মানুষদের নিয়েই আমাদের জীবন । চলতে হচ্ছে তাদের সাথেই। ইচ্ছে করলেই সব কিছু ছেড়ে ছূঁড়ে গৃহত্যাগী হয়ে জঙ্গলে চলে যাওয়া যায় না আজকাল। আমরা এও জানি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনযাপন আমরা কীভাবে পার করব তাও নির্ভর করছে অন্যের উপর। যাদের সাথে আমরা চলছি দিনরাত।
কাছের মানুষদের উপরই নির্ভর করছে আমাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ। তাদের সাথে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই চলছে আপনার প্রমোশন, ব্যবসা-বানিজ্য, ভবিষ্যতের খুঁটিনাটি ।
অথচ জানি মানুষের সাথে স্বচ্ছন্দভাবে চলা সত্যিই কঠিন একটা বিষয়। প্রতিটা মানুষ যে যার নিজের ইগোর বৃত্তে বন্দি । সেখান থেকে টেনে বের করে এনে বন্ধু বানানো সত্যিই চরম কঠিন একটা কাজ সন্দেহ নেই। তাই বলে পিছিয়ে যাবারও কোনো কারণ নেই। বিদেশে প্রচুর কাউন্সেলর রয়েছেন যাঁরা বড় মাপের ফি-এর বিনিময়ে ক্লায়েন্টকে উপদেশ দেন কীভাবে সম্পর্কের উন্নয়ণ করতে হয়। পাশ কাটিয়ে যেতে হয় নানান বাধা বিঘ্ন ।
মানব চরিত্রের সাধারণ কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য জেনে নিলে আপনার কাছে এই কঠিন কাজটা জলের মতো সহজ হয়ে যাবে ।
কারণ একথা মনে রাখার দরকার আছে প্রতিটা মানুষই গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিটা মানুষই আলাদা। আমরা যদি সহজভাবে চলতে পারি আমাদের পরিচিত মানুষগুলোর সাথে, তবে সহজভাবেই অর্জন করতে পারব সাফল্য আর জনপ্রিয়তা।
এর বিকল্প আর কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না । শুধু সাধারণ কয়েকটা নিয়ম অনুসরণ করতে হবে কষ্ট করে।
১) সমালোচনাঃ
অন্যের সমালোচনা করা হচ্ছে পোষা কবুতরের মত। এটা উড়ে চলে আসবে আপনারই কাছে। সমালোচনা করে করেও বন্ধুত্ব পাওয়া যায় না। যায় না কোনো মতবাদ পরিবর্তন করা। অন্যের দোষ ত্রুটি নিয়ে যত বেশি সমালোচনা করবেন ততই সে নিজেকে শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখবে। বদলাতে চাইবে না কিছুতেই। বরং উল্টো নিজের কাজের সমর্থন করতে থাকবে অবচেতনভাবে। সমালোচনার বাজে ব্যপারটা হচ্ছে ব্যক্তির অহমকে আঘাত করা। ফলে আপনি তার ‘জানের দুশমন’ হয়ে যাবেন সহজেই।
কী দরকার আছে অন্যের দোষ ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করার। স্কুল জীবনে আমাদের এক বন্ধু বড্ড বেশি লম্বা চুল রাখত। বেচারা ছিল ভীষণ রোগা। আবার চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। আক্ষরিক অর্থেই কুৎসিত লাগত তাকে । ব্যপারটা নিয়ে আমরা যতই তাকে বলতাম ততই সে গোঁ ধরে থাকত। এবং চুল আরও বেশি লম্বা রাখার মহা পরিকল্পনা করত। যেন আমরা তার ব্যাপারে সমালোচনা বন্ধ করে দিলাম, একটু ভড়কেই গেল বেচারা। কিছুদিন পর ঠিকই স্বাভাবিক চুল বয়ে বেড়াতে লাগল নিজের মাথায়।
সত্যি কথা বলতে কী সমালোচক হবার জন্য তত বেশি জ্ঞানের দরকার হয় না। ইচ্ছে করলে যে কোনো গাধা আর অল্প বুদ্ধির লোকও দক্ষ সমালোচক হতে পারেন। কাজেই আমরা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের ছাঁচে ফেলে অন্যকে বিচার করতে যাব না। কি বলেন ?
মনে রাখবেন, অন্যের সমালোচনা করলে নিজেকেও সমালোচিত হতে হয়। যা শুনলে ভালো লাগে না।
ডঃ জনসন বলেছিলেন- ঈশ্বর পর্যন্ত মৃত্যুর আগে বিচার করে না। আমরা করতে যাব কেন ?
২) ভালো ব্যবহার সবচেয়ে বড় সম্পদঃ
খারাপ ব্যবহার করেও অন্যের কাছ থেকে কাজ আদায় করা যায়। তবে সেটা কতটুকু মানসম্পন্ন হবে আপনিই ভালো জানেন। আপনার বাচ্চাকে ভয় দেখাতে পারেন- বিকেল পাঁচটার মধ্যে অংকগুলো শেষ না করলে বাইরের মাঠে খেলতে দেয়া যাবে না তাকে। বাচ্চা অংক ঠিকই করবে। তবে মন থেকে নয়। কর্মচারীকে ভয় দেখাতে পারেন, অমুক কাজটা না করলে আপনি ওর চাকরি খেয়ে নেবেন। কর্মচারী কাজ করবে ঠিকই। মানসম্পন্ন নয়। উৎপাদন হবে বাজে।
প্রথমে জানতে হবে মানুষ কাজ করে কেন ? এর হরেক রকম ব্যাখ্যা থাকলেও মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাটা দারুণ। তার মতে আমরা সবাই কাজ করি আবেগতাড়িত হয়ে অথবা বড় কিছু হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করি সেজন্য।
বড় কিছু হতে চাই আমরা। বিখ্যাত কেউ। চাই মানুষ আমাদের মূল্য দিক। বুঝুক, আমি লাখে একজন। হাজার টাকা দিলেও আমার মতো একজন পাওয়া যাবে না। নিজের প্রাধান্যবোধ চাই আমরা।
মানুষ আর পশুর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। মানুষের রয়েছে বিখ্যাত হবার মনোবাসনা।
এজন্যই চার্লস ডিকেন্স লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত সব লেখাগুলো। এই আকাঙ্খার জন্যই আপনি হালফ্যাশনের পোশাক পরার চেষ্টা করেন। কেউ চেষ্টা করে দামি গাড়ি কেনার জন্য। যাতে আঙুল তুলে তাকে সবাই দেখায়। এরই জন্য হোটেলের মালিক আরও নতুন হোটেল খোলার চেষ্টা করেন। ধনী লোক বানাতে চায় বিশাল বাড়ি। যে বাড়িটা তার প্রয়োজনের তুলনায় বিচ্ছিরি রকম বড়।
শুধুমাত্র খ্যাতির মোহে মানুষ অপরাধী পর্যন্ত হয়। বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন।
ভিক্টর হুগোর মতো লোক পর্যন্ত চাইতেন প্যারিসের নাম বদলে তাঁর নামে রাখা হোক। শেক্সপিয়ারের মত কালজয়ী নাট্যকার পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাণীর কাছ থেকে পুরষ্কার প্রত্যাশা করতেন।
ভারতবর্ষের অনেক রাজা-বাদশা চাইতেন তাঁকে ছোট সাধারণ নামে না ডেকে লম্বা-চওড়া কোনও নামে যেন ডাকে সবাই। যেমন, হেকমতে আলাম তৈমুরে শাহজাদা মীর এ বখ্ত, নূর এ এলাহী, বরকতে খাজা, শাহে আলম বাদশাজাদ জনাব মিলন গাঙ্গুলী দরবারে হাজির।
দুঃখিত উদাহরণ দিতে গিয়ে এরচেয়ে ভালো কিছু মনে করতে পারছিলাম না।
অর্থাৎ যা বলতে চাইছিলাম তা হচ্ছে মানুষ গুরুত্ব পেতে চায়।
আমি এমন কিছু মেডিক্যাল কেস হিস্ট্রি জানি, তাতে দেখা যায় মানুষ অনেক সময় সহানুভূতি পাবার জন্য বা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য রোগাক্রান্ত হতে চায়।
আমার এক বন্ধুর খালাকে চিনতাম। ভদ্র মহিলাকে কেউ তেমন পছন্দ করত না। প্রায় নি:সঙ্গ জীবন যাপন করতেন। প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর অসুস্থ হতেন। আর যায় কোথায়, ফোন দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতেন সব কাছের আর দূরের আত্মীয়স্বজনদের। বাড়ি-ঘর ভরে যেত আত্মীয়স্বজন দিয়ে। কেউ হরলিক্সের বয়াম, কেউ কেজি খানেক আপেল, বেদানা, নাসপাতি এইসব নিয়ে উর্ধশ্বাসে দৌড়ে আসতেন।
সবাই আসা মাত্র তিনি সুস্থ হয়ে যেতেন। ছোটখাট উৎসব চলত তাঁর বাড়িতে। ঠিক মাস ছয়েক পর যখন দেখতেন কেউ তাঁকে তেমন পাত্তা দিচ্ছে না, আবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি।
প্রতিটা মানুষই চায় গুরুত্ব পেতে। আগের দিনে ধনী লোকেরা অভিযাত্রীদের দূর্গম এলাকাতে অভিযান চালানোর জন্য গোপনে আর্থিক সহায়তা দিতেন। শর্ত এই,নতুন আবিষ্কার করা কোনো পাহাড় বা হ্রদের নাম যেন তাঁর নামে রাখা হয়।
এ এক অদ্ভূত ক্ষুধা মানুষের। আর আপনি যদি শুধুমাত্র একটু ভালো ব্যবহার করে অন্যকে তৃপ্তি দিতে পারেন সন্দেহ নেই আপনার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবই করবে সে।
একটু ভালো ব্যবহার করুন কর্মচারীদের সাথে তিনগুণ-বেশি উৎপাদন পাবেন। ভালো ব্যবহার করুন সহকর্মীদের সাথে, গায়ে পড়ে সাহায্য করবে সবাই আপনাকে।
৩) কাউকে ছকে ফেলবেন নাঃ
সত্যি তাই। যে যেমন তাকে ঠিক সেই ভাবেই গ্রহণ করুন। নিজের ভালোমন্দ, পছন্দ-অপছন্দ তার উপর চাপিয়ে দেবেন না। বা আশা করবেন না অপরজন সেইভাবেই চলবে।
আপনি নিজে কী খেতে পছন্দ করেন ? ধরা যাক বিরিয়ানি আর খাসির রেজালা। তো ছুটির দিনে আপনি যখন জলাশয়ে মাছ ধরতে যান বড়শিতে করে বিরিয়ানি আর রেজালা দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। নাকি মাছেদের জন্য অন্য কিছুর ব্যবস্থা করেন ? যেমন- পোকা, মাকড়, পিঁপড়ের ডিম, বাসি পাউরুটির দলা এই সব।
মানুষের সাথে চলতে গেলে একই পদ্ধতিটা ব্যবহার করলে ক্ষতি কী ?
৪) প্রভাব বিস্তারঃ
সারাদিন উপদেশ খয়রাত করেও অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন না। বদলে তাকে আস্তে করে জানিয়ে দিন এর বদলে সে কী পেতে পারে। ব্যাপারটা এমন_ ধরা যাক আপনার সন্তান ধুমপান করে। তাকে বলে লাভ নেই ধুমপানে হেন হয় তেন হয়। বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থা ধুমপানের কুফল সম্পর্কে কী কী রিপোর্ট দিয়েছে গত বছর। এত কিছু বলার চেয়ে আপনি যদি তাকে শুধু মনে করিয়ে দেন যে, ধুমপান করলে তার যথেষ্ট দম থাকবে না, ফলে সে ক্রিকেট খেলার টিমে সুযোগ নাও পেতে পারে বা একশ গজ দৌড়ে বিজয়ী নাও হতে পারে। দেখবেন এতেই যথেষ্ট কাজ হবে।
তর্ক করে প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ এমন ভান করবে যে আপনার কথা মেনে নিচ্ছে। মনে মনে গোঁ ধরে থাকবে নিজের মতবাদের উপরেই।
ছোট্ট শিশু টুকু খাবার খেতে চাইত না। ওর বাপ-মা নানান পদ্ধতি আর কায়দা প্রয়োগ করলেও লাভ হয় নি। বরাবর টুকু ছিল রোগা আর দূর্বল। কিন্তু যখন আমি বললাম, ভালমত না খেলে ও সাইকেল চালানো শিখতে পারবে না, আমি ভাবছি সামনের জন্মদিনে টুকুকে একটা দারুণ সাইকেল কিনে দেবো, কিন্তু কী আর করা, সাইকেল চালাতে যে অনেক শক্তি লাগে, সেটা পাওয়া যায় শুধু নিয়মিত ভালো খাবার খেলেই….
তো অবশ্যই বুঝতে পারছেন তারপর কী হয়েছিল ? কী দরকার বলার যে, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করলে ভূতে এসে তোমাকে কামড়ে দেবে… ইত্যাদি।
৫) অন্যের প্রতি আগ্রহ দেখানঃ
আমরা শুধু নিজের ব্যাপারেই আগ্রহী থাকি। দুনিয়া চুলোয় যাক তাতে কার কী !
অন্যের সাথে কথা বলার সময় ৯০ ভাগ কথাই আমি, আমি, আর আমি। কেমন আছেন বললেই হলো । শুরু করে দিই – ‘আর কোথায় রে ভাই। বাড়ির ছাদে ফাটল ধরেছে, গ্রামের বাড়িতে চুরি ডাকাতি বেড়ে গেছে, শেয়ারে অনেক টাকা গচ্চা খেয়েছি। সকালে বাস ধরতে না পেরে অফিসে লেট করে গেছি। বন্ধু হেকমত বিয়ে করেছে, দাওয়াত দেয় নি। ডাক্তার রোজ হাঁটাহাঁটি করতে বলেছে। বাতের ব্যাথা বেড়েছে, চুল পড়ে যাচ্ছে। মাথায় পাঁচড়া হচ্ছে আজকাল। বউ নতুন শাড়ির জন্য ঝগড়া করেছে গতরাতে’। ইত্যাদি ইত্যাদি…। মোদ্দা কথা ছেড়ে দেয়া রেডিওর মতোই বকে যাই আমরা।
নিজেদের নিয়ে আগ্রহ আর বলার শেষ নেই আমাদের। আমাদের আগ্রহ আমাদের নিয়েই। সকাল, দুপুর আর রাত পর্যন্ত।
নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন, যে গ্রুপ ছবিতে আপনি আছেন সেটা হাতে নিয়ে প্রথমেই কার চেহারা দেখার চেষ্টা করেছেন ?
নিজেকেই।
নিউ ইয়র্কে একবার এক টেলিফোন কোম্পানি এক পরীক্ষা চালায়। তারা একটা জরিপ নিতে চেষ্টা করে কথাবার্তা বলার জন্য কোন শব্দটা লোকজন বেশি ব্যবহার করে।
এবং তারা পায়, যে শব্দটা সবাই বলে- আমি ।
৫০০ ফোন কলে ৩৯৯০ বার বলা হয় আমি।
অন্যের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি না আমরা। আমাদের হাতে সময় নেই।
বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে, যে লোক অন্যের ব্যাপারে আগ্রহী হতে চায় না তার জীবন যাপন হয় সত্যিই কষ্টকর। সব রকম ব্যর্থতাও তার ঘাড়ে চাপে।
অন্যের প্রতি আগ্রহী হলে দেখবেন অনেক জটিল কাজ সহজ হয়ে যাচ্ছে। দেখা হলে নিজের প্যাঁচাল বাদ দিয়ে তার কুশল জিজ্ঞেস করুন। জানতে চান কেমন চলছে তার দিনকাল। ব্যবসা। লেখালেখি। পড়াশুনা। ক্যারিয়ার। বলতে দিন তার কথা। মনে রাখুন তার জন্মদিন। শুভেচ্ছা জানান তার জন্মদিনে। ছোট ছোট এই কাজগুলো জীবনে বড় সব পরিবর্তন আনে। বিশ্বাস করুন।
৬) হাসুনঃ
একটা চিনা প্রবাদ এরকম, যে হাসতে পারে না তার কোনো দোকান খোলা উচিত নয়। কারণ সে কিছুই বিক্রি করতে পারবে না।
শুধু দোকান চালানোর জন্যই নয়, সাধারণভাবে প্রতি মূহুর্তেই একটু হাসির দরকার আছে । হাসি বন্ধুত্বের চিহ্ণ। এটা ব্যবহারে সুনাম আনে। এটা ঘটে এক মূহুর্তের জন্য, কিন্তু এর স্মৃতি মনে থাকে অনেকদিন পর্যন্ত। হতাশ ব্যক্তির জন্য আপনার হাসি আশার আলো। ক্লান্ত ব্যক্তির জন্য আপ্যায়ন। হাসি কেউ দোকান থেকে কিনতে পারে না। ধার করে বা চুরি করে আনতে পারে না। শুধুমাত্র আপনিই তাকে দিতে পারেন।
৭) নাম ধরে ডাকুনঃ
যেকোনো মানুষের কাছে তার নিজের নাম হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয়। হাজার, লক্ষবার শুনেও সে ক্লান্ত হয় না।
অনেক ধনী ব্যক্তিরা লেখকদের টাকা পয়সা দেন এই জন্য যে লেখক যেন বইটা তাঁর নামে উৎসর্গ করে।
অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পিছনেও এই ব্যাপারটা রয়েছে। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি।
যখনই কারো সাথে পরিচিত হচ্ছেন চেষ্টা করবেন তার নাম মনে রাখতে। পরবর্তীতে যখন আবার তার সাথে দেখা হবে, নাম ধরে ডাকুন। দেখবেন সে মুগ্ধ হচ্ছে। ভাবছে আপনি এখনো তাকে মনে রেখেছেন। এই বোধটাই অনেক কিছু সহজ করে দেয়।
৮) অন্যের কথা শুনুনঃ
হ্যাঁ, আমরা অন্যের কথা শুনতে চাই না। আগেই বলেছি। কষ্ট করে নিজের মুখটা বন্ধ করে যদি একবার মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনে দেখতেন। কারণ মানুষ ভালো বক্তার চেয়ে ভালো শ্রোতা বেশি পছন্দ করে। অথচ ভালো শ্রোতার সংখ্যা খুবই কম। রিডার্স-ডাইজেস্ট পত্রিকাতে একবার লেখা হয়েছিল, অনেকেই ডাক্তারের কাছে যান শুধুমাত্র তার কথা শোনানোর জন্য।
বাইরের দেশে প্রচুর কাউন্সেলর আছে। যাদের কাছে মানুষজন যায়। ঘন্টা হিসাবে প্রচুর পয়সা দিয়ে সিটিং দেয়। কী করে ? কিচ্ছু না। শুধু রোগীর কথা শোনে। আর তাতেই ভালো হয়ে যায় রোগী। কীভাবে এটা সম্ভব ? আসলে বুক ভরা কথা জমা ছিলো রোগীর । একজনের কাছে গড়গড় করে বলতে দিয়ে হালকা হয়ে যায় তার মন। আর এতেই আরোগ্য লাভ করে সে।
একবার এক অনুষ্ঠানে গিয়ে এক লেখকের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম আমি। ভদ্রলোক বেশ অমিশুক। দীর্ঘদিন লেখালেখি করেও নাম যশ করতে পারেন নি। সবচেয়ে বড় কথা বেশ গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন তিনি।
তো কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কী এক কথায় ভদ্রলোক জানালেন, তার এক ভাগ্নি কানাডা’তে থাকে। আমি খুশি খুশি গলায় বললাম, ‘কানাডা তো দারুণ জায়গা ভাই। আপনি গেছেন কখনও ?’
ব্যস্ । ভদ্রলোক শুরু করলেন। ঝাড়া বিশ মিনিট বকবক করে গেলেন কানাডা নিয়ে। তিনি গেছেন। তাঁর দারুন লেগেছে। কতটা শীত পড়ে। ভ্যাঙ্কুভার আর মন্ট্রিয়াল শহরের বর্ণনা। ইত্যাদি ইত্যাদি।
ব্যাপারটা আপনার কাছে যা-ই লাগুক এটাই কিন্তু স্বাভাবিক। ভদ্রলোক চাইছিলেন একজন শ্রোতা আর কিছু নয়। আজও অন্যের কাছে বেশ প্রশংসা করেন তিনি। ছেলে হিসেবে নাকি আমি দারুণ !সিডনী শহরের এক অনুষ্ঠানেও এরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এক কৃষিবিজ্ঞানীর সাথে পরিচয় হতেই তিনি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন কী কী উপায়ে চাষবাস করা হলে বাংলাদেশে খাদ্য সমস্যা থাকবে না। বীজ সংরক্ষণ করতে হবে কীভাবে। এইসব হাবিজাবি আরকি। মনোযোগ দিয়েই ভদ্রলোকের কথা শুনছিলাম। ততটা বুঝতে পারছিলাম না অবশ্য। কিন্তু মাঝে মধ্যে টুকটাক প্রশ্ন করে মন্তব্য করছিলাম।
অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকদের কর্তাব্যক্তি আমাকে ডেকে বললেন, ভাই, কৃষিবিদ ভদ্রলোক তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আপনি নাকি দারুণ আলাপি, আউট নলেজ নাকি প্রচুর। অনেক পড়াশুনা আপনার।
হতভম্ব হয়ে শুনছিলাম সে সব। আমার আউট নলেজ প্রচুর। আরে পুরো সময়টাতে তো আমি কোনও কথাই বলি নি।
প্রতিটা মানুষ নিজের সম্পর্কে আগ্রহী। আফ্রিকাতে কতজন না খেয়ে মারা গেছে তারচেয়ে বেশি আগ্রহী তার নতুন কেনা লতাপাতা ছাপার হাওয়াইয়ান জামার প্রতি। নতুন স্যুটটাতে তাকে কেমন দেখাচ্ছে তার উপর। কাজেই অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। বলতে দিন তার কথা। পুরানো সেই প্রবাদটার কথা মনে নেই ? ঈশ্বর আমাদের দুটো কান আর একটা মুখ দিয়েছেন। যা বলব তার দ্বিগুণ শুনব।
৯) কী বলবেনঃ
কথা বলার সময় সদা পরিচিত ব্যক্তিকে কী বলবেন ? কিচ্ছু না। শুধু তার নিজের আগ্রহ আর পছন্দ অপছন্দ নিয়ে প্রশ্ন করুন। আলাপের কুমড়োটা আপনাআপনিই গড়িয়ে যাবে সামনের দিকে। মাথা চুলকিয়ে বিষয় বস্তু খুঁজতে হবে না। শুধু তার সম্পর্কে প্রশ্ন করুন। একজন লেখককে জিজ্ঞেস করতে পারেন জিলেপি ভাজা তার ভালো লাগে কিনা। মোটেও বিরক্ত হবেন না তিনি। বরং উল্টো বলে বসবেন ছোট বেলায় তার মামার বাড়িতে যে জিলেপি ভাজা খেয়েছিলেন আজও মুখে লেগে আছে।
শুধু লেখা নিয়েই যে লেখক বেচারাকে জিজ্ঞেস করতে হবে এমন কোনো মহাজাগতিক আইন নেই।
১০) বৈচিত্র্যঃ
ব্যবহারের ছোটখাট কিছু বৈচিত্র্য পরিবেশ পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে। মনে রাখবেন প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো দিক দিয়ে আপনার চেয়ে দক্ষ বা যোগ্য । রিকশায় চড়ে যাচ্ছেন। মলিন পোশাক পড়া রুক্ষ চুলের এই রিকশাওয়ালা যে চমৎকার বাঁশি বাজাতে পারে জানেন আপনি ? না। এই জন্যই হয়তো ওকে পাত্তা দিচ্ছেন না।
সিডনি শহরে একবার বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়েছিলাম। বাড়িওয়ালা বুড়ো দরজা খুলে আমাকে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘বাঙালিদের কাছে আমি বাড়ি ভাড়া দিই না।’
সাথে সাথে সায় দিলাম আমি। ‘ঠিকই করেছেন। ওরা বাড়ি-ঘরের যত্ন নেয় না। বড্ড বেশি নোংরা। হৈ চৈ করে। ভদ্রলোকদের সাথে মানিয়ে চলতে পারে না। রাত দশটার পর গান বাজায়’।
বুড়ো বেশ থতমত খেয়ে গেলেন। সে ভেবেছিল তার কথা শুনে হৈ চৈ করে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেব আমি। এতদিন আসলে সবাই তা-ই করেছে। এখন বেচারা বিপদে পড়ে গেল। হাসিমুখে বলল, ‘তোমাকে দেখে অবশ্য ওদের মতো মনে হচ্ছে না। ভিতরে এসে বাড়িটা দেখো। তোমার পছন্দ হলে আমার আপত্তি নেই ভাড়া দিতে’।
কী বুঝলেন?
বৈচিত্র্য ।
বাড়ির পাশেই ছিল একটা পোস্ট অফিস। দরকারি এইসেই কাজে প্রায়ই যেতে হতো সেখানে। সব সময়ই দেখতাম মধ্যবয়ষ্ক একটা লোক কাজ করত সেখানে। অসুখি চেহারা। মুখে হাসি নেই। বছরের পর বছর হয়তো এই একঘেঁয়ে কাজটা করে যাচ্ছে।
সেই খাম ওজন কর রে। ডাকটিকিট দাও রে। রশিদ লেখ রে । পাওনা পয়সা নাওরে। আবার ভাংতি পয়সা ফেরত দাওরে। মোট কথা বেচারার জীবন থেকে বৈচিত্র হারিয়ে গেছে কবেই। সার্ভিসও খুব একটা ভাল দিচ্ছে না। বেঁচে থাকার কোন অর্থই খুঁজে পাচ্ছে না সে।
একদিন ধুম করে বলে বসলাম, স্যার আপনার চুলগুলো কিন্তু দারুণ। আমার চুলগুলো যদি এমন হতো !
খুচরা পয়সা ফেরত দিচ্ছিল আমাকে ভদ্রলোক। কথা শুনে প্রথমে বেশ একটু চমকে গিয়েছিল। তারপর একগাল হেসে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে না। আগের মতো আর নেই। বিশ বছর আগে যদি দেখতে আমাকে।
তারপর বুড়ো শুরু করল গল্প।
বুড়ি অর্থাৎ তার স্ত্রী ত্রিশ বছর আগে তার চুল দেখে কতটা মুগ্ধ হয়েছিল । হেন , তেন আরও কত কি। শেষে এ-ও যোগ করলো অনেক লোক আজও তার চুলের প্রশংসা করে।
আমি জানি সেদিন সারাক্ষণই কার্পাস তুলোর মত বাতাসে ভাসছিল বুড়ো । খুশিতে ডগমগ হচ্ছিল সে। আয়নাতে নিজের চেহারাও দেখেছে সম্ভবত কয়েকবার ।আর সম্ভবত বাড়ি ফিরে বুড়ির কাছেও ঘটনাটার বর্ণনা করেছিল বেশ ব্যাখ্যা করে।
এ ঘটনার প্র যতবারই বুড়োর মুখোমুখি হয়েছিলাম , ততবারই দেখেছিলাম তার উজ্জ্বল হাসিমুখ। আমাকে দেখলেই যারপর নাই খুশি হয়ে উঠত সে। সার্ভিসও দিত দারুন রকমের ভাল।
কাজেই সব সময়ই ব্যবহারের বৈচিত্র দিয়ে অন্যকে ভাবার সুযোগ দিন কোন না কোন দিক দিয়ে সে আপনার চেয়ে ভাল , দক্ষ, সুযোগ্য। এই অনুভূতিই চালিয়ে নিয়ে যায় সব মানুষকে। কেউই এর ব্যতিক্রম নয়।
অন্যের প্রতি একই আচরণ করুন যে আচরণ আপনি অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন। আপনার এই আচরণের জন্য অন্যের বন্ধুর তালিকায় আপনার নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। সন্দেহ নেই।
১১) নিজের ভুল স্বীকার করুনঃ
এতে আপনি ছোট হবেন না কোনোভাবেই। আপনার ব্যবহার, কথাবার্তা আর আচরণে কোথাও ভুল হলে আপনি যদি সবার সামনে তা স্বীকার করেন ব্যাপারটা আপনার জন্য মহত্ত্বের পরিচয় হয়েই দেখা দেবে। নীচ মনের মানুষেরাই কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না।
১২) তর্কে বহুদূরঃ
সত্যিই তাই। কাজের কাজ কিচ্ছু হয় না। শুধু ঝামেলা আর অসন্তোষ বাড়ায় এই তর্ক। সম্ভবত ঝামেলাটা শুরু হয় স্কুল জীবন থেকে। কেউ যদি বলে তার মামার বাড়িতে তিনটে লিচু গাছ আছে, সঙ্গে সঙ্গে বুক চিতিয়ে জানিয়ে দিই, আমার মামার বাড়িতে পাঁচটা লিচু গাছ আছে। এক একটা লিচু ক্রিকেট বলের সমান।
মামা থাকুক আর না থাকুক লিচু গাছের সংখ্যা বেশি বলতেই হবে। বড় হয়েও একই বদ অভ্যাস বয়ে বেড়াচ্ছি আজও। আড্ডায় কেউ কিছু বললে তার উপর কিছু বলতেই হবে। কোনো দরকার আছে অন্যের ভুল ধরিয়ে দিয়ে তর্ক করা? বা বাহবা পাওয়ার জন্য তর্ক করার ।
একটা অনুষ্ঠানে ধুমসে আড্ডা চলছিল। এক মুরুব্বি ভদ্রলোক বলছিলেন সায়েন্স ফিকশন বইগুলোর ব্যাপারে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘রোবটদের নিয়ে যে তিনটি সূত্র আছে সেগুলো আর্থার সি. ক্লার্কের লেখা। সাথে সাথেই প্রতিবাদে ফেটে পড়ল আমার এক সঙ্গী। সে জানাল, নাহ্ , সূত্রগুলো আইজ্যাক আসিমভের লেখা, ব্যস, আর যায় কোথায়, লেগে গেল অসম বয়সী দুই সায়েন্স ফিকশন পাঠকের তর্ক।
দুই একজন আমার মত জানতে চাইল। কারণ বেশ কিছু সায়েন্স ফিকশন গল্প আমিও লিখেছি। কাজেই তাদের বদ্ধমূল ধারণা আমি বোধহয় সায়েন্স ফিকশন বিশেষজ্ঞ।
আমি সঙ্গীকে ইঙ্গিত করে বেশ জোরেই বললাম, ‘নাহে, তুমি ভুল করছ। মুরুব্বি ঠিকই বলেছেন, সূত্রগুলো আর্থার সি. ক্লার্কের লেখা’।
সে রাতে বাড়ি ফেরার সময় সঙ্গী তো আমার উপর মহা খাপ্পা। জানতে চাইল আমি কেন মুরুব্বিকে জিতিয়ে দিলাম।
আমার ব্যাখ্যা ছিল এরকম_ যে লোক এত বড় একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে তাকে অতগুলো মানুষের সামনে ছোট করে কী লাভ? অনুষ্ঠানের মজাটাই যাবে নষ্ট হয়ে। ভদ্রলোক একদিন না একদিন বই-পত্র ঘাঁটতে গিয়ে ঠিকই নিজের ভুলটা ধরতে পারবে। সেটাই বোধহয় ভালো।
তর্কের একট মজার ব্যাপার, আপনি হেরে গেলে তো গেলেনই আর যদি জিতেও যান তাতেও লাভ নেই। প্রতিপক্ষের ইগোতে যে আঘাত করেছেন সে মন থেকে আপনার মতবাদ বা যুক্তি কিছুতেই মেনে নেবে না।
১৩)ভাল দিয়ে শুরু করুনঃ
ব্যাপারটা অনেকটা এরকম: দাঁড়ি গোঁফ কামানোর আগে যেমন আচ্ছা করে সাবান ঘষে নেয়া। কী লাভ সাবান ঘষে? একটু পর তো ওদের কেটেই ফেলব। কিন্তু আপনি তো জানেন কেন একাজ করছেন আপনি। তাই না ?
প্রথম যখন পরিচিত এক পত্রিকায় লেখা দিয়ে এসেছিলাম তার ঠিক পঁচাত্তর দিন পর সম্পাদকের সাথে মুখোমুখি বসেছিলাম আমরা। আমাকে বললেন, ‘মিলন, তোমার সবগুলো লেখাই দারুণ লেগেছে আমার। বর্ণনা, শব্দ চয়ণ, ভাষা, সবই ভালো। শুধু বানানের দিকে একটু খেয়াল রাখবে’।
আজও মনে রেখেছি তাঁর কথা। একই পদ্ধতি নিজে ব্যবহার করছি হাজার কর্মচারীর উপর। সেদিন একজনকে ডেকে বললাম, তোমার টমেটোর সসটা দারুণ হয়। শুধু টমেটোগুলো ছোট করে কাটবে আর লবন কম দেবে।
কর্মচারী খুশিতে গদগদ। অথচ ওকে যদি বলতাম, ওই মিয়া এত লবন দেও কেন ? লবন কি মাগনা ? আর টমেটো আরও ছোট কইরা কাটতে পারো না ? অ্যাঁ ?
কী রকম হত ব্যাপারটা ? মনে মনে কর্মচারী আমার পিন্ডি চটকাত। সন্দেহ নেই।
কাজেই ভাল কথা দিয়ে শুরু করুন।
আবার ঐ কৌতুকটার মতো যেন না হয়।
এক ডাক্তার আর রোগীকে বলছে, ভাই আপনার জন্য দুটো সংবাদ আছে। একটা ভালো, আরেকটা খারাপ। কোনটা আগে বলব ?
রোগী হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। বিরস মুখে বলল, ভালোটাই আগে বলুন।
ডাক্তার এক গাল হেসে বললেন, আপনার বন্ধু আক্কাস আপনার জন্য একজোড়া দামী জুতো কিনে পাঠিয়েছে, অ্যাডিডাস কোম্পানীর। একদম ফরেন মাল। পাঁচ বছরের গ্যারান্টি। এটা পরে ফুটবল খেলতে পারবেন। পাঁচতলার পাইপ বেয়ে উঠানামা করতে পারবেন। হিপি ছবির নায়কদের মতো নাচানাচি করতে পারবেন…।
রোগী বাধা দিয়ে বলল, ঠিক আছে, বুঝতে পেরেছি। এ জুতো জোড়া পরে আমি চাঁদেও হাঁটাহাঁটি করতে পারব। এবার খারাপ সংবাদটা বলুন দয়া করে।
ডাক্তার দুঃখী মানুষের মতো মুখভঙ্গি করে বললেন, ও হ্যাঁ, তা হচ্ছে অপারেশন করে আপনার দুটো পা-ই কেটে ফেলতে হবে।
১৪) আদেশ নয়, অনুরোধঃ
এটা প্রমাণিত যে, আদেশ না করে যদি কাওকে আপনি অনুরোধ করেন তবে সে প্রয়োজনীয় সাড়া দেয়। আমার মনে হয় একমাত্র আলাদিনের প্রদীপের দৈত্য ছাড়া কেউই আদেশ বা হুকুম পছন্দ করে না। ‘এটা করো, ওটা করা উচিত, এভাবে না করে ওভাবে করো’। এই কথাগুলো নিজের অজান্তেই বিদ্রোহী করে তোলে মানুষকে। শব্দগুলো অহমকে আঘাত করে।
বদলে আপনি যদি অনুরোধ জানান তো ভালো ফল দেবে। ‘এভাবে করতে পারো?, আপনার কী মনে হয় এ ব্যাপারে ?, বা তোমার কি মনে হয় এভাবে কাজ হবে ?’ এই বাক্যগুলো অপরপক্ষকে ভাবতে বাধ্য করে সে গুরুত্বপূর্ণ। তার অহঙ্কার বোধ বজায় থাকে। ফলে কাজটা করে বাস্তবসম্মতভাবে। খুশি মনে।
১৫ ) সময়ের মূল্যঃ সবারই সময়ের মূল্য আছে। অপরপক্ষকে এমন ভাব দেখাবেন না আপনি তারচেয়ে বেশি ব্যস্ত মানুষ। ব্যাপারটা সত্যি হলেও প্রতিপক্ষ ভাববে আপনি ভান করছেন। কাউকে যদি বলেন বিকেল পাঁচটা তবে আক্ষরিক অর্থেই যেন বিকেল পাঁচটা হয়। দীর্ঘক্ষণ কাউকে অপেক্ষা করিয়ে রাখবেন না নিজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে। এইসব সস্তা আর পুরানো কৌশল। আপনিও জানেন আমিও জানি।
খুব নাম করা এক হোটেল ব্যবসায়ীকে চিনতাম ব্যাক্তিগত ভাবে। তার আঠারোটা হোটেল আছে পৃথিবীর নানা দেশ। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। জখনই মুখোমুখি হতাম আমিই লজ্জায় জিজ্ঞেস করতাম , স্যার বোধ হয় ব্যস্ত ?’
কারন আমি জানি সত্যি তাই। মরার সময় নেই ভদ্রলোকের। তারপরও ফিক করে হেসে বলতেন, ‘ হ্যাঁ ব্যস্ত তো বটেই , তারপরও তোমাকে দেয়ার মত সময় আমার আছে। বলো কি করতে পারি তোমার জন্য ? ‘
অদ্ভুত একটা কৌশল। তারপরও ঝুপ করে মনটা ভাল হয়ে যেত। অথচ আমি জানি সবার সাথেই এই একই সংলাপ ব্যবহার করছেন উনি। তারপরও খারাপ লাগতো না।
১৬) আপোষ করাঃ মাঝে মাঝে করলে ফায়দা পাওয়া যায়। এক ভদ্রলোক একদিন অনেকের সামনে বলে বসলেন, ‘ আপনার লেখা আমার ভাল লাগে না। অনেক অপ্রয়োজনীয় তথ্য দেন ।’
বেশ হকচকিয়ে গিয়ে বললাম,’ তাই নাকি ?
‘ হ্যাঁ, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন তিনি। ‘ আপনার অমুক লেখায় আপনি লিখেছেন ” কয়েকটা বুনো প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে বাগানে।” প্রজাপতি আবার পোষা আছে নাকি ? সবই তো বুনো।’
না হেসে পারলাম না। ব্যাখ্যা করলাম ভদ্রলোককে- খামারে কৃত্রিম উপায়ে প্রজাপতি পজনন করা হচ্ছে আজকাল থাইল্যান্ড সহ আরও কিছু দেশে। পতঙ্গজগতের বৈচিত্র্য রক্ষার জন্যই এসব করছে তারা। এগুলোর সাথে সাধারণ প্রজাপতির বেশ তফাৎ আছে। দেখলে বোঝা যায়।
সব বলার পর আচমকা বলে বসলাম, ‘আমার ভুলও হতে পারে। কারণ অনেক আগে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে একটা ফিচর পড়েছিলাম। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকাতে। সেখান থেকেই জেনেছি এসব। কাজেই আমার কথাই চরম সত্য নয়’।
ভদ্রলোক আমার কথা বিশ্বাস করলেন। উল্টো আমার পক্ষে সাফাই গাইতে লাগলেন।
১৭) উৎসাহ উদ্দীপনাঃ
উৎসাহ জিনিসটা বড্ড বেশি ছোঁয়াচে। অন্যকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য এর চেয়ে বড় কিছু নেই। হাজার ধাতানি দিয়েও যেটুকু কাজ করাতে পারবেন না, সামান্য একটু উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারলে তার হাজারগুণ বেশি কাজ আদায় করা সম্ভব।
উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করতে দুটো কৌশল আছে।
১। পুরষ্কার।
২। প্রতিযোগীতা।
পুরষ্কারের ব্যাপারটা সাধারণ। সবাই জানে। আমি ১৯৯৯ সালে বিখ্যাত একটা ক্যাফেতে কাজ করতাম। তখন এর ম্যানেজার আবিষ্কার করলেন একটা স্যান্ডউইচ বিক্রি করলে যে লাভ হয় একটা ককটেল মিক্স পানীয় বেচতে পারলে ৮০% বেশি লাভ হয়। কাজেই ম্যানেজার সব কর্মচারীদের নানানভাবে চাপ দিতে লাগলেন বেশি করে ককটেল পানীয় বিক্রি করার জন্য।
দীর্ঘ তিন মাস পর দেখা গেল তেমন একটা বেশি বেচা হচ্ছে না ককটেল। শেষে তিনি ঘোষণা করলেন যেহেতু একটা ককটেল এর দাম চার ডলার পঁচাত্তর সেন্ট, কেউ যদি তা খদ্দেরের কাছে বিক্রি করে তবে চার ডলার পাবে মালিক আর পঁচাত্তর সেন্ট পাবে কর্মচারী। যে কিনা পানীয়টা বিক্রি করছে।
যাদুমন্ত্রের মতো কাজ হলো। একটা ককটেল বিক্রি করতে পারলেই পঁচাত্তর সেন্ট নিজের পকেটে। বাপরে। এবার দেখা গেল বেচার হিড়িক। ক্যান ভর্তি ফলের রস, বোতল ভর্তি পানীয় আর বালতির পর বালতি আইস কিউব শেষ হতে লাগল প্রতি ঘন্টায়। বারটেন্ডারদের দম ফেলার সময় পর্যন্ত ছিল না তখন।
দুই মাসে ক্যাফে যা লাভ করল, সারা বছরও তা করে না।
কী করে এটা সম্ভব ? কারণ পুরষ্কার। পুরষ্কার হচ্ছে একটা খেলনা, এটা সব বয়সে সবাই পছন্দ করে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটা হচ্ছে প্রতিযোগীতা। মানুষ এটা ভালবাসে। একটা কাহিনী পড়েছিলাম এরকমঃ
কোনো একটা কারখানাতে উৎপাদন কমে গিয়েছিল মারাত্মকভাবে। মালিক ম্যানেজারকে তাগাদা দিচ্ছিল নানানভাবে। লাভ হচ্ছিল না। ম্যানেজার কর্মচারীদের চাকরি নট করে দেয়ার ভয়-ভীতি দেখিয়েছিল বিস্তর। লাভ লবডংগা।
মালিক একদিন কারখানা পরিদর্শন করতে এলো। সবকিছু চুপচাপ শুনে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীকে প্রশ্ন করল, ‘আজকে কত উৎপাদন হয়েছে ?’
‘ ছয়, স্যার’। জবাব দিল কর্মচারী। মালিক তখন এক টুকরো খড়িমাটি দিয়ে সামনের দেয়ালে বড় করে সংখ্যায় লিখল ছয়। তারপর কোনও কথা না বলে গটগট করে চলে গেল।
তখন দিনের শিফট শেষ হয়েছে মাত্র। রাতের শিফট শুরু হতে চলেছে। রাতের শিফটের সব কর্মচারীরা এসে ছয় সংখ্যাটা দেখে অবাক হয়ে এর মানে জানতে চাইল। যে ছোকরা ঘটনাটা দেখেছিল সে-ই ব্যাখ্যা করে বলল সবকিছু।
রাতের শিফটের কর্মচারীরা ধুমসে কাজ করল সে রাতে। যাবার সময় দেয়ালের ছয় সংখ্যাটা মুছে লিখে রেখে গেল সাত। দিনের শিফটের কর্মচারীরা এসে সাত লেখা দেখে বিরক্ত হলো। আচ্ছা, তা হলে এই ব্যাপার ? রাতের শিফটের ওরা নিজেদের এত ভালো মনে করে ? ওদের একটা শিক্ষা দেয়া দরকার। ভূতের মতো খাটতে লাগল ওরা। উৎপাদন করল দারুণ। দিনের শেষে সাত সংখ্যাটা মুছে ওরা লিখল আট। কারণ উৎপাদন তা-ই হয়েছে।
সন্ধাবেলা রাতের শিফটের ওরা এসে… মানে বুঝতেই পারছেন? এভাবে চলতে লাগল দিনের পর দিন। যে কারখানাটা এতদিন ঢিমে তালে চলছিল সেটা পরিণত হলো ব্যস্ত এবং সফল একটা প্রতিষ্ঠানে। কীভাবে এটা সম্ভব ?
আগেই বলেছি মানুষ প্রতিযোগীতা পছন্দ করে। এটাও একটা খেলা। শৈশব থেকে পেয়েছি আমরা। কাউকে যদি উৎসাহের তাপে তাতিয়ে নিতে পারেন, কাজ হবে একশো ভাগের বেশি। যে কারণে মৌলবাদী নেতা আর ভন্ড পীরবাবারা অনেকদূর সফল হয়। তাদের নীতিহীনতার কারণে নিজেদের পাঁকে ডুবে মরে শেষ পর্যন্ত।
তো শেষ পর্যন্ত এই-ই। এ পর্যন্ত আমরা যা পেলাম তা হলোঃ
০১। অন্যের সমালোচনা করব না কখনও। বিশেষ করে তার সামনে তো নয়ই।
০২। প্রতিটা মানুষকেই আমরা গুরুত্ব দেব। কারন তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভালবাসে। তাদের সাথে ভালো
ব্যবহার করব।
০৩। কাউকে ছকে ফেলে বিচার করব না। যে যেমন তাকে ঠিক সেইভাবে গ্রহণ করব। আমার মতো যে তাকে হতে
হবে এমন কোনোও কথা নেই।
০৪। অন্যকে উপদেশ না বিলিয়ে তাকে জানিয়ে দেব বদলে সে কী পেতে পারে, বা হারাতে পারে।
০৫। অন্যের প্রতি আগ্রহ দেখাব।
০৬। হাসি মুখে কথা বলব। আপ্যায়ণ করব।
০৭। মানুষের নাম মনে রাখব। নাম ধরে ডাকব।
০৮। অন্যের কথা শুনব, নিজেরটা কম বলে।
০৯। আলাপচারিতার সময় অন্যের ব্যাপারে জানতে চাইব।
১০। ব্যবহার বৈচিত্র্য দিয়ে অন্যকে বুঝতে দেব সে আমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, যোগ্য, দক্ষ।
১১। নিজের কোথাও ভুল হলে স্বীকার করে নেব।
১২। তর্ক পরিহার করব সব সময়।
১৩। কারও ভুল ত্রুটি বলার আগে প্রশংসা দিয়েই শুরু করব।
১৪। আদেশ না করে অনুরোধ করব।
১৫। সবার সময়েরই মূল্য আছে। হোক সে রিকশাওয়ালা বা সরকারি দলের মন্ত্রী।
১৬। আপোষ করলে আমি কখনওই ছোট হব না।
১৭।উৎসাহ আর উদ্দীপনা সবচেয়ে বড় এনার্জি টনিক।
শেষ কথা এই, জার্মানদের একটা প্রবাদ আছে, অন্যের বিপদে আমরা বেশি আনন্দ পাই। কথাটা হয়তো সত্যিই। আমার তো ভাই মনে হয়। কাজেই নিজেদের জয়-বিজয় গৌরব গাঁথাকে অত বড় করে উপস্থাপন করার দরকার দেখি না। নিজেদের বিজয়কে একটু কম করে বিজ্ঞাপন দিই। অন্যের প্রতি বিণয়ভাব দেখাই। নম্র হই। ভালো আচরণ করি।
কারণ একথা ঠিক। আপনি বা আমি কেউই অতটা মূল্যবান নই। নিজেদের নিয়ে বাহাদুরি করার জন্য আমাদের জীবনটা খুবই ছোট। আগামী একশো বছর পর আমাদের কথা কেউ মনে রাখবে না। কাজেই মাঝের এই সময়টুকু আমরা ভালো ব্যবহার আর আচরণ দিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করে সুন্দর জীবন যাপন করব।
অনেক কথা বললাম এতক্ষণ। অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। দয়া করে ভুল বুঝবেন না। আমার শুভেচ্ছা রইল আপনার প্রতি।
ধন্যবাদ।
(বিদেশী বইয়ের কাঠামো অবলম্বন করে লেখা )

মতামত জানান