এক দেশে এক রাজা ছিল।
রাজার নাম ছিল ভূপতি। নামে ভূপতি, কিন্তু ভূমির খবর তার ছিল না। মাথায় সোনার মুকুট, গায়ে রেশমের পোশাক, কিন্তু বুদ্ধি? বুদ্ধির কথা আর কী বলব, সে বুদ্ধি ছিল সোনার মুকুটের নিচেই চাপা পড়ে। কেউ কিছু বললেই রাজা বলতেন “হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো! বেশ বলেছ!” বুঝুন আর না বুঝুন।
তবে রাজামশাই মনে মনে খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কারো ক্ষতি চাইতেন না, কাউকে কষ্ট দিতেন না। শুধু বুদ্ধিটাই যা ছিল না।
এই রাজার ছিল এক মন্ত্রী।
মন্ত্রীর নাম কালিন্দী। দেখতে সুন্দর, কথায় মিষ্টি, চলনে বিনয়ী কিন্তু ভেতরে? ভেতরে সে ছিল একটা বিষধর সাপ। সাপ যেমন ফণা তুলে ছোবল মারে, কালিন্দীও তেমনি। শুধু তার ছোবল দেখা যেত না।
কালিন্দী বুঝেছিল, বোকা রাজা হলো তার সোনার খনি।
সে রাজার নামে ফরমান জারি করত। রাজার নামে খাজনা বাড়াত। রাজার নামে প্রজাদের মাল লুটে নিত। আর নিজে গিয়ে প্রজাদের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নত করে বলত, “ভাই সব, রাজামশাই শুনলেন না। আমি বহুত বলেছি, কিন্তু কী করব বলো, আমি তো নিরুপায়।”
প্রজারা ভাবত, ওই মন্ত্রীই তো একমাত্র আপনজন। রাজাটা শুধু অত্যাচারী।
এইভাবে দিন যায়, মাস যায়। রাজার বিরুদ্ধে প্রজাদের মনে রাগ জমতে থাকে। কৃষক মাঠে কাজ করতে করতে অভিশাপ দেয়। কামার হাপর টানতে টানতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বণিক দোকান বন্ধ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে।
আর কালিন্দী? সে এর মধ্যে সৈন্যদের কানে কানে বিষ ঢেলে দিল।
“এই বোকা রাজার অধীনে থেকে কী লাভ? প্রজারা না খেয়ে মরছে, আর রাজামশাই প্রাসাদে বসে ভোজ করছেন।”
একদিন রাতে-
আকাশে চাঁদ ছিল না। ঝিঁঝি পোকার ডাকও থেমে গিয়েছিল। রাজপথে মশালের আলোয় ভেসে উঠল হাজার হাজার রাগী মুখ। চিৎকার উঠল,
“রাজা ভূপতি নিপাত যাক! অত্যাচারী রাজার বিচার চাই!”
সৈন্যবাহিনীও বিদ্রোহ করে বসল। সেনাপতি তরোয়াল উঁচিয়ে বলল, “রাজা ভূপতি, সিংহাসন ছেড়ে দিন!”
রাজামশাই কিছুই বুঝলেন না। শুধু বুঝলেন , পালাতে হবে।
প্রাসাদের পেছনের গোপন পথ দিয়ে, খালি পায়ে, মাথায় মুকুট ছাড়া তিনি অন্ধকারের ভেতর দিয়ে দৌড়ে পালালেন। পেছনে পড়ে রইল রাজ্য, সিংহাসন, সোনার মুকুট। সামনে ছিল শুধু অন্ধকার বন আর অজানা পথ।
রাজা সারারাত হাঁটলেন।
কোথায় যাচ্ছেন জানেন না। কেন যাচ্ছেন বোঝেন না। ভোরের আলো ফুটতেই একটা বিশাল বটগাছের গোড়ায় এসে বসে পড়লেন। আর তখনই কাঁদলেন। হাউমাউ করে কাঁদলেন। সিংহাসনে বসে যিনি কখনো চোখের জল ফেলেননি, আজ সেই রাজার চোখের জলে মাটি ভিজে গেল।
ঠিক সেই সময় মাথার উপর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
“এই যে, কাঁদছ কেন গো পথিক?”
রাজা চমকে উঠে তাকালেন।
বটগাছের ডালে বসে আছে একটা পাখি। কিন্তু কী অদ্ভুত পাখি রে বাবা! গায়ে সোনা আর সবুজ পালক, ঠোঁটে মণির আভা, আর চোখ দুটো — ওই চোখের দিকে তাকালে মনে হয় সেখানে পৃথিবীর সব জ্ঞান লুকিয়ে আছে।
এ হলো হীরামন পাখি।
যুগে যুগে সে আসে। কখন আসে? যখন অন্যায় বাড়ে, যখন সত্যের পথ হারিয়ে যায়, তখনই হীরামন পাখি দেখা দেয়। তাকে যে চেনে, সে ধন্য। তার কথা যে শোনে, সে পথ পায়।
“তুমি কে গো পাখি?” রাজা কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি হীরামন। বলো তোমার কথা।”
রাজা তখন সব বললেন। শুরু থেকে শেষ। কালিন্দীর কথা, প্রজাদের বিদ্রোহের কথা, রাতের পালিয়ে আসার কথা, সব।
হীরামন চুপ করে শুনল। তারপর বলল,
“রাজা, তোমার রাজ্য গেছে কারণ তুমি রাজ্য চিনতে পারোনি। প্রাসাদে বসে রাজ্য শাসন হয় না, প্রজার কাছে গিয়ে প্রজার কথা বুঝতে হয়। তুমি বোকা ছিলে না, ভূপতি। তুমি ছিলে অজ্ঞ। আর অজ্ঞতা দূর হয় অভিজ্ঞতায়।”
“তাহলে এখন আমি কী করব গো পাখি?”
“এই বনের ওপারে একটা গ্রাম আছে, সুখপুর। সেখানে থাকে এক কৃষক, নাম তার মাধব। তার কাছে যাও। বলো তুমি পথিক, কাজ খুঁজছ। রাখাল হয়ে থাকো তার বাড়িতে। নিজের পরিচয় গোপন রাখো। আর চোখ খোলা রাখো দেখো, শেখো, বোঝো।”
“কিন্তু আমি তো রাজা! রাখালের কাজ করব?”
হীরামন মাথা কাঁত করে বলল , “যে রাজা প্রজার জীবন বোঝে না, সে রাজার যোগ্য নয়। আগে মানুষ হও, ভূপতি। তারপর রাজা হওয়ার কথা ভেবো।”
সুখপুর গ্রামটা ছোট্ট, কিন্তু প্রাণবন্ত।
কৃষক মাধব ছিলেন মাঝবয়সী মানুষ। কপালে রোদের ছাপ, হাতে কাজের দাগ, কিন্তু মনে ছিল পাহাড়ের মতো সরলতা। ভূপতি যখন তার দরজায় এসে দাঁড়াল, ক্লান্ত, ধুলোমাখা, একা, মাধব এক মুহূর্তও ভাবলেন না।
“আসো বাবা, ঘরে এসো। মুখে জল খাও আগে।”
রাজা নাম বললেন, ভোলা।
পরদিন ভোরে মাধব তাকে নিয়ে গেলেন মাঠে। হাতে দিলেন একটা লাঠি, বললেন , “ওই দ্যাখো গরুগুলো। মাঠে নিয়ে যাবে, ঘাস খাওয়াবে, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরাবে।”
রাজা ভূপতি যিনি কখনো নিজের হাতে এক গ্লাস জলও ঢালেননি, তিনি সেদিন হাতে লাঠি নিয়ে গরু চরাতে বেরোলেন।
প্রথম দিন গরু পালাল, ভূপতি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন কাদায়। দ্বিতীয় দিন রোদে পুড়ে ঘাড় লাল হয়ে গেল। তৃতীয় দিন পা ফুলে উঠল। কিন্তু মাধবের স্ত্রী সুধা প্রতিদিন সন্ধ্যায় গরম ভাত আর ডাল বেড়ে দিতেন, “খাও বাবা, শরীর ঠিক থাকলে কাজ হবে।”
সেই ডাল-ভাতের স্বাদ ভূপতি আগে কখনো পাননি। সোনার থালায় যত পদই থাকুক, মাটির বাটির ডালের উষ্ণতা সেখানে ছিল না।
দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস গেল।
ভূপতি শিখলেন কাদামাটিতে পা রেখে হাঁটতে। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস হাত দিয়ে ছুঁতে। বৃষ্টির আগে মেঘের রং দেখে আবহাওয়া বুঝতে। আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ চিনতে।
বিকেলে গ্রামের বটতলায় সবাই জড়ো হত। কৃষকরা গল্প করত, দুঃখের কথা বলত। ভূপতি চুপ করে বসে থাকতেন আর শুনতেন।
“এবার খাজনা দিতে পারলাম না রে ভাই। ধার করতে হবে।”
“ছেলেটা জ্বরে পড়েছে, ওষুধ কেনার পয়সা নেই।”
“বাজারে গেলে সৈন্যরা মাল লুটে নেয়।”
ভূপতির বুকটা ভার হয়ে যেত। মনে মনে বলতেন, এরা কি সত্যিই আমার রাজ্যের মানুষ? এরা এতটা কষ্টে ছিল? আমি কেন জানতাম না?
উত্তরটা তিনি জানতেন। কারণ তিনি কখনো জানতে চাননি।
এদিকে চন্দ্রপুরে কালিন্দী সিংহাসনে বসেছে।
প্রথম কয়েকদিন সে ভালো ভালো কথা বলল। দু-একটা ছোট কাজ করল। প্রজারা ভাবল, এইবার বুঝি রাজ্যে সুখ আসবে।
কিন্তু বেশিদিন মুখোশ পরে থাকা যায় না।
সিংহাসনে বসতেই কালিন্দীর লোভ বেড়ে গেল দশগুণ। খাজনা দ্বিগুণ করা হলো। যে দিতে পারবে না, তার জমি বাজেয়াপ্ত। বাজারে তার লোকেরা বসে ব্যবসায়ীদের মাল অর্ধেক দামে কিনে নিত। কেউ প্রতিবাদ করলে রাতে তার ঘরে আগুন।
যে মানুষগুলো একদিন কালিন্দীকে ভালো মনে করেছিল, তারা বুঝল, তারা ঠকেছে।
গ্রামের বুড়ো রামেশ্বর একদিন বলল — “আরে, রাজা ভূপতি তো এর চেয়ে ভালো ছিলেন! উনি কিছু বুঝতেন না, তাই এই শয়তানটা সব করত। এখন তো সরাসরি করছে।”
কিন্তু এত বুঝে কী হবে? কালিন্দীর হাতে সৈন্য আছে, অস্ত্র আছে, ক্ষমতা আছে। প্রতিবাদের ভাষা তখন বুকের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকত।
একদিন হীরামন পাখি এলো সুখপুর গ্রামে।
ভূপতি তখন মাঠে গরু চরাচ্ছেন। পাখি এসে বসল পাশের একটা আমগাছে।
“ভূপতি, তুমি কি প্রস্তুত?”
ভূপতি লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চেহারা বদলে গেছে, রোদে পোড়া, শক্ত, পরিণত। চোখে একটা গভীর ভাব এসেছে যা আগে ছিল না।
“কীসের জন্য প্রস্তুত?”
“তোমার রাজ্যের জন্য। তোমার প্রজার জন্য। চন্দ্রপুরের মানুষ এখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তারা মুক্তি চায়, কিন্তু নেতা নেই, পথ নেই।”
ভূপতি একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “কিন্তু আমি কি পারব গো পাখি? আমি তো বোকা রাজা।”
হীরামন হাসল। বলল, “যে মানুষ নিজের ভুল বোঝে, সে আর বোকা নয়। তুমি এই কয় মাসে যা শিখেছ, তা কোনো রাজকীয় শিক্ষায় শেখা যায় না। আজ সন্ধ্যায় গ্রামের বটতলায় যাও। মানুষকে সত্য কথা বলো। বাকিটা দেখো।”
সেই সন্ধ্যায় সুখপুরের বটতলায় অনেক মানুষ জমল।
শুধু সুখপুর নয় — আশেপাশের গ্রাম থেকেও এলো লোক। হীরামন পাখি উড়ে এসে বটগাছের মাথায় বসল। তারপর তার গলা থেকে বেরিয়ে এলো এমন এক কণ্ঠস্বর, যা মানুষের বুকের ভেতরে গিয়ে ঘা দেয়।
সে বলল কালিন্দীর সব কুকর্মের কথা। বলল কীভাবে রাজার নাম ব্যবহার করে সে প্রজাদের ঠকিয়েছে, কীভাবে বিদ্রোহ লাগিয়েছে, কীভাবে সিংহাসন দখল করেছে।
তারপর বলল, “তোমাদের মধ্যেই আছেন তোমাদের রাজা। রাখাল ভোলা নামে যে মানুষটা এই কয় মাস তোমাদের সাথে মাটিতে বসে খেয়েছে, মাঠে কাজ করেছে, সে-ই রাজা ভূপতি।”
সবাই চমকে তাকাল ভোলার দিকে।
ভূপতি এগিয়ে এলেন। তিনি কথা বললেন, কিন্তু আগের বোকা রাজার মতো নয়। শান্ত, স্পষ্ট, সরল গলায়।
“আমি তোমাদের রাজা ছিলাম, কিন্তু তোমাদের কথা জানতাম না। এই কয় মাসে তোমাদের সাথে থেকে বুঝেছি, রাজার মুকুট থাকলেই রাজা হওয়া যায় না। এই ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।”
বটতলায় পিনপতন নীরবতা।
তারপর বুড়ো রামেশ্বর উঠে দাঁড়াল। বলল, “রাজামশাই, আমরাও ভুল করেছিলাম। মিথ্যায় ভুলেছিলাম। এখন সত্য জেনেছি।”
একজন, দুজন, তিনজন একে একে উঠে দাঁড়াল সবাই।
পরের ভোরে চন্দ্রপুরের রাজপথে অন্য এক মিছিল নামল।
এবার তাদের হাতে মশাল নেই, মুখে রাগ নেই। হাতে ধানের শীষ, লাঙলের ফলা, মাটির প্রদীপ। মুখে একটাই কথা,
“সত্যের জয় হোক। ন্যায়ের রাজা ফিরে আসুক।”
কালিন্দীর সৈন্যরা আটকাতে এলো। কিন্তু যে সৈন্যরা নিজেরাও প্রজার ছেলে, যাদের মা-বাবা এই ভিড়েই দাঁড়িয়ে, তারা তরোয়াল নামিয়ে রাখল।
সেনাপতি এগিয়ে এলেন। মাধব কৃষককে দেখলেন পাশে, দেখলেন ভূপতিকে। একটু থামলেন। তারপর মাথা নোয়ালেন।
“রাজামশাই, আমরা ভুল করেছিলাম।”
কালিন্দী প্রাসাদের জানালা থেকে দেখল, এবার আর পালানোর পথ নেই। তার সব চাল শেষ। সত্য বেরিয়ে পড়েছে।
রাজা ভূপতি সিংহাসনে ফিরলেন।
কালিন্দীর বিচার হলো, প্রতিশোধের বিচার নয়, ন্যায়ের বিচার। যে ক্ষতি সে করেছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পাঠানো হলো জনসেবায়।
আর রাজা ভূপতি? তিনি প্রতি সপ্তাহে একদিন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গ্রামে যেতেন। কৃষকের সাথে বসে কথা বলতেন, সমস্যা শুনতেন। তাঁর দরবারে যে কোনো প্রজা সরাসরি কথা বলতে পারত। মাধব কৃষককে তিনি প্রজাকল্যাণ পরিষদের প্রধান করলেন। বললেন, “তুমিই আমাকে রাজা হতে শিখিয়েছ।”
আর হীরামন পাখি?
একদিন বিকেলে সে এসে বসল রাজপ্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু চূড়ায়। ভূপতি তাকে দেখে এগিয়ে এলেন।
“যাচ্ছ হীরামন?”
“আমার কাজ শেষ। তুমি এখন নিজেই পথ চিনতে পারবে।”
“কখনো আবার আসবে?”
হীরামন একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “যেখানে সত্যিকারের মানুষ থাকে, সেখানে আমি সবসময় আছি। দেখা যাই না বলে নেই ভেবো না।”
পরের মুহূর্তেই সে উড়ে গেল। সোনালি-সবুজ একটা ছায়া আকাশে মিলিয়ে গেল।
চন্দ্রপুরে আবার সোনালি ধান হলো। নদীতে আবার মাছ খেলল। বাজারে বাজারে আবার হাসি ফুটল।
আর শিশুরা রাতে ঘুমানোর আগে মায়ের কাছে বায়না ধরত,
“মা, হীরামন পাখি আর বোকা রাজার গল্পটা বলো।”

