” মামা, আপনি কি ঝিঙ্কু ভাইকে ‘ হরর’ গল্প দিয়েছেন?” জিজ্ঞেস করল আমার শাগরেদ।
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। বিখ্যাত একটা রেস্টুরেন্টের কিচেনে ব্যস্ত আমি।
সামনেই গ্রিল। তাতে ঝলসানো হচ্ছে এক ডজন স্যামনমাছের ফালি, কয়েক মুঠো ( প্রায় ৩ কেজি) বাচ্চা অক্টোপাস, কয়েকটা বড় বড় কমলা রঙের গলদা চিংড়ি এবং কমপক্ষে দেড় ডজন সবুজ খোসার ঝিনুক।
প্রচণ্ড ব্যস্ত আমি। মরার সময় নেই। রেস্টুরেন্ট ভর্তি খদ্দের। সবাই ক্ষুধার্ত। অপেক্ষা করছে কখন খাবার আসবে। তাই এইসময় সাগরেদের বলা কথাটা হঠাৎ বুঝে উঠতে পারলাম না।
” ঝিঙ্কু আবার কে?” প্রশ্ন করলাম।
” ঐ যে কাজী ‘ মনসুর’ হোসেন। মাসুদ রানার ছেলে, যিনি কাজী আনোয়ার হোসেন সিরিজ লেখেন”, কতগুলো মাছের ফালি ডুবো তেলে ভাজতে ভাজতে বলল সাগরেদ।
ব্যাপারটা এবার বুঝতে পেরে না হেসে পারলাম না। কাজী শাহনূর হোসেন ( টিংকু ভাইয়ের) কথা বলছে। সাগরেদ উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়েছে। বরাবর তাই করে। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি এত জটিল করে ফেলে যে বিপদেই পড়তে হয়।
হাসতে হাসতে জানালাম, ” না, হরর গল্প লেখা হয়নি। কারণ বাছাই করা কিছু সত্য ঘটনা লিখতে চেয়েছিলাম। তেমন কাহিনী পেলাম কই?”
” মামা, তাহলে রবিবারে আবার ভূতের গল্পের আসর বসাবেন?” জিজ্ঞেস করল সাগরেদ।
বললাম, ” ঠিক আছে, আবার বসা যেতে পারে। কাহিনীগুলো শুনতে খারাপ লাগে না। কিন্তু গল্পের কথক যোগাড় করবে কোত্থেকে? ”
” আরে মামা, ম্যায় হুঁ না”, বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল সাগরেদ। তারপর গুনগুন করে একটা গান গাইতে লাগল। গানের কথাগুলো বড্ড বিচ্ছিরি।
এক রবিবার সকালে যে লোকটিকে নিয়ে সাগরেদ আমার বাসায় হাজির হল, লোকটা দেখতে বেশ ভদ্রগোছের। বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। বেশ স্বাস্থ্যবান। কয়েকটা পাকা চুল চেহারাতে আভিজাত্য এনে দিয়েছে। একে অপরের হাত ঝাঁকিয়ে পরিচয় পর্ব সারলাম।
যেহেতু হরর গল্পের আসর বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম আগে তাই বাসায় সস্তা ওয়াইন ছিল না। যেটা চার লিটারের প্যাকে কিনতাম। বদলে জিন, বরফ আর সবুজ কাগজী লেবু দিয়ে চমৎকার একটা মিক্সড ককটেল বানিয়ে আপ্যায়ন করলাম।
নানান কথার পর দ্বিতীয় ড্রিংকটা হাতে নিয়ে নিজের কাহিনী বলা শুরু করলেন ভদ্রলোক। যাঁরা আবৃত্তি করেন, অনেকটা তাঁদের মতো। কাহিনীটা এইরকম :
:- বছর দশেক আগের কথা। আমি তখন আমেরিকায় থাকতাম। স্টুডেন্ট ভিসাতেই গিয়েছিলাম। তবে সম্ভবত দুই বা তিনদিন কলেজে ঢুকেছিলাম। আর যাইনি। দরকার মনে করিনি। বদলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম একটা বহুজাতিক কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে কাজে লেগে। প্রচুর কাজ করতাম। ওভারটাইমও পেতাম প্রচুর। ফলে মাস শেষে যে ডলার পেতাম সেগুলো টাকায় হিসেব করে দেখতাম, আমি কুবেরের খালাতো ভাই হতে পারব। উৎসাহের চোটে আরও বেশি করে ভূতের মতো খাটতাম।
প্রথমে নিউ ইয়র্ক শহরের জ্যাকসনহাইটে থাকতাম। কিন্তু শালার বাঙালি একটা জাতি বটে। বিকেলবেলা যখন জ্যাকসনহাইটের রাস্তা ধরে হেঁটে যেতাম, বাঙালির কাণ্ডকারখানা দেখে বিরক্তি লাগত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে খ্যাঁক – খ্যাঁক করে হাসছে, পান খেয়ে যেখানে সেখানে ‘ পিক’ ফেলছে। একটা স্যান্ডুইচ জাতীয় কিছু নিয়ে এক টেবিলে দশজন বসে আড্ডা মারছে। আড্ডার বিষয়? আবার কি? দেশের রাজনীতি। সারাদিন বাথরুম সাফ করার কাজ সেরে এখানে এসে সব ‘ হমুন্দির পুত’ বুদ্ধিজীবী সাজে। বসে বসে রাজা উজির মারে।
বেশ বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম এখানকার পরিবেশের জন্য। শেষে কোম্পানিই আমায় বদলি করে দূরে পাঠিয়ে দিল। কোথায়? না, চলে গেলাম আলবামাতে। আপনি বোধহয় ‘ সুইট হোম আলবামা’ ছবিটা দেখেছেন? দেখেননি? আচ্ছা দেখে নেবেন। দারুণ ছবি!
তো, ওখানেই একটা নিঝুম এলাকাতে ছোট্ট একটা বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। একাই। আমি আবার একটু মদ্যপান করি। তাই একা একা থাকতেই পছন্দ আমার। সন্ধে সাতটা থেকে পরদিন সকাল সাতটা পর্যন্ত ডিউটি ছিল ফ্যাক্টরিতে। সকালবেলা কাজ থেকে ফেরার সময় ম্যাগডোনাল্ড থেকে প্যানকেক আর কফি খেয়ে ফিরতাম। সারাদিন ঘুমোতাম। সন্ধেবেলা উঠে ভাত, স্যুপ আর একটা তরকারির ঘ্যাঁট রান্না করে খেয়েদেয়ে আবার বেরোতাম কাজে। মোট এক হপ্তা পার হয়ে গেল এভাবে। তারপরেই ঘটল ঘটনাটা।
সেদিন ছিল আমার ছুটি। কাজ নেই। ঘুম থেকে সন্ধেবেলা উঠে ভাবলাম, যাই শপিং সেন্টারে গিয়ে কিছু সসেজ, রুটি, মাখন এইসব কিনে আনি গে। আসার সময় একটা নাইট ক্লাবে গিয়ে একটু ‘ ন্যাংটো’ নাচও দেখে আসা যাবে।
সন্ধের পর হাঁটতে বের হলাম। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মোটা কাপড়েও শীত মানছিল না। তাছাড়া এমনিতেও আমি শীতকাতুরে। সাপের মতো। হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটছিলাম নির্জন রাস্তা ধরে। রাস্তায় লোকজন তেমন নেই।
অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটতে হাঁটতে এ গলি সে গলি দিয়ে যেতে যেতে একসময় পথ হারিয়ে ফেললাম। কোথায় এসে পড়েছি সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। কুছ পরোয়া নেই এমন একটা ভান করে হাঁটছিলাম।
এমন সময় ছোট্ট মেয়েটাকে চোখে পড়ল আমার। মেয়েটার বয়স বড় জোর ছয় কি সাত হবে। পথের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাপুস নয়নে কাঁদছে। লম্বা একটা ফ্রক পরনে। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে কাঁধের দুই পাশে। মুখটা কচি এবং নিষ্পাপ। হাতে একটা পুতুল। পুতুলটা যত্নের সাথে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বুকের সাথে। মা যেমন করে সন্তানকে জড়িয়ে রাখে।
এত প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও মেয়েটার খালি পা। আর গায়ে’ও শীতের কোনও কাপড় নেই। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। আর শীতে কাঁপছে। একবার ভাবলাম – থেমে কুশল বিনিময় করি। মানে জিজ্ঞেস করি, ‘ কাঁদছ কেন খুকি?’ পরক্ষণেই চিন্তাটা বাতিল করে দিলাম। কি দরকার সেধে ঝামেলা ডেকে আনার। প্রায় সব আমেরিকানদের ঘরে ঘরে সমস্যা আছে। আমি কে এসব দেখার।
হেঁটে চলেই আসছিলাম। কিন্তু মেয়েটা আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। কি যেন বলছে। কান্নার জন্য পরিষ্কার শুনতে বা বুঝতে পারছি না। তবে ” মা, মা” শব্দটা স্পষ্ট শুনলাম।
মেয়েটা কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? নাকি ওর মা’র কোনও বিপদ হয়েছে? নাকি ওর মা অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে? বাড়িতে বড় কেউ নেই? তা হলে হাসপাতাল বা পুলিশে ফোন করছে না কেন? সবচেয়ে বড় কথা, এতদূর মেয়েটা এল কিভাবে?
” কি হয়েছে তোমার?” এবার না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।
” মা,….মা….” কাঁদতে কাঁদতে বলল বাচ্চা মেয়েটা , আরও কি কি যেন বলল। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না। শুধু একটা শব্দ শুনলাম – ” মারা যাচ্ছে “।
বাচ্চাটার মা তাহলে মারা যাচ্ছে?
” পুলিশে ফোন করছ না কেন”, জিজ্ঞেস করলাম, ” তুমি নাইন, ওয়ান, ওয়ান ( ৯১১) কল করে পুলিশ ডাকতে পারো না?”
কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা যা বলল, তার অর্থ হচ্ছে ওদের বাসায় ফোন নেই। বাবা লাইন কেটে দিয়েছে।
” ধুত্তেরি!” বলে আবার হাঁটা শুরু করলাম। বাচ্চা মেয়েটাও যথারীতি কাঁদতে কাঁদতে আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। আমার কনুই ধরে টানতে লাগল। আর সেইসাথে কাঁদতে কাঁদতে মা-র কথা বলতে লাগল। ভেবে দেখুন! ব্যাপারটা কতখানি করুণ! আপনারা হলে পারতেন এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে আসতে? হ্যাঁ মানছি, অনেক বাঙালি এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজের চামড়া আগে বাঁচাতে চায়। ওরা হচ্ছে “……” পোলা। আমি ওদের মতো নই। মায়ের দুধ যথেষ্ট খেয়েছি। ভীরু নই। এই শীতের রাতে একটা বাচ্চা মেয়েকে এমনি পথে ফেলে যাই কোথায়?
” কোথায় বাসা তোমার?” জানতে চাইলাম। উত্তরে মেয়েটা আঙুল তুলে দূরের একটা বাড়ি দেখিয়ে দিল। নিঃসঙ্গ একটা বাড়ি।
” ঠিক আছে চলো “„ সায় দিলাম। তখনও অন্য কিছু বিপদের কথা মাথায় আসেনি। এটা কিন্তু একটা ফাঁদও হতে পারত!
বাচ্চা মেয়েটা হাঁটতে লাগল দ্রুত। খুশি হয়েছে ও। ভেজা গালে মুক্তোর দানার মতো লেগে আছে এক দুই ফোঁটা অশ্রু।
ওর পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম আমি। ফাঁকা রাস্তা। একটাও বাড়ি ঘর নেই এখানে। নির্জন পথের দুই পাশে বড় বড় কিছু অচেনা গাছ। নাম জানি না। আসলে আম আর কলা গাছ ছাড়া অন্য কিছু চিনি না। বিশাল গাছগুলোর পাতাগুলো সব ঝরে গেছে শীতের জন্য। মনে হচ্ছে যেন অসংখ্য পিশাচ হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে পথের দুই পাশে।
পথের শেষ মাথায় বাড়িটা। বাড়ির সামনে এসে অবাক হলাম। পুরো বাড়ি অন্ধকার। কোথাও কোনও আলো জ্বলছে না। তারপরও বোঝা যাচ্ছে বাড়িটা চমৎকার গড়নের। একটু পুরনো ধরনের। সামনে ছোট্ট বাগান। যত্নের অভাবে লম্বা লম্বা ঘাস জমে আছে। শুকনো বাদামি ঝরা পাতার স্তুপ এখানে সেখানে। সামনে একটা ফোয়ারা। একসময় হয়ত পানি ঝরত। এখন শুকনো খটখটে। নোংরা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
বাচ্চা মেয়েটা দৌড়ে ঢুকে গেল ভেতরে। তাকে অনুসরণ করে যেই ভেতরে ঢুকতে গেছি এইসময় গেটের পাশে থাকা ফুলের গাছগুলোতে আটকে গেল আমার জ্যাকেটের আস্তিন।
” অ্যাই, দাঁড়াও আমার জন্য”, জ্যাকেটের আস্তিনটা কাঁটাঝোপ থেকে মুক্ত করতে করতে বললাম মেয়েটাকে।
মেয়েটা ভেতরে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে কে জানে! শুধু বাড়ির ভেতর থেকে ওর গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। পাগলের মতো চিৎকার করে ডাকছে, ” মাম্মি…..মাম্মি…..”
মাত্র কয়েকটা মূহুর্ত। জ্যাকেটের ‘ হাতা’ গাছের কাঁটা থেকে ছাড়িয়ে সামনে চলে এলাম। এবার বাড়ির সামনে আসতেই বুকটা দমে গেল আমার। বাড়ির সদর দরজাটা কাঠের তৈরি। বন্ধ। বাইরে থেকে না ভেতর থেকে বলতে পারব না। তবে বাইরে আড়াআড়িভাবে কয়েকটা লম্বা কাঠের পাল্লাতে পেরেক ঠুকে ‘ পাকাপাকি ‘ ভাবে বন্ধ করে দেয়া আছে দরজাটা। এই দরজা না ভেঙে ভেতরে ঢোকা যাবে না। দরজার পাশে বড় বড় দুটো জানলা। দুই পাশে। সেগুলোতেও একই কায়দায় তক্তা মেরে বন্ধ করে দেওয়া। অর্থাৎ এই বাড়িটি দীর্ঘকাল ধরে পরিত্যক্ত। এইরকম বাড়ি এর আগেও দেখেছি আমি।
কিন্তু প্রশ্ন হল, মেয়েটা তাহলে কোথায় গেল?
চৌকস আর ডাকাবুকো হিসেবে খ্যাতি ছিল আমার সবসময়েই। পায়ে হেঁটে পুরো বাড়িটা এক চক্কর ঘুরে আসলাম এবার। না। ভেতরে প্রবেশ করার অন্য কোনও রাস্তা নেই। আরও কটা জানলা পেলাম। কয়েকটার আবার শার্শি ভাঙা। মলিন পর্দা ঝুলছে। কিন্তু ঠিক একই কায়দায় বন্ধ করা।
আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না। এমন সময় দেখতে পেলাম মেয়েটাকে। একতলার ছাদের ওপর ছোট্ট চিলেকোঠার জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। এখন আর কাঁদছে না। তবে পুতুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত ভঙ্গিতে। অবাক হলাম কিভাবে এত দ্রুত বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল মেয়েটা! ঢুকলই বা কোন পথে? আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে কেন? কি করব এখন?
মুখ তুলে চিৎকার করে মেয়েটাকে কিছু বলতে যাব, এমন সময় অনুভব করলাম অস্বাভাবিক কিছু ব্যাপার আছে কোথাও; এবং ব্যাপারটা ধরতে পেরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসার মত হলো।
মেয়েটার মুখ চাঁদের আলোতে রক্তশূন্য আর ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। যেন মোমের তৈরি। দুই চোখের নীচে গভীর কালো দাগ। মাথা দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছে। লাল টকটকে। তরল লাল মদের মত। আমার দিকে তাকিয়ে পিশাচের মত হাসছে মেয়েটা।
সম্ভবত চিৎকার করার জন্য জোরে শ্বাস নিচ্ছিলাম, তাই অনুভব করলাম পচা একটা দূর্গন্ধ ভেসে আসছে কোত্থেকে যেন। মেয়েটার শরীরটা যেন কাঁচের তৈরি। স্বচ্ছ। ওর শরীর ভেদ করে ওপাশের সব কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম। একসময় ধীরেধীরে ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গেল মেয়েটা। কেউ নেই ওখানে। অথচ আমি কসম খেয়ে বলতে পারি কয়েক মূহুর্ত আগেও মেয়েটা ছিল ওখানে।
অদ্ভুত, অচেনা একটা আতঙ্ক এসে ভর করল আমার ওপর। ভেতর থেকে কে যেন তাগাদা দিচ্ছে আমায়। বলছে – পালাও, পালাও। জীবনের প্রথম ভয় পেয়ে ঝেড়ে দৌড় মারলাম আমি গেটের দিকে। ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটছি।
গেটের বাইরে আসতেই হঠাৎ কার সাথে যেন ধাক্কা খেলাম। দুজন লোক। সাথে একটা গাড়ি। লাল – নীল বাতি জ্বলছে গাড়ির ছাদে।
” হেই, মিস্টার,” চেঁচিয়ে বলল একজন, ” বিনা অনুমতিতে অন্যের বাড়িতে ঢোকার জন্য গ্রেফতার করছি তোমায়”।
বুঝলাম এরা পুলিশ। দেখাই যাচ্ছে। কথার তুবড়ি ছোটালাম। কি বলছি নিজেও জানি না। ওরা দুজন একে অপরকে বোকার মতো দেখতে লাগল। তারপর পত্রপাঠ হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে গেল কাছের পুলিশ স্টেশনে।
একটা সাদা নির্জন কামরাতে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখল আমাকে। অনেকক্ষণ। তাও ভাল। স্বদেশের পুলিশ হলে এতক্ষণে কি করত কে জানে! আমার নিজের দেশে রাতের বেলা ছিনতাইকারীর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার।
যাই হোক। অনেকক্ষণ পর কামরার ভেতর প্রবেশ করলেন একজন বড় মাপের অফিসার। মানে নিগার। ব্যবহার ভাল। জিজ্ঞেস করলেন কেন ওই বাড়িতে আমি ঢুকেছিলাম।
সব বললাম তখন।
আমাকে এক কাপ কালো কফি পরিবেশন করে বিরস মুখে সব শুনলেন অফিসার। এক যন্ত্র এনে পরীক্ষা করে দেখলেন আমি মাতাল কিনা। আমি থামতেই কোত্থেকে একটা ফাইল নিয়ে আসেন অফিসার। আঁতিপাঁতি করে খুঁজে পোস্টকার্ড সাইজের একটা ছবি তুলে দেখাল আমাকে। জিজ্ঞেস করল, ” দেখুন তো, এই মেয়েটা কি না”।
অবাক হলাম। তাই তো। এই মেয়েটাই তো নিয়ে গিয়েছিল আমায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মায়াবী চেহারা। সোনালি চুল দুই পাশে ছড়ানো। হাতে একটা পুতুল। আদর করে জড়িয়ে রেখেছে। অবিকল সেই একরকম।
কাতলা মাছের মতো হাঁ হয়ে গেল আমার মুখ। চিৎকার করে বললাম, ” অফিসার, এই মেয়েটাই। হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই। আমাকে এ….ই…..”
ট্রাফিক পুলিশের মতো একটা হাত তুলে আমায় থামিয়ে দিলেন অফিসার। বিরক্ত হয়ে আমায় দেখতে লাগলেন। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ” আপনি জানেন কি বলছেন আপনি? অ্যাঁ? তিন বছর আগে মারা গেছে এই মেয়ে। আমি নিজে তার লাশ দেখেছি। ”
হাঁ করে চেয়ে রইলাম। কি বলব? চিন্তাভাবনা সব জট পাকিয়ে গেছে।
আমার অবস্থা দেখে কি বুঝলেন অফিসার কে জানে? আরও এক কাপ কালো তেতো কফি বানালেন। তারপর শোনালেন তাঁর কাহিনী…… ঐ বাড়িটায় এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা থাকতেন। বউ আর ছোট্ট একটা মেয়েকে নিয়ে। ভদ্রলোকের কি সমস্যা ছিল কে জানে! তবে খুব স্যাডিস্ট ছিলেন। বউকে মারধোর করতেন। যখন তখন। মেয়েটাও রেহাই পেত না।
এটা একটা রুটিন হয়ে গিয়েছিল। এত অত্যাচার সহ্য করেও বউ কখনো পুলিশের কাছে জানায়নি বা আইনি কোনও সহায়তা নেয়নি। কেন? আজ আর সেসব জানার উপায় নেই। হতে পারে মহিলা সত্যিই ভালবাসতেন ভদ্রলোককে। তবে দ্বিতীয় যে ধারনাটা সবাই করে তা হচ্ছে ওই মহিলা ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের কোনও একটা দেশের নাগরিক। গ্রীনকার্ড পাবার জন্য ভদ্রলোককে বিয়ে করেছিলেন। তখনো পর্যন্ত গ্রীনকার্ড দেননি তাঁকে ভদ্রলোক।
সম্ভবত এই জন্যই পালিয়েও যেতে পারতেন না ভদ্রমহিলা। করুণ ব্যাপার হচ্ছে মা-কে যখন মারধর করা হত, তখন বাচ্চা মেয়েটা দৌড়ে চলে যেত দূরের প্রতিবেশীদের বাড়িতে। সাহায্য চাইতে। প্রতিবেশীগুলো ছিল দূর্বল প্রকৃতির। মানে সবাই বাংলাদেশি বা ভারতীয়। একেবারে ভীতুর ডিম। পাছে কোনও ঝামেলায় পড়ে তাই মেয়েটাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যেত না কেউ।
মেয়েটা কাঁদত আর সবার কাছে সাহায্য ভিক্ষে করত। এবং এইভাবে এক সন্ধেয় যখন বাপ বেল্ট দিয়ে মা’কে পিটাচ্ছিল, তখন দৌড়ে সাহায্য চাইতে মেয়েটা বাইরে চলে যায় এবং রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। এক মাতাল বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছিল গাড়ি।
পুলিশ আসে। প্রতিবেশী দু’একজন বাড়িটা দেখিয়ে দেয়। গিয়ে দেখে সব শেষ। ভদ্রলোক তার বউকে মেরে নিজের মুখে পিস্তল ঢুকিয়ে ট্রিগার টিপে দিয়েছেন। ব্যস, দি এন্ড। সব শেষ। সেই থেকে বাড়িটা পরিত্যক্ত। সরকারী সম্পত্তি এখন। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে বিক্রি করার। আমেরিকার হাজারো ফ্যামিলি ভায়োলেন্সের একটা কাহিনী মাত্র।
তবে অচেনা কোনও পথিক ওই পথ দিয়ে গেলে এখনো একটা বাচ্চা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে গিয়ে সাহায্য চায়……।
অফিসার তাঁর কাহিনী শেষ করলেন।
ঘন্টা দুয়েক পর পুলিশ স্টেশন থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে দারুণ শীত। হেঁটে হেঁটে আবার সেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। এখন আর ভয় লাগছে না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে মনে বললাম, ‘ খুকি, সে রাতে আমার সাথে তোমার দেখা হলে হয়তো আজ তুমি আর তোমার মা দুজনেই বেঁচে থাকতে। মরত তোমার বাপ’।
–কাহিনীকার ভদ্রলোক আরও কয়েকটা মিক্স খেয়ে বিদায় নিলেন। শেষের দিকে বেশ মাতাল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। মাতাল কাহিনীকার বিদায় নিতেই সাগরেদ জানতে চাইল, ” কেমন লাগল মামা?”
” ভালই”! মেক্সিকান মদের বোতলের ‘ কালোয়ার’ ছিপি খুলতে খুলতে বললাম। তবে এই টাইপের অনেক কাহিনী আমি শুনেছি। এটা বিশেষ কিছু না।
এরপর সাগরেদকে এরকম একই ধরনের দু একটা কাহিনী শোনালাম। দেখলাম ওর চোখ দুটো খোসা ছাড়ানো সেদ্ধ ডিমের মতো বড় বড় হয়ে উঠছে ভয়ে। ভয় হল এরপর ছেলেটা হার্টফেল না করে বসে। তাহলে মহা মুশকিল হয়ে যাবে।
সাগরেদকে বললাম রাতের খাবার আমার এখানে খেয়ে যেতে। রাজি হলো। বারান্দায় গেল হাত মুখ ধোয়ার জন্য। তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো ছিটকে চলে এল সঙ্গে সঙ্গে।
অবাক হলাম। ” কি হলো?”
দেখলাম ভয়ে ওর মুখটা হোয়াইটপ্রিন্ট কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। ফিসফিস করে বলল, ” মামা, বাইরে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা পুতুল না ‘ কুত্তা’ কি যেন’।
বুঝলাম, একটু আগে অতিথি ভদ্রলোকের মুখ থেকে শোনা কাহিনীটা ওকে বেজায় ভয় পাইয়ে দিয়েছে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললাম, ” আরে গাধা, ওটা আমাদের প্রতিবেশীর মেয়ে। অশরীরী কোনও কিছু না। ”

পরের সপ্তাহ। নতুন আরেকজন কাহিনীকার ধরে নিয়ে এসেছে সাগরেদ। এ লোকটা মধ্য বয়স্ক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। আজকাল এ ধরনের ফ্রেম চলে না। ছোটবেলায় স্কুলের দুই একজন বদরাগী স্যারদের দেখতাম এমন চশমা পরতে।
কাপড়চোপড়েও বেশ ফুলবাবু ভদ্রলোক। সিডনি শহরে বাঙালি শীতের পোশাক বলতেই স্যুট, টাই অথবা লেদার জ্যাকেট মনে করে। সবাই তাই পরে।
তা, এই ভদ্রলোক বেশ মার্জিত। তিনি নাকি বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন একজন কৃষিবিদ হিসেবে, মাইগ্রেশন নিয়ে। এখন তিনি বলছেন তাঁর কাহিনী –
আমার ভাই কি যেন দেখে ভয় পেত। ভীষণ ভয়। রাজুর ( ভদ্রলোকের ভাইয়ের নাম) বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। মানে প্রথম যখন ভয় পায় সে।
তবে বলতে কি আমাদের বাড়ির পরিবেশ ছিল ভয় পাবার মতোই। বিশাল বাড়ি। একসময় নাকি জমিদারবাড়ি ছিল। দেশ ভাগের সময় এর মালিক সবাইকে নিয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছিল। গরীব কয়েকজন আত্মীয় স্বজন থাকত বাড়িটায়।
তো তাদের উৎখাত করেই বাড়িটা দখল করেছিল আমাদের পূর্বপুরুষরা। এমন কথাও শুনেছি, তাদের সবাইকে হত্যা করে রাতের অন্ধকারে পিছনের কুয়োতে ফেলে দিয়েছিল তারা। অসম্ভব কিছু নয়। হতেও পারে। কারণ আমার বাপ চাচা, এঁদের দেখেছি আমি। মানুষ হিসেবে তাঁরা ছিলেন খুব নিষ্ঠুর। এক কথায় অমানুষ। তাঁদের অত্যাচারের নানান নমুনা পড়লে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় আজও।
বাড়িটা ছিল সত্যিই বিশাল। অন্দরমহল, কাছারিঘর, মজলিসের ঘর, কি নেই! কড়ির মতো সাদা রঙের রাজপ্রাসাদ। আশেপাশে প্রচুর গাছপালা। বিশাল বাগান। গাছপালাতে ঠাসা সবুজ একটা বন যেন। গাব, নারকেল, করমচা, সুপারি, তাল কি নেই। প্রচুর বাসক পাতা হয়ে থাকত। নীলরঙের ভীমরাজ পাখির ঝাঁক দলবেঁধে কোলাহল করত সবসময়।
মোট এক একর জায়গা জুড়ে ছিল আমাদের সেই বাড়ি আর বাগান। তুলনায় মানুষজন কমই ছিল বাড়িতে। আমি, ভাই রাজু, আব্বু আর আম্মু, চাচা – চাচী আমাদের পরিবারে। চাচাদের একমাত্র ছেলে তখন শহরে। পড়াশোনা করতেই বোধহয়! নাকি ব্যবসা দেখতে আজ আর মনে পড়ে না।
দিনের বেলা বাড়িটা কামলা শ্রেণীর লোকজনে গমগম করলেও রাতের বেলা একেবারে নিঝুম হয়ে যেত। দু’চারজন পাহারাদার থাকত বটে, রাত জেগে বাড়ি পাহারা দিত বল্লম, সড়কি নিয়ে তবু সত্যি কথা বলতে কি রাতের বেলা একটু ভয় ভয়ই লাগত। বিশাল বাড়ি। কত অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসত রাতের বেলা। হঠাৎ করে দমকা হাওয়া বয়ে যেত কোত্থেকে যেন। খটখট করে নড়ে উঠত বাড়ির কোনও জানলার পাল্লা। যে কোনও বিশাল বাড়িতে অল্প কিছু মানুষ থাকলেই আপনি অন্য রকম কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন; যেগুলো শহরের ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটে কখনওই পাবেন না।
তবে যে জিনিসটা আমি ভয় পেতাম তা হল অনেক গভীর রাতে আমি অদ্ভুত এক শব্দ পেতাম মাঝেমাঝে। মনে হত বাড়ির পেছনের কুয়োর ভেতর থেকে শব্দগুলো ভেসে আসছে। ঝুপ করে কেউ যেন নামল কুয়োর ভেতরে। বা রাতের বেলা কুয়োর ভেতর থেকে কিছু যেন একটা উঠে আসছে। প্রথম প্রথম মনের ভুল ভেবে পাত্তা দিতাম না কিন্তু পরে বুঝেছিলাম ‘ মনের ভুল ‘ ভাবাটাই কত বড় ভুল ছিল আমার। কাহিনীকার ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ” গভীর রাতে শোনা সেইসব অদ্ভুত শব্দগুলো পাত্তা না দেয়ার কারণ হচ্ছে, ঐ শব্দগুলো প্রায়ই রাতে শুনতে পেতাম। মনে হত কারা যেন নূপুর পায়ে বাড়ির পেছনের বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে। খুব ভয় পেতাম তখন। পরে আমাদের কামলা আসগরের কাছে শুনেছিলাম, ওগুলো নাকি সজারু। সজারুর গা ভর্তি কাঁটা। হাঁটলেই ঝুমঝুম করে বাজে।
কামলা আসগর দারুণ কায়দা করে সজারু ধরত। কলা গাছের নরম কান্ড নিয়ে বসে থাকত গাছের ওপর। নীচ দিয়ে সজারু হেঁটে যাবার সময় ঝুপ করে ফেলে দিত কলাগাছের একটা নরম কান্ড। সজারুর কাঁটাগুলো গেঁথে যেত এর সাথে। দৌড়ে পালাতে পারত না। তারপর ধরতে আর কতক্ষণ? অনেকবার খেয়েছি সজারুর ঝাল মাংস।
আমাদের বাড়ির রান্নাঘরের দায়িত্বে ছিল জুলেখার মা। বুড়ি মানুষ। তার মুখে শুনতাম ভূত – প্রেত – পিশাচ নিয়ে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব গল্প। ভয়ে হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যেত। কতবার তাঁকে অনুরোধ করতাম, ” খালা, এ রকম গল্প আর বোলো না”।
বুড়ি তখন অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলত, ” ক্যানরে বাপ, ডর করে? আইচ্চা আর কমু না”। তারপরেই কি যেন মনে পড়েছে এমন এক ভঙ্গি করে শুরু করত আরেকটা নতুন গল্প। কি সব গল্প! আতঙ্কে নীল হয়ে যেতাম। আমার তখন আট বছর বয়েস। ভাবুন দেখি আমার অবস্থা। আমাকে একা পেলেই বুড়ি শুরু করত এইসব গল্প। ভয়ে তার কাছেই ঘেঁষতে চাইতাম না আমি। এইভাবে চলছিল আমাদের জীবনযাপন।
এরই মধ্যে ছোটভাই রাজু একদিন ভয় পেল।
সেটা ছিল শীতের এক রাত। হয়তো রাত আটটা বাজে। গ্রাম তো, মনে হয় যেন অনেক রাত। আমাদের খাওয়াদাওয়া মাত্র শেষ হয়েছে। চাচা দাওয়ায় বসে হুঁকো টানছেন। ফরাসী হুঁকো। পিতলের তৈরি। হাতে খাবনামা টাইপের বই। রান্নাঘরে ব্যস্ত জুলেখার মা আর একজন কাজের মেয়ে।
সম্ভবত জোনাকি পোকার লোভে রাজু রান্নাঘরের পেছনে ঘুরঘুর করছিল। ওর একটা শখ ছিল জোনাকি পোকা ধরে স্বচ্ছ কাঁচের বয়মে ভরে অন্ধকার ঘরে বসে থাকা। রাত নয়টার মধ্যে আমরা সবাই ঘুমোতে চলে যাই।
পুরো বাড়ি নিঝুম। কাজের মেয়েটার বাসন মাজার শব্দও বেশ জোরে শোনা যাচ্ছিল। বাইরে শীতের মিষ্টি হাওয়া। টুপটাপ শিশির পড়ার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি ছিলাম আম্মুর সাথে। পড়া নিচ্ছিল আম্মু। ঠিক এমন সময় আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল রাজু। ভয়ার্ত সেই চিৎকার।
দৌড়ে ছুটে গেলাম সবাই। রান্নাঘরের পেছনে কতগুলো ভুঁইচাপা আর হেতাল ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে একটানা চিৎকার করে চলেছে রাজু। চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেছে। মুখ টকটকে লাল। আঙুল তুলে দূরে কি যেন দেখাচ্ছে আমাদের। যদিও কিছুই নেই সামনে।
সবাই ধরাধরি করে বাড়ির ভেতর নিয়ে এলাম রাজুকে। ওর মুখ দিয়ে ফেনা গড়িয়ে পড়ছিল তখন। দৌড়ে পাহারাদার দুজন পর্যন্ত এসে গেছে। চাচা গিয়ে ওদের দুজনের ‘ কোকসা’তে লাথি মেরে ভর্ৎসনা করে বললেন , “…..” মারানীর পোলারা, বাড়ির ভেতর চোর ঢুকেছে, কি করছ তরা?”
চারদিক তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। চিল্লাচিল্লি শুনে আরও অনেকেই চলে এসেছিল। কমপক্ষে পনেরোষোলো জন মানুষ লাঠি, বল্লম আর হাতে হ্যারিকেন নিয়ে ভাল করে খুঁজে দেখল। কিছু পাওয়া গেল না।
তবে আমার মনে হয়েছিল রাজুর প্রথম চিৎকারের পর আমি কুয়োর মধ্যে ঝুপ করে একটা শব্দ শুনেছি। শীতকালে কুয়োর পানি অনেক নিচে নেমে যেত। কাছেই ছিল মেঘনা নদী। শুনতাম কুয়োর নিচের সুড়ঙ্গ গিয়ে মিশেছে নদীতে।
টানা এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগল রাজু। জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকত। একটা শব্দ বারবার শুনতাম আমরা, ” রাক্ষস “।
পীরগঞ্জে আমাদের পরিচিত এক হুজুর ছিলেন। বড় বুজুর্গ লোক। তাঁর ফুঁ দেয়া পানি খেতে নাকি হাউযে কওসরের মতো। একদিন তাঁকে নিয়ে আসা হল বাড়িতে। তিনি অনেকরকম দোয়াদরুদ পড়ে নানান টোটকা দিয়ে গেলেন। বাড়ির চারপাশে কতগুলো তাবিজও পুঁতে দিলেন। এতকিছুর জন্যই বোধহয় সুস্থ হয়ে উঠল রাজু।
সুস্থ হবার পর একদম বদলে গেল সে। একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। কোথায় গেল আগের সেই দুরন্তপনা! বাগানেই যেত না সে। আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেত পিছনের সেই কুয়োটাকে। যমের মতো ভয় পেত। সুস্থ হবার পর অনেকদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আসলে কি দেখে অত ভয় পেয়েছিল সে? কখনোই বলেনি। তবে এই প্রসঙ্গ উঠলেই অচেনা এক আতঙ্ক ফুটে উঠত ওর সুন্দর মায়াবী দুই চোখে।
হয়তো বয়স কম থাকায় আমিও বুঝতে পারিনি ওর অনুভূতিগুলো। একদিন ওকে তেঁতুল বিচি দেয়ার লোভ দেখিয়ে আবারও একই ব্যাপারে জানতে চাইলাম। জানতাম এতে কাজ হতে পারে, কারণ তেঁতুলের বিচির প্রতি ওর দারুণ লোভ। ওগুলো নিয়ে খেলতে ভালবাসত ভাইটা আমার।
মুঠোভর্তি বিচিগুলো নিল সে। চোখে মুখে ফুটে উঠল চাঁদের আলোর মতো হাসি। এবার জানতে চাইলে ফিসফিস করে বলল, ” রাক্ষস “।
” রাক্ষস! ” অবাক হলাম, ” কেমন দেখতে রে?”
” ছোটখাটো মানুষের মতো “, বিচিগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে বলল রাজু , ” ইয়া বড় মুখ। দাঁতগুলো ঢ্যাঁড়শের মতো বড় বড়। আর….আর সারা শরীরে মাছের মতো আঁশ”।
বলতে বলতে ভয় ফুটে উঠল ওর চোখে। বিড়বিড় করে বলল, ” ভাইয়া, আমার ভীষণ ভয় করে”।
” দূর পাগল!” অভয় দিয়ে বললাম, ” আমি আছি না!”
চুপচাপ দিন কেটে যেতে লাগল। আগের মতোই। রাজুর রাক্ষস দেখার গল্প আমরা সবাই জানতাম। সবাই ধারণা করেছিল, রূপকথার গল্প পড়ে পড়ে এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছে ও। ছোটরা কত কিছুই না চিন্তা করে। সেগুলোর কি কোনও ছাতামাথা আছে? অথবা জোছনার আলোয় কলাগাছের ছায়া দেখেও ভয় পেয়ে থাকতে পারে। না জানলে রাতের বেলা শুধুমাত্র বাদুড়ের ডাক শুনেও আপনি ভয় পেতে পারেন।
রাজু দ্বিতীয়বার যখন ভয় পেল এবার সবাই নড়েচড়ে বসলাম। আবার রাক্ষস দেখেছে ও। কুয়োর ভেতর থেকে শুধু একটা মাথা বের করে নাকি বাড়ির দিকে তাকিয়েছিল সেটা। রাজুর সাথে চোখাচোখি হতেই ঢেঁড়সের মতো বড় বড় দাঁত বের করে হাসছিল রাক্ষসটা। রাজু চিৎকার করে উঠতেই সেটা ঝুপ করে নেমে গেছে কুয়োর ভেতর। তখন ছিল সন্ধেবেলা।
আবার লোকজনে ভরে গেল বাড়ি। নানান জনে নানান কথা বলছে। সম্ভব এবং অসম্ভব দুটোই।
কেউ বলছে খারাপ কোনও জ্বিনের নজর পড়েছে আমাদের বাড়ির ওপর। কেউ বা বলছে কে বা কারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। কেউ তো সাফ সাফ বলেই ফেলল, আমাদের পূর্বপুরুষরা এই বাড়ির বাসিন্দাদের হত্যা করে পেছনের কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল, তাদের একজন নাকি বলেছিল মরার পর ফিরে আসবে, প্রতিশোধ নিতে। কিছুতেই আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না। সে-ই ফিরে এসেছে এখন।
এরকম কত কিছু যে শুনলাম!
আবার হুজুর এলেন। দুটো মুরগি সদকা দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। আবার কতগুলো তাবিজ বানিয়ে বাড়ির এখানে সেখানে পুঁতে রাখলেন, বড় বড় দু একটা গাছেও ঝুলিয়ে দিলেন। রাজুর গলাতেও বড় একটা তাবিজ ঝুলিয়ে দেওয়া হল।
আমি মাঝেমাঝে যেতাম কুয়োর পাড়ে। বড় বড় লাল পোঁড়া ইঁট দিয়ে বাঁধানো কুয়োটা। উঁকি দিয়ে দেখতাম। নীচে গভীর কালো পানি। এর পানি আমরা খেতাম না। তবে কাপড় ধোয়া, বাসন মাজার কাজে ব্যবহার করা হত।
আবার দিন যেতে লাগল। রাজু ছাড়া বাড়ির আর কেউ কিন্তু কখনো বিচিত্র কোনও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি। ধীরেধীরে তাই আবার পাতলা হয়ে গেল সবকিছু। তবে ভীতুর ডিম হিসেবে রাজুর নাম সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।
কুয়োর ধারে দিনের বেলাতেও যেত না রাজু। সন্ধ্যার পর তো প্রশ্নই ওঠে না। শুধু ঘরের ভেতর মোটা গরাদের জানলার পাশে বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা কুয়োর দিকে তাকিয়ে থাকত।
আমাদের আব্বু বেশ বিরক্ত হলেন ব্যাপারটায়। একদিন রেগেমেগে রাজুকে জিজ্ঞেস করলেন, ” বল দেখি, কি দেখিস তুই সারাক্ষণ, ওদিকে তাকিয়ে?”
রাজু কিছু না বলে মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেতে দাগ কাটতে লাগল। এরপর আব্বু যা করলেন তা সত্যিই অমানবিক। রাজুকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন কুয়োর পাড়ে। রাজু ভয়ে কাঁদতে লাগল। কিন্তু আব্বু ছাড়বেন না। মাথায় জেদ চেপে গেছে তাঁর। কুয়োর পাড়ে বড় একটা করমচা গাছের সাথে রাজুকে বেঁধে রেখে এলেন। বললেন, ” ঘন্টা তিনেক থাকবি তুই। দেখবি ভয় দূর হয়ে গেছে। ঠিক আছে!”
আব্বুর কাজে বাধা দেয় এমন কেউ ছিল না আমাদের পরিবারে। এমনকি মা কিংবা চাচাও নয়। সবাই ঘরে এসে বসে রইলাম। রাজু একা রইল কুয়োটার পাশে। প্রথম কয়েক মিনিট বেশ কাঁদল। তারপর চুপ মেরে গেল।
কি অমানুষিক! ছোট্ট একটা বাচ্চা যে কিছু একটা ভয় পায়, কিছু একটা দেখে, তাকে রাখা হল সেই ভয়ের উৎপত্তিস্থানেই। সেটা ছিল আষাঢ় মাস। হঠাৎ করেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। প্রচণ্ড বৃষ্টি। সাথে শয়তানের হাসির মতো ঘনঘন বজ্রপাত।
হঠাৎ এই বৃষ্টির জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল কি কি নিয়ে যেন। ফালতু সব কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। হ্যারিকেন জ্বালাও….উত্তরের ঘরের জানলা বন্ধ কর….হ্যান করো…ত্যান করো…। এত গোলমালের মধ্যে সবাই ভুলে গেল রাজুর কথা। আম্মু বাদে।
বারবার তিনি যেতে চাইছিলেন কুয়োর পাড়ে, যেখানে অন্ধকারে একা রয়েছে তাঁর নাড়ি ছেঁড়া ধন। একসময় আব্বু একটু চোখের আড়াল হতেই ছুটে গেলেন তিনি সেখানে।
একটু পর সবাই আম্মুর রক্তহিম করা চিৎকার শুনতে পেল।
সবাই গিয়ে হাজির হলাম কুয়োর পাশে। যদিও বৃষ্টি পড়ছিল তখন। তবে বাজপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এত হ্যারিকেন আর হ্যাজাক জ্বালা হয়েছে যে প্রায় দিনের আলোর মতো লাগছিল জায়গাটা।
গিয়ে দেখি, রাজু বসে আছে করমচা গাছের তলায়। দুটো চোখ বড় বড়। তখনো চোখদুটোতে আতঙ্কের ছায়া। শরীরের অর্ধেক মাংস কিসে যেন খুবলে খেয়ে গেছে। মারা গেছে কখন।
পরের ঘটনা আর ফেনিয়ে বলার মতো কারণ দেখি না। ঘটনা এর বেশী আর কিছু নেই’ও। আম্মু অনেকদিন পর্যন্ত প্রায় পাগলপারা হয়ে ছিলেন। এই ঘটনার জন্য সবাই আব্বুকে দোষারোপ করত। আর আব্বুও কেমন যেন বেকুব কিসিমের হয়ে গিয়েছিলেন তার পর থেকে।
মাসখানেক পর বাড়ির এক কাজের ঝি কুয়োর পাড়ে ‘ রাক্ষস ‘ দেখতে পায়। যা দেখতে ছোটখাটো একটা মানুষের মতো। বড় মাথা, ঢেঁড়সের মতো বড় বড় দাঁত, সারা শরীর মাছের মতো আঁশে ভর্তি। হুবহু রাজুর দেখা অপার্থিব জিনিসটার মতো। ভয়ে ঝি – টা এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগে মারা যায়।
বাধ্য হয়ে চাচা তখন কুয়োর ওপরটা মোটা টিন দিয়ে বন্ধ করে দেন। পরপর দুটো অপমৃত্যু হবার পর ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয় আমাদের বাড়িটা। শহরে চলে আসি এরপর আমরা। দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকে বাড়িটা। ঝোপজঙ্গল বেড়ে প্রায় থাকার অযোগ্য হয়ে যায় বাড়িটা।
শেষে কয়েকজন গরিব কামলা আবার থাকতে শুরু করে বাড়িটায়। ওরা খুবই গরীব, বর্ষাকালে ওদের ঘরদোর বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে ওরাই থাকা শুরু করে আবার, প্রাণের মায়া না করেই।
তো ওদের অনেকেই রাতের বেলা শব্দ শুনতে পেত। কুয়োর মোটা টিনের ঢাকনাটা ভেতর থেকে কে যেন খোলার চেষ্টা করত। সবাই শুনেছে সেই শব্দ। অনেকগুলো বছর পর নদী ভাঙনের ফলে নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং কুয়োর সাথে সংযুক্ত সুড়ঙ্গটাও বন্ধ হয়ে যায় কোনওভাবে। তখন থেকে আর শোনা যেত না সেই ভীতিকর শব্দটা।
এখন কেউ জানে না সেইসব কথাগুলো। গ্রামের লোকজনও প্রায় ভুলে গেছে। আমি মনে রেখেছি শুধু। আমার ধারণা সত্যিই কিছু একটা ছিল কুয়োর মধ্যে। নদী থেকে আসত সেটা। সম্ভবত।”
ভদ্রলোক তাঁর কাহিনী শেষ করে আমাদের মনটা বিষাদে পূর্ণ করে রেখে বিদায় নিলেন।
চুপচাপ বসে রইলাম আমি আর আমার সাগরেদ। বাইরে প্রচণ্ড শীত। দমকা হাওয়া এসে আমার ঘরের জানলার শার্শিগুলো ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝে। কামরায় ফায়ারপ্লেসের জায়গায় ইলেকট্রিক হিটার বসিয়েছি কায়দা করে। আরামদায়ক গরম বাতাস বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে ড্রাগনের নিশ্বাসের মতো।
” তোমার কি মনে হয়, ভদ্রলোকের কাহিনীটা শুনে?” জানতে চাইলাম সাগরেদের কাছে।
বড় এক টুকরো মাডকেকে কামড় বসিয়ে সাগরেদ বলল, ” হতে পারে, মামা। কত আজব জিনিসই তো আছে। কেন ‘সেক্স প্রিয়’ (!) বলেছেন না, স্বর্গে আর পৃথিবীতে অনেক কিছুই আছে……”
সাগরেদের কথায় ভিরমি খাওয়ার দশা হল আমার। ও শেক্সপীয়রকে ‘ সেক্স প্রিয়’ বলছে, ওকে সংশোধন করতে গেলাম ; কিন্তু সে সুযোগ পেলাম কই! মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে বলে যেতে লাগল, ” তখনকার দিনে গ্রামে বাঘডাঁশ দেখা যেত প্রচুর। যেগুলোকে বনবিড়ালও বলা হত। এরা নদী থেকে মাছ ধরে খেত। গৃহস্থের মুরগি, ছাগল এমনকি ছোট ছোট বাচ্চাদেরও খেয়ে ফেলত”।
” তোমার ধারনা, ঐ কুয়োর ভেতরও ওরকম কিছু একটা ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ঝটপট নতুন ব্যাখ্যা দিল আমার সুযোগ্য সাগরেদ। সমান তালে কেক গিলে যাচ্ছে আর বলছে, ” ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু না। আগেকার দিনের লোকের মুখে এ রকম কিংবদন্তির কিছু পিশাচের কথা অহরহ শোনা যেত। এইসব পিশাচ নদীতে থাকত। নদী থেকে উঠে এসে গৃহস্থের বাচ্চাদের ধরে খেত।”
” সত্যি তাই”, আমি এবার বললাম, ” চমৎকার কিছু ভয়াল চরিত্র আগেকার দিনের গ্রামেগঞ্জের লোকের মুখে মুখে ফিরত। আজকাল সেগুলো আর শোনা যায় না। কারণ গ্রাম আর গ্রাম নেই আগের মতো। এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও টিভি, মোবাইল ফোন চলে এসেছে। আর সেই সাথে হারিয়ে গেছে ভয়াল চরিত্রগুলো।”
” আপনার কি মনে হয় মামা, সত্যিই কিছু ছিল কুয়োটার ভেতর? ”
” বলা মুশকিল “, আমি বললাম, ” হয়তো সত্যিই কিছু একটা ছিল সেখানে , কেউ কিছু দেখেছিল। হয়তো ডালপালা ছড়িয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে গেছে কিন্তু কিছু একটা নিশ্চয়ই ছিল।”
” তোমার নিজের কিছু হরর ঘটনা জানা আছে মামা?” জিজ্ঞেস করল সাগরেদ।
” আছে”, আমি বললাম, ” আমার মা’র স্টকে অনেক এরকম হরর স্টোরির স্টক আছে। আমার মায়ের শৈশবটা কেটেছে তাঁর ঠাকুরমার কাছে। একা। কারণ মাত্র আট বছর বয়সে বাপ মা’কে হারিয়েছিলেন আমার মা। ঘন বর্ষার এক সন্ধ্যায় চা আর ভাজাভুজি খেতে খেতে এইসব কাহিনী শুনতাম আমরা আর রোমাঞ্চিত হতাম। মা’র গল্প বলার বিশেষত্ব হচ্ছে, কোনও হরর স্টোরি বলার পর মা সেগুলোর চমৎকার লৌকিক ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। একটা ঘটনা এরকম –
অজ পাড়া গ্রামে এক মহিলা বাস করতেন বিশাল একটা বাড়িতে। শুধু ছোট ছোট দুটো বাচ্চা নিয়ে। স্বামী শহরে কি একটা চাকরী করতেন। সপ্তাহে একদিন বাড়ি ফিরতেন।
বাড়িটা ছিল বড় এবং নিঝুম। প্রতিবেশীরা ছিল বেশ দূরে। গাছপালায় ঠাসা বাড়ির সামনে বেশ বড় একটা বিল ছিল।
বিলটার অদ্ভুত ব্যাপার – প্রচণ্ড গরমের সময়তেও বিলটার পানি শুকাত না এক ইঞ্চিও। আবার বর্ষাকালে টানা বৃষ্টির পরও পানি বাড়ত না একটুও। সবসময় শান্ত, কালো পানি আয়নার মতো ঝকঝক করত। আর পানিও ছিল বরফের মতো ঠাণ্ডা যাকে বলে।
এক রাতে মহিলা ঘুমোচ্ছিলেন বাচ্চাদুটোকে নিয়ে। গ্রামের রাত তো, বলা মুশকিল তখন ঠিক কয়টা বাজে। হঠাৎ নিঝুম রাতে ঘুম ভেঙে গেল মহিলার। পরিষ্কার শুনলেন – বাইরে দরজার কড়া নেড়ে তাঁর স্বামী ডাকছেন তাঁকে। আনন্দের আতিশয্যে বিছানা ছেড়ে নামলেন তিনি। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললেন এবং বেকুব হয়ে গেলেন। বাইরে ধবধবে জ্যোৎস্না, কেউ কোথাও নেই। একেবারে খাঁ খাঁ করছে উঠোন। ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। মনে পড়ল, গুরুজনেরা তাঁকে বলেছে – গহীনরাতে এক ডাকে কখনো দরজা খুলতে নেই। খারাপ জিনিসরা রাতের বেলা পরিচিতদের গলার স্বর নকল করে ডাকে। কথাটা মনে পড়তেই ভয়ে আতঙ্কে মহিলাটির সর্ব শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঝটাপট বন্ধ করতে গেলেন দরজা, সেইসময় অনুভব করলেন, এক ঝলক দমকা বাতাস যেন ঢুকে পড়ল তাঁর ঘরের ভেতর। দপ করে নিভে গেল হ্যারিকেনটা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে গেল ঘর। আর আশ্চর্য শীতল এক অনুভূতি। বাইরে কি যেন একটা নড়াচড়া করছে।
কাঁপা হাতে বালিশের তলা থেকে দেশলাই বের করে হ্যারিকেন জ্বাললেন মহিলা। এবার চিল চিৎকার করে উঠলেন। বিছানার উপরেই ঘুমিয়ে ছিল তাঁর বাচ্চাদুটো। এখন নেই। বিছানা শূন্য। আর ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদুটোর কান্না।
পাগলের মত দৌড়ে দরজা খুললেন তিনি। দৌড়ে চলে এলেন বাইরে।
পরদিন খুব ভোরে গ্রামবাসীরা এসে দেখল বিলের ধারে অপ্রকৃতিস্থের মত বসে আছেন মহিলা। আর বিলের কালো জলে মরে ভাসছে বাচ্চা দুটো।
তিন মাইল দূর থানা থেকে পুলিশ এল। বাচ্চাদুটোর মৃত্যু রহস্যের কোনও কিনারা হল না। মহিলাটি বাচ্চার শোকে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। অসংলগ্ন ভাবে যা বললেন তিনি, তা হচ্ছে, তিনি ঘরের বাইরে এসে দেখেন কালো ছায়ার মতো একটা কুৎসিত আকারের জীব তাঁর বাচ্চাদুটোকে বিলের পানিতে ডুবিয়ে মারছে আর খিলখিল করে হাসছে।”
কাহিনী শেষ করে সাগরেদকে বললাম, ” মা এই কাহিনীর কি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জানো? বলেছিলেন ওটা ছিল আসলে একটা হত্যাকান্ড। খুব কৌশলে কাজটা করা হয়েছিল। আদৌ তাই কিনা, আমার মনে প্রশ্ন আছে”।
” আপনার নিজের জীবনে কোনও হরর অভিজ্ঞতা নেই?” লাল রঙের শার্লি টেম্পল ভর্তি কাঁচের গ্লাসটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল সাগরেদ।
” আছে”, বললাম।
সাগরেদ : সেসব কাহিনী লিখবেন না?
আমি : নাহ।
সাগরেদ : কারণ?
আমি: খুব ছোটবেলায় আমার জীবনের প্রথম যে বইটা পড়েছিলাম, সেটা হচ্ছে ‘ রাক্ষসের মায়াপুরী’। দারুণ লেগেছিল সেটা সে বয়সে। আজ এতগুলো বছর পর যখন নিজের দেশের অবস্থা দেখি, তখন মনে হয় সত্যিকারের হরর ঘটনাগুলো সেখানেই ঘটছে। কি হচ্ছে না সেখানে? মাদ্রাসার ছোট্ট এক এতিম বাচ্চা দুপুরে খাওয়ার পর আরও একটু ভাত চেয়েছিল, সেজন্য মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে বাচ্চাটাকে।
স্বামী তার স্ত্রী ‘কে খুন করে গাড়িতে বসিয়ে পুরো শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে তিন ঘন্টা ধরে।
পাঁচ বছরের বাচ্চা কাজের মেয়ের ওপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয় শিক্ষিতা অভিজাত গৃহবধূ।
বন্ধু বন্ধুকে সামান্য কারণে খুন করে দিচ্ছে। যৌতুকের জন্য বাড়ির বউয়ের গায়ে আগুন দিয়ে দিচ্ছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। প্রেমিকাকে অবলীলায় খুন করছে প্রেমিক। কোথাও আবার প্রেমিককে সর্বস্বান্ত করে অন্যের সাথে পালিয়ে যাচ্ছে প্রেমিকা……….. এইসব দেখে মনে হয়, কি দরকার হরর গল্প লেখার? আমরাই তো এক একেকটা রাক্ষস, পিশাচ আর শয়তান। স্বদেশ এমনকি এক এক সময় মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই তো রাক্ষসের মায়াপুরী।
চুপচাপ আমার কথাগুলো শুনল সাগরেদ। ওর চেহারা কুৎসিত হয়ে গেছে। আনন্দে ওর চেহারা কুৎসিত দেখায়। দুঃখেও ওর চেহারা কুৎসিত দেখায়। এখন সম্ভবত দ্বিতীয়টার কারণে এমন লাগছে ওকে।

মতামত জানান