মুক্ত রাস্তাটা দিয়ে দুটো শূন্য হাত নিয়ে হাঁটছিল একটা লোক। পথের খানিকটা এগুতেই তার একটা হাত আর খালি রইলনা। সেখানে এসে স্থান নিল একটা কোমল নরম হাত। এবার দুজন হাঁটছে মুক্ত রাস্তাটা দিয়ে। একে অপরের হাত ধরে। পথে ধরে বেশ আনন্দেই কিছুদুর চললো তারা। হাতের বাঁধন শক্ত করে ভাবলো পথের শেষের অবদি যাবে এভাবেই। কিন্তু একটু এগোতেই একটা বাক পড়লো। বাকের ঠিক মাঝখানটা লোকটা কেন যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার অপর হাতে সহসা আরেকটা কোমল হাতের অস্তিত্ব অনুভব করলো সে। খানিকটা সময় পেরোলো। লোকটার দুটো হাতই এখন আর শূন্য নেই। আবার হাটতে শুরু করলো ওরা। এবার ঠিক তিন জোড়া হাত। একে অপরকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। প্রত্যেকেরই ইচ্ছা, একসাথে পুরো পথটা পাড়ি দিবে, এভাবে একে অপরের হাত পাকড়ে পৌঁছবে পথের শেষে অবদি। কিন্তু ঝামেলা হয়ে গেলো। লোকটা হাত পাকড়ে থাকা সেই পুরনো হাতটা কেমন যেন পিছিয়ে পড়ছে। ঠিক তাল মেলাতে পাড়ছে বাকি হাতটার সাথে। বার বার করে তাদের চলার গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
পথটায় আরেকটা নতুন বাক এলো। স্থির হয়ে দাড়ালো লোকটা। তারপর হ্যাঁচকা টানে পুরনো হাতটা থেকে নিজের হাতটা মুক্ত করে নিল। ছুড়ে ফেলা হাতটা অসহায়ভাবে আকুতি জানালো। লোকটা ফিরলওনা। নতুন কোমল হাতটা মুঠোবন্দি করে হাটতে শুরু করল এবার। পথের অনেকটা এগোলো ওরা। কিন্তু লোকটা যেন আর নতুন হাতটার সাথে ঠিক তাল মিলিয়ে উঠতে পারছেনা। ক্রমশ হাপিয়ে উঠতে থাকলো সে। একটা সময় তার হাত পাকড়ে থাকা নতুন কোমল হাতটার বাধন ঢিলে হয়ে গেল। তারপর কেমন করে যেন ফসকে গেলো  নতুন হাতটা। আবার দুটো শূন্য হাত নিয়ে লোকটা দাঁড়িয়ে রইল হতভম্ব হয়ে। ঠিক যেন একটা মূর্তি। লোকটার দুটো হাতে এসে ভর করল প্রচণ্ড একাকীত্বতা। চলার গতি আর নেই কিন্তু  প্রাণপণে চাইল কেউ একজন তার হাতে হাত রাখুক। শূন্য হাত ঘেঁসে হু হু  করে বাতাসের ঝাপটা বয়ে যায়। সেই শব্দও যেন ভয়ঙ্কর অসহ্য লাগে লোকটা কাছে।সামনে তখনও পথ অনেকটা বাকি। কি করবে ঠিক ভেবে পায়না লোকটা। খানিকটা সময় পেরোয়। আশায় থেকে থেকে যখন নিজের খোল হাট মুঠো করে ফেলতে শুরু করেছে ঠিক তখন  একটা ছোট বাচ্চার হাত এসে পাকড়ে ধরে লোকটার হাতটাকে। বাচ্চা মেয়েটার অপর হাতটা পাকড়ে আছে সেই ঝেরে ফেলা পুরনো কোমল হাতটা। আবার গতি আসে। এবার মুক্ত রাস্তা দিয়ে তারা তিনজন হাটতে শুরু করে। খানিকটা যেতেই লোকটার খালি অপর হাতটায় মুঠো করে ধরলো আরেকটা নতুন কোমল হাত। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায় লোকটা। একটু সময় নেয়, কি যেন ভাবে। অপর হাত পাকড়ে থাকা বাচ্চা হাতটা থেকে একটু উষ্ণ চাপ অনুভব করে। নতুন কোমল হাতটা আর প্রশ্রয় পায়না লোকটার কাছে। মুক্ত রাস্তা দিয়ে এখন এগিয়ে যাচ্ছে ওরা তিনজন।  লোকটা, সেই পুরনো হাত আর তাদের এক করে রাখা সেই বাচ্চা হাতটা। তারা এগিয়ে চলে ক্রমশ সামনে… আরও সামনে…… পথের শেষ অবদি কিংবা তার চেয়েও হয়তো দূরে কোথাও।

মতামত জানান