ড্যাটলভ পাস ট্র্যাজেডি: ইউরাল পর্বতের বরফে ঢাকা সেই ৯টি রহস্যময় মৃত্যুর উন্মোচন

১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তর ইউরাল পর্বতমালার বরফে ঢাকা দুর্গম অঞ্চল। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বইছে তীব্র হাড়-কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ। এমন এক ভয়াল রাতে ‘খোলাত সিয়াখল’ (স্থানীয় মানসি উপজাতির ভাষায় যার অর্থ “মৃত্যুর পাহাড়”) তার ঢালে ছড়ানো একটি তাঁবুর ভেতর চেপে বসেছিল ৯ জন তরুণ-তরউনী। তারা সবাই অভিজ্ঞ স্কিয়ার ও হাইকার, উরাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সেরা শিক্ষার্থী।

কিন্তু সেই রাতে এমন কিছু একটা ঘটেছিল, যা তাদের বাধ্য করেছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রির বরফে নিজেদের তাঁবু ভেতর থেকে ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে কেটে, কোনোরকম শীতের পোশাক বা বুট জুতো ছাড়াই পরম আতঙ্কে অন্ধকারের দিকে ছুটতে। সপ্তাহখানেক পর যখন উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছায়, তারা মুখোমুখি হয় ইতিহাসের অন্যতম অদ্ভুত ও গা ছমছমে দৃশ্যপটের। আজ ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও “ড্যাটলভ পাস ঘটনা” বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।


১. অভিযাত্রী দল ও যাত্রার শুরু

অভিযাত্রী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ২৩ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেধাবী ছাত্র ইগর ড্যাটলভ। তার নামানুসারেই পরবর্তীকালে এই গিরিপথের নাম হয় “ড্যাটলভ পাস”

দলে ছিলেন মোট ১০ জন সদস্য: ৮ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী। সবাই ছিলেন ক্লাস-২ স্কিয়ার, আর এই অভিযান সফল হলে তারা পেতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ “ক্লাস-৩” হাইকিং সার্টিফিকেট। তাদের মূল গন্তব্য ছিল উত্তর ইউরালের অন্যতম দুর্গম পর্বত ওতোর্তেন

যাত্রার শুরুতে দলের একজন সদস্য, ইউরি ইউদিন, পিঠের তীব্র ব্যথার কারণে ২৫ জানুয়ারি অভিযান থেকে পিছু হটে ফিরে আসেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, অসুস্থতার কারণে পিছু হটাই ইউরিকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তিনি হন এই দলের একমাত্র জীবিত উত্তরসূরি। বাকি ৯ জন সদস্য সামনে এগিয়ে যান।


২. নিখোঁজ হওয়া এবং ভয়ংকর আবিষ্কার

১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভিজাই গ্রামে ফিরে এসে ইগর ড্যাটলভের তাদের স্পোর্টস ক্লাবে টেলিগ্রাম করার কথা ছিল। কিন্তু ১২ তারিখ পার হয়ে যখন ২০ ফেব্রুয়ারি আসে, পরিবারের উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছায়। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনী এবং সেচ্ছাসেবক ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি বিশাল উদ্ধারকারী দল ইউরাল পর্বতে পাঠানো হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি, উদ্ধারকারীরা অবশেষে খোলাত সিয়াখলের ঢালে ইগর ড্যাটলভদের তাঁবুটি খুঁজে পান। তাঁবুটি দেখে উদ্ধারকারীরা স্তম্ভিত হয়ে যান:

  • ভেতর থেকে কাটা তাঁবু: তাঁবুর বাইরের দিক থেকে কোনো ক্ষতি হয়নি। ধারালো কিছু দিয়ে তাঁবুটি ভেতর থেকে কেটে বের হওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছিল।
  • অনুপস্থিত জুতো ও পোশাক: মাইনাস ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তাঁবুর ভেতরেই অলস পড়ে ছিল অভিযাত্রীদের ভারী জ্যাকেট, বুট জুতো ও বুট মোজা।
  • পায়ের ছাপ: তাঁবুর বাইরে বরফের ওপর খালি পায়ের ছাপ (অথবা কেবল মোজা পরা পায়ের ছাপ) পাওয়া যায়, যা নির্দেশ করে অভিযাত্রীরা চরম আতঙ্কে জুতো পরার সময়টুকুও পাননি।

৩. নিথর দেহগুলোর রহস্যজনক অবস্থা

তাাঁবু থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দূরে একটি বড় দেবদারু গাছের নিচে প্রথম দুটি লাশ পাওয়া যায়: ইউরি দোরোশেঙ্কো এবং ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কো। দুজনেই ছিলেন কেবল অন্তর্বাস পরা, তাদের হাত-পা হিমায়িত। দেবদারু গাছের ডালগুলো ছাঁটা ছিল, যেন কেউ গাছে উঠে দূরে তাঁবুর দিকে তাকাচ্ছিল বা আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিল।

কিছু দূরেই পাওয়া যায় ইগর ড্যাটলভ, জিনাইদা কোলমোগোরোভা ও রুস্তেম স্লোবোদিনের লাশ। তাদের মুখ ছিল তাঁবুর দিকে ফেরানো, ধারণা করা হয় তারা তাঁবুতে ফিরে আসার চেষ্টা করছিলেন।

বাকি ৪ জনের লাশ খুঁজে পেতে সময় লাগে আরও মে মাস পর্যন্ত। তারা চার ফুট বরফের নিচে একটি খাঁদের মধ্যে চাপা পড়ে ছিলেন। কিন্তু তাদের দেহের আঘাত ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা তৈরি করে:

  1. অভ্যন্তরীণ ভয়াবহ আঘাত: নিকোলাই থিবো-ব্রিনোলের খুলিতে প্রচণ্ড আঘাতের চিহ্ন ছিল। লুদমিলা দুবিনীনা এবং সেমিয়ন জোলোতারিওভের বুকের পাঁজর ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, যা কোনো বড় গাড়ি দুর্ঘটনার ইমপ্যাক্টের সাথে তুলনীয়।
  2. অক্ষত ত্বক: আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাড় চুরমার হলেও বাইরের চামড়ায় আঘাতের কোনো বড় দাগ ছিল না! কোনো মানুষ যদি হাত দিয়ে মারামারি করত, তবে এমন নিখুঁত অভ্যন্তরীণ ধ্বংস সম্ভব ছিল না।
  3. নিখোঁজ অঙ্গ: লুদমিলা দুবিনীনার জিহ্বা, চোখ ও মুখের অংশবিশেষ গায়েব ছিল।
  4. তেজস্ক্রিয়তা: কয়েকজন অভিযাত্রীর পোশাকে পাওয়া যায় অস্বাভাবিক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা।

ময়নাতদন্তের পর সোভিয়েত তদন্তকারীরা একটি রহস্যময় বাক্যে কেস বন্ধ করে দেন: “এক অজানা ও পরাক্রমশালী প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে এই মৃত্যু ঘটেছে।”


৪. কী ঘটেছিল সেই ভয়াল রাতে? প্রধান প্রধান তত্ত্বসমূহ

ছয় দশক ধরে শত শত গবেষক, সাংবাদিক ও বৈজ্ঞানিক ড্যাটলভ পাসের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। উঠে এসেছে নানা রোমাঞ্চকর তত্ত্ব:

১. স্থানীয় মানসি উপজাতির আক্রমণ?

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল মানসি উপজাতির লোকেরা তাদের পবিত্র পাহাড়ে অনুপ্রবেশের অপরাধে অভিযাত্রীদের হত্যা করেছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে কোনো মারামারির আলামত বা অন্য কারো পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন যে হাড় ভাঙার মতো আঘাত কোনো মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব।

২. সোভিয়েত গোপন সামরিক অস্ত্র বা প্যারাসুট মাইন পরীক্ষা?

সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন স্নায়যুদ্ধের তুঙ্গে। অনেকেই মনে করেন, ওই এলাকায় গোপনে প্যারাসুট মাইন বা মিসাইল পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। তেজস্ক্রিয় পোশাক, আকাশে দেখা যাওয়া রহস্যময় আলোর বৃত্ত এবং সামরিক বাহিনীর তড়িঘড়ি তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এই তত্ত্বকে তীব্র করে তোলে।

৩. ইনফ্রাসাউন্ড ও নিম্নমাত্রার শব্দতরঙ্গ

একটি তত্ত্বে বলা হয়, ইউরাল পর্বতের বিশেষ ভৌগোলিক গঠন এবং প্রবল শৈত্যপ্রবাহের কারণে সেখানে ইনফ্রাসাউন্ড বা নিম্নমাত্রার শব্দতরঙ্গ তৈরি হয়েছিল। এই শব্দতরঙ্গ মানুষের কানে শোনা যায় না, কিন্তু মস্তিষ্কে তীব্র আতঙ্ক, বমি ভাব এবং অমূলপ্রতক্ষ্য তৈরি করে। আতঙ্কে উন্মাদ হয়েই নাকি সবাই তাঁবু কেটে পালিয়েছিলেন।

৪. আধুনিক বৈজ্ঞানিক সমাধান: বরফের স্ল্যাব ধস

২০২১ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ সুইজারল্যান্ডের গবেষক আলেকজান্ডার পুজরিন এবং জোহান গোমে একটি যুগান্তকারী মডেল উপস্থাপন করেন।

তারা গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞানের সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখান:

  • অভিযাত্রীরা তাঁবু খাটানোর জন্য বরফের ঢালে যে গর্ত খুঁড়েছিলেন, তা বরফের ওপরের কড়া স্তরটিকে দুর্বল করে দেয়।
  • তীব্র বাতাসের কারণে রাতের বেলা অতিরিক্ত বরফ তাঁবুর ওপরের ঢালে জমা হয়।
  • হঠাৎ করেই বরফের একটি ভারী ও কঠিন স্ল্যাব ধস তাঁবুর ওপর ভেঙে পড়ে।
  • ঘুমন্ত অবস্থায় এই ভারী বরফের চাপেই নিকোলাই ও লুদমিলাদের পাঁজর ও খুলি ভেঙে যায়।

স্ল্যাবের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার আতঙ্কে এবং দ্বিতীয় ধসের ভয়ে তারা দ্রুত ধারালো ছুরি দিয়ে তাঁবু কেটে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু মাইনাস ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অন্ধকার পাহাড়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও আঘাতের কারণে একজন একজন করে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। (পরে লুদমিলার চোখ বা জিহ্বা না থাকার কারণ হিসেবে বন্যপ্রাণী ও বরফের নিচে পচনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করা হয়।)


উপসংহার

প্রকৃতি কি তবে বিজ্ঞান দিয়ে তার রহস্যের অবসান ঘটিয়েছে? হয়তো ২০২১ সালের স্ল্যাব ধসের তত্ত্বটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা। কিন্তু শেষ বেঁচে থাকা সদস্য ইউরি ইউদিন মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, “যদি ঈশ্বর আমাকে একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তর চাওয়ার সুযোগ দেন, তবে আমি জিজ্ঞেস করব: সেই রাতে আমার বন্ধুদের সাথে আসলে কী ঘটেছিল?”

খোলাত সিয়াখলের নীরব বরফ আজও ৯টি তাজা প্রাণ ও তাদের অপূরণীয় স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রহস্য বিজ্ঞান দিয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা করা গেলেও, ভয়াল সেই রাতের আতঙ্ক আর অভিযাত্রীদের করুণ চিৎকার আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়।