রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর একটি মোহাম্মদপুর টাউন হল। প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণা, সুউচ্চ অট্টালিকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপ আর আধুনিকতার চাকচিক্য। কিন্তু এই কোলাহলের ঠিক পাশেই, গজনবী রোড দিয়ে কয়েক পা ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন সময় এক লহমায় থমকে যায়। চোখ ধাঁধানো আলো হারিয়ে গিয়ে সামনে ভেসে ওঠে এক আলো-আঁধারির গোলকধাঁধা।
মাথার ওপর জট পাকিয়ে থাকা শত শত অবৈধ বিদ্যুতের খোলা তার যেন কোনো দানবীয় মাকড়সার জাল। দুই পাশে স্যাঁতসেঁতে নোনা ধরা ইটের দেয়াল, এতটাই সংকীর্ণ গলি যে দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে যেতে গেলে একজনের কাঁধ অন্যজনের গায়ে ঘষা খায়। সূর্যের আলো যেখানে কোনোদিন মাটির স্পর্শ পায় না, আর বাতাসে সবসময় ভেসে থাকে খোলা নর্দমার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, কয়লার ধোঁয়া আর ফুটন্ত সরিষার তেলের সুবাস।
এটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। সরকারি হিসেবে মাত্র ১৬ একর জমিতে গড়ে ওঠা এক ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ, যেখানে গাদাগাদি করে বাস করছেন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ। পৃথিবীর যেকোনো জনবহুল বস্তির চেয়েও এর ঘনত্বের হিসাব বহুগুণ ভয়ংকর।
বাইরের পৃথিবী যখন চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিপ্লব ঘটাচ্ছে, তখন এই ক্যাম্পের মানুষগুলো অর্ধশতক ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন শুধু একটু মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারের জন্য। কিন্তু কীভাবে ঢাকা শহরের বুকে গড়ে উঠল এই অভিশপ্ত ছিটমহল? কারা এই মানুষগুলো, আর কেনই বা তাদের নামহীন এক ইতিহাসের দায় বয়ে বেড়াতে হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম?
১. দেশভাগের রক্তক্ষরণ ও এক ভুল স্বপ্নের মোহ
জেনেভা ক্যাম্পের ইতিহাস আসলে ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষ ভাগের এক করুণ রক্তক্ষয়ী পরিণতির সাথে জড়িত।
১৯৪৭ সালে যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন ভারতের তৎকালীন বিহার, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু উর্দুভাষী মুসলমান দাঙ্গা ও সহিংসতার মুখে নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। মুসলিম লীগের আশ্বাসে তারা ভেবেছিলেন, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান হবে তাদের স্বপ্নের স্বর্গরাজ্য। সেই মোহে প্রায় ১০ লাখের বেশি উর্দুভাষী মুসলিম পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) পাড়ি জমান।
পূর্ব বাংলায় আসার পর তাদের বেশিরভাগকেই পুনর্বাসন করা হয়েছিল সৈয়দপুর, ঈশ্বরদী, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায়। ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে স্থানীয় বাঙালিদের সাথে তাদের ছিল বিস্তর ফারাক। পাকিস্তান সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করত। ফলে ভালো চাকরি, রেলওয়ের কলোনি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তাদের একটি বড় অংশ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামোর পরম অনুগত হয়ে ওঠে। তারা কখনোই নিজেদের মাটির সাথে, অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে একাত্ম হতে পারেনি। এই ভাষাগত দূরত্ব ও রাজনৈতিক অন্ধত্বই ১৯৭১ সালে ডেকে আনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

২. ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ‘রেড ক্রস’-এর তাঁবু
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত ও বেদনাদায়ক। পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের অনেকে শান্তি কমিটি ও সহযোগী বাহিনীতে যোগ দেয়, যার ফলে সাধারণ বাঙালিদের সাথে তাদের এক গভীর ঐতিহাসিক শত্রুতা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে যুদ্ধবন্দী হিসেবে দিল্লিতে চলে যায়। কিন্তু তৎকালীন বাংলাদেশে থেকে যায় প্রায় পাঁচ লাখের বেশি উর্দুভাষী সাধারণ মানুষ। পরাজিত শক্তির দোসর হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে এবং চরম অনিশ্চয়তায় তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঘরবাড়ি ছেড়ে এক জায়গায় জড়ো হতে শুরু করে।
ঠিক সেই সংকটজনক মুহূর্তে তাদের জানমালের নিরাপত্তা ও মানবিক আশ্রয়ের জন্য এগিয়ে আসে জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC)। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় রেড ক্রস ১৯৭২ সালে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাময়িকভাবে ১১৬টি আশ্রয় ক্যাম্প স্থাপন করে। মোহাম্মদপুরের এই ১৬ একর ফাঁকা জমিতে রেড ক্রসের তাঁবু খাঁটিয়ে হাজার হাজার পরিবারকে জায়গা দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে, তাই এই অস্থায়ী ক্যাম্পটির নাম মানুষের মুখে মুখে হয়ে যায় ‘জেনেভা ক্যাম্প’।
পরিকল্পনা ছিল, রেড ক্রসের তত্ত্বাবধানে এই মানুষগুলো মাত্র কয়েক মাস বা বড়জোর বছরখানেক এখানে থাকবে। এরপর আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে তাদের নিজেদের দেশ পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। রেড ক্রসের ফর্ম পূরণ করে তারা নিজেদের ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু সেই কয়েক মাসের অস্থায়ী আশ্রয় যে অর্ধশতাব্দীর এক স্থায়ী নরকে রূপ নেবে, তা সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
৩. পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা ও রাষ্ট্রহীনতার অভিশাপ
যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার এই উর্দুভাষীদের প্রতি যে আচরণ করেছিল, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে এক জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতা।
১৯৭৩ সালের দিল্লি চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় পাকিস্তান প্রথমদিকে কিছু সরকারি চাকরিজীবী ও ভাঙা পরিবারের মানুষকে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়। প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ তখন পাকিস্তানে চলে যান। কিন্তু এরপরই পাকিস্তানের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ সংকীর্ণতা দেখা দেয়। সিন্ধু প্রদেশের রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষ করে করাচির রাজনীতি) দাবি তোলে যে আরও লাখ লাখ উর্দুভাষী বিহারী যদি করাচিতে আসে, তবে স্থানীয় সিন্ধিদের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
ব্যস, পাকিস্তান সরকার তাদের সীমানার দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। যে পাকিস্তানের জন্য তারা নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখেছিল, সেই পাকিস্তানই এক নিমেষে তাদের নিজের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে ছুড়ে ফেলে দিল। ওদিকে নবজাত বাংলাদেশেও তারা পরিচিতি পান ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ হিসেবে। ফলে জেনেভা ক্যাম্পের মানুষগুলো হয়ে পড়লেন আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘স্টেটলেস’ বা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রহীন এক জনগোষ্ঠী। তাদের না ছিল কোনো দেশের পাসপোর্ট, না ছিল নাগরিক অধিকার, না ছিল ভোট দেওয়ার ক্ষমতা। ক্যাম্পের বাঁশের বেড়া আর টিনের চালের খাঁচাতেই বন্দি হয়ে গেল তিনটি প্রজন্মের কোটি স্বপ্ন।
৪. আট বাই আট ফুটের খাঁচা ও দৈনন্দিন দুঃস্বপ্ন
জেনেভা ক্যাম্পে প্রবেশ করলে বোঝা যায় মানুষের সহ্যক্ষমতার সীমা ঠিক কতটা হতে পারে। এখানে প্রতিটি পরিবারের ভাগে রয়েছে মাত্র আট বাই আট ফুট কিংবা খুব বেশি হলে দশ বাই আট ফুটের একটিমাত্র এক চিলতে কামরা। এই একটি ছোট ঘরের ভেতরই বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদী মিলে আট থেকে দশজন মানুষকে থাকতে হয়। ঘরের ভেতর কোনো আসবাবপত্র রাখার জায়গা নেই। কাঠের পাটাতন দিয়ে ওপরের দিকে মাচা বানিয়ে সেখানে রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাম্পের তরুণরা অনেক সময় পালা করে ঘুমায়, একজন দিনে ঘুমালে আরেকজন রাতে বাঁশের মাচায় শুতে যায়।
পুরো ক্যাম্পের সবচেয়ে অমানবিক দৃশ্যটি হলো এর শৌচাগার ব্যবস্থা। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি গণ-শৌচাগার। প্রতিদিন ভোরে প্রতিটি শৌচাগারের সামনে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশুর দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। কখনো কখনো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই, ফলে একটু বৃষ্টি হলেই ক্যাম্পের গলিপথগুলো মলমূত্র আর নর্দমার কালো পানিতে ভেসে যায়।
কিন্তু এই চরম নরকবাসের মধ্যেও জেনেভা ক্যাম্পের মানুষগুলো থেমে থাকেনি। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা নিজেদের অসাধারণ কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছে। ঢাকার বেনারসি শাড়ি, বিয়ের জমকালো লেহেঙ্গা কিংবা নামী-দামী বুটিকের যে চোখ ধাঁধানো জরি আর কারচুপির সূক্ষ্ম কাজ আমরা দেখি, তার সিংহভাগই তৈরি হয় এই জেনেভা ক্যাম্পের আলোহীন স্যাঁতসেঁতে ঘরের ভেতর বসে থাকা নিঃশব্দ কারিগরদের আঙুলের ছোঁয়ায়। এছাড়া মোটর মেকানিক, মাংস কাটার কসাই, কিংবা নাপিত হিসেবে তাদের নিষ্ঠা ও দক্ষতা গোটা ঢাকা শহরে সুবিদিত।

৫. কাবাবের সুবাস ও অন্ধকার জগতের ভয়াল ছোবল
জেনেভা ক্যাম্পের সাথে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত দ্বিমুখী বৈপরীত্য। একদিকে এখানে রয়েছে ঢাকার বিখ্যাত রসনা বিলাসের হাতছানি, অন্যদিকে রয়েছে মাফিয়া আর মাদকের ভয়াল অন্ধকার।
সন্ধ্যা নামলেই জেনেভা ক্যাম্পের বাইরের সীমানা রূপ নেয় এক উৎসবমুখর খাদ্যের শহরে। মুস্তাকিমের শিক কাবাব, বোটি কাবাব, গরুর মগজ ভাজা আর মুচমুচে লুচি কিংবা পরোটা খাওয়ার জন্য গুলশান-ধানমন্ডি থেকে শুরু করে শহরের নানা প্রান্তের ভোজনরসিকরা এসে ভিড় জমান। কয়লার গনগনে আগুন আর পোড়া মশলার মাতাল ঘ্রাণের এই দৃশ্যপট মুখরিত থাকে গভীর রাত পর্যন্ত।
কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরের অন্ধকার গলিতে এই সুবাসের পেছনেই ওঁত পেতে রয়েছে অপরাধজগতের কালো থাবা। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে জেনেভা ক্যাম্প ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রধান মাদক চোরাচালানের স্বর্গরাজ্যে। ইয়াবা, হেরোইন এবং গাঁজার বড় বড় সিন্ডিকেট ক্যাম্পের সরু গলিগুলোকে তাদের নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছে। কারণ ক্যাম্পের জটিল গোলকধাঁধায় কোনো অচেনা মানুষ ঢুকলে সহজে পথ খুঁজে পায় না, আর পুলিশি অভিযানের সময়ও অপরাধীরা ছাদের ওপর দিয়ে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে নিমেষে পালিয়ে যেতে পারে।
মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পের ভেতরে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র গ্যাং। চুয়া সেলিম, বুনিয়া সোহেলের মতো শীর্ষ গ্যাংস্টারদের আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রায়ই কেঁপে ওঠে মোহাম্মদপুরের শান্ত জনপদ। হাতবোমা, পেট্রোল বোমা আর আগ্নেয়াস্ত্রের মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে সাধারণ নিরীহ বাসিন্দাদের রক্তে ভিজে যায় ক্যাম্পের ইট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লুট হওয়া অস্ত্র প্রবেশ করায় এই সংঘর্ষ রূপ নিয়েছে এক প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধে, যেখানে বহু সাধারণ কিশোর ও পথচারী প্রাণ হারিয়েছে। অপরাধের এই অন্ধকার পুরো ক্যাম্পের সাধারণ খেটে খাওয়া নিরীহ পরিবারগুলোর জীবনকে করে তুলেছে আরও বেশি বিষাদগ্রস্ত ও কলঙ্কিত।

৬. ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক রায় ও নতুন প্রজন্মের স্বদেশের সন্ধান
জেনেভা ক্যাম্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে ২০০৮ সালের মে মাসে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেন যে, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর যেসব সদস্য ১৯৭১ সালের পরে জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা ১৯৭১ সালে নাবালক ছিলেন এবং যারা বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করেন, তারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক। এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ তিন দশক পর তারা ভোটাধিকার এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) পাওয়ার আইনি অধিকার লাভ করেন।
এই রায়ের পর ক্যাম্পের বাস্তবতায় এসেছে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।
আজকের জেনেভা ক্যাম্পের তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকালে আপনি ১৯৭১-এর কোনো ছবি খুঁজে পাবেন না। এই ছেলেমেয়েরা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে। তারা নির্ভুল বাংলায় কথা বলে, বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে, আর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে গিয়ে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য গলা ফাটায়। তাদের কাছে পাকিস্তান কোনো স্বপ্নের দেশ নয়, বরং এক অচেনা দূরবর্তী মানচিত্র। তারা নিজেদের বুক ফুলিয়ে বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিতে চায়।
কিন্তু বাস্তবতা এখনো তাদের জন্য ভীষণ নিষ্ঠুর। যখন কোনো ক্যাম্পের ছেলে বা মেয়ে চাকরির জন্য আবেদন করতে যায়, কিংবা পাসপোর্ট অফিসের ফরমে ঠিকানার জায়গায় লিখে ‘জেনেভা ক্যাম্প’, তখনই শুরু হয় অদৃশ্য বৈষম্য। পুলিশ ভেরিফিকেশনে তাদের ফাইল আটকে যায়, ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ইন্টারভিউতে ক্যাম্পের ঠিকানা দেখে কপাল কুঁচকে তাকানো হয়। আইনি নাগরিকত্ব মিললেও সামাজিক স্বীকৃতি যেন এখনো তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
একটি স্থায়ী পুনর্বাসন কি কেবলই স্বপ্ন?
জেনেভা ক্যাম্পের বয়স এখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে। এটি কেবল একটি বস্তি নয়, এটি এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভুলের এক জীবন্ত উন্মুক্ত জাদুঘর।
কোনো সভ্য রাষ্ট্র তার রাজধানীর বুকে অর্ধলক্ষ মানুষকে এভাবে স্থায়ীভাবে আট বাই আট ফুটের একটি খাঁচায় শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। যারা এই দেশে জন্ম নিয়েছে, যাদের মেধা ও শ্রম এই দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে, তাদের শুধুমাত্র ক্যাম্পের সংকীর্ণ ঠিকানার কারণে সমাজচ্যুত করে রাখা এক বড় মানবিক ব্যর্থতা।
জেনেভা ক্যাম্পের সমাধান কোনো সাময়িক উচ্ছেদ বা পুলিশি অভিযান হতে পারে না। এর একমাত্র সমাধান হলো এই মানুষগুলোকে নাগরিক মর্যাদায় ঢাকার বাইরে বা উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিতভাবে স্থায়ী পুনর্বাসন করা। নতুন প্রজন্মকে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহাসিক বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে দিয়ে স্বাধীন দেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
যতদিন না সেই মুক্ত আকাশের নিচে তাদের জায়গা হবে, ততদিন মোহাম্মদপুরের এই ঘিঞ্জি গলির স্যাঁতসেঁতে দেয়ালগুলো মানব ইতিহাসের এক চরম ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

