ধারাবাহিক অন্ধকারের ছায়া - 3 পর্ব (4)

তিন

গাঁও গেরামে যেমন যেমন ভাল মানুষদের অভাব নাই তেমনি নেই চোর ছেচরদের অভাব !
করিম মোল্লার কলাবাগান একরাতেই প্রায়খাক করে দিয়েছে ।
আর তা দেখে চেচিয়ে পুরো পাড়া এক করে দিয়েছে সে। কলাবাগানের চারপাশে ভিড় জমে গেছে বেশ। যতজন না এসেছে স্বান্তনা দিতে তার তিনগুন এসে তামশা দেখতে। শিশিরে গা ভিজে একাকার করিম মোল্লার। সেদিক তার খেয়াল নেই। এ মাথা থেকে ও মাথায় লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। আর ফকফকে সাদা চুল দাড়ি নাড়িয়ে সমানে বকে যাচ্ছে।
করিম মোল্লার বড় ছেলে নজু মোল্লা এসে বিরুক্তমুখে বলল , বুউড়া , বাইত যাও ।এত তামশার কি আছে ?
ছেলের কথা শুনে করিম তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ।
: হারামারির পুত , তুই কি বুঝবি ! তামশা আইজকা ভাল কইরাই দেখামু ।
এই নিয়ে বাপে ছেলেতে প্রায় ধরাধরির উপক্রম। পাড়ার লোক নজু মোল্লাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে গেল। করিম মোল্লা এবার খেতের আইলেই বসে পড়ে।

শাহজাহান আজ একটু দেড়িতেই ঘুম ভাঙল। কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি তার। সকালের দিকে ঘুম এসেছে। আজ খেতে কাজ নেই। তাই বিছানায় একটু গড়িয়েই উঠবে ভেবেছিল। বউ এসে দুবার উকি দিয়ে গেছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে শাহজাহান। রা করেনি।
শেষমেষ গা ঝাড়া দিয়ে উঠেই পড়ে সে। উনুন থেকে একটা কয়লা বেছে নিয়ে ফিরতেই বউ বলে ,
: রইমার বাপ চাইল নাই ।
শাহজাহান একবার আগুন চোখে তাকায়। তারপর কলে গিয়ে মুখ ধুয়ে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
করিম মোল্লার কলাবাগানে ভীর দেখে সে গিয়ে উকি দেয়। করিম মোল্লা এখনও ভেজা কাপড়ে আইলে বসে আছে।
সারা কলাবাগান জুড়ে কলাগাছের ধ্বংসস্তুপ দেখে ব্যাপারটা বুঝে নেয় শাহজাহান ।
: কাকা ,কামডা কহন অইছে ? টের পাওনাই ?
শাহজাহান এগিয়ে যায় করিম মোল্লার দিকে।
শাহজাহানকে দেখে বিলাপ থামায় করিম মোল্লা ।
: টের পামু কেমনে ? চোরকি এতে কাচা নি ?
করিম মোল্লার ঘুম এমনিতে পাতলা। টু শব্দেই নাকি তার ঘুম ভেঙে যায়। তাছাড়া তার বাড়িও কলাবাগান থেকে বেশি দুরে নয় । তাহলে সারারাত ধরে চুরি চলল সে খোজ পেলনা কেন ?
: কোবরেজি করে নিছে । মন্ত্র পইড়া ঘুম পাড়িয়ে কামডা করছে !
শাহজাহান মাথা নেড়ে সায় দেয়। তার মনে ঘুরছে কালকে রাতের ঘটনা। কালকে পুকুর পাড়ের সেই ছায়ামুর্তিটা। সেইই চোর নয়তো ?
: সন্দ করো নাহি কাওরে ?
করিম মোল্লার বিলাপ আবার শুরু হয়। বুক চাপরে সে কাঁদে কিছুখন ।
তারপর বলে ,
: দূরে মানুষ না শাজান । আমার বাড়িতই তো শত্তুর অভাব নাই ।

গ্রামের মধ্যে ভূঁইয়াদের পরে করিম মোল্লাদেরই একটু অবস্থা ভাল। তার দুই ছেলে প্রবাসী। পাঁচ ছেলের মধ্যে একটা আর্মিতে। বাকি দুটা বাড়িতেই থাকে। বড় ছেলে নজু । বাপের সাথে দিনরাত খাটেও , আবার খিটমিটিও বাদে বেশ।
ছোট সাজু । এখনও নাবালাক । প্রাইমারি স্কুলে ফোরে পড়ে ।
একটা মেয়েও ছিল তার। গত বছর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে ।
করিম মোল্লার উন্নতি হয়েছে রাতারাতি । দেশ স্বাধীনের পর করিম মিয়ার থাকার একটা কুঠিরও ছিলনা। আর কয় বছরে সে কিনা করেছে ?
হাসনাবাদ থেকে সে দামী টিন এনে ঘর বেঁধেছে । দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছে । তারা মাসে মাসে মোটা টাকা পাঠাচ্ছে।
চরে জমিও রেখেছে দু এক বিঘা ।
লোকে বলে হানাদার বাহিনীর সাথে হাত ছিল তার। তারাই নাকি লুট করা সোনাদানার একটা ভাগ দিয়ে গেছে তাকে ।

করিম মোল্লার বড় ভাইয়ের দু ছেলে । কবির মোল্লা আর হামিদ মোল্লা । কবিরের সাথে বনিবনা নাই করিম মোল্লার । তার মতে ,হারামজাদা ।
বাবার মৃত্যুর পর ভাইকে খেটে বড় করে সে। কিন্তু তাতে কি ? বিনিময়ে ভাইকে করেছে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত । কলা চুরির পেছনে এই কবিরের হাত বলে করিম মোল্লার সন্দেহ ।

হামিদ মোল্লার অবশ্য এসবে খেয়াল নেই ।সে অন্য জগতের মানুষ । গান বাজনা নিযেই তার দিন কাটে । করিম মোল্লা তারউপরও তেমন একটা খুশি । প্রতিদিন দু বেলা গিয়ে সে গালি গালাজ করে আসে থাকে ।
করিম মোল্লা হয়ত যোহেরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছে , দেখেকি হামিদ ধরেছে জোর গলায় গান । তাতেই খিটমিটেটা বেঁধে যায় ।
: ঘর নাই ,সংসার নাই ,নামাজ নাই , রোযা নাই।আছে খালি গান বানবার মুরোদ । আল্লাল দুনিয়ায় কত কিছিমের যে গুনাগার বান্দার ঠাই !
হামিদ রাগ করেনা । হাতের দুতারায় টুং ,টাং সুর বাঁধে ।
বলে ,
: কাকা হুনবা নাকি ? ভালা একটা গান বানছি । পেম পিরিতির গান না , মারফতি গান।
শুনে রাগে মাটি দুবার আছড়েই পড়ে আরকি করিম ।
: আইছে আমার মারফতি গান লেহাইয়া । পেডে খাওনা না থাকলে মারফতি গান গাইয়া ভিক্ষা করন লাগব ।
শুনে জোর গলায় হেসে উঠে হামিদ ।
: ভিক্ষা করুমকে কাকা । তোমার বাইত যামুগা । গিয়া কাকিরে কমু , কাকি বাত বাড় । কাকাযে রুই মাছটা আনছে মাথাড়া দেও আমারে ।
এবার আর করিম দাড়ায় না । রাগে গজরাতে গজরাতে বাড়ি ফিরে সে ।
হামিদকে সে যতই ধুর ধুনা করুক । হামিদের প্রতি তার কেমন যেন একটা দরদ । সত্যিই হামিদ যদি কোনদিন এসে ভাত খাওয়ার কথা বলে রুই মাছের মাথা দিয়ে ,সে না করতে পারবেনা ।

দুদিন আগে কবিরের সাথে তুমুল ঝগড়া বেঁধেছিলো করিম মোল্লার । আর তারপরেই কলাবাগানের এই অবস্থা ।
: ডাকাইত .. ডাকাইত ..
আবার বিলাপ শুরু হয় করিম মোল্লার ।
শাহজাহান আর ওখানে দাড়ায় না ।বাড়িতে সবাই উপোসি আছে । চাল নিলে তবে চুলোয় হাড়ি বসবে ।
বড় রাস্তায় উঠে তার দেখা হয় টুনু মিয়ার সাথে । ময়মনসিংহের লোক এ টুনু মিয়া । বছরে দুবার , ধান লাগানো আর ধান কাটার সময় দলবেঁধে কামলা খাটার জন্য আসে টুনু মিয়ারা ।
: শাজান ভাই কই যাও ? বাজারে নি ?
শাহজানের হাতে বাজারের ব্যাগ দেখে বলে সে ।
: হ টুনু ভাই । কবে আইলা ?
: আইজই আইছি । ভুঁইয়ার বাইত উঠছি ।হাঁজের সম যাইও ।
শাহজাহান মাথা নেড়ে বাজারের পথে এগোয়ে । তার পেট খিদায় চো চো করছে ।এমনিতেই করিম মোল্লার ওখানে অনেক দেড়ি করে ফেলেছে । আর দেড়ি করলে চলবেনা ।

Series Navigation<< অন্ধকারের ছায়া – ২অন্ধকারের ছায়া – ৪ >>

মতামত জানান