আকাশটা হঠাত্ করে কেমন যেন ভীষণ গুমরা মুখ করে রেখেছে । মুহূর্তের মধ্যে সূর্যমামা লুকিয়ে গেছে কাল আঁধারে ঘেঁরা মেঘের চাদরে । এই বুঝি এখনি এক পশলা বয়ে যাবে ভূমির উপর দিয়ে । ওদিকে গরু দুটো মাঠে রয়েছে এখনো । সন্ধ্যে হওয়ারও বেশি দেরি নেই । তাই নিরীহ এ প্রাণী দুটোকে আনতে মাঠে চলল আমির হোসেন ।

সীমান্ত পাড়ের মানুষ ওরা । সেখানেই তাদের চাষ-বাষ করে খেতে হয় । সাথে দু একটা গরু-ছাগল পালন করলে একটু বাড়তি আয় পাওয়া যায় । এর জন্য আলাদা কোন খাটা-খাটনির প্রয়োজন হয়না তাদের । ক্ষেতের আশ-পাশের পতিত জমিতে ওগুলো সহজেই পালা যায় । মাঠের কাঁচা ঘাস খেয়েই ওরা বেশ মোটা তাজা হয়ে ওঠে ।

আমির হোসেন মাঠে এসে গাই গরুটা দেখতে পেলেও ষাঁড়টাকে দেখতে পেলনা । এদিকে আকাশের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে । তাছাড়া মাঠেও আর কাউকে দেখা যাচ্ছেনা । সবাই আগেই তাদের গরু-ছাগলগুলো নিয়ে চলে গেছে । আমির হোসেন চিন্তায় পরে গেল । খুঁজা শুরু করে দিল ষাঁড়টাকে । হঠাত্ ঝঁপ করে নেমে পরল বৃষ্টি ।

ষাঁড়টাকে খুঁজতে খুঁজতে আমির হোসেন একেবারে সীমান্তের কাছা-কাছি চলে এসেছে । কাঁটা তারের বেড়ার ওপাশেই ইন্ডিয়া । হঠাত্ তার চোখ পরল বিএসএফ এর একটি টহল ঘাঁটিতে । ওখানেই তার ষাঁড়টাকে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেল সে । ভয় পেয়ে গেল ও । কি করে ষাঁড়টাকে ফিরিয়ে আনবে ভাবতে লাগল সে । আশপাশে কোন বিজিবি টহল ঘাঁটিও নেই যে , ওদের মাধ্যমে ষাঁড়টাকে ফেরত আনবে ।

একবার ভাল মত চারদিকে তাকিয়ে বিএসএফ সদস্যদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইল আমির হোসেন । কিন্তু নাহ , কাউকে দেখা যাচ্ছেনা । তাই সাহস করে সীমানার ওপাশে চলে গেল সে । এরপর আস্তে আস্তে ষাঁড়টার কাছে এসে আরেকবার তাকাল , এবারও কাউকে দেখতে পেলনা । তখনো মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে । ভিজে চটকে গেছে আমির হোসেনের জামা-কাপড়গুলো । তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ষাঁড়টাকে বাঁধন খুলে এগিয়ে নিয়ে চলল ওপারের দিকে ।

ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠছে আমির হোসেনের । আর মনে মনে ভাবছে , এখন যদি কোন বিএসএফ সদস্যের চোখে পরে যায় , তাহলে নিশ্চিত মৃত্যু । কিন্তু না , ভাগ্য ভাল থাকায় কেউ দেখতে পেলনা তাকে । ষাঁড়টাকে নিয়ে ভালমতই ফিরে আসল সে । এরপর গরুদুটোকে নিয়ে রওনা দিল বাড়ির পথে । বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তারাও কেমন যেন চিমটা লেগে গেছে ।

পরদিন ভোরে গরুদুটোকে নিয়ে মাঠে এল আমির হোসেন । যথারীতি তাদের খুটিয়ে দিয়ে ক্ষেতের কাজে মন দিল সে । তখনো কেউ মাঠে আসেনি । আসলে আমির হোসেনকে ওবেলা বউটাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে । নতুন বিয়ে করেছে ও । আজ তাদের নায়র যাওয়ার কথা । তাই সকাল সকালই মাঠে এসে পড়েছে ও ।

আমির হোসেন কাজ করছে আর একা একাই হেসে ওঠছে নিজের সাথে । বউটার মুখখানা বার বার ভেসে ওঠছে চোখের সামনে । বউ তার ভারি মিষ্টি দেখতে । তবে একটু লাজুক স্বভাবের । লাজুক বউই পছন্দ আমির হোসেনের । কারণ সে মনে করে লজ্জাই হল মেয়েদের ভূষণ ।

হঠাত্ আমির হোসেনের চোখ গেল গরুদুটোর দিকে । দেখতে পেল দুজন লোক তার ষাঁড়টাকে নিয়ে সীমান্তের দিকে চলে যাচ্ছে । আমির হোসেন দৌড়াতে লাগল লোকদুটোর পেছনে । তাকে দৌড়ে সীমান্তের দিকে ছুটতে দেখল কালাম মুন্সী । কিন্তু বিষয়টিকে পাত্তা দিলেননা তিনি । মন বসালেন ক্ষেতের কাজে । ততক্ষণে এক এক করে সবাই মাঠে এসে কাজে লেগে পরেছে ।

আমির হোসেন দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে লোকদুটোকে ধরতে পেরেছে । ততক্ষণে তারা সীমান্তের খুব কাছা-কাছি চলে এসেছে । ওপারে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন বিএসএফ সদস্য । আমির হোসেন লোকদুটোকে তার ষাঁড়টা তাকে ফিরিয়ে দিতে বলতেই , সীমান্তের ওপার থেকে এপারে চলে আসল বিএসএফ সদস্যরা । এরপর তাদের মধ্য থেকে একজন ক্ষপ করে ধরে বসল আমির হোসেনকে । বাকিরা কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করে দিল ষাঁড়টাকে ধরে নিয়ে আসা লোকদুটোকে । ওরা দালাল বলে পরিচিত । চিনতে কষ্ট হলনা আমির হোসেনের ।

আমির হোসেন কাতর কন্ঠে অনুরোধ করল , স্যার ! আমার ষাঁড়টারে আমায় দিয়া দেন । সাথে সাথে রাইফেলের উল্টো পিঠ দিয়ে বেশ জোরে ওর তল পেটে একটা আঘাত বসিয়ে দিল একজন বিএসএফ সদস্য । ফলে জমিতে লুটিয়ে পরল আমির হোসেন । পরা মাত্রই সবাই মিলে এলোপাথারি পদাঘাত করতে শুরু করে দিল তাকে । ভারি জুতোর আঘাতে আঘাতে নাক মুখ ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল ওর । যন্ত্রণায় কোঁত্ কোঁত্ আওয়াজ করতে লাগল সে । ইচ্ছে মত পদধলিত করার পর , একজন বিএসএফ সদস্য তার রক্তে ভেজা চুলের মুঠি ধরে টেনে দাঁড় করাল তাকে । এরপর বলল , বেটা চোর ! সুযোগ পেয়ে সীমানা পার হয়ে ষাঁড়টা নিয়ে নিয়েছিস ! এখন বলছিস , এটা তোর ষাঁড় । আরেকজন বলে ওঠল , শালারা ! ভিক্ষারি হলে কি হবে , কলিজা ভরা সাহস ওদের । অন্যজন বলে ওঠল , ইচ্ছে করছে শালাকে গুলি করে পুঁতে দিই !

কিছুক্ষণ পর আমির হোসেনকে ফেলে রেখে গায়ে থুঁতু মেরে ষাঁড়টাকে নিয়ে সীমান্তের ওপাশে চলে গেল বিএসএফ সদস্যরা । আমির হোসেন কিছুই করতে পারলনা । শুধু শেষবারের মত ঝাঁপসা চোখে নিঃশক্তি শরীরটাকে কোনরকমে দাঁড় করিয়ে চিত্কার করে বলে ওঠল সে , আমার ষাঁড়টারে আমায় ফিরাইয়া দেন স্যার ! ওমনি একটা গুলি এসে লাগে তার ঠিক বুকের মাঝখানটায় । চিরনিদ্রায় হারিয়ে যায় সে । নায়র আর যাওয়া হয়নি তার নতুন বউকে নিয়ে ।

ওদিকে কালাম মুন্সী খেয়াল করল , সেই যে ছেলেটাকে দৌড়ে সীমান্তের দিকে যেতে দেখলাম , আরতো ফিরতে দেখলামনা ! তাই সবাইকে নিয়ে সীমান্ত পাড়ে ছুটে গেলেন তিনি । গিয়ে দেখলেন আমির হোসেন মরে পরে আছে সেখানে । তার মাথার পাশটায় ঠিক মুখের সামনে কিছুটা রক্ত জমে থাকতে দেখল তারা । আফসোস করে ওঠলেন কালাম মুন্সী । এসময় কেউ একজন ও পাড়ার বিজিবি টহল ঘাঁটিতে খবর দিলে কয়েকজন সদস্য ঘটনাস্থলে এসে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে । ততক্ষণে আমির হোসেনের বাড়িতে খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে কান্নার রোল পরে যায় সেখানে ।

এদিকে বিজিবি সদস্যরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিএসএফ প্রতিনিধি দলের সাথে পতাকা বৈঠকের আয়োজন করে । ঘটনার দায় স্বীকার করে বিএসএফ সদস্যরা ক্ষমা চায় বিজিবি সদস্যদের কাছে । ফিরিয়ে দেয় আমির হোসেনের ষাঁড়টাকে । কিন্তু ফিরে আসেনা আমির হোসেন । ততক্ষণে সে জানাযা শেষে শায়িত হয়ে গেছে গোরস্থানে….

মতামত জানান