টেনিস বল ছেড়ে কাঠের বল দিয়ে যেদিন ক্রিকেট খেলতে নামলাম সেদিনই মনে হল দুর্ঘটনা ঘটবে। আমার ধারনাটা সত্য প্রমান করার জন্যই যেন দূর্ঘটনা ঘটল। দুর্ঘটনা ঘটবি তো ঘট। মানা করেছে কে? তাই বলে প্রথম দিনই ঘটতে হবে? আর তা আবার চিনু মামার সাথে?
আমরা এলাকার চেয়ারম্যানের কানের কাছে প্যান প্যান ঘ্যান ঘ্যান ক্যান ক্যান করে নাকের পানিতে চোখের পানির শুন্যতা পুরণ করে অনুদানের এক সেট ক্রিকেট খেলার সামগ্রী বাগিয়ে নিলাম। চিনু মামা সেটা জানেন না। তিনি হলেন আমাদের “হযবরল ক্লাব” এর ইউনিভার্সাল মামা কাম অলিখিত সভাপতি। তিনি জানবেনই বা কি করে? ক্লাবের সভাপতি হলে কি হবে, চাঁদা আদায়ে তার মহা অরুচি। চাঁদাবাজি? ছো ছো- ওটাতো গুন্ডা বদমায়েশের কাজ। আর কোন অনুষ্ঠানে আমরা যদি তার কাছে চাঁদা দাবি করি তবে তিনি বেমালুম গায়েব হয়ে যান। কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন ঠিকই হাজির হন।
যাই হোক – নতুন ক্রিকেটের সামগ্রী পেয়ে আমাদের খুশি দেখে কে? দেরী না করে মাঠে নেমে পড়লাম। কে কার আগে প্যাড পড়ে ব্যাট হাতে নিবে তার প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেল। আমি হালকা পাতলা মানুষ। শরীরে শক্তি কম। তাই প্রতিযোগীতায় না নেমে বলের দখল নিলাম।
ব্যাট হাতে প্রস্তুত আমাদের ড্যাসিং ব্যাটসম্যান মানিক। বল হাতে প্রস্তুত আমি। প্রথম বলে বোল্ড করার আশায় বল করলাম সর্ব শক্তি দিয়ে। ওমা! ছক্কা!!!! না না- ব্যাটস ম্যান ছক্কা মারে নাই। সে তো বল নাগালই পায় নাই। বল আমার হাত থেকেই শুণ্যে ভাসতে ভাসতে সীমানার বাইরে চলে গেল। চারিদিকে হাসির ধুম পড়ে গেল। মান সম্মান বাচাতে দেখে শুনে পরের বল করলাম। মানিক করল দর্শনীয় কাভার ড্রাইভ। বল মাটি কামরে সীমানার দিকে যাচ্ছে। এমন সময় মাঠে প্রবেশ করল আমাদের গ্রেট চিনু মামা। দেরী না করে বল ফিরিয়ে দেবার আশায় করল পেল্লায় এক কিক। পরমুহুর্তে বাবাগো মাগো বলে তিরিং বিরিং করে নাচতে শুরু করলেন তিনি। তার এক পায়ে নাচ দেখে দিনার গান ধরল, “এক পায়ে নাচ তুমি…………..”।
পায়ের ব্যাথাটা কমে যেতেই চিনু মামা হুংকার ছাড়ল, “দেখি বলটা। বল এত শক্ত হল কি করে?” চিনু মামার হুংকার তো নয় যে না ১০০ বাশ ফট ফট করে ফাটার শব্দ। বলটা তখন ক্লাবের সবচেয়ে নিরিহ আর ভীতু সুমনের হাতে ছিল। মামার হুংকার শুনে বলটা সুমনের এক মন ভারি মনে হল। তাড়াহুড়া করে বল ছুড়ল মামার দিকে। সুমনের হাতের টিপ অসাধারণ! বলটা মামার দিকে না গিয়ে মামার পাশে দাড়ানো টাকলু রবিউলের দিকে গেল। আমরা টাক মাথায় সংঘর্ষের ঠাক করে একটা শব্দ শুনলাম। আর রবিউলকে মাঠের মাঝে চিৎপটাং অবস্থায় আবিস্কার করলাম। চিনু মামা আবার হুংকার দিল, “কে কোথায় আছিস? জলদি পানি আন।“ আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, “মামা, আমরা সবাই আছি। খালি আশে পাশে পানি নাই।“ ফাজিলের ফাজিল দিনার সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে, “ কে কয় পানি নাই? আমার কাছে আছে।“ চিনু মামা আবার হুংকার দিয়ে বলে, “ব্যাটা ফাজিল। তাইলে দেরী করতাছস কেন? জলদি পানি দে।“ এই বার দিনার মুচকি হেসে বলে, “না- মানে মামা, আমার সুসু ধরছে। যদি বলেন তো রবিউল ভাইয়ের মাথায় সুসু করে দেই। পানিও পাওয়া যাবে আমার…………।” আমার কোথায় মামার হুংকার শুনব তা না, শুনলাম রবিউলের হুংকার। “তবে রে…..” বলে তেড়ে উঠল রবিউল। তাড়া করল দিনার কে। আর হাবলু মিয়া নাচতে শুরু করল, “ইউরেকা!! ইউরেকা!!” বলে। আমরা অবাক। হাবলুরে জিগাইলাম, “আবে হাবলু, তুই আবার কি আবিস্কার করলি?” হাবলু হেসে বলল, “জটিল ঔষধ আবিস্কার করছি। কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলেই মাথায় সুসু করে দিব!!!!”
বল হাতে পেয়ে চিনু মামা বেজায় খুশি। বলটাতো দারুন। এই বল দিয়ে আমি বল করব। এতক্ষন প্যাড পড়ার প্রতিযোগীতা ছিল। এইবার শুরু হল প্যাড খোলার প্রতিযোগীতা। চিনু মামা এমন কোন ফাস্ট বোলার না যে ব্যাটসম্যানেরা তার বলের গতিকে ভয় পাবে। ভয় পায় তার বেগতিক মেজাজ কে। কেউ যদি ভুল করেও মামার বলে বাউন্ডারী হাকায় তবে মামা বলটা সেই ব্যাটসম্যানের পিঠে ছুড়ে শোধ নেয়। টেনিস বলের মার সহ্য করে সবাই চার ছয় মারতে চাইলেও কাঠের বলের সামন্য রিস্কও কেউ নিতে চাইল না। অবশেষে ব্যাটসম্যান পাওয়া গেল। ব্যাট প্যাড হাতে দাড়িয়ে গেল জাভেদ ওমর খ্যাত আমিন। তার বিশ্বাস ছিল, সে যখন ব্যাটিং করে তখন বল মাঠের বাইরে যেতে ভয় পায়। কিন্তু চিনু মামার প্রথম বলেই অঘটন ঘটে গেল। আমিন আলতো করে বলটা ছুয়েছে মাত্র। বলটা সবাইকে ফাকি দিয়ে মাঠের বাইরে চলে গেল। আর আমিন? বল নাকি আমিন, কে কার আগে বাউন্ডারী লাইন পার হল বুঝতে পারলাম না। খালি চিনু মামার ফাটা বাশের গলায় চিৎকার শুনলাম, “ফিরা আয় কইতাছি। ফিরা আয়। কোন সাহসে আমার বলে চার মারলি?” পলয়ন রত আমিন কোন মতে বলল, “মামা, দুঃসাহসে।“

মতামত জানান