বর্ষাকাল ডাকাতদের জন্য দারুন একটা সময়।
নদীর পানি বেড়ে গিয়ে দুই কূল উপচে উঠে। গ্রামের নিচু পথ ঘাট ডুবে এক একটা গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ছন্নছাড়া দ্বীপের মত। যোগাযোগের উপায় থাকে না। রাতের বেলা টিমটিম করে কুপি বা হারিকেলের জ্বলে।
লম্বা কালো ছিপ নৌকা নিয়ে রাতের বেলা নদীতে চলে আসে ডাকাতের দল। দলের মধ্যে এমন লোক থাকে যারা খুব নিঃশব্দে দাড় বাইতে পাররে। আর ছিপ নৌকা তো বাতাসের আগে চলে। নদীর কলকল শব্দ আর রাতের বাতাসের শব্দে নৌকার দারের শব্দ চাপা পড়ে যায়। অমাবস্যা রাত ডাকাতি করার জন্য ভাল। ভরা জোসনার রাত ভাল না। বহু দূর থেকে কারও চোখে পড়ে যায়।
লুটের মাল অর্ধেক পাবে দলের সর্দার। বাকি অর্ধেক সমান ভাগ হবে দলের সব সদস্যদের মধ্যে। নিয়ম খুব কড়া। ডাকাতি করার আগে যে বাড়িতে লুট করতে যাবে সেই বাড়ির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে আসে ডাকাত দলের একজন। যে খোঁজ নিয়ে আসবে সে সমান ভাগ পাবে। খোঁজ নিতে হয় নানান ফিকির বা কায়দা করে। খোঁজ মানে- বাড়ির কর্তার আয় উপার্জন কেমন ? বাড়িতে নগদ টাকা কত থাকে। বাড়ির সদস্য কত ? বাচ্চা আর বুড়ো কতজন ? মেয়েরা গয়না গাটি কেমন পরে। প্রতিবেশীদের বাড়ি ঘর কত দূরে দূরে। সেই সাথে পালানোর পথটাও খেয়াল রাখতে হয়।
বেশ কয়েকদিন খোঁজ নেয়ার পর সর্দার নিজেই ঠিক করবে কবে ডাকাতি করতে যাবে। কয়েক দফা মিটিং হয় নিজেদের মধ্যে। নৌকা থাকে ওদের। সেগুলো নদীর মধ্যে অগভীর পানিতে ডুবিয়ে রাখে। যাতে কেউ না জানে। অথবা বিল থেকে নরম ঘাস কেটে আনার জন্য সেই নৌকা ব্যবহার করে। অস্ত্র থাকে। রামদা, বল্লম , বা বড় বড় কাঠের লাঠি। লোহার অস্ত্র গোপনে লুকিয়ে রাখে। কেউ যদি থানায় গিয়ে দারোগা বাবুর কাছে নালিশ করে তবে ঝামেলা হতে পারে । সেই ভয়েই লুকিয়ে রাখতে হয়। হতে পারে শ্মশানের বড় কোন গাছের উপরে। বা বিরান মাঠের মধ্যে কোন শিমুল গাছের তলায়। মাটিতে গর্ত খুড়ে। এই জায়গাটা শুধু ওরাই চিনতো।
তো কয়েক দফা মিটিং শেষ হবার পর সর্দার নিজেই দিন ঠিক করতো। এবং অম্যাবস্যা হত বেশির ভাগ সময়।
দলের সবাই রাতের বেলা এসে হাজির হত সেই জায়গায় যেখানে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে।সামান্য মদ খাওয়া হত। মদ খাওয়াও ডাকাতি করার একটা অংশ। নদী থেকে ছিপ নৌকা তুলে নিয়ে যাত্রা শুরু হত। যে বাড়িতে ডাকাতি করবে তার কাছা কাছি এসে সব ডাকাত সারা শরীরে ভাল করে তেল মাখিয়ে নিত । যাতে বাইম মাছের মত পিচ্ছিল হয়ে যায়। সাহসী কোন চৌকিদার যদি সাপটে ধরতে চায় ডাকাতদের তখন ঠিক মাছের মতই পিছলে যেতে পারবে। সবার মুখে মাখা হয় ভুসো কালি। যাতে চেহারা চেনা না যায়। মাথায় লাল গামছা বা কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা হয়। দুই এক ডাকাত নাকি কানে মাকড়ি পড়তো বা জবা ফুল রাখত।
এবার বাড়ির কাছা কাছি এসে, হা- রে- রে- রে- রে বলে বিকট ডাক ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো। বাড়ির লোকজনদের মেরে হাত পা বেঁধে ভয় দেখিয়ে লুটে পুটে নিত নগদ টাকা কড়ি। গয়না। সুবিধে হলে ধান বা চালের বস্তা । নিদেন পক্ষে বাড়ির থালা বাসন হাঁড়ি পাতিল সব। দরকার মনে করলে খুন খারাবিও করতো ডাকাতদল । কাজ শেষে দৌড়ে গিয়ে নৌকায় উঠত। দ্বিগুণ বেগে বৈঠা মেরে বাড়ির পথ ধরত। লুটের মাল সামান ভাগ হয়ে যেত সঙ্গে সঙ্গে। কিছু দিন লুকিয়ে রাখত জিনিসগুলো। বিক্রি করতে গেলেই ধরা পরে যাবে যে। পরিস্থিতিটা একটু শান্ত হলেই আস্তে ধীরে বিক্রি হত সেই জিনিস।
ডাকাত দল মাস তিনেক বা চারেক বসে চুপচাপ দিন গুজরান করতো। অলস সময় কাটাত। আর খোঁজ রাখত। কে টাকা পয়সা বানাচ্ছে। কার কাছে নগদ টাকা আছে। আবার সময় সুযোগ পেলে ঝাঁপিয়ে পড়তো কোন গেরস্থের বাড়িতে।
শুধু যে বর্ষাকালে ডাকাতি করতো এমন না কিন্তু। শীত – গরম সব ঋতুতেই ওরা ওদের কাজ চালিয়ে যেত। তবে বর্ষাকালটা ছিল বেশ ভয়ের সময়।গ্রামগুলো বিছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সবাই বেশ আতঙ্কের মধ্যে থাকতো। যাদের ঘরে টাকা পয়সা থাকত তাদের ঘুম হারাম হয়ে যেত। চৌকিদার পাওয়া বেশ সমস্যা বর্ষার দিনগুলোতে। দেখা যেত চৌকিদার নিজেই বাড়িতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এমন ও হয়েছে চৌকিদার নিজেও ডাকাতদলের সদস্য হয়ে গেছে। গোপনে গিয়ে খবর দিয়েছে সর্দারের কাছে , কোন বাড়িতে লুট করলে মেলা টাকা কড়ি পাওয়া যাবে।
আমি যে ঘটনা তোমাদের বলব সেটা মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাট এলাকার। ১৯৪৫ সালের কথা।
বর্ষাকাল চলছে । রাত মাত্র নয়টা। কিন্তু মনে হচ্ছে নিঝুম রাত। সূর্য ডুবে যাবার পর পর রাতের খাওয়ার আয়োজন সেরে নেয় গ্রামের মানুষ। কেরোসিন তেল বাঁচাতে চায়। খামাখা তেল পুড়িয়ে লাভ কি ?
সন্ধ্যার পর পরই রাতের খাওয়া দাওয়ার পাট শেষ করেছেন নীলকান্ত বাবু । মোটা লাল চালের ভাত, মাগুর মাছের ঝোল আর সোনামুগ ডাল। খাওয়া শেষে পরোটার মত বিশাল একটা আমসত্ব খেয়ে ভাবলেন জীবনটা আসলেও খারাপ না।আবার মনে পড়লো আজ বিকেলেই হাট থেকে পাট বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কাল সকালে সদরে গিয়ে মহাজনের দপ্তরে জমা দিলে তবে শান্তি। টাকা ওখানেই নিরাপদে থাকবে। উল্টা কিছু সুদ পাওয়া যাবে। বাড়িতে টাকা রাখা একদম নিরাপদ না। ডাকাতি হচ্ছে বেশ। বর্ষা নামতেই ডাকাতদল বেশ জোরে সোরে নেমে পড়েছে। পাশের কয়েকটা গ্রামে ডাকাতি হয়ে গেছে ।
নীলকান্ত বাবু নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। উনারা যৌথ পরিবার। পাঁচ ভাই এক সাথেই থাকেন। পাশাপাশি পাঁচ ভাইয়ের ঘর। অবস্থা ভাল থাকায় টিনের চৌচালা ঘর তুলেছেন। বাড়ির মাঝে বেল আর নিম গাছ। কয়েকটা বরই আর করমচা গাছ মিলিয়ে সুন্দর ছায়া ছায়া নির্জনবাস বসতি। বাড়ির নিচেই নদীর ঘাট। ওখানেই বৈঠক খানা। বাইরের লোকজন এলে ওখানেই বসে। পান তামাক খাওয়া হয়। খোশ গল্প ও চলে।
উঠানে দাঁড়িয়ে চারিদিকটা দেখলেন নীলকান্ত বাবু। নিঝুম। আকাশ মেঘলা থাকায় কালিগোলা অন্ধকার। নদী থেকে ভেজা বাতাস দৌড়ে আসছে সোজা বাড়ির দিকে। গাছের পাতার শন শন শব্দ পরিবেশটা কেমন যেন ছমছমে করে তুলছে। পুরো বাড়িটা একবার চক্কর দিয়ে এলেন নীলকান্ত বাবু। অজানা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। বাড়ির সবাই ঘুমে। বাকি চার ভাই তাদের গিন্নি আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘরে তার গিন্নি আর শিশু পুত্র ও ঘুমে।
আজকের রাতটা অন্য রকম। মনে মনে ভাবলেন তিনি। ঠিক করলেন আজ রাতে ঘুমাবেন না। বৈঠকখানায় বসে কাটিয়ে দেবেন। সকালে জলখাবার খেয়ে ছোট ভাইকে নিয়ে সদরে চলে যাবেন। টাকা জমা দিলেই নিশ্চিত।
বৈঠকখানা বাড়ির শেষ মাথায়। এখান থেকে চারিদিকটা বেশ দেখা যায়। বৈঠকখানা থেকেই মাটি কাঁটা পথটা নীচে নেমে গেছে। গিয়ে মিশেছে গ্রামের মেঠো পথের সাথে। এখন বর্ষা, তাই নদীর পানি বেড়ে একদম বৈঠকখানার বারান্দা পযন্ত এসে ঠেকেছে। ছপ ছপ করে শব্দ করছে ধলেশ্বরীর ঘোলা পানি।
হারিকেলের সলতে বাড়িয়ে দিলেন। বিকেল বেলা কেরোসিন ভরা হয়েছে। বাদুরের চিহ্ন মার্কা কাঁচের চিমনি মেজে ঝকমকে করা হয়েছে। বেশ উজ্জ্বল আলো দিতে লাগল হারিকেলটা। বৈঠকখানার বাইরে ওটা রাখলেন। আলো সামনের দিকে এমন ভাবেই পড়লো যাতে বেশ দূর পযন্ত নজরে আসে। যদিও নদীর ঘোলা পানি আর ভেসে যাওয়া কচুরির স্তূপ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নদীর পানি দেখাচ্ছে কালো। যেন কয়লা দিয়ে আঁকা।
বৈঠকখানার এক কোনে ঠেস দিয়ে রাখা আছে কয়েকটা হুঁকো। একটা নিয়ে খানিক তামাক সেবনের আয়োজন করলেন। খোলা বাতাসে শীতের আমেজ লাগছে তার। চুপচাপ তামাক টানলেন। অনেক সময় কেটে গেল। ঝিঝি আর ব্যাঙের ডাক মিলে অদ্ভুত একটা হচ্ছে হচ্ছে দূরের ডুবে থাকা বেতের জঙ্গল থেকে। মাঝে মাঝে হটাৎ থেমে যাচ্ছে ওদের কোলাহল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার শুরু করছে। দূরের হিজল ডুমুর গাছের ডাল থেকে বাদুরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ এলো।
সময় কাটতে লাগল। এক ঘেয়ে সময়। কি একটা জিনিস দেখে যেন সতর্ক হয়ে গেলেন নীলকান্ত বাবু।
কি সেটা ?
ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। নদীর পানিতে ভেসে ভেসে কয়েকটা কচুরি পানার দঙ্গল ঠিক তাদের বাড়ির দিকেই আসছে। আর সব কচুরির দঙ্গল স্রোতের সাথে ভেসে চলে যাচ্ছে স্রোতের দিকেই। কিন্তু এই সাতটা ধীরে ধীরে চলে আসছে এই দিকেই। আরও একটু খেয়াল করতেই বুঝে গেলেন আসল ব্যাপারটা। মোট সাতজন ডাকাত মাথার উপর কচুরির দঙ্গল রেখে ধীরে ধীরে সাঁতরে এই বাড়ির দিকেই আসছে।ওদের পুরো শরীরটা পানির নীচে । চোখ আর নাক উপরে। সেটাও ঢেকে রেখেছি কচুরির স্তূপ দিয়ে। যাতে মনে হয় শুধু কচুরিই ভাসছে। কে বুঝবে ?
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন নীলকান্ত বাবু। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলার কোন মানে হয় না। বহু দূরে দূরে প্রতিবেশীদের ঘর। চেঁচালে এত দূর শব্দ যাবে না। গেলেও কেউ আসবে কিনা সন্দেহ। বাড়ির লোকজন ভয়ে তরাসে বিরাট হই চই শুরু করবে। বৈঠকখানার দেয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল বড় একটা মাছ মারার কোঁচ। শক্ত হাতে তুলে নিলেন সেটা। মাছ শিকারি হিসাবে বেশ সুনাম আছে নীলকান্ত বাবুর। কোঁচ গেঁথে মাছ ধরায় জুরি নেই তার।
বুঝতে পারলেন কচুরিপানা গুলো ভেসে বৈঠক খানার পিছন দিক দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। ডাকাত দল বুঝতে পেড়েছে আলো জ্বলছে মানে কেউ হয়তো জেগে আছে। আবার অনেক ধনী লোকের বাড়ির কাচারি ঘরে বা বৈঠকখানার সারারাত অমন একটা আলো জ্বলে। হারিকেল বা হ্যাজাক।
কোঁচ নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন নীলকান্ত বাবু। নিজের প্রাণ দিয়ে হলেও আজ ডাকাতদের প্রতিরোধ করবেন।
ডাকাতদল বুঝতে পারেনি কিছুই। আগের মতই একই ছন্দে স্রোতের তালে তালে ভেসে আসছে কচুরিপানার দঙ্গল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন নীলকান্ত বাবু। আরও কাছে এসে গেছে। একটু পরেই মাটিতে পা ঠেকবে ডাকাতদলের । তখন দৌড়ে উঠে হুড় মুড় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়বে সবাই। ঠেকানো যাবে না। লুটে নেবে সব। খুন জখম ও করবে।
গায়ের জোরে কোঁচ ছুড়ে মারলেন নীলকান্ত বাবু। সবার সামনে যে কচুরিপানার দঙ্গল ছিল সেটা লক্ষ্য করে।ঘ্যাচ করে সেটা বিঁধল । অচেনা জলদানবের মত ভয়াল গলায় চেঁচিয়ে উঠলো ডুবে থাকা ডাকাত লোকটা। মুহূর্তেই সেই জায়গার পানি রক্তজবা ফুলের মত লাল হয়ে গেল। কোঁচের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। সেই দড়ি ছিল নীলকান্ত বাবুর হাতের কবজির সাথে প্যাচ দেয়া। টান দিতেই কোঁচ ফিরে এলো তার হাতেই। ইচ্ছে – দ্বিতীয় আঘাত করবেন পরের ডাকাতটাকে। কি অদ্ভুত। একটা ডাকাতও সামনে এলো না। আগের মতই ডুবে ফিরে চলল উল্টা দিকে। যেই দিক দিয়ে ওরা এসেছে। চুপচাপ। নিঃশব্দে।
ডাকাতের চিৎকার ছিল বেশ ভয়ঙ্কর। বাড়ির ভেতর থেকে নীলকান্ত বাবুর অন্য ভাই জেগে দৌড়ে চলে এলো। হাতে লাঠি । সব শুনে বিরক্ত হলো সবাই।
ছোট ভাই বিরক্ত হয়ে বলল- আপনি বোকার মত এমন করতে গেলেন কেন ? এখন ডাকাত দল যদি কাল বা পরশু দল বল নিয়ে প্রতিশোধ নিতে ফেরত আসে ? তখন ?
কিন্তু ডাকাত বাড়িতে ঢুকলে টাকা পয়সা গহনা সবই লুটে নিত। বললেন নীলকান্ত বাবু।
তবু ভাল। টাকার উপর দিয়ে সব যেত। এখন তো জানের উপর ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হবে। বিরক্ত হয়ে বলল মেঝ ভাই।
হু। ওরা কাল বা পরশু ঠিকই ফিরে আসবে। গম্ভীর মুখে বলল সেঝ ভাই।
সবাই তিরস্কার করতে লাগল নীলকান্ত বাবুকে। রাত জেগে কাঁটাল সবাই। ঘুমের প্রশ্ন উঠে না। ভয় হচ্ছিল। ওরা না আবার চলে আসে। ভোর হল। ডালিম ফুলের মত নরম রোদ উঠল পূর্ব দিকে। মোরগ ডেকে উঠলো । পাখীর কিচির মিচির। সকাল বেলায় সদরে চলে গেল দুই ভাই। টাকা জমা দিয়ে এলো মহাজনের দপ্তরে।
বিকেল বেলা বাকি চার ভাই জানালো তারা আজ রাতে বাড়িতে থাকবে না। নিশ্চিত, ডাকাত দল ফিরে আসবে।
নীলকান্ত বাবু দুঃখী গলায় বললেন- বাড়িঘর রেখে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে ? তাছাড়া থাকবেই বা কোথায় ? পাঁচ ভাই মিলে থাকলে ভাল হত না ? সবাই মিলে বাড়ি পাহারা দিতে পারতো।
কেউ রাজি হল না। সাফ জানিয়ে দিল বড় ভাইয়ের বোকামির মাশুল তারা দিতে পারবে না। চলে গেল। প্রতিবেশী দুই চারজন মুখে মুখে ঘটনার প্রশংসা করলেও কেউ রাত জেগে নীলকান্ত বাবুর সাথে পাহারা দিতে রাজি হল না। সবাই নিশ্চিত আজ বা কাল ডাকাত দল ফিরে আসবেই। শোধ নিতে।
সন্ধ্যার পর পর নীলকান্ত বাবুর বাড়ি একদম ভূতুরে হয়ে গেল।
আগের রাতের মতই একটা হারিকেল জ্বেলে রেখে দিলেন বাড়ির উঠানে। কোঁচ হাতে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন বাড়ির এক কোনের কদম গাছের উপরে। এখান থেকে ভালই দেখা যায় সব। সারারাত বসে রইলেন। খানিক পর পর সতর্ক ভাবে চারিদিকটা দেখে নিতেন। ডাকাত দল ফিরে আসবেই।
সারারাত শেষ করে সকাল করলেন। নেমে এলেন কদমগাছের উপর থেকে। ক্লান্ত। রান্নাঘরে বসে চিড়ে আর গুড দিয়ে জলখাবার শেষ করলেন। খানিক পর বাকি চার ভাই তাদের বউ বাচ্চা প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে ফিরে এলো। সেইদিন থেকে বদলে গেল নীলকান্ত বাবুর জীবন। সারাদিন পড়ে ঘুমান তিনি। আর সারারাত জেগে বাড়ি পাহারা দেন।একা। এই ভাবে ছয় মাস যাবার পর বাকি চার ভাইয়ের ভয় খানিক কাটল। ওরা ফিরে এলো বাড়িতে। নীলকান্ত বাবু পরের বর্ষাকাল পযন্ত এই রাত জাগার ডিউটি দিয়ে গেলেন।
ডাকাতরা ফিরে এলো না। মজার ব্যাপার হল আশে পাশের গ্রামগুলোতে আর কখনই ডাকাতি হয়নি। কখনই না। ব্যাপারটা নিয়ে সবাই বেশ আলোচনা করতো। শেষে সবাই এক মত হল- সব গ্রামে এই সাত ডাকাত বাবুরাই লুটতরাজ চালাত। নীলকান্ত বাবু সম্ভবত ডাকাত দলের সর্দারকে মেরে ফেলেছিল। দলের বাকি সদস্যরা আর সাহস পায়নি ফিরে আসতে। যদি সর্দার না মরে অন্য কোনটা মারা যেত ? তবে নিশ্চিত করে বলা যায় ওরা ফিরে আসতো।
যাক কমলাঘাটে আর কখন ডাকাতের উপদ্রব হয়নি। এতেই আমি খুশি। ওটা আমার মায়ের গ্রাম। আর নীলকান্ত বাবু আমার মায়ের ঠাকুর দাদা। পিচ্চি বেলায় অনেক বৃষ্টির রাতে মুড়ির সাথে বেগুনী, আলুর চপ আর পিয়াজু ভাঁজা মাখা খেতে খেতে মায়ের মুখে এই গল্প শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছি।
আজ তোমাদের বললাম।
( শেষ)

মতামত জানান