ধারাবাহিক ক্ষুদে বিজ্ঞানীর ক্লাব - 8 পর্ব (28)

যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। মাটি বলতে কিছুই নেই। আসলে মাটি রয়েছে জমাট বাঁধা বরফের নিচে। গাছপালা তো দূরের কথা, এক টুকরো সবুজের চিহ্নও নেই কোনখানে। কনকনে ঠান্ডা। হিমেল বাতাসে হাড় কাঁপিয়ে দেয়। সারা বছর শীতের রাজত্ব এখানে। এই হলো উত্তর মেরু। এস্কিমোদের দেশ।
এস্কিমো শব্দের অর্থ ‘কাঁচা মাংস খায় যারা’।
এই নামটা ওদের দিয়েছে অ্যালোং কুইন রেড ইন্ডিয়ানরা।
শ্বেতাঙ্গরা ওদের কাছ থেকে শুনেই একস্কিমো শব্দটা ব্যবহার করছে।
এস্কিমোরা নিজেদেরকে ‘ইনুইত’ বলে। ইনুইত শব্দের অর্থ আসল মানুষ।
বিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ১০,০০০ বছর আগে এস্কিমোদের পূর্ব পূরুষেরা মধ্য এশিয়া থেকে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য এই মেরু অঞ্চলে এসেছিল।
এস্কিমোদের রয়েছে অনেকগুলো আঞ্চলিক ভাষা। একটা মূল ভাষা থেকে এই আঞ্চলিক ভাষাগুলির উৎপত্তি।
যাযাবরদের মতোই এরা ঘুরে বেড়ায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। বরফের কারণে চাষাবাদ করা সম্ভব না হওয়ায় শিকারই এদের জীবীকার একমাত্র অবলম্বন। বরফের রাজ্যে কঠিন প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার জন্যে এরা বাধ্য হয়েই কাঁচা মাংস খায়। আগুনে সেদ্ধ করে খাওয়ার সুযোগ এবং সময় কোনোটাই এদের নেই।
এস্কিমোরা উমিয়াক এবং কায়াক নামের প্রাচীন ধরণের নৌকা ব্যবহার করে। এই নৌকা ‘ওয়ারলাস’ নামের এক ধরণের প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি করে। শিকার করার জন্য প্রায় হার্পুনের মতো অস্ত্র ব্যবহার করে। পাখি শিকারের জন্য লম্বা দড়ির মাথায় পাথর এবং হাড় বেঁধে গুলতির মতো অস্ত্র বানায় এস্কিমোরা। এর নাম ‘বোলা’।
শিকার বলতে শুধুমাত্র তিমি, ওয়ালরাস সীল, বলগা হরিণ আর ক্যারিবু। ক্যারিবু প্রায় হরিণের মতো এক ধরণের প্রাণী। মাংসের জন্যে এদের শিকার করা হয়, আর বলগা হরিণকে পোষ মানানো হয় স্ল্যাজ গাড়ী টানার জন্য।
তিমি, ওয়ালরাস আর সীল মাছ থেকে এস্কিমোরা জীবন ধারণের প্রায় সব উপাদান পেয়ে থাকে। এসব প্রাণীর মাংসই এস্কিমোদের খাবার। এছাড়াও এসব প্রাণীর চামড়া দিয়ে কাপড়, নৌকা আর তাবু তৈরি করা হয়। চর্বি দিয়ে জ্বালানো হয় বাতি। রগ, শিরা ইত্যাদি সুতা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। হাড় দিয়ে বানানো হয় শিকারের অস্ত্র অথবা কাঠের বিকল্প কোনো জিনিস।
এস্কিমোদের মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী। যেমন: চুকটী, ইয়াকুত, ইভেংক, নেনেক, সামি, পোলার, ব্যাফীন দ্বীপবাসী, কুচিত, এলিউত।
ইয়াকুতরা আর সব এস্কিমোদের মতো যাযাবর নয়। এরা স্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকতেই পছন্দ করে। ব্যাফীন দ্বীপবাসীরা পারকা নামক এক ধরণের পোষাক তৈরি করে, এটি ক্যারিবুর প্রাণীর চামড়ায় তৈরি হয়।
এস্কিমোরা সীলের চামড়া দিয়ে তাঁবু তৈরি করলেও ইগলু শব্দটা এদের কাছ থেকেই এসেছে। ইগলু হচ্ছে এদের বাড়ির নাম। বরফ কেটে কেটে উল্টিয়ে রাখা বাটির মতো করে এ ধরণের বাড়ি তৈরি করা হয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা থাকলেও ইগলুর ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির কিছু কিছু এস্কিমোদের কাছে পৌঁছলেও এরা প্রাচীন পদ্ধতিতে জীবন-যাপন করতে ভালবাসে।
এস্কিমোদের সততা, পরিশ্রম এবং জীবন-যাপন সব দেশের মানুষের মনকে নাড়া দেয়।

Series Navigation<< ক্রিস্টাল কিভাবে জমাট বাঁধে ?গুহামানবের খাবার >>

মতামত জানান