‘ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে, তখন তাহার স্বপ্ন, তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে, তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং, জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাঁহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেনো?’

 

আমাদের দেশ তথা এই উপমহাদেশে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কথা উঠলে উঠে আসবে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ যোগেশচন্দ্র ঘোষের নাম। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে যোগেশচন্দ্র ঘোষ এক কিংবদন্তিতুল্য নাম। তিনি সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। সাধনা আর যোগেশচন্দ্র ঘোষ দুটি নাম সমানুপাতিক।

এই যোগেশচন্দ্র জন্মেছিলেন ১৮৮৭ সালে শরিয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে। তাঁর বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। যোগেশচন্দ্র অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। গ্রামের বাড়িতেই কেটেছে তাঁর ছোটোবেলা; গ্রামের স্কুলেই পড়ালেখা শুরু। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা তাকে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। ঢাকায় এসে বালক যোগেশ্চন্দ্র ভর্তি হোন ঐতিহ্যবাহী জুবিলী স্কুলে। ১৯০২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। এর পর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। স্কুল ও কলেজজীবনে তিনি স্বদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। সে সময়ে স্বদেশচিন্তা গভীর প্রভাব ফেলেছিলো তার মনে; যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পরবর্তী জীবনের কর্মকাণ্ডে।

বিদেশী ওষুধের চেয়ে তিনি দেশী গাছগাছড়ার মাধ্যমে চিকিৎসা কে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ পাস করে চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। কোচবিহার কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে সেখান থেকে থেকে বিএ পাস করেন। এমএ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে। সেখানে তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সান্নিধ্যে আসেন। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ই তাঁকে দেশজ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে ব্যাপক উৎসাহিত করেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে  ইংল্যান্ড যান। সেখান থেকে এফসিএস ডিগ্রি লাভের পর আমেরিকা থেকে এমসিএস করেন। স্বাচ্ছন্দ্যমূলক জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন ১৯০৮ সালে। যোগ দেন ভাগলপুর কলেজে। চার বছর রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসবে ছিলেন সেখানে। এর পর চলে আসেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। ১৯১২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজকেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন। গুরু প্রফুল্ল চন্দ্রের দীক্ষা ও নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে ১৯১৪ সালে ৭১, দীননাথ সেন রোডে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। অনেকের ধারণা, তিনি নিজের স্ত্রীর নামে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, নিজের স্বপ্ন-সাধনা থেকে প্রতিষ্ঠানের এরূপ নামকরণ। প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সাধনা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম অর্জন করে। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর গবেষণা, অদম্য সাধনা ও কর্মোদ্যমের ফলে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদীয় ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালি আধুনিক মানে উন্নীত হয়। যোগেশচন্দ্র ঘোষ নিজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশজ মানুষের সংযোগের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন- ‘ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে, তখন তাহার স্বপ্ন, তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে, তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং, জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাঁহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেনো?’

লোকমুখে যতটুকু জানা যায়, যোগেশ্চন্দ্র ঘোষ জগন্নাথ কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর পর আয়ুর্বেদ ওষুধের মানোন্নয়ন এবং এই শাস্ত্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার কাজে নিজেকে পুরোপুরি গবেষণাগারে নিয়োজিত করেছিলেন। রোগী দেখা ব্যতীত অন্য কোনো কাজে তিনি জনসম্মুখে আসতেন না। কারণ, তিনি গবেষণাগারে রোগের লক্ষণ, কারণ প্রতিকার নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত থাকতেন। আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, আয়ুর্বেদ ঔষধের ব্যবহার পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘অগ্নিমন্দা ও কোষ্ঠবদ্ধতা’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গৃহ চিকিৎসা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু কর্ণ নাসিকা ও মুখ রোগ চিকিৎসা’, ‘আয়ুর্বেদ ইতিহাস’, ‘টেক্সট বুক অব এনঅরগানিক কেমিস্ট্রি’, ‘সিম্পল জিওগ্রাফ’, ‘সিম্পল এরিথমেটিক’ ইত্যাদি।

 

সেদিন ছিলো ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ। নিঝুম রাত, নিস্তব্ধ নগরী। সাধনা ঔষধালয়ের গেইটে যথারীতি দারোয়ান ছিলো। যুদ্ধের সময়কার থমথমে পরিবেশে একটি মিলিটারি জিপ এসে থামলো। তাদের হাতে ছিলো ভারী অস্ত্র। তখন সাধনা ঔষধালয়ের গেইটের সামনেই হলো মিলিটারি আর মুক্তিবাহিনীর গোলাবর্ষন। যোগেশচন্দ্র গবেষণাগারেই ছিলেন সে রাতে। মিলিটারিরা সেই রাতে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে সে রাতে চলে গেলো। পরদিন সকালে অর্থাৎ ৪ঠা এপ্রিল যোগেশচন্দ্র আর তাঁর সহকর্মীরা নিচে নেমে আসলেন দেখার জন্য যে শেষ রাতে মিলিটারিরা কি পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো! এমন সময় তিনটি মিলিটারি গাড়ি কারখানার সামনে এসে থামলো। গাড়িভর্তি ছিলো সশস্ত্র সৈন্য। যোগেশচন্দ্র সহ সবাইকে সেখানে লাইনে দাঁড় করানো হলো। তারপর সেখান থেকে যোগেশচন্দ্র কে সৈন্যরা উপরে নিয়ে গেলো। রাইফেলের সামনে দাঁড়িয়ে যোগেশচন্দ্র কি বলেছিলেন তা কখনো কেউ জানতে পারে নি। সুযোগ বুঝে নিচে থাকা সবাই পালিয়ে বাঁচতে পারলেও বাঁচতে পারেননি যোগেশচন্দ্র ঘোষ। পাকিস্তানী মিলিটারিরা বেয়নেটের আঘাতে বুকের পাঁজর খুঁচিয়ে হত্যা করেছিলো তাঁকে। তাঁর পিঠের বা’দিকে পাওয়া গিয়েছিলো বুলেটের চিহ্ন। অবসান হয়েছিলো এক অনন্য মানুষের।

আজ যোগেশচন্দ্র ঘোষের প্রয়াণ দিবসে খিচুড়ির পক্ষ থেকে তাঁর জন্য আকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

মতামত জানান