বাংলা সিনেমায় – লেখায় দেশভাগের হতাশা,ক্ষোভ – অস্তিত্ব হারানোর ব্যথা যেমন উঠে এসেছে ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে। ভারতবর্ষের এই বিভক্ত হওয়া মনঃস্তাত্বিক ভাবে আঘাত করে ছিলো আরো একজন সাহিত্যিক কে। তার লেখাগুলোতেও উঠে এসেছে দেশভাগের পর অস্থিতিশীল সময়ের কথা, যন্ত্রণা, ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, দাঙ্গার আতঙ্ক, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বিদ্বেষ। তিনি আর কেউ নন উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত ছোটগল্পকার সাদাত হোসান মান্টো৷ উর্দু সাহিত্যের সেরা ছোটগল্পকার হলেও শুনলে অবাক হতে হয়, এই উর্দুতেই তিনবার অকৃতকার্য হয়ে চতুর্থবারে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন কোনোমতে। একুশ বছর বয়সে তার্কিক লেখক আবদুল বারি আলিগের সঙ্গে মান্টোর সাক্ষাৎ ঘটে।

এই সাক্ষাত মান্টোকে অনেক প্রভাবিত করে। আবদুল বারি আলিগ মান্টোকে রাশিয়ান ও ফারসি ভাষা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই মান্টো, ভিক্টর হুগোর “The last Day of a Condemned Man” এর উর্দু অনুবাদ করেন। যা পরবর্তীকালে “সারগুজাস্‌ত-ই-আসির”( এক বন্দীর গল্প) নামে উর্দুতে প্রকাশিত হয়।বিদেশী সাহিত্য উর্দু ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে মান্টো অন্য এক জগতের সন্ধান পান। কিছুদিন পর আবদুল বারি আলিগের পত্রিকাতেই ছদ্মনামে তার প্রথম গল্প ‘তামাশা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে মান্টো আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি যুক্ত হন ইন্ডিয়ান প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনে, এখানে তার আলাপ হয় লেখক আলি সর্দার জাফরির সাথে। ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার। ১৯৪১-১৯৪৩ সালের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি রেডিও নাটকও লিখে ফেলেন। ১৯৪৫ সালের মধ্যে ‘ধুয়া’, ‘কালো সালোয়ার’ এবং ‘বু’ নামে তার অন্যতম বিখ্যাত কিছু ছোটগল্প প্রকাশিত হয়। বলিউডের বহু সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার তিনি। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিং তার কৃতিত্ব। ১৯৪৭ এর আগস্টে তিনি খেয়াল করেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দ্রুতবেগে বোম্বেতে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক ঐ সময়টাতেই তিনি একজন মুসলিম হবার অপরাধে বোম্বে টকিজ ফিল্ম থেকে তার স্ক্রিন রাইটারের চাকরি হারান। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি শহর ছাড়তে বাধ্য হন।

শরণার্থী হিসেবে তিনি পরিবারসহ আশ্রয় নেন পাকিস্তানের লাহোরে।দেশভাগের কারণে যে মানুষগুলোর জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছিল, সাদাত হাসান মান্টো তার মধ্যে অন্যতম। দেশভাগ নিয়ে এ সময়টাতে ‘টোবা টেক সিং’, ‘ ঠান্ডা গোস্ত ‘ সহ আরো বেশ কিছু বিখ্যাত গল্প তিনি লেখেন।পাকিস্তানে থাকাকালে লেখক হিসেবে তাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া না হলেও তিনি সেসময় যেসব গল্প লিখেছিলেন, সেগুলোকেই তার সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে ধরা হয়। ব্রিটিশ শাসন আমলেই গল্পে অশ্লীলতা ছড়াবার দায়ে তিনবার তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো।৪৭ এর দেশভাগের পর তিনি যখন পাকিস্তানে চলে যান, তখন তাকে একই অভিযোগে আরো তিনবার অভিযুক্ত হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, “একজন লেখক তখনই কলম ধরেন, যখন তার সংবেদনশীলতা বা অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।” পাকিস্থানী সিনেমা ইন্ড্রাস্টিতে কাজ করার চেস্টা করেছিলেন।কিন্তু পরপর তার দুইটি সিনেমা ফ্লপ হয়। খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে পত্রিকাতে ছোটগল্প, রম্যরচনা লিখেই পরিবার চালাতেন। অতিরিক্ত মদ্যপান, চরম বাউন্ডুলে-বেপরোয়া জীবণযাপণে মান্টো “লিভার সিরোসিস” এ আক্রান্ত হন।

অপ্রতুল চিকিৎসা,আর্থিক অনটনে জর্জরির মান্টো ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি মাত্র ৪২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫০ সালে মান্টো স্বভাবসিদ্ধ বিদ্রুপে লিখেছিলেন, ‘এক দিন হয়তো পাকিস্তানের সরকার আমার কফিনে একটা মেডেলও পরিয়ে দেবে। সেটাই হবে আমার চরম অপমান।’ পাকিস্তানের জন্মের ৬৫ বছর উপলক্ষে ২০১২ এর অগস্টে পাকিস্থান সরকার ঠিক সেটাই করেছে। সাদাত হাসান মান্টোকে তারা ‘নিশান-এ-ইমতিয়াজ’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। যিনি তাঁর ‘এপিটাফ’ এ লিখে গিয়েছিলেন, ‘এই সমাধিতে টন-টন মাটির তলায় শুয়ে আছে সেই ছোটগল্পকার – যে ভাবছে, খোদা নাকি সে নিজে কে বেশি ভাল গল্পকার!’

মতামত জানান