এখানে একটা সৈকতের নাম পাউ পাউ বীচ( paw paw beach)।কি অদ্ভুত নাম!
আদিবাসীদের ভাষায় আর অর্থ হচ্ছে-সুগন্ধি সৈকত । এরই বা মানে কি?দ্বীপের সৈকতগুলোতে শুধু নোনা পানির ঘ্রান আর সামুদ্রিক আগাছা পচা ঘ্রান ছাড়া আর কিছু পাইনি।
তাহলে ঐ সৈকতটা কেন সুগন্ধি সৈকত হবে ?
আমার সাথে আদিবাসি এক মহিলা কাজ করতো ।নাম বেকি। বেকি ছিল একাধারে ড্রাইভার এবং হোসট। অর্থাৎ ক্যাফেতে খদ্দের ঢুকলে বেকি তাদের পছন্দ মত চেয়ারে বসিয়ে হাতে মেনু তুলে দেয়।বেকি দেখতে ছিল মদের পিপের মত মোটা আর গোল।চমৎকার হাসিখুশি। তবে সমস্যা একটাই। প্রায়ই টাকা ধার চাইত। এবং কখনই টাকা ফেরত দিত না।এই দ্বীপের আদিবাসীদের এটাও একটা সাধারন আচরণ।
বেকিকে জিজ্ঞেস করলাম সত্যিই কি পাউ পাউ সৈকতে মিষ্টি কোন ঘ্রানপাওয়া যায় ?বেকি সায় দিল।বিরক্ত হয়ে বললাম- কই ,আমি তো গত বছর একবার মাছ ধরার জন্য গিয়েছিলাম বীচটাতে।
আহামরি সুন্দর না সৈকতটা। মাছ ও তেমন ধরা পরে না। তবে ঝিনুক পেয়েছিলাম প্রচুর। পরে সেগুলো লবণ আর লেবুর রস দিয়ে কাঁচাই খেয়েছিলাম। দারুন স্বাদ। কিন্তু আমরা তো শুধু ঝিনুকের ঘ্রানই পেয়েছিলাম। অন্য কোন সৌরভ পাইনি।বেকি একটা অদ্ভুত তথ্য দিল।শুধু রাতের বেলা নাকি সেই সৈকতে মিষ্টি রহস্যময় একটা ঘ্রান ভেসে আসে।ইচ্ছে করলে আমি গিয়ে দেখে আসতে পারি !
এই ধরনের ব্যাপার গুলোতে আমার আগ্রহ দারুন।খুব ছোট বেলায় চৈত্র মাসের ঝাঁ ঝাঁ রোদের মধ্যে হেঁটে গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি। ওদের টিয়া পাখী নাকি লাল রঙের মরিচ খায়- সেটা দেখতে। ঠিক করে ফেললাম সময় পেলেই কোন এক রাতে হাজির হব পাউ পাউ সৈকতে। আজকাল সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দুটো পযন্ত কাজ করি ক্যাফেতে।
কাজ শেষ করে সরাসরি যাওয়া ভাল।
জীবনের বড় একটা সময় সৈকতে বা জঙ্গলে ক্যাম্প ফায়ার করে কাটিয়েছি।ভালই লাগে।ব্যাপারটা উপভোগ্য। দ্বীপটাতে প্রায় সারে চারশো বাঙ্গালী আছে। ওদের কাউকে কখনই ক্যাম্প ফায়ারে ব্যাপারে আগ্রহী দেখিনি। কেন কে জানে।বাঙ্গালীদের মূল বিনোদন হচ্ছে ছুটির দিনে সবাই একসাথে বসে গুলতানি মারা।চাঁদা তুলে বিয়ার কিনে আসর বসানো। তাস বা জুয়ার ব্যবস্থা করা। অথবা ভর পেটে খেয়ে দাঁত খিলান করতে করতে বসে -বাবা কেন মেথর ? মার্কা সিনেমা দেখা।পরিচিত একজনকে দেখি করণ অর্জুন সিনেমাটা দেখে হাউ মাউ করে কান্না করে।নাক দিয়ে গয়েস ঘোষের ঘি এর মত শিকনি বের হয়।এটাই বাঙ্গালীদের জীবন যাপন।
দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।একই নিয়মে।কাজেই এদের চোখে আমার জীবন যাপন বেশ অস্বাভাবিক।বুঝতেই পারে না একটা বাঙ্গালী ছোকরা কেন আদিবাসীদের সাথে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়।হাতে টাকা পয়সা না থাকলে লেগুনের ভেতর থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে এনে বিক্রি করে মদের পয়সা যোগার করে। তারপর আদিবাসী বন্ধুদের সাথে সারা রাত সৈকতে বসে মদ গেলে।জঙ্গলের ভেতরে আগুন জ্বেলে রাত কাটানোর মানেই বা কি ?
এদের সব অভিযোগ শুনি।মনে মনে হাসি।চার দেয়ালে বন্দি এরা জানবে কি করে, মধ্যরাতের জঙ্গল কতটা রূপবতী!জানবে কি করে চাঁদটা সারা রাত আকাশের কত কত কোনায় ঘুরে আর তাতেইজঙ্গলের রূপ রাতের একেক প্রহরে একেক রকম হয়ে যায়।কল্পনা করুন না প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে একটা দ্বীপ।সৈকতের কাছাকাছি এক জঙ্গলেছোট্ট একটা ক্যাম্প ফায়ার।একুশ বছরের এক যুবক বসে আছে আগুনের সামনে।
আগুনের ভেতরের কাঠগুলো টুস টাস করছে একটু পর পর। খানিক দূরে মোটা কাপড়ের তাবুর ভেতরে ঘুমাচ্ছে
যুবকের সঙ্গীরা।
আকাশ ভর্তি তারা। যেন কালচে নীল রঙের চাদরের উপর এক মুঠো চিনির দানা ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ।দূরের পাহাড়টা যেন মস্ত বড় একটা তিমি মাছ।
সমুদ্র থেকে নোনা বাতাস আসছে। জঙ্গলথেকে বুনো একটা ঘ্রান কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে। কত রহস্যময় শব্দই না হচ্ছে আশেপাশে।সবই রাতের শব্দ। রাতের নিজস্ব কিছু শব্দ আছে। খোলা প্রান্তরের মাতাল হাওয়া জঙ্গলের গাছের ডালাপালায় এসে বাড়ি খেয়ে অদ্ভুত , ভৌতিকআর রহস্যময় শব্দ করছে।বাতাসে লম্বা ঘাসগুলো সর সর করে শব্দ করছে।নিশাচর পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে কখনও কখনও ।
সন্ধ্যা রাতেই আগুনে ঝলসে খাবার খেয়ে নিয়েছিল যুবক আর তার সঙ্গীরা। খাবার বলতে সমুদ্রের মাছ, বাচ্চা অক্টোপাস,সৈকত থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বাদামি খোসার ঝিনুক আর বুনো মুরগি। তেল মশলা ছাড়া ,আগুনে পুড়িয়ে শুধু লবন দিয়ে এই খাবারগুলো শুধু ক্যাম্প ফায়ারে খেতে মজা।স্বাভাবিক পরিবেশে এর কোন স্বাদ নেই।খাওয়ার পর কম্বল মুড়ি দিয়ে তাবুর ভেতরে শুয়ে পড়েছে সঙ্গীরা। যুবক একা বসে আছে আগুনেরপাশে।
ওর মন খারাপ। বাড়ির কথা মনে পরে যাচ্ছে ওর।
মায়ের কথা মনে পড়ছে বার বার।কত দিন থাকতে হবে এই দ্বীপান্তরে ?
এই যুবকটাই আমি। আমার মায়ের ভাষায়-মিলন মিলন ডাক পারি।মিলন গেল কার বাড়ি ?আয়রে মিলন ঘরে আয় ,দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।
ক্যাম্প ফায়ারের সঙ্গী হিসাবে সব সময় আদিবাসীদের পেতাম।এটা ওদের জীবনের একটা অংশ। এর আগে একজন মাত্র বাঙ্গালী আমার সাথে ক্যাম্প ফায়ারকরেছিল।
সে হচ্ছে শ্রী শ্রী লাকড়ি দাস বাবাজি। নাহ। ছেলেটা কোন যোগ গুরু বা মহাস্বামী নয়।ওর আসল নাম বিজয় কৃষ্ণ কুণ্ডু। আমার দেখা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রোগা মানুষ। আমিই ওর নাম লাকড়ি দাস রেখেছিলাম।লাকড়ি দাসের সাথে অনেক বছর যোগাযোগ নেই। ও আছে পাশের দ্বীপ তিনিয়ানে।
তবে পাউ পাউ সৈকতে যাবার জন্য সঙ্গী পেয়ে গেলাম। ও হচ্ছে আমিন।আমিনের গায়ের রঙ কালোজামের মত কালো।ছিপছিপে শরীর। ওর সাহস এর মেজাজের জন্য দ্বীপে খুব বিখ্যাত ছিল। অন্যের বিপদে সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়ত। একটা না একটা ঝামেলায় জড়িয়ে থাকতো সারা বছর।আমার ছায়াসঙ্গী এই আমিন। যদি কখনো বলি- আমিন কালকে আমি নরকে যাবো। যাবে নাকিআমার সঙ্গে ? সাথে সাথে ও চিন্তা করে বলবে – ঠিক আছে মিলন ভাই , সকাল সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে থাকবো।
শেষ বিকেলে পৌছে গেলাম পাউ পাউ সৈকতে।আজ ছুটি। আমিনের ও। যে গাড়িতে করে এসেছি সেটাও আমিনের। পাউ পাউ সৈকতটা দ্বীপের উত্তরে। জায়গাটার নাম সানরকি। বেশ বদনাম আছে এই জায়গার।সানরকির আদিবাসীগুলো তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি দাঙ্গাবাজ। বেশ কয়েকটা রক্তহিম করা খুন খারাপি হয়েছে এই এলাকায়।অথচ শেষ বিকেলের জলপাই তেলের মত আলোতে খুব সুন্দর লাগছে সানরকি গ্রামটা।
পাউ পাউ সৈকতটা আহামরি তেমন কিছু না। আগেই বলেছি। তবে খানিক দুরেই নিক্কো হোটেল। দ্বীপের সবচেয়ে বড় হোটেল।এ ছাড়া আর কোন আকর্ষণ নেই। বলতে আপত্তি নেই দ্বীপের সবগুলোসৈকতই অসম্ভব রকমের পরিষ্কার। কষ্ট করে হারাধনের মত করে খুঁজলেওবিয়ারের খালি কোন টিন বা প্ল্যাস্টিকের খালি বোতল পাওয়া যাবে না। প্রতিটা
সৈকতেই সবুজ রঙের ময়লা ফেলার বীণ আছে। ওখানেই সবাই ময়লা ফেলে।আর প্রতিদিনই পৌরসভার গাড়ি এসে ময়লা সংগ্রহ করে ডাম্পিঙে নিয়ে ফেলে দেয়।কয়েকটা ক্যারাবিয়ান পাইন গাছের নিচে আমাদের গাড়ি পার্ক করলাম। তারপর ক্যাম্প ফায়ার করার জন্য প্রস্তুত হলাম।
এখানে শুকনো কাঠের অভাব নেই। কোন মালিকানাও নেই।যার যত খুশি নিতে পারে।কিছু যোগার করলাম।
আমাদের তাবু নেই। তবে বৃষ্টি হলে গাড়ির ভেতরে বসে থাকতে পারব।আর কেন যেন মনে হচ্ছে সারারাত এখানে থাকতে হবে না। বিশেষ করে আমিন বারবার বলছিলরাত এগারটার মধ্যে ফিরে যেতে পারলেই আমরা GIG ডিস্কোতে যেতে পারব।রবিবার রাতে GIG ডিস্কোটা বেশ জমে উঠে। আমিন নাচতে ভালবাসে। যদিও ওর নাচ দেখলে অনেকেই ভয় পেয়ে যায়।দেখে মনে হয় একজন মৃগী রোগী প্রচণ্ড যন্ত্রনায় খিচুনি খাচ্ছে।
সূর্যটা ডুবে যাবার আগে আকাশটা কতবার যে রঙ বদলালো সেটা দেখার মত একটা বিষয়।নীল-ঘন নীল-বেগুনি গোলাপি-লাল-সোনালি।আর শেষ পযন্ত পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল সূর্যটা।সমুদ্রের পানি শান্ত। পানির রঙ সীসের মত।আগুন জ্বেলে নিলাম।সারাদিন প্রচণ্ড গরমের পর হঠাৎ করেই ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে।রাত যত বাড়বে সমুদ্র থেকে হানাদারের মত ছুটে আসবে আরও বেশি শীতল বাতাস।
এটা দ্বীপের নিয়ম। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। রাতের বেলা সমুদ্র থেকেস্থল ভাগে ছুটে আসে ঠাণ্ডা হাওয়া। দিনে এর উলটো।হঠাৎ অনুভব করলাম নিজের অজান্তেই আমার নাকের ফুটো কুচকে উঠছে।জোরে শ্বাস নিচ্ছে ফুসফুস। সমুদ্রের নোনা গন্ধ আর জলজ আগাছার পচা গন্ধ ছাপিয়েবুকের ভেতরে ঢুকছে চমৎকার মিষ্টি একটা ঘ্রান।
আমিনও বুঝতে পেরেছে।একটা টিন কাটার দিয়ে কৌটা খুলে সাঁরডিন মাছ বের করছিল ও। ইচ্ছে- সাঁরডিন মাছ,টমেটো আর লেটুস পাতা দিয়ে স্যা্নডউইচ বানাবে। সাথে কুল বক্সে প্রচুর বিয়ার আর কোমল পানীয় আছে। দুজনের ভালই চলবে।অবাক হয়ে দুই বন্ধু আবিস্কার করলাম- প্রতিটা গল্পের পিছনেই সত্য থাকে।রাতের বেলা সত্যিই পাউ পাউ সৈকতে দারুন একটা চনমন করা সৌরভ পাওয়া যায়।কয়েক মুহূর্তের জন্য বিবাগী হয়ে গেলাম।তারপর সামলে নিলাম।
না।ব্যাখ্যার অতীত কিছুই নেই এই পৃথিবীতে। অপ্রাকৃত কোনঘটনার মুখোমুখি হয়নি আমরা।খুব সাধারন একটা ঘটনা। এই মিষ্টি সৌরভটা আমি চিনি। এটা দ্বীপেরই ঘ্রান। আইল্যান্ডব্লসম বলে। প্রথম যেদিন এসেছি এই দ্বীপে সেই রাত থেকেই চিনি ঘ্রাণটা।প্রতিরাতেই পাওয়া যায়। হালকা ভাবে। তবে পাউ পাউ সৈকতে ঘ্রানটা একটু কড়া।এই যা।
এই দ্বীপটা কাঠ গোলাপ গাছে ভর্তি। যদিও নারকেল গাছ দ্বীপের প্রধান গাছ। পুরানো দিনের নাবিকরা এই দ্বীপগুলোকে কোকোনাট আইল্যান্ড বলতো।দ্বিতীয় হচ্ছে কাঠ গোলাপ। প্রচুর আছে। সাদা রঙের সুন্দর একটা ফুল হয়। যার মাঝখানে হলুদ ফোঁটা। তাহিতি আর হাওয়াইয়ান দ্বীপের মেয়েরা ফুলের মালা গলায় দেয় উৎসবের সময়। পাগল করা একটা ঘ্রান আছে ফুলটাতে। এরই ঘ্রান মাতিয়ে রাখে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলো।পাউ পাউ সৈকতে এই গাছের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অনেক অনেক বেশি। হতে পারে অতীতে এই জন্যই আদিবাসীরা এই নামকরণ করেছে।অন্য কিছু না।
মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে একটাই ঋতু । সারাবছরই বসন্ত।
তবে তুলনামূলক ভাবে জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পযন্ত বৃষ্টিটা একটু বেশি হয়। কাজেইএই সময়টা ওরা বর্ষা ঋতু হিসাবে ধরে।
আর আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পযন্ত সমুদ্র উত্তাল থাকে।এই সময়টাতেই টাইফুন এসে আঘাত করে দ্বীপগুলোতে।
অনেকবার বড় বড় টাইফুনের মুখোমুখি হয়েছি। ভয়াল সেই সব ঝড়। পিচ্চি এই দ্বীপটাযে কোন সময় ডুবে যেতে পারতো অতল সাগরে।ঠিক এক টুকরো পাথরের মত।যায়নি। সেটা আমাদের পূর্বপুরুষদের দোয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
বাদলার মৌসুমটা ভাল লাগতো আমার। বৃষ্টিটা নেমে পড়ত হঠাৎ করেই।কোন আগাম নোটিশ ছাড়াই। এবং কোন সম্ভাবনার সুত্র প্রযোগ করেও বোঝা যেত না কখন বৃষ্টি থামবে। দশ মিনিট পরও থামতে পারে আবার টানা পাঁচ দিন পরও থামতে পারে।দ্বীপে এসেছিলাম আগস্ট মাসের শেষে। এসেই পেয়েছিলাম একঘেয়ে বৃষ্টির দিনরাত্রি।সান্তালোরিস নামে এক নিঝুম গ্রামে থাকতাম। গ্রামটা উঁচু পাহাড়ের উপর। চারিদিকে জঙ্গল। নিঃসঙ্গ একটা কাঠের বাড়িতে থাকতাম। আমি এবং আমরা। সবচেয়ে কাছের দোকানটা ছিল এক মাইল দূরে।
এমনও হয়েছে বৃষ্টির দিনে রান্না করতে গিয়ে দেখি লবণ বা তেল নেই।বা্ধ্য হয়ে ভিজতে ভিজতে মাইল খানেক দূরের দোকানটায় যেতে হত। দুই পাশে পাহাড়। মাঝখানে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরিকরা। বৃষ্টির পানিতে পাহাড় থেকে চুনা পাথর গলে দুধের স্রোতের মত ভেসে যাচ্ছে পথের দুইধার দিয়ে।অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু সেই সব দেখার মুড নেই আমার। হীরের টুকরোর মত অসংখ্য নুড়ি পাথরগড়িয়ে নামছে পাহাড় থেকে। বৃষ্টির তোড়ে।
বে কায়দায় পা দিলেই হড়াৎ করে গড়িয়ে পড়তে হবে শক্ত পাথুরে পথে। মরব না। কিন্তু দুইশো ছয়টা হাড্ডি গুড্ডির মধ্যে কয়টা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব ঈশ্বরই জানেন।বৃষ্টির জন্য পাহাড়ের উপর কাঠের বাড়িতে বন্দি হয়ে থাকতাম মাঝে মাঝে ।
বাড়ির জন্য মন খারাপ হত তখন। মাত্র তিন মাস ধরে এসেছি- মন তো খারাপ হবেই। দু চারজন কে মড়া কান্না করতে দেখেছি দেশ আর পরিবারের জন্য।পরে এদের অনেকেই আর দেশে ফেরেনি। মা বাবা দেশ প্রেমিকা সব ভুলে ওখানেই ছিল মহা সুখে।১৯৯৮ সালে সানভিসান্থি নামে দীঘল ঘাস ভর্তি একটা গ্রামে থাকতাম। বিজেতা ফারনান্দ নামে শ্রীলঙ্কান এক বন্ধু ছিল। ঘন বাদলার দিনে দুই ডজন সেদ্দ ডিম,দুই ডজন হটডগ ভাজা,আর নোনা শূয়রের মাংস ভেঁজে অ্যালুমিনিয়ামের একটা পাত্রে করে নিয়ে আসতো।
চার রাস্তার মোড়ে গোল একটা ছাউনিতে গিয়ে বসতাম চার পাঁচ জনে।
ছাউনিটা বাচ্চাদের জন্য। ওরা এখানে বসে ইস্কুলের বাসের জন্য অপেক্ষা করতো। বৃষ্টি ভেজা রাতে আমরা সেই ছাউনিতে বসে পশুর মত গিলতাম ভাঁজা জিনিসগুলো। সাথে যে বিয়ার থাকতো সেটা বলার কোন দরকার দেখি না । বিয়ার খুব সাধারন একটা পানীয় এই দ্বীপে। দোষ মুক্ত। মানুষ পানির চেয়ে বিয়ার বেশি গিলে। অনেক আদিবাসী ঘুম থেকে উঠেই ছয়টা ক্যান নিয়ে বসে যেত। এটাকে বলে সিক্স প্যাক।সকাল থেকে সন্ধ্যা পযন্ত বিয়ার গেলা সাধারন একটা ব্যাপার।
দুটো বিয়ার কোম্পানি চুটিয়ে ব্যবসা করে এখানে। বার্ডঅয়াইজার আর মিলার।এদের দাপটে অন্য কোম্পানিগুলো টিকতেই পারে না। রেডডগ আর আইস হাউজ নামের দুই কোম্পানি অল্পদিনেই লোটা বদনা নিয়ে ভেগে গেছে। অথচ ওদের বিয়ারের স্বাদ অদ্ভুত রকমের ভাল। জাপানি বিয়ার কিরিন ইচিবান আর আসাহি ভাল চলতো। ফিলিপিনো বিয়ার সানমিগেল আর মেক্সিকান করোনা শৌখিন টুরিস্টদের কাছে প্রিয় ছিল। করোনা বিয়ারের বোতলের ভেতরে এক ফালি হলুদ লেবু ঢুকিয়ে খেতে হত।সুজু নামের কোরিয়ান মদের বোতল পাওয়া যেত। স্বাদ ঠিক কেরোসিন তেলের মত।
আমার বসের সাথে একবার গোরস্তানে গিয়েছিলাম।
দ্বীপে একটাই গোরস্তান। মাত্র পাঁচ একর জায়গার উপর। মড়া লাশগুলো সবাই কাঠের বাক্সের ভেতরে ঢুকে সমুদ্রের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। সামনে নারকেল গাছের সারি। ডান দিকে বিশালএকটা গির্জা।মাঝে মাঝেই টুংটাং করে গির্জার ঘণ্টাটা বেজে উঠছে। বিশাল কয়েকটা অচেনা গাছে নিলিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো থেকে শুকনো বাদামী পাতা ঝরে পড়ছে একটু পর পর।
মোটকথা মরার পরও লোকগুলো সুখেই আছে।জায়গাটা আমার এতই ভাল লেগে গেল যে ঠিক করে ফেললাম মরার পর এখানে আমার কবরটা হলে খারাপ হবে না।আমার বস আর আমি গিয়েছি তার আঙ্কেলের কবরটা দেখতে। পরিচ্ছন্ন করব। কোথাও ঘাস বা ফালতু লতাগুল্ম নেই। প্রত্যেকটা কবরের মাথায় সাদা ক্রুশ। কাঠের বা সিমেন্টের।
অবাক হয়ে দেখি আঙ্কেল জো -র কবরের উপর একটা বিয়ারের ক্যান রাখা। বসকে কারণটা জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম আঙ্কেল জো বিয়ার দারুন রকমের পছন্দ করতেন।তাই মরার পর কবরের উপর এক ক্যান বিয়ার রেখে দিয়েছে তারই পরিবারের লোকজনেরা।আঙ্কেল জো-র আত্মা যদি কখনও আসে তবে কবরের উপর প্রিয় বিয়ারের একটা ক্যান দেখে খুশি হবে।ব্যাপারটা দেখে হাসব না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না কিছুক্ষণ।শেষে বসকে বললাম- বস ব্যাপারটা কি হাস্যকর না ?
বস রেগে গিয়ে বললেন- অ, আচ্ছা এটা তোমার কাছে হাস্যকর বলে মনে হল ,না ? তাহলে মড়ামানুষের কবরের উপর ফুল রেখে দেয়ার মানে কী ? সেটাও তো ফাজলামি । নাকি ?
সেটা তো মৃত লোকটাকে সম্মান দেখানর জন্য ফুল রাখি আমরা- ব্যাখ্যা দিতে চাইলাম।
তো? সম্মান দেখাতে গিয়ে একটা বিয়ার রাখলে ক্ষতি কী ? অ্যা ? রাগে গজ গজ করতেকরতে বললেন বস।
লক্ষ্য করে দেখলাম বেশির ভাগ কবরের উপরই ফুল দেয়া।আর কিছু কবরের উপর মৃতের প্রিয় জিনিস রাখা। একজন পুলিশ অফিসারের কবর দেখলাম।সিমেন্টে বাঁধানো বেদীর উপর অফিসারের ইউনিফর্মের ব্যাচ রাখা। আরেকটা মেয়ের কবরের উপর সস্তা পুঁতির মালা । হয়তো মালাটা মেয়েটার প্রিয় ছিল। শেষ পযন্ত পিচ্চি একটা কবরের উপর এসে থামল আমার চোখ। কবরটা একেবারে ছোট। কোন বাচ্চার কবর।সিমেন্টে বাঁধানো হয়নি কবরটা।
ওর বাপ মায়ের কাছে তেমন পয়সা ছিল না বোধহয় ।কবরটা ঘিরে কাঠের ছোট্ট একটা বেড়া দেয়া আছে। কাঠের ক্রুশটায় লেখা————
“ আমাদের ছোট্ট রাজকুমারি একা ঘুমিয়ে আছে এখানে। ”
কবরের উপর অবহেলায় অনাদরে পরে আছে বাদামী রঙের একটা খেলনা ভালুক।রোদে আর বৃষ্টিতে রঙ জ্বলে বিবর্ণ হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই দমকা বাতাস বয়ে গেল।টুংটাং করে গির্জার ঘণ্টাটা বেজে উঠলো বিষণ্ণ সুরে। এক মুঠো শুকনো পাতা এসে ছড়িয়ে পড়লোকবরগুলোর উপর। যেন প্রকৃতি ওদের শেষ ভালবাসা জানাচ্ছে।বলছে ঘুমুও তোমরা বাছারা। বস আর আমার মধ্যে চোখাচোখি হল। নীরবে বের হয়ে এলাম করবস্থান থেকে।
বিষাদে মন ভরে গেছে।
আমাদের খাওয়ার পানি কিনে খেতে হত। কলের পানি ছিল খুবই নোনা। কোন রকমে গোসলের কাজ হত। কিন্তু রান্না বান্নার কাজে ব্যবহার করলে খাবার বিস্বাদ হয়ে যেত।
এমন কি কলের পানি দিয়ে গাড়ি ধোয়া মোছা করলেও গাড়িতে মরচে পড়ে যেত।পুরো দ্বীপে একটা মাত্র জলাভূমি ছিল- সুসুপি লেক। সুসুপি গ্রামেই বিশাল এই লেকটা।তবে পানি ভাল না। পান করা যেত না। প্রচুর তেলাপিয়া মাছ পাওয়া যেত।কে কবে কয়েকটা তেলাপিয়া ছেড়েছিল শখ করে সেগুলোই এখন ঝাড়ে বংশে বেড়ে গিয়ে লেকটা ছেয়ে গেছে। লেকের পারে চমৎকার সবুজ দীঘল ঘাস। টিয়া পাখির পালকের মত রঙ।লেকের পারে যাদের বাড়িঘর তাদের বেশ ভাগ্যবান বলা যায়। বেকির বাড়িওলেকের পারে। একবার গিয়েছিলাম বেড়াতে।
অনেক ভৌতিক আর রোমাঞ্চকর গল্পআছে এই সুসুপির লেকটা নিয়ে।
বেকির দাদু বেশ কিছুটা জায়গা জমি পেয়েছিলেন দ্বীপের গভনরের কাছ থেকে।জলাভূমির পাশেই। জায়গাটা ছিল গহীন জঙ্গল। গাছপালার ঠাস বুনোট আর লম্বা সবুজ দীঘলঘাসে ভর্তি।
পরিবারের সবাই মিলে টানা কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে চমৎকার কাঠের একটা বাংলো বানিয়ে ফেলন। অনেক ভালবাসা আর শ্রম দিয়ে বানাল একটা মুরগি আর শুয়োরের খামার। সুখে দিন কাটতে লাগলো ।
এর মধ্যে জন্ম নিল বেকির বাবা।আনন্দ আর সুখের বৃষ্টি ঝরতে লাগলো পুরো পরিবারের উপর।একদিন সকালে পরিবারের সবাই অবাক হয়ে দেখল খামারের সবচেয়ে বড় শুয়োরটা কে যেন মেরে রেখে গেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো খামার বাড়ি।শুয়োরের মাথাটা মুচড়ে ছিঁড়ে রেখেছে যেন কোন এক দানব ।
সবাই বেশ দুঃখ পেল। তবে কেউ বুঝতে পারল না কে এমন কাজ করেছে। তাছাড়া জঙ্গলে কোন হিংস্র প্রাণীও নেই।সেই রাতে পাহারায় রইলো দাদু।কিছুই হল না।পরপর কয়েক রাত দাদু আর দাদুর ছোট ভাই মিলে পালাক্রমে পাহারা দিল।কোন লাভ হল না।শেষে পাহারা বন্ধ করে দিল। পরের রাতেই খামারের সবগুলো মোরগ – মুরগি মারা গেল।
একই রকম গলা ছিঁড়ে মুণ্ডু আলাদা করা।বুড়ো এক পাদ্রির কাছে সাহায়্য চাইল দাদু। অনেক খোঁজ খবর নিয়ে পুরানো পুঁথিপত্র ঘেঁটে পাদ্রি জানাল জলাভূমির ওই অংশে এক পিশাচ থাকে। দাদু বাড়ি করায় ওরঅসুবিধে হচ্ছে। দাদু যদি অন্য কোথায়ও চলে যায় ভাল। আর না গেলে দাদুর সন্তানের উপরহাত দেবে সে। আগের প্রানিগুলোকে মেরে সেই রকম ইঙ্গিত দিয়েছে পিশাচটা।
অতীতে যারাই বসতি করতে এসেছিল তারা সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে।সব শুনে বাড়ি ফিরে এলো দাদু। দুই ভাই মিলে ঠিক করলো- বাড়ি ছেড়ে পালাবে না তারা। মোকাবেলা করবে অদৃশ্য সেই শয়তানের। কিন্তু কি ভাবে ?আবার পালা করে রাত জাগতে লাগলো দুই ভাই।কেটে গেল এক মাস। কিছু হল না।সম্ভবত ব্যাপারটা ভাল ভালই শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে হলী ওয়াটার ছিটিয়ে দেয়া হয়েছেকয়েক লিটার।এক সন্ধ্যায় বাইরে বসে আড্ডা দিচ্ছিল দাদু আর ভাই।রান্না ঘরে রাতের খাবার বানাচ্ছিল দিদিমা। ঘরের ভেতরে শিশুটা একা ঘুমাচ্ছে।কি মনে করে রান্নাঘর থেকে বেডরুমে গিয়েছিল দিদিমা।
হটাৎ করেই দিদিমার ভয়াল চিৎকার শুনে দুই ভাইয়ের পিলে চমকে উঠলো।
দৌড়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। যা দেখল তাতে দুজনের চোখ কপালে উঠে গেল।বাচ্চাটা ঘুমিয়ে আছে। তবে বিছানায় না। শূন্যে ভেসে আছে ও। আর ধীরে ধীরে ভাসতে ভাসতেচলে যাচ্ছে খোলা জানালার দিকে। ওখানেই লেকের কালো পানি টলটল করছে।দাদুর ভাই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল পিচ্চিটাকে। আর দাদু কাঠের আলমারি খুলেবের করে আনল শটগান।
অন্ধকারে একের পর এক গুলি চালাতে লাগল।চিৎকার করে বলতে লাগল- বেজন্মা শূয়রের বাচ্চা তুই আমার বাচ্চাকে চাস ?আয়, সামনে আয় তুই, দেখি নরকের কোন মাথায় থাকিস।রাতের অন্ধকারে তিনজনেই শুনতে পেল- বাইরে কে যেন দৌড়ে পালাচ্ছে।দাদু শটগান হাতে দৌড়ে বাইরে চলে এলো। আকাশে পুরো চাঁদ ছিল না। অর্ধেক বা তার কমবেশি।সেই আলোতে দাদু দেখল- দীঘল ঘাসের মধ্যে কে যেন ছুটে পালাচ্ছে।
মাথায় রক্ত চেপে গেল দাদুর। টিন ভর্তি কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল ঘাসের ঘাসের জঙ্গলে।দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো বুনো ঘাস-লতা-গুল্ম।আগুনের ভেতর থেকে কে বা কি যেন ভয়াল সুরে চিৎকার করে যাচ্ছে। কোন মানুষ বা প্রাণী অমন করে চিৎকার করে ?সেই সাথে দুই ভাই মিলে একটার পর একটা গুলি করে যেতে লাগলো চিৎকার লক্ষ্য করে।জঙ্গলের ভেতরে পাগলের মত ছুটোছুটি করছে অপার্থিব জিনিসটা।আর মাঝে মাঝে ভয়াল স্বরে চিৎকার করে উঠছে।
এক সময় ভোরের আলো ফুটে উঠল।আকাশের রঙ হল কচি লেবু পাতার মত। নিভে গেল দীঘল ঘাসের আগুন। মোরগফুলের মত রঙ নিয়ে সূর্য উঠল ।এর পরে আর কখনওই কোন রকম উপদ্রব হয়নি জলাভূমির পারে।
ভৌতিক বা আধিভৌতিক কিছুই আমি বিশ্বাস করি না। তারপরও চাঁদের আলোয় সুসুপিলেকের পারে বসে আদিবাসীদের মুখে নানান বিচিত্র সব কাহিনি শুনতাম। খারাপ লাগতোনা।হরর কাহিনির মূল হচ্ছে পরিবেশ আর বাচন ভঙ্গি।আদিবাসীরা ভূত প্রেত খুব বিশ্বাস করে। বিশেষ করে হোয়াইট লেডির গল্প। অনেকেই দেখেছেতাকে। জঙ্গলে, পুরানো বাড়িতে নানান জায়গায় । ফাঁকা সড়কে ও দেখেছে অনেকে।মেয়েটার গায়ের রঙ সাদা। একদম মোমের মত। লম্বা কালো চুল। দ্বীপের আদিবাসীদেরমধ্যে প্রায় হাজার বছর ধরে এই হোয়াইট লেডির গল্প চলে আসছে।কারো কোন ক্ষতি করেনি সে।তবে তার সাথে আমার কখনও ই দেখা হয়নি।
পানি কিনে খেতে হত। বেশ দাম পড়ত। ২ লিটারের পানি ২ ডলার ৫০ সেন্ট। খালি বোতল নিয়ে গেলে দোকানদার পানি ভর্তি করে দিলে শুধু ৫০ সেন্ট। ঐ যে কেরোসিন তেল লোকে যে ভাবে কিনে।দেশে তখনও বোতল কিনে খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়নি। শুধু আমার শহরে একবার একব্যান্ড শিল্পী এসেছিলেন। ধরা যাক তার নাম পটল বাচ্চু। উনি পানির বোতল সাথে করেএনেছিলেন। আগে দেখিনি।এখানে রোজ বাড়তি অনেকগুলো টাকা চলে যেত শুধু পানি কিনতেই। সবার আলাদা আলাদা বোতল ছিল। বোতলে যার যার নাম লেখা। প্রায়ই গভীর রাতে কাজ থেকে ফিরে দেখতাম কে বা কারা আমার বোতল খালি করে ফেলেছে।ধুন্ধুমার লেগে যেত।
রোজ একটা ঝগড়া হত রুম মেটদের সাথে।শেষে একবার পানির বোতলে ভিনেগার ভরে রাখতেই চুরি বন্ধ হল।আর যার মুখে অরুচি রোগ হয়েছিল তার পাছায় দুটো লাত্থি দিলাম।কারন ঐ শালায় ই পানি চোর।
বস একদিন বিরক্ত হয়ে বলল- এই তোমরা বৃষ্টির পানি খাও না কেন ? অ্যা? যত সব নবাব…।
বৃষ্টির পানি খাওয়া কী ঠিক হবে ?বেশ অবাক হলাম।
বস বিরক্ত হয়ে বললেন – কেন তুমি কী আশা করেছিলে বৃষ্টির বদলে আকাশ থেকে কোকাকোলা পড়বে ? অ্যা? যত সব পচা কুমড়ার নাতি ।বাতিল টয়লেট কোথাকার।আরে আমরা আমেরিকানরা বৃষ্টির পানি খাই আর তুমি কোথাকার লাট বাহাদুর ?
আবিষ্কার করলাম প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপগুলোতে সবাই কম বেশি বৃষ্টির পানি খায়।সবার বাড়িতে নীল রঙের একটা ট্যাঙ্কি থাকে। টিনের চাল বা ছাদ থেকে কৌশলে পানি ধরে ছাঁকনিতে ছেঁকে ট্যাঁঙ্কিতে জমা হয় নিজে নিজেই।বৃষ্টির পানি একদিন খেয়ে দেখলাম।অদ্ভুত স্বাদ।
প্রশান্ত মহাসাগর থেকে টনে টনে পানি বাস্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। বেশিদূর যেতে না যেতেইধাক্কা খায় দ্বীপগুলোর পাহাড়ে।
মেঘগুলো সব হুমড়ি খেয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে। এই পানিতেনা আছে কোন রাসায়নিক অনুকণা, না আছে গাড়ি ঘোড়া বা কলকারখানার পোড়া তেলেরছায়া।বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বোতল ভর্তি যে পানি বিক্রি করে সেগু্লোর চেয়ে হাজারকোটি আর লক্ষ গুন ভাল এই দ্বীপের বৃষ্টির পানি।
তো, আমরা বৃষ্টির পানি খাওয়ার অভ্যাস করলাম। কিন্তু পাহাড়ের উপর যে কাঠের বাড়িতেথাকি ওখানে নীল ট্যাঙ্কি নেই।পানি ধরার কোন ব্যবস্থাও নেই।তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। কোম্পানি তিন মাস ধরে বেতন আটকে রেখেছে। বাজার করার পয়সা নেই- আর পানি তো দূরের কথা।সবার সব বোতল খালি। ৫০ সেন্ট দিয়ে এক বোতল কিনে আনি পাঁচ জনে ভাগ করে শ্যাম্পেনের মত সেই পানি গিলি।পানির অভাবে প্রস্রাব হলুদ হয়ে গেছে।
রোজ রাতে স্বপ্নে দেখি বালতি ভর্তি করে রুহ আফজা খাচ্ছি। সাথে প্রচুর বরফ।
পুরানো এক সহকর্মী যে অনেক দিন ধরে এই দ্বীপে আছে- সে পরামর্শ দিল-লাউ লাউ বে (Lau Lau bay) তে বাতিল একটা অয়্যার হাউজ আছে।অতীতে সেটা নাম করা সিমুজু কোম্পানির কারখানা ছিল। সেই বন্ধ কারখানাতে বিশাল একটা সিমেন্টের ট্যাঙ্কি আছে। সারা বছরই পানিতে ভর্তি থাকে সেটা। কেউ পানি নেয় না। ইচ্ছা করলেই আমরা সেখান থেকে দরকার মত লিটার লিটার পানি আনতে পারি।
আমরা তখন পানির জন্য খুন খারাপি ও করতে পারি। যেমন কথা তেমনি কাজ। সেই রাতেই আমার আর শ্রী শ্রী লাকড়ি দাস বাবাজির ডিউটি ছিল সিমুজু কোম্পানির অয়্যার হাউজে। বিশ লিটার পানি ধরেএমন দুটো বড় বড় গ্যালন নিয়ে গেলাম। গভীর জঙ্গলের ভেতরে কাঠের তৈরি একটা বাড়ির পিছনে পেলাম সিমেন্টের পানির ট্যাঙ্কটা। ঠাণ্ডা পানি ভর্তি।
পেতলের কলটা ছাড়তেই খ্যাক খ্যাক শব্দ করে বের হয়ে এলো শরাবন তহুরার মত সুস্বাদু আর মিষ্টি পানি।পালা করে পানি খেলাম দুই বন্ধু। পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেল পানি গিলতে গিলতে।লাকড়ি দাস তো আগ্রহের আতিশয়্যে এত দ্রুত পানি গিলতে শুরু করেছিল যেনাকে মুখে পানি আটকে দম বন্ধ হয়ে মারাই যেতে বসেছিল।পিঠের মধ্যে জোরে জোরে কয়েকটা চাপড় দিলাম বা্ধ্য হয়েই। পরে অভিযোগ করেছিলইচ্ছা করেই নাকি জোরে জোরে মেরেছি ওকে।
অভাবিত প্রচুর পানি মাগনা পেয়ে আবেগের চোটে পানির ট্যাঙ্কিটা জড়িয়ে ধরে ফেললাম।আপনারা আমার উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেন কোন মেয়েকেও আমি এতোটা আবেগ দিয়ে জড়িয়ে ধরিনি কখনও। সেই রাতে প্রচুর পানি খেলাম দুই বন্ধু। আর প্রস্রাব করলাম। আবার পানি খেলাম। আবার প্রস্রাব করলাম। এই চক্র চলতেই থাকলো পরদিন সকাল পযন্ত। আমাদের বস পরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে আমাদের আনতে গিয়ে দেখে আমরা দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে কাটাকুটি খেলছি। চল্লিশ লিটার পানি নিয়ে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরলাম।ঘণ্টা দুইয়েকের মধ্যে সব গিলে ফেলল বাড়ি ভর্তি বাঙ্গালী ভাই ব্রাদাররা।
শীতের শুরুতে মে্পল গাছের পাতা যেমন টুপটাপ করে ঝরে পড়তে থাকে ঠিক সেই রকম নীরবে একঘেয়ে কেটে যেত আমাদের দি্নগুলো। আদিবাসীরা প্রায়ই দল বেঁধে আক্রমণ করতো। মাঝে মাঝেই খবর পেতাম – অমুক এলাকায় ছয় সাত জন আদিবাসী এসে তমুককে মেরে তক্তা বা আলুভর্তা বানিয়েছে।
প্রতি সপ্তাহে এমন একটা না একটা খবর পেতাম। রাতের বেলা ডিউটিতে যাবার সময় সুন্দর ভাবে বিদায় নিতাম রুম মেটদের কাছ থেকে। যেন এটাই শেষ দেখা। একজন আরেক জনের মঙ্গল কামনা করতাম।তারপরও অপ্রিয় কেউ পিটুনি খেয়ে এলে মনে মনে দারুন খুশি হতাম আমরা।
সপ্তাহে পাঁচদিন কাজ। দুই দিন ছুটি। ছুটির দিনে সবাই দল বেঁধে নাইট ক্লাবে গিয়ে হাজিরহতাম। অসংখ্য নাইট ক্লাব ছিল দ্বীপে। তবে ক্লাব জামা (jama ) আর স্টপ লাইট ক্লাব দারুন ব্যবসা করতো। বলতে লজ্জা নেই ক্লাব জামা -র মেয়েগুলো ছিল বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী।ক্লাব দুটোর বাইরে বিকিনি পড়ে নর্তকী মেয়েগুলো সন্ধ্যার পর থেকেই হাঁটাহাঁটি করতো।খদ্দের ধরার কৌশল হিসাবে। এ দুটো ক্লাবে ঢুকলেই আমাদের নিখোঁজ সঙ্গীদের পেয়ে যেতাম।এক কোনে বসে বসে বিয়ার গিলছে। কোলের উপর অর্ধনগ্ন কোন সুন্দরী বসা। হায় হায়। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর ছিল পোকার রুম গুলো। প্রতি কুড়ি কদম পর পরই পাওয়া যেতএই জুয়ার আড্ডা গুলো। এই দ্বীপগুলোতে জুয়া বৈধ।
সবাই বুক ভরা আশা নিয়ে খেলতে আসতো।আজ জ্যাকপট জিতবেই। জ্যাকপট হচ্ছে ৫০ হাজার আমেরিকান ডলার।সারা মাসের উপার্জন মাত্র কয়েক মিনিটে শেষ করে হতাশ মুখে বাড়ি ফিরত বাঙ্গালীগুলো।পোকার রুমগুলোতে ঢুকলে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। অসংখ্য সারিবন্ধ মেশিন। সামনে মানুসগুলো বসা,সবাই উত্তেজিত। মেশিনে কয়েন ঢালছে।টুং টাং শব্দ করে মেশিন চলছে। খুচরো পয়সা হর হর করে বের হয়ে আসছে কোন কোনমেশিন থেকে। মদ্দা কথা পোকার রুমগুলো যেন এক একটা মিনি ক্যাসিনো।
পোকার রুমের ভেতরে আপনি যতক্ষণ থাকবেন ততক্ষণ কফি আর কোমল পানীয়আপনার জন্য ফ্রি। যত খুশি কোন বাধা নেই।ট্রেজার আইল্যান্ড গেইম ক্লাব নামে একটা পোকার রুমে কাজ করেছিলাম এক মাস।আমার কাজ হল কোন মেশিন বিগড়ে গেলে মেকানিককে খবর দেয়া। মাতাল খদ্দেরগুলোকে চোখে চোখে রাখা।দেউলিয়া হয়ে কোন খদ্দের যাতে চিল্লাচিল্লি না করে সেই দিকে নজর রাখা। কিছু তস্কর পোকার রুমের বাইরে ঘুরাঘুরি করে। পার্ক করে রাখা গাড়ি থেকে চাকা, ভিউ গ্লাস এই সব চুরির মতলবে থাকে ওরা। সিসি ক্যামেরায় সেই তস্করদের উপর নজর রাখা। এই সব হাবিজাবি আরকি…।এই পেশাটাকে বলে বুল বয়।
সম্ভবত আমিই একমাত্র বাঙ্গালী এই দ্বীপে যে কখনই মেশিনে জুয়া খেলিনি।মেশিনগুলো বানানই হয়েছে এমন ভাবে যাতে সেটা খদ্দেরের পয়সা মালিকের পকেটে নিয়ে আসতে পার।আর দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে-আমার ধারনা আমি আমার জীবন বাজি ধরে যথেষ্ট জুয়া খেলেছি। সেটাই ভাল লাগে। আর বরাবর সফল হই সেই জুয়াতে।
আমরা যে কাঠের বাড়িতে থাকতাম সেটাকে বলা হত ব্যারা্ক।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই এই ব্যারাক শব্দটা বেশ জনপ্রিয়। বিশাল কোন বাড়িতে চারপাঁচ জন লোক থাকলেই সেটা ব্যারাক হয়ে যাবে। বাড়ি বা বাসা না। আমাদের ব্যারাকে আমাদের দিনগুলো বেশ হল্লা করে কাটতো।
আমাদের দেশে যেমন স্বঘোষিত কিং অফ হরর আর স্বঘোষিত মৌলিক থ্রিলার লেখক আছেন ঠিক তেমনি প্রত্যেকটা ব্যারাকে একজন করে স্বঘোষিত বড় ভাই থাকতেন।
এরা খুই মজার চরিত্র ছিল। আমাদের ঘাড়ে পড়েছিল আবু মিয়া। লম্বা- ফর্সা আর ভীষণ রোগা এই লোকটা দেখতে কমেডিয়ানদের মত। ছোট্ট পেঁপের মত মুখ। তাতে বিশাল গোঁফ। ঠিক রূপকথা গল্পের রাজার কতোয়ালদের মত। আবু মিয়ার বয়স চল্লিশ হতে পারে। আবার পয়তাল্লিশহতে পারে। বলা মুশকিল।
দেশে থাকতে বাসের ড্রাইভার ছিল। কাজেই উনাকে ওস্তাদ বলে ডাকলে খুশি হত।ছুটির দিনে সব বাঙ্গালী মদ বিয়ারের আসর বসাত। তখন আবু মিয়া আসরের মধ্যমণি হিসাবে বসতে পছন্দ করত।সমস্যা হচ্ছে- আবু মিয়া মদ কেনার চাঁদা দিতে চাইতো না। আর তার হাতে একটার পর একটা বিয়ারের টিন বা মদের গ্লাস তুলে দিতে হত। শুধু তাই না এক নাগাড়ে তার বকবকানি ও শুনতে হত। তার গল্পের বিষয় মাত্র দুটো। এক- সে খুবই একজন তুখোড় ড্রাইভার ছিল। তার দক্ষতার কারনে বাসটা একবার খাদে পড়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আর দুই মর্জিনা নামে এক মেয়ে তাকে অল্প অল্প ভালবেসেছিল।
এই অল্প অল্প ভালবাসার ব্যাপারটা আমাদের কাছে বেশ জটিল মনে হত। একটা সময় আমরা তার প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠলাম। একই গল্প বার বার শুনতে কার ভাল লাগে ? তাছাড়া গল্পের মাঝে কেউ প্রস্রাব করতে উঠে গেলেও আবু মিয়া বেশ রেগে যেত। দীর্ঘ পাঁচ মাসে সে একবারও বিয়ার কেনার জন্য এক ডলারও চাঁদা দেয়নি।অথচ আসর থেকে বাদ ও দিতে পারছি না। একবার না ডাকলে সে বসের কাছে গিয়ে আমাদের নামে হরেক পদের নালিশ দেয়। আমরা নাকি খামাখাই পানি আর বিদ্যুতের অপচয় করি। হেন তেন।
শেষে একদিন এক কাণ্ড করলাম।একরাতে প্রচুর সস্তা মদ খাইয়ে মাতাল বানালাম আবু মিয়াকে।
কোরিয়ান মদ সুজুইছিল সবচেয়ে সস্তা। সবুজ রঙের এই বোতলটা দেখলেই কেমন ভয় করে। তাতে আবার চানাচুরেরমত হিজিবিজি ভাষায় কি সব লেখা । স্বাদটা জঘন্য। মনে হয় ভিনেগার- কেরসিন-আর বাচ্চাদের প্রস্রাব এক সাথে সমান অনুপাতে মিলিয়ে বানানো। মাতাল হবার পর আবু ভাইয়ের অচেতন দেহটা তার বিছানায় যত্ন করে শুইয়ে দিলাম ।
বিছানার পাশে সাত আটটা খালি বিয়ারের টিন আর শূন্য সুজুর বোতল এলোমেলো করে রেখে দিলাম।বড় একটা মিকচার মেশিনে বাসি ভাত, ডাল আর কিছু সবুজ কাঁচা বরবটির টুকরো দিয়ে আধা মিক্স করলাম জিনিসগুলো। সেই কুৎসিত মিশ্রণটা ছড়িয়ে দিলাম আবু মিয়ার বিছানাতে,ঘরের মেঝেতে । এখানে সেখানে। তারপর বেছে বেছে সস্তা কিছু জিনিস ভাঙলাম। যেমন কাঁচের একটা গ্লাস, ছাইদানি, দাঁড়ি কামানর সস্তা আয়না। আরও কিছু হাবিজাবি। লণ্ড ভণ্ড করলাম আবু মিয়ার ঘরের সব জিনিস। তারপর সোজা গেলাম বসের কাছে। বসের বাসা কাম অফিসটা আমাদের ব্যারাকের সামনেই।
একগাদা ফাইল নিয়ে বসে ছিলেন বস। আমাদের দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন- “কি ব্যাপার আবার অ্যাডভানস টাকা চাও নাকি ? আমি কি টাকার গাছ লাগিয়েছি ? অ্যা ?যত সব পচা গুগলি শামুক আর বাসি পনিরের বার্গার।”
“আরে রাখেন আপনার টাকা।” একটা ভাব নিলাম বসের সাথে। “আপনার প্রিয় আবুর জন্য তো আর ব্যারাকে থাকা যাবে না বোধ হয়।”
“কেন কি হয়েছে ?” অবাক হলেন বস।
কি হয়েছে মানে ? মুখটা তম্বা করে বললাম। খোঁজ রাখেন কিছু ? আ্মাদের তো অন্য কোথাওবাসা খুজতে হবে মনে হচ্ছে। প্রতি রাতেই মদ খেয়ে আবু মাতলামি করে। শান্তি নষ্ট করে।জিনিস পত্র ভাংচুর তো আছেই। না পারি ঘুমাতে। না পারি কিছু বলতে।আপনার প্রিয় কর্মচারীকে কে কি বলবে। আসলে আমাদের জীবনটাই…। দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার সুখ কিসের…।
শান্তশিষ্ট বস হটাৎ খেপে গেলেন। বললেন – চল তো দেখি ব্যাপারটা। আবুর কামরায় চল…।
সসম্মানে বসকে গাইড করে নিয়ে এলাম আবুর ঘরে। দেখার মত একটা দৃশ্য বটে।মাতাল আবু মরার মত ঘুমাচ্ছে। মুখটা অল্প একটু ফাঁক হয়ে আছে মড়া চিতল মাছের মত। রুমের ভেতরের পরিবেশ এমনই যেন এক হালি হাতি পাগলা নাচ নেচেছে।চোখ দুটো বাকরখানির মত বড় বড় করে সবই দেখলেন বস।
তারপর সেই আধা তরল অদ্ভুত সেই কুৎসিত মিশ্রন দেখিয়ে অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- ওগুলো কি?
বমি বস। ব্যাখ্যা করলাম। রোজই মাতাল হয়ে বমি করে সব নষ্ট করে।
বস বেচারা জানবেন কি করে আমরা বাসি ভাত- ডাল আর কাঁচা বরবটি মিকচারে ঘুঁটে এই জিনিসটা বানিয়েছি।ঘেন্নায় বসের চেহারা হরতকির মত হয়ে গেল।আমার কথার সমর্থন জানাতে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল লাকড়ি দাস।
কাঁদতে কাঁদতে আবুর অত্যাচারের বর্ণনা দিল প্রানবন্ত ভাষায়।লাকড়ি দাসের অভিনয় দারুন প্রাণবন্ত। কান্নার অভিনয় করতে গিয়ে ওর নাক দিয়ে শিকনি বের হয়ে গেল।
ঠিক আছে। সায় দিলেন বস। আবুকে বলবে কাল থেকে পরপর দুই দিন ওর কাজ বন্ধ।মাতাল হবার শাস্তি। আর ঘুম থেকে উঠেই যেন সকালে দেখা করে আমার সাথে।
গট গট করে বস চলে গেলেন।আমরা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
নেশার মৌতাতে পরদিন দুপুর পযন্ত ঘুমালো আবু মিয়া। তারপর যখন ঘুম ভাঙলো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ওর মাথায়।কি হয়েছিল গত রাতে? এই সব কি ?টল মল পায়ে হাজির হলো আমার রুমে।
আমি তখন সারা মুখে সাদা শেভিং ক্রিম মেখে আয়নাতে নিজেকে দেখছিলাম।ভাবছিলাম-বুুড়ো হলে যখন আমার সব দাঁড়ি গোঁফ পেকে সাদা হয়ে যাবে তখন বোধহয় এমন হনুমানের মতই কুৎসিত লাগবে আমাকে।
ভয়াত গলায় আবু জিজ্ঞেস করলো -কাল রাতে কি হয়েছিল মিলন ?
ফোঁস করে একটা কৃত্রিম দীঘশ্বাস ছেড়ে বললাম- ভাই যে জিনিস খেয়ে হজম করতেপারেন না নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না সেই সব ছাই ছক্কড় গিলতে যান কেন ?
পাথরের মত মুখ করে বসে রইলো আবু।
আর আমি রেজর দিয়ে দাঁড়ি মুখ কামাতে কামাতে ব্যাখ্যা করলাম কাল রাতে কি কি অনাসৃষ্টিকরেছে সে। বমি, জিনিসপত্র ভাংচুর,হট্টগোল কি করেনি সে? বস এসে সব দেখে গেছে। দুই দিনের জন্য সাসপেন্ড করেছে আবুকে। এবং বলেছে ভুলে ও যেন বসের চোখের সামনে না পড়ে। আবুকে দেখলেই বসের মেজাজ খিচড়ে যাবে।আতঙ্কিত আবু নিজের রুমে ফিরে গিয়ে সেই রহস্যময় বমি পরিষ্কার করতে লেগে গেল।
আমি আর লাকড়ি দাস হায়েনার মত হাসতে লাগলাম।
একটু পর বস হাজির। জানতে চাইলেন- আবু কেন তার সাথে দেখা করেনি?
বললাম- বস আবু বলেছে সে দেখা করতে বাধ্য নয়। এটা আমেরিকার দ্বীপ। ফ্রি আইল্যান্ড।যার যা খুশি করার অধিকার আছে।
রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আবুর রুমে হাজির হলেন বস। আবু তখন পাগলের মত ওর রুমের জিনিসপত্র পরিষ্কার করছিল।
বসকে দেখে হোয়াইট প্রিন্ট কাগজের মত সাদা হয়ে গেল ওর চেহারা।
ভেরি গুড আবু। ঢাকাই সিনেমার ভিলেনের মত বললেন বস। তোমার শূয়রের খামারটাপরিষ্কার করছ নাকি ?
ইয়েস বস। বলল আতঙ্কিত আবু মিয়া।
কাল রাতে ভালই আনন্দ করেছ ?
ইয়েস বস।
তারপর রুমের এই অবস্থা ?
ইয়েস বস।
আর সকালে আমার সাথে দেখা করতে চাওনি। বলেছ এটা ফ্রি আইল্যান্ড। তোমারযা খুশি করার অধিকার আছে।
ইয়েস বস…।
হঠাৎ বুঝতে পারলো আবু কথার তোড়ে কি ভুল করে ফেলেছে। তাড়াতাড়িসংশোধন করার চেষ্টা করলো- নো বস নো…।
ঠিক আছে। চিবিয়ে চিবিয়ে রায় ঘোষণা করলেন বস। যতদিন তুমি আমার ব্যারাকে থাকবে ততদিন ভুলেও মদ, বিয়ার গিলতে পারবে না। যদি তোমার হাতে এই সব জিনিস দেখিসে দিনই তোমার চুক্তিপত্র বাতিল করে দেশে পাঠিয়ে দেব। ব্যাপারটা পরিষ্কার?
ইয়েস বস। প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল আবু মিয়া।
আর বস আমরা যখন মদ বিয়ারের আসব বসাব আবু যেন তখন সেই সব পরিষ্কার করে।নিরীহ মুখে নতুন শর্ত দিলাম।
হ্যাঁ তাই হবে। বলেই গট মট করে বস চলে গেলেন অফিসে।
ততক্ষণে আমার আর লাকড়ি দাসের হাসি দুই কানের লতি পযন্ত গিয়ে ঠেকেছে।আধ খোলা দেশলাইয়ের বাক্সের মত দাঁত বের করে হাসছি আমরা। এর পর থেকে ছুটির দিনগুলোতে বসে বিয়ার গিলতাম আমরা। সাথে ঝলসানো মুরগি। আবু বসে থাকতখানিক দূরে। পচা আতাফলের মত শুকনো ওর চেহারা।
আমরা মাঝে মাঝে হাক দিতাম- আবু ভাই ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে আসুন। আর এইখালি বোতলগুলো নিয়ে বিনে ফেলে দিন। আর চারটে হটডগ ভেঁজে আনুন।
দৌড়ে গিয়ে আমাদের ফরমায়েশ পালন করতো আবু। ঠাণ্ডা ঘেমে উঠা বিয়ারের টিনগুলো দেখত আর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলত।
মাঝে মাঝেই আকাশের দিকে মুখ তুলে অভিশাপ দিত- আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম।মিলনের ব্যবস্থা কইরো।
ঈশ্বর অনেক ব্যস্ত থাকায় আমার কোন ক্ষতি করেননি।আর আবু ভাই আজ ১৯ বছর পর আপনার কথা খুব মনে পড়ছে…।কোথায় আছেন আপনি কে জানে।
আমাদের দ্বিতীয় শত্রু হচ্ছে কৃষ্ণ ।না ভগবান শ্রী কৃষ্ণ না। ভদ্রলোকের নাম হচ্ছে কৃষ্ণ দাস। লোকটা অসম্ভব রকমের মোটাআর কুৎসিত।
দেখতে হুবহু বাংলাদেশের একজন হরর লেখকের মত।
সেই লেখকটা অনেকটা বাপ্পি লাহিড়ী আর ডাইনোসরের মিক্স চেহারার ।চিনলেন না ? আরে ওঁই যে গিলাকলিজা খেকো শয়তান বা পিশাচের মরণ চিৎকার মার্কা বই লেখে যে।আরে যে লেখকটা বাংলা ভাষায় হরর গল্প লেখার নিয়ম নীতি নিধারন করেছেন যে হরর গল্পে মোটেও রম্য থাকতে পারবে না। হরর গল্প হতে হবে ভয়ের।সেই লোকটার মতই কুৎসিত আমাদের কৃষ্ণ দাস।
তবে সেই লেখকের মনটাও কুৎসিতকিন্তু আমাদের কৃষ্ণ দাসের মনটা বেশ ভাল।সমস্যা হল রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই গীতা পড়তে বসে যায় কৃষ্ণ বাবু।আমরা রাতের বেলা ডিউটি করে এসে একটু আরাম করে ঘুম দেই অমনি উনিস্নান ত্নান করে পিচ্চি একটা গামছা পড়ে গীতা পড়েন। আর জোরে জোরে গীতার মাহাত্য ব্যাখ্যা করতে থাকেন ।সারাদিন শত ভাবে আমাদের বুঝিয়ে দেন আমরা কত পাপী। মরার পর আমরা বিশেষ করেআমি যে নরকে গিয়ে কুম্ভিপাকে গড়াগড়ি খাব এই ব্যাপারে নিশ্চিত তিনি।
কুম্ভিপাক জিনিসটা কি কে বলবে ?সারাক্ষণ ভয় দেখান আমাদের। মরার পর নরকে কি কি শাস্তি দেয়া হবে। বা পরজন্মে কুত্তা বা বিলাই হিসাবে জন্ম নেব আমরা পাপের ফল ভোগ করতে। সারাক্ষণ যদি ধর্মের ঢোল বাজতেই থাকে তবে মুশকিল হয়ে যায়। অথচ নিজে শুধু গীতা পড়ার মধ্যেই শেষ। মদ গেলে যৎপরোনস্তি। মানে যথেস্থ । নাইট ক্লাব থেকেও বের হতে দেখেছি অনেক বার। যদিও কৃষ্ণ দাস বলেন পরিচিত কাকে যেন খুঁজতে গেছেন ক্লাবের ভেতরে। আবার আমাদের নিরামিষ খাবার উপদেশ দিয়ে নিজে মুরগির ঠ্যাং বড়টা বেছে নেয়।
বড্ড মুশকিলে পড়লাম। লোকজন কিন্তু কৃষ্ণ দাস বাবুকে বেশ ধার্মিক হিসাবেই চেনে। সবচেয়ে বিরক্তকর হচ্ছে রুমালের সমান একটা গামছা পড়ে বসে বসে চিল্লা চিল্লি করে গীতা পড়াটা। গামছাটা এতই ছোট যে সবই দেখা যায়। যা দেখা আমাদের উচিৎ নয়।কিছু বললেই- তেড়ে আসেন। বলেন – তবে রে পাতকি তুই ধ্বংস হয়ে যাবি রে। কর্মফল ভোগ…হেন তেন।
শেষে একটা কাণ্ড করলাম। ফোন করে এক ডজন প্লে-বয় ম্যাগাজিনের অডার দিলাম।ওদের বললাম কৃষ্ণ দাস বাবুর নামে যেন ডেলেভারিটা আসে।তারপর ঘাপটি মেরে বসে রইলাম সবাই…।।
একদিন দুপুরে সবাইকে কচলে দিচ্ছিলেন কৃষ্ণ দাস।আমরা যে মহা পাপী আর মরার পর নরকে যাবো সেটা আবারও বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ঠিক তখনই বস একটা প্যাকেট নিয়ে এসে বলল- কৃষ্ণ তোমার নামেএকটা প্যাকেট এসেছে।কৃষ্ণ দাস খুবই অবাক। সে তো কিছুর অডার দেয়নি।
বস কৌতূহলী হলে বললেন- আচ্ছা কৃষ্ণ দাস তুমি প্যাকেট খোল তো।
প্যাকেট খোলা হল।আমরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। প্যাকেটের ভেতর থেকে বের হল এক গাদা প্লে বয় ম্যাগাজিন। সুন্দরী মেয়েগুলো মনোহর ভঙ্গিতে রয়েছে।কৃষ্ণ দাসের মুখটা টম্যাটোর মত লাল হয়ে গেল।
আরে কৃষ্ণ দাস তুমি তো বেশ রসিক মানুষ। খ্যক খ্যক করে হাসতে হাসতে বললেন বস।
নাহ নাহ বস এটা আমার অডার না। বিব্রত গলায় বলল কৃষ্ণ দাস। ভুলে এসেছে।
আরে লজ্জার কিছু নেই। ম্যাগাজিন গুলো নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে বললেন বস।আমি ও প্লে বয় ম্যাগাজিনের খুব ফ্যান ছিলাম এককালে।
আমরা সবাই চোখ গোল্লা গোল্লা করে তাকিয়ে রইলাম কৃষ্ণ দাসের দিকে।
বেচারা কাউকেই বোঝাতে পারছেন না। আমরা শুধু লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে লাগলাম।এমন সময় লাকড়ি দাস দৌড়ে এসে বলল- কৃষ্ণ দাদা স্টপ লাইট নাইট ক্লাব থেকে ম্যানেজার ফোন দিয়েছে। জানতে চেয়েছে আজ সন্ধ্যায় আপনি যাবেন কিনা ? ফিলিপাইন থেকেন নতুন নর্তকী এসেছে।
কৃষ্ণদাস বাবু শুধু কাতল মাছের মত মুখটা অব অব করে কিছু বলার চেষ্টা করলেন।কিছুই বলতে পারলেন না। আমাদের চক্রান্ত ঠিকই বুঝেছেন তিনি। সেই দিনের পর আর কখনই আমাদের বিরক্ত করতেন না।
১৯৯৮ সালের পর আর দেখা হয়নি তার সাথে। জানি না কোথায় আছেন।
এই দ্বীপের গ্রামগুলোর নাম বড় অদ্ভুত।চালানকিয়া, চালান লাউ লাউ, ডানডান, ফিনাসিসো, গোয়ালরাই, কাগমান, কোভলারভিল, লোয়ার বেইজ ( বাঙ্গালিরা বলে লোহার ব্রিজ) ,মারফি, নেভি হিল, অলেয়াই,পটোরিকো, সান রকি, সুসুপি, তানাপাগ, সানভিসান্থি, ক্যাপিটাল হিল,চালান কানুয়া, চালানপিও, পাপাগো, সানজসে আর সান আন্তিনিও।দ্বীপে মাত্র একটা শহর- গ্রারাপান।আর গ্রারাপানে হাঁটলে মনে হবে লাস ভেগাসে পৌছে গেছেন আপনি।
কি নেই গ্রারাপানশহরে ?
পুরো দ্বীপটা জ্যান্ত হয়ে উঠত বিকেলের পর থেকে। সারাদিন টুরিস্টগুলো সমুদ্র সৈকতে পড়ে থেকে সান বাথ করে কাঁকড়ার মত লাল হয়ে যেত।আদিবাসী ধীবররা চলে যেত মাছ ধরতে। নৌকা ভর্তি মারলিন, ,ওয়াহু( wahoo) , টুনা , ম্যাকরেল, মাহিমাহি , বিলফিস আরপ্যারট ফিস নিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতো ওরা। প্যারটফিস গুলো দেখতে হুবহু তোতা পাখির মত। শরীরের আঁশগুলো পযন্ত তোতা পাখির মত রঙিন- ঝলমলে। ঠোঁট পযন্ত তোতা পাখির মত।দেখলে ভয় ভয় করে।
কিন্তু অদ্ভুত রকমের স্বাদ।কেরোসিন কাঠের বাক্সে হীরের কুঁচির মত সাদা বরফ ঠাসা হত। সুন্দর করে মাছ গুলো সাজিয়ে রেখে চালান দেয়া হত দ্বীপের বড় বড় হোটেলগুলোতে। শুক্রবার রাতে দ্বীপটাতে নরক গুলজার হয়ে যেত। কারন পরের দুইদিন ছুটি।সারারাত গাড়ি ছুটে বেড়াত দ্বীপের এখানে ওখানে। সুপার মার্কেট গুলোতে ভিড়।সবাই কেনা কাঁটা করছে। মাংস আর বিয়ার হরিলুটের বাতাসার মত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে দোকান থেকে।
জমে উঠেছে নাইট ক্লাব, বার, বিচ ক্লাব, বিলিয়াড খেলার ক্লাবগুলো। মারামারি আর হাতাহাতিঘটছে কয়েকটা কুখ্যাত ক্লাবে। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জেলখানার ভেতরে কোলাকুলিকরে বন্ধু হয়ে যাচ্ছে ওরা। পরের সপ্তাহে এক সাথে বসে মদ গিলছে।শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই আদিবাসীরা দল বেঁধে চলে যেত সৈকতে।
মাছ, অক্টোপাস, স্কুইড ,ঝিনুক আগুনে ঝলসে খেত। রোববার সকালে কেউ কেউ গির্জায় যেত প্রাথনা করতে। আর সোমবারে ঢিমে তালে শুরু করতো সপ্তাহের প্রথম দিনটা।এই ভাবেই চলতো মাসের পর মাস। যুগের পর যুগ।অদ্ভুত এক জীবনযাত্রা। দুঃখ নেই। কষ্ট নেই।
শুধু উৎসব আর উৎসব।জীবন যেমনটা হওয়া দরকার আসলে।
দ্বীপের ঠিক মাঝখানেই মড়া তিমি মাছের মত শুয়ে আছে পাহাড়টা। পাহাড়টার নাম তাপোচাউ (Tapochau) । উচ্চতা ১৫৬০ ফুট। অনেক অনেক আগে দ্বীপের এক আদিবাসীসর্দারের নাম ছিল তাপোচাউ। সে নাকি প্রথম এই পাহাড়ের উপর উঠেছিল। সেই থেকেএই নাম ।
দ্বীপের যে প্রান্তে যান না কেন পাহাড়টা আপনার চোখে পড়বেই। কতগুলো সুন্দর সুন্দর বাড়ি রয়েছে পাহাড়ের উপর। খুবই ধনী লোকের বসত বাড়ি সে সব। পাহাড়ের চুড়োতে দানবের চোখের মত মিট মিট করত লালএকটা আলো। ওটা রেডিয়ো রিসিভার স্টেশন। আমেরিকানরা বসিয়েছে। হাওয়াই মেঠাইয়ের মত কয়েক দলা মেঘ সব সময় জমে থাকত পাহাড়টার গলার কাছাকাছি।
একবার পাহাড়ের উপরের ঘন জঙ্গলে কিভাবে যেন আগুন ধরে গিয়েছিল। টানা চারদিনধরে জ্বলেছিল সেই আগুন। রাতের বেলা দেখার মত একটা দৃশ্য হয়েছিল তখন।পুরো পাহাড়টা যেন জ্বলছে দাউ দাউ করে। দূর থেকে মনে হচ্ছিল পাহাড়টা যেন এক মুঠো ডালিম দানা দিয়ে তৈরি ।যতদিন বেঁচে থাকব মনে থাকবে।
আগুন নিভে যাবার আট মাস পযন্ত পাহাড়টা দেখতে ন্যাড়া ন্যাড়া লাগতো।পরে ধীরে ধীরে গাছপালা জন্মে আবার সবুজ হয়ে গিয়েছিল ওটা। একবার আদিবাসী এক সঙ্গীকে গাইড হিসাবে নিয়ে গিয়ে উঠলাম পাহাড়ের উপর। বেশ ঠাণ্ডা পাহাড়ের উপর।পুরো দ্বীপটাকে এক টুকরো রুটির মত দেখতে পাচ্ছিলাম চোখের সামনে। দূরের সৈকত যেন বাদামী রঙের একটা চুলের ফিতা। পিঁপড়ের মত গাড়ি। দেশলাইয়ের বাক্সের মত হোটেল। নীল পুঁতির মত হোটেলের সুইমিং পুল।
দেখতে পাচ্ছিলাম দূরের তিনিয়ান দ্বীপ। খুব বিখ্যাত দ্বীপ ওটা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওখানেই রাখা হয়েছিল পারমাণবিক বোমা তিনটে। দুটো বোমা নিয়ে ফেলা হয়েছিলহিরোশিমা আর নাগাসাকিতে। বদলে গিয়েছিল ইতিহাস।
এখানে সমুদ্রের রঙ তিন রঙের।
লেগুনের ভিতরে গাঢ় নীল রঙের। লেগুনের বাইরে ফিরোজা রঙের। তারপরই শুধুই নীল। তার ও পরে সমুদ্র যেন সীসের তৈরি।সমুদ্রের কয়েক জায়গায় ঝাঁক বেঁধে উড়ছে কিং ফিসার পাখী।কারন ওখানেই আছে মাছের ঝাঁক।আমি যে দ্বীপটাতে আছি এটার নাম সাইপান।মারিয়ানা দ্বীপমালার সবচেয়ে বড় আর ঘনবসতিপূণ দ্বীপ এটা। লোকসংখ্যা মাত্র৮০৩৬২ জন। দ্বীপের আয়ত্ন ৪৭ বর্গমাইল। পাশের দ্বীপ তিনিয়ান ৩৯ বর্গ মাইল।তারপর রোতা ৩২ বর্গ মাইল।মোট ১৪টা দ্বীপ আছে মারিয়ানা দ্বীপমালায়।উত্তর দিক থেকে ধরলে- ফারলন ডি পাজের। ময়াগ। আসনসন।আরিহান। পাগান।আলামাগান।গুগয়ান। সারিগান। আনাতাহান। ফারলন ডি ম্যাগ্যালান। সাইপান।তিনিয়ান। আগুয়ান।রোতা।
জুন-জুলাই এই দুই মাসে দ্বীপে একটা উৎসব হয়।নাম ফ্লেইম ট্রি ফেস্টিভ্যাল (flame tree festival) ।অর্থাৎ কৃষ্ণচুড়া গাছের উৎসব।ব্যাপারটা হয়তো বুঝতে পারছেন। গ্রারাপান শহর থেকে আমার প্রিয় সান আন্টোনিও গ্রামপযন্ত মোট ৯০০ কৃষ্ণচুড়া গাছ আছে।
১৯৬০ সালে ফ্রান্সি্সকো বরহা নামে এক সরকারি কর্মচারী চমৎকার এই গাছের চারা বুনতে শুরু করে দ্বীপের নানান জায়গাতে।সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সারা দ্বীপ ভরে গেছে এই কৃষ্ণচুড়া গাছে। জুন- জুলাইমাসে যখন মোরগের ঝুঁটির মত লাল টকটকে ফুলগুলো ফোটে তখন মনে হয় পুরোদ্বীপটাতে বোধহয় আগুন ধরে গেছে। দলে দলে জাপানি টুরিস্ট ছুটে এসে পাগল করা এই দৃশ্য দেখার জন্য। সারা দ্বীপ জুড়ে শুরু হয় উৎসব।ছুটির দিনে মা- কে লেখা চিঠিটা নিয়ে চালানকানুয়া গ্রামে যাই। দ্বীপের এক মাত্রপোস্ট অফিসটা আছে ঐ গ্রামে।বড় বড় তিনটে কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচেই পোস্ট অফিসটা।
সারাক্ষণ ঝুর ঝুর করে জ্বলন্ত কয়লার মত ঝরে পরে ফুলগুলো।
মায়ের কাছে লেখা চিঠিটা পোস্ট করে সৈকতের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি। ভাবতে ভাল লাগে বাড়ির সবাই ভাল আছে।
শুধু আমার জন্য রাখা দুধ মাখা ভাত কাকে খেয়ে যায়।সমুদ্রের নোনা বাতাসে মনটা বিবাগী হয়ে যায়।বাতাসে ভাসে অচেনা ফুলের রেণু। উত্তরের এই দ্বীপগুলো তেলরঙে আঁকা একটা ছবি বলে মনে হয়।নিয়তির কোন অমোঘ টানে এখানে চলে এসেছি কে জানে !
অনেকগুলো বছর ছিলাম দ্বীপটাতে। ভয়াবহ সব ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিবারবার।
শিকার করেছি বুনো শুয়োর। আদিবাসীদের ধাওয়া খেয়ে প্রান ভয়ে পালিয়েছি। তুচ্ছ কারনে বিবাদে জড়িয়ে গেছি প্রিয় বন্ধুর জন্য। গভীর অরন্যে জংলী কুকুরের পাল্লায় পড়েছি।পেয়েছি স্বর্ণ হৃদয়ের কিছু বন্ধু।কুটিল কিছু মানুষ।বন্ধুত্ব । প্রেম।দেখেছি ভয়াবহ সব সামুদ্রিক ঝড়।
ময়ূরকনঠী রাতে ভিজেছি তরল জোসনার আলোতে। দেখেছি নীল লেগুন ভর্তি রুপালী জেলি ফিসের ঝাঁক। শুনেছি ডলফিনের কান্না।
কত কি!
সময় আর সুযোগ পেলেই সে সব কাহিনি বলল আপনাদের কাছে।
শুনবেন আমার গল্প ?

মতামত জানান