও পড়ে আছে তার নোংরা কাপড়ের ঝুড়ি। মা ন্যান্সি ব্ল্যাকওয়েল সেগুলো আর লন্ড্রিতে দেননি। জিজ্ঞেস করতেই বলেন, “আমরা তার গন্ধ হারাতে চাইনি,” তিনি বলেন। ওর আধোয়া জামায় এখনও যেন সে লেগে আছে।

২০২৩ সালের মার্চে, টেনেসির ন্যাশভিলে The Covenant School–এ বন্দুক হামলায় ছয়জন নিহত হন, তাদের মধ্যে ছিলো ৯ বছরের Hallie Scruggs।
দুই বছর পরও হ্যালি স্ক্রাগসের ঘর ঠিক আগের মতোই আছে। বিছানায় তার লাল কম্বল, চারদিকে ছোট ছোট সংগ্রহ—ইউনিকর্ন মূর্তি, ছোট লাল সেফ বক্স, অসমাপ্ত লেগো সেট। কার্পেটের ওপর পড়ে থাকা বিশাল টেডি বিয়ার এখনো ওভাবেই পড়ে আছে, ঠিক যেভাবে হ্যালি রেখে গিয়েছিল। তার মা জাডা স্ক্রাগস বলেন, এ ঘর যে কত কান্নার সাক্ষী। তার বাবা বলেন, “আমি তাকে ছুঁতে চাইতাম… তার ঘামে ভেজা চুল অনুভব করতে চাইতাম। তার বিছানাটাই এখন তার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার জায়গা।”

২০২২ সালের ২৪ মে, টেক্সাসের Robb Elementary School–এ ভয়াবহ বন্দুক হামলায় ১৯ জন শিশু ও ২ জন শিক্ষক নিহত হন। সেই শিশুদের একজন, ৯ বছরের জ্যাকি কাজারেস । টেক্সাসের ইউভালডেতে জ্যাকি কাজারেসের ঘর বেগুনি রঙে ভরা। ছাদের চারপাশে জ্বলে থাকা গোলাপি স্ট্রিং লাইট এখনও নিভেনি। ড্রেসারের ওপর মোড়ানো চকলেট ঠিক ওমনই পড়ে আছে। তার হেয়ারব্রাশে আটকে থাকা চুল আজও কী জীবন্ত!
জ্যাকির টেডি বিয়ারের বোতাম চাপলে শোনা যায় তার হাসি—কুকুরদের সঙ্গে খেলতে খেলতে হাসছিল সে। বড় হয়ে পশুচিকিৎসক হতে চেয়েছিল।

২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার Saugus High School–এ শুটিংয়ে নিহত হয় ১৫ বছরের Gracie Muehlberger। ড্রেসারের ওপর রাখা রঙিন ছোট একটি ট্রিঙ্কেট বাক্সে গ্রেসি নিজেকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিগুলো জমিয়ে রাখত। ১৩ বছর বয়সে লেখা নোটগুলিতে ছিল উত্তেজনা আর স্বপ্নে ভরা ভবিষ্যৎ—অষ্টম শ্রেণির গ্র্যাজুয়েশন, হাইস্কুলের প্রথম দিন, কলেজ জীবন। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পরের পরিকল্পনাও লিখেছিল সে—গাড়িতে জোরে গান বাজবে, আর কাপ হোল্ডারে থাকবে তার প্রিয় স্টারবাকসের ক্যারামেল ফ্রাপুচিনো।
একটি চিঠিতে সে লিখেছিল:
“প্রিয় ভবিষ্যতের আমি, OMG, এটা হাইস্কুল! এই দিনের জন্য আমি কতদিন অপেক্ষা করেছি। ভয় পেও না। তুমি জীবনে কিছু আজীবন বন্ধু পাবে, আবার কিছু শত্রুও। নেতিবাচক বিষয়গুলোতে মন দিও না… সুন্দর কিছু পরবে, অবশ্যই। আমি তোমাকে ভালোবাসি!! শুভকামনা।”

কিন্তু হাইস্কুল জীবনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সব স্বপ্ন থেমে যায়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারিটার সগাস হাই স্কুলে এক ছাত্র পিস্তল নিয়ে গুলি চালায়। নিহত দুই শিক্ষার্থীর একজন ছিল গ্রেসি। তার বয়স ছিল মাত্র ১৫।“তার সামনে পুরো ভবিষ্যৎ পড়ে ছিল,” সিএনএনকে বলেছিলেন তার বাবা ব্রায়ান মিউলবার্গার। “সে হাইস্কুলে মাত্র ১৫ সপ্তাহ কাটাতে পেরেছিল।”
মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে মেয়ের ড্রয়ার খুলে দেখতে গিয়ে গ্রেসির মা সিন্ডি সেই চিঠিগুলো খুঁজে পান।“একদিন হঠাৎ বাক্সটা খুললাম, আর দেখেই অবাক হয়ে গেলাম—এগুলো কী! পড়তে পড়তে কেঁদে ফেলেছিলাম,” তিনি বলেন। “আমি জানতামই না সে ডায়েরি লিখত।”
দীর্ঘদিন গ্রেসির ঘর গুছাতে পারেননি তার বাবা-মা। মেয়ের স্মৃতি আছে বলেই এ ঘর ছেড়ে যেতে চাননি ব্রায়ান। অন্য রাজ্যের চাকরির সুযোগও ফিরিয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত ডকুমেন্টারিতে অংশ নেওয়ার পর তারা জর্জিয়ার আটলান্টার উপকণ্ঠে নতুন বাড়িতে চলে যান। কিছু জিনিস সঙ্গে নেন, বাকিগুলো সংরক্ষণে রাখেন। নতুন বাড়ির পাশে একটি লেক আছে। সেখানে তারা “গ্রেসিস পয়েন্ট” নামে একটি জায়গা বানাবেন—যেখানে পরিবার ও বন্ধুরা একসঙ্গে বসবে, আগুন জ্বালাবে, স্মোরস বানাবে।
আগের বাড়িটি যারা কিনেছেন, তারা গ্রেসির ঝাড়বাতিটি খুলে ফেলেননি—তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সেটি ছেলের ঘরেই রেখে দিয়েছেন। তার আলো এখনও জ্বলছে।

নীরবতাই যেন প্রতিবাদঃ
All the Empty Room-ইচ্ছাকৃতভাবেই বন্দুক বা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো আলোচনা করে না। এর উদ্দেশ্যে সহমর্মিতা জাগানো। হার্টম্যান বলেন, “স্কুলে গুলির ঘটনা বারবার কভার করতে করতে মনে হচ্ছিল দেশ যেন ধীরে ধীরে এটাকে দৈনন্দিন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। আমি ভাবলাম—মানুষকে এই অনুভূতির অসাড়তা থেকে জাগানো যায় কীভাবে?” তিনি শিশুদের ফেলে যাওয়া শূন্য ঘরগুলি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন— একেকটা বুলেট একেকটা ঘর ই শুধু ফাঁকা করে না; নিরেট করে দেয় বাবা-মায়ের বুক। তিনি চিন্তা করতেন দিনের শেষে বাবা-মায়েরা যখন ওই ঘরে ফিরে যান, তখন তাদের কেমন লাগে? তিনি বলেন, “আমি ভাবতাম, দিনের যদি পুরো আমেরিকা একবার সেই ঘরগুলোতে দাঁড়াতে পারত—তাহলে কি আমাদের সহমর্মিতা ফিরে আসত?” স্টিভ হার্টম্যান বলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল “to remember them as kids, not as victims.”কারণ আমরা প্রায়ই তাদের ‘ভিকটিম বলে চিহ্নিত করি—কিন্তু তারা ছিল ফুটবলপ্রেমী, বইপোকা, আঁকতে ভালোবাসা, গানের স্কুলে যাওয়া—একেকটি পূর্ণ জীবন। ডকুমেন্টারির শেষে দেখা যায় হার্টম্যান ও বব তাদের বাড়ি ফিরে আসে। বব প্রতি সকালেই তার কিশোরী মেয়ের ছবি তুলেন। পাছে তার স্মৃতিটুকুন ও না থাকে। ঠুনকো জীবনের তো কোন ভরসা নেই। গ্রেসির মায়ের আক্ষেপে যেন স্পষ্ট হয় জীবনের অনিশ্চয়তা, “সে সবসময় মঞ্চে উঠতে চাইত। এখন তাকে নেটফ্লিক্সে দেখা সত্যিই অবাস্তব লাগে। বড় পর্দায় সে এসেছে—কিন্তু যেভাবে আসতে চেয়েছিল, সেভাবে নয়।”