ধারাবাহিক ঈশ্বরের বাগান - 4 পর্ব (5)
বসেছে বেণী। মরচে ধরা গেইটে নতুন রঙ করলে যেমন দেখায় বেণীর চেহারা তেমন লাগছে।
আমাকে দেখে থতমত খেয়ে গেল।
‘ ওস্তাদ সব সময় ভুল টাইমে এন্ট্রি মারেন ।’ বিব্রত গলায় বলল বেণী।
‘এখানে কি করছ তুমি ?’ জানতে চাইলাম। ‘ তোমাকে তো এই জায়গায় থাকার কথা না।’
‘ খিদে পেয়ে গিয়েছিল ওস্তাদ ।’ মিনমিন করে জবাব দিল বেণী । ‘ আপনার কাজ শেষ করেই বসেছি । চলুন গাড়িতে বসে কথা বলি।’
আমি বাইরে চলে গেলাম। পিছন থেকে বেণী বলল , ‘ মেয়েটাকে বিদায় করে আসছি।’
দুই মিনিট পর ফেরত এলো ।
আসলে দিনার বাসার পাশেই মেয়েটা থাকে। সাফাই গাইলো বেণী। ‘ মেয়েটা সুন্দরী না ওস্তাদ। কালোর মধ্যে ভাল। কবি বলেছেন গায়ের সবাই তাকে বলে কালো।’
‘কাজ কতদূর ?’
‘ খোঁজ নিলাম ওস্তাদ। যে রাতে দিনা খুন হয়েছিল দূইজন মানুষ অনিতাকে নদীর পারে যেতে দেখেছিল।’
কে কে ?
‘প্রথম জন এক সিঅ্যানজি ড্রাইভার । অনিতার পোশাকের বর্ণনা হুবহু দিয়েছে। কিন্তু চেহারা ভাল করে দেখতে পায়নি। নিজের চেহারা গোপন করে রাখতে চাইছিল মেয়েটা । অত রাতে অমন নির্জন জায়গায় যাবে দেখে ড্রাইভার কলগার্ল ভেবেছিল।’
‘ তখন সময় কত হবে ?’
‘ মধ্যরাত ওস্তাদ ।’
‘আর দ্বিতীয় জন ?’
একটা জাউল্লা । মধ্যরাতের পর চিংড়ি মাছ ধরার জন্য ঝাঁপি পাতে লোকটা। সেই রাতে হাফ চাঁদ ছিল। চাঁদের আলোতে অনিতাকে দেখেছে। কিন্তু পোশাকের রঙ সঠিক বলতে পারছে না।’
মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম , মনে হচ্ছে দিনাকে যখন খুন করা হয়েছিল ঘটনার খুব কাছেই অনিতা ছিল।’
গাড়ির ভেতর থেকে দিনার নীল সালোয়ার কামিজ বের করে বেণীকে দেখালাম , ‘ চিনতে পার ?’
‘হায় ভগবান।’ ওর লাল মুখটা আরও লাল হয়ে পাকা টম্যাটোর মত হয়ে গেল।
‘জুবায়ের আলমের কাঠের আলমারির ভেতরে পেয়েছি।’ ধীরে ধীরে সব খুলে বললাম। এমনকি আদিত্য লাল আর অনিতার বিকিনি পরা ছবিটার কথাও।
তাহলে কি জুবায়ের আলম হারামজাদা দিনাকে খুন করেছে ? রাগী গলায় জানতে চাইল বেণী।
‘চট করে বলা মুশকিল। কোন ধারনাই কিন্তু টিকছে না ।’ বললাম। ‘ একটা সিধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলি তখনই নতুন কিছু ঘটে আর আগের ঘটনার সাথে কোন ছকে যায় না। এখন একটা কাজ করা যায় বদমায়েশ মশিউর রহমানে বাড়ি চল। দুইজনে মিলে ভয় দেখিয়ে কথা আদায় করতে পারব।’
গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বললাম , হাবড়া মশিউরের সাথে কথা বলে সোজা অফিসে যাব। সব ঘটনার সুত্র মিলিয়ে দেখি কিছু পাওয়া যায় কি না।’
‘ আদিত্য লাল জুবায়েরে বাড়িতে কি খুঁজতে গিয়েছিল ওস্তাদ ?’ বেণীর প্রশ্ন।
‘কোন আইডিয়া নেই। তবে ভাগ্য ভাল ওর আগে আমি গেছি ওখানে। অনিতার ছবিটা সেইজন্য হাতে এসেছে । রাজশাহীর একটা স্টুডিয়োর নাম আছে ছবির পেছনে। কাল তুমি রাজশাহী যাবে। অনিতার অতীত নিয়ে খোঁজ খবর নিতে হবে তোমাকে। যে মেয়ে স্টুডিয়োতে বিকিনি পড়ে ছবি তোলে ওর মধ্যে মস্ত কোন ঘটনা না থেকেই পারে না।’
আমি শিউর , তুমি গেলেই মারাত্নক কোন খবর বের করে ফেলতে পারবে।’
পিছনের সীটে বসে বেণী মনোযোগ দিয়ে অনিতার সেই রক্ত গরম করা ছবিটা দেখছিল।
‘মারাত্নক ফিগার।’ বলল বেণী। ‘ ছবি তোলার মধ্যে কোন জড়তা নেই। ভাগ্যবান ক্যামেরাম্যান।’
নগর খানপুরের হাসপাতাল ছেড়ে শীতলক্ষ্যার পারে চলে এলাম। জায়গাটা খুব সুন্দর। এত বছরেও ঘিঞ্জি হয়ে যায়নি। সেই ১৯৮০ থেকে আজও আমার ভাল লাগে। বরফ কলে ছেড়ে গেলেই বড় বড় দুই কড়ই গাছ। চারিদিকে এত বালি মনে হয় সাগর সৈকতে এসে গেছি।
মজার ব্যাপার হল আমি জানি মশিউরের বাড়ি কোথায়। ছাত্র জীবনে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঐ জায়গায় গেছি বহুবার। নদীতে স্নান করার জন্য। ওখানে একটা দোকানে বড় বড় ডালপুরি বিক্রি করতো। কামড় দিলেই ঝুরঝুর করে ডাল বের হয়ে আসতো।
ওখানেই দোতলা নিঃসঙ্গ একটা বাড়ি আছে। হিন্দুদের বাড়ি। অনেক রঙ চোঙ্গ করা হয় না। বাড়িটার পজিশন কড়া। নদীর দুর দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায়। সারা বছর হা হা করে হাওয়া বয়। শীতে ইউরোপ মার্কা একটা আমেজ।
মূল রাস্তা থেকে লাল কাঁকড় বিছানো পথে টানা দশ মিনিট হাঁটলে বাড়িটা।
গাড়ির দরজা লক করে ধূলামাখা গরম কাঁকড়ের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
‘ চাঁদের আলোতে অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায় রাতের বেলা।’ বললাম। ‘ মশিউরের কাছে টেলিস্কোপ ছিল। অনেক কিছুই দেখেছে হারামজাদা।’
‘টাকা পয়সার অফার দিয়ে দেখি কি হয় ?’ বলল বেণী।
‘ আগে কথা বলি। প্যাচে ফেলে কথা আদায় করার কায়দাও জানি।’
বাড়ির সামনে বুনো গাছের দঙ্গল। যত্ন না নেয়ায় বিচ্ছিরি লাগছে। মস্ত একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ওর লাল ফুল ফেলে দিয়ে বাড়িটা একেবারে ল্যাবড়া থ্যাবড়া করে ফেলেছে। এত কিছুর মধ্যে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা।
নীচ থেকেই দেখলাম, ছাদের কোণে ছয় ইঞ্চি লেন্সের পেল্লাই এক টেলিস্কোপ রোদের আলো ঝিকিয়ে একচক্ষু দানবের মত নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছিল।
বাড়িটা এত নিঃসঙ্গ যে প্রানের কোন চিহ্ন নেই।
ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। পুরানো আসবাবে ঠাসা একটা রুম। একটা টেবিল।উপরে খবরের কাগজ। আধখাওয়া পাউরুটি আর আপেল।
চারিদিকে নোংরা আর রুচিহীনতার ছাপ। বেসিনটা পর্যন্ত ঘিনঘিনে।
‘কেউ আছেন ? ‘ জানতে চাইলাম।
জবাব নেই।
‘ব্যাটা ছাদে। মহিলাদের স্নান করার দৃশ্য উপভোগ করছে ।’ চোখ টিপে বলল বেণী ।
‘চল গিয়ে হাতে নাতে ধরি ব্যাটাকে।’ বললাম
ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কোণে সিঁড়ি। শব্দ না করে দুইজনে উপরে উঠলাম। আমি আগে। পিছে বেণী।
পিতলের তিনপায়া একটা চাকাযুক্ত স্ট্যান্ড। ওটার উপর টেলিস্কোপ ফিট করা। কাঠের একটা টুল। পাশে অযত্নে পড়ে আছে কয়েকটা মদের খালি বোতল। এক ঝাঁক নীল ডুমো মাছি উড়ছে। বিন বিন শব্দ। মাছিগুলো আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে উড়ে গেল। আবার ফিরে এসে বসলো খাবারের উপর।
মশিউর রহমান চিত হয়ে শুয়ে আছে। কপালের ঠিক মাঝখানে একটা গর্ত। মনে হয় হাতুড়ি দিয়ে কেউ বাড়ি মেরেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। জেলির মত মাত্র জমাট বেঁধেছে সেই রক্ত। মাছিদের উল্লাস।
একটা ব্যাপার নিশ্চিত বেচারা আর কখনই টেলিস্কপ দিয়ে নরনারীর গোপন মেলামেশা উপভোগ করবে না।
কখনই না।
‘হায় ভগবান।’ বেণী আমার কাঁধ খামচে ধরল।
বিকেল পাঁচটা দশ।
সুর্যের আলো জ্যামিতিক নকশা বানিয়ে অফিসের ভেতরে আসছে। সেই আলোতে অফিসটাকে ম্লান দেখাচ্ছে।
নিচের ফুটপাত গ্রীষ্মের স্বাদ পেয়ে ক্লান্ত।
কামরার ভেতরে পাগলের মত পায়চারি করছি আমি। বরফের মত মুখ কর্রে বসে আচছে কাঞ্চন।
‘আমরা কি জানতাম নাকি ?’ আগের কথার কখেই ধরলাম। ‘ নিচে দেখি দরজা খোলা। ভাাবলাম বুড়ো ভামটা ছাদে আছে। গেলাম। চিত হয়ে মরে পড়ে আছে। খুব বেশি হলে আধা ঘণ্টা আগে খুন হয়েছে।’
কাঁঞ্চন মোটেও উত্তেজিত হয়নি । শুধু তর্জনী আর বুড়ো আংঙ্গুল দিয়ে নিচের ঠোঁট টেনে ধরছে বারবার। তার মানে ঘটনা যে রকম হচ্ছে ওর পছন্দ না।
তারাতাড়ি যোগ করলাম , পাশের কৃষ্ণচুড়া গাছে কেউ উঠে গুলি করতে পারে। আবার খোদ মশিউর তাকে বাসার ভেতরে নিতে পারে। বাজি ধরে বলতে পারি, খোঁজ নিলে দেখা যাবে একই পিস্তল দিয়ে দিনাকে খুন করা হয়েছে।। অবস্থা দেখে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে পালিয়েছি।’
‘ ঘটনাটা বেশ গোলমেলে হয়ে গেল কিন্তু ।’ গম্ভীর গলায় বলল কাঞ্চন । ‘ তুমি যদি ওসি কাদেরকে আলিজান মীর্জার ব্যাপারে সব খুলে বলতে তবে হয়তো মশিউর বেঁচে থাকত আজ।’
‘হতে পারে।’ বললাম । ‘ কিন্তু সন্দেহ আছে আমার। ‘ মিজার মোল্লাকে এত কিছু বলেছে মশিউর কিন্তুত খুনির ব্যাপারে একটা শব্দও বলেনি। জাঁকির কথা বলেছে তখনও কিছু বলেনি। হয়ত খুনির কাছ থেকে কিছু নগদ কড়ি আদায়ের চেষ্টা করেছিল । নিজের মৃত্যুর জন্য ভামটা নিজেই দায়ী।’
‘মানলাম তোমার কথা।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাড়িয়ে চোখ কুচকে তাকিয়ে রইল দুরের কার্নিশে ঝুলে থাকা বিবাগী সূর্যের দিকে। ‘ এখন ওসি কাদের নতুন করে তোমার পিছনে লাগবে।
পুলিসের সাথে শত্রুতা করে এই দেশে টিকে থাকা অসমম্ভব। কিছু করতে হবেনা তোমার নামে আট দশটা মামলা দিলেই তুমি শেষ । কি করতে চাও এখন ?’
‘ বেণীকে রাজশাহী পাঠিয়ে দিয়েছি। অনিতার অতীতের কোন সুত্র পাওয়া যায় কিনা খোঁজ নিতে। তাছাড়া মেয়েটা ওখানেও লুকিয়ে থাকতে পারে। মেয়েটাকে দরকার । খুনের সময় ঘটনাস্থলে ছিল। তারপর যুবায়ের আলমের সাথে কথা বলব।’
‘ ভাল কথা, কিন্তু তুমি কি মনে করে ওর বাসা থেকে দিনার কাপড় চোপড় নিয়ে এসেছ ? এখন তো জুবায়ের সরাসরি বলবে অই জিনিসের ব্যাপারে সে জানেই না।’ আমার দিকে ফিরে বলল কাঞ্চন।
‘তাড়াহুড়ায় ভুল কর্রে ফেলেছি। স্বীকার করলাম। আবার হয়তো ভালই করেছি অদিত্য লাল গিয়েছিল ওখানে। হয়তো এইগুলো খুঁজতে ।’
‘আরেকটা পয়েন্ট । যুবায়ের আলমের বাসায় শুধু দিনার সালোয়ার কামিজ পেলে। কিন্তু জুতা বা অন্তবারস নেই কেন ?’
‘জানি না। তবে জুবায়ের হয়তো লুকিয়ে ফেলেছে।’
‘অদিত্য লালের বাসায় একবার গোপনে যাবে নাকি ? ‘
‘ গেলে ভাল হয়। কিন্তু আপাতত না।’
‘যা করার জলদি কর। পুলিশ কিছু করার আগে খুনিকে ধরতে হবে নইলে আমাদের সবারই বিপদ।’
‘ তুমি ডাক্তার শিকদার আলমকে ফোন দাও । দিনার কাপড় পরীক্ষা করতে দিয়েছিলাম। কোন ক্লু পায় কি না। ‘
কাঞ্চন ফোন করতে লাগল।
জানালার পাশে দাড়িয়ে দিশেহারা হয়ে ভাবছিলাম। আসলে হচ্ছে কি ? দিনার কাপড় খুলে নিয়েছে কেন হত্যাকারী ? অনিতা কেন নেকলেস দিতে গেল ?
কাঞ্চন ডাক্তারকে লাইনে পেয়ে ফোন দিল আমার হাতে। ডাক্তার সাহেব জানালেন দিনার কাপড়ে রক্তের দাগ , বালির কণা পাওয়া যায়নি । বা অন্য কোন রকম সুত্র ও উনি দিতে পারছেন না। ধন্যবাদ দিয়ে জানালাম খানিক পর এসে কাপড় দুটো নিয়ে যাব আমি।
কাঞ্চন জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে আছে।
‘সমম্ভবত অন্য কাপড় পরেছিল দিনা।’ বললাম। ‘ কপালে গুলি লেগেছে , কাপড়ে বালি বা রক্ত থাকবে না অসমম্ভব।’
‘খুন করার আগে শয়তানটা হয়তো ওকে বিবস্ত্র করিয়েছে ।’ বলল কাঞ্চন।
মাথার চুলে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে বললাম, ‘ আমি আর জকির যাচ্ছি জুবায়ের আলমের সাথে দেখা করতে। লোকটা বেশ খচ্চর । চাপ দিলেই খবর বের হবে আশা করছি। একা সামাল দেয়া কষ্ট হয়ে যাবে। সেইজন্য জাকিরকে নিচ্ছি।’
দরজার কাছে গেছি মাত্র। ডেস্কের ফোনটা বেজে উঠল ।
রিসিভার কানে তুলে মাত্র পাঁচ সেকেন্ড শুনে নামিয়ে রাখল কাঞ্চন। আমার দিকে চেয়ে বলল , ‘ পরিচিত এক কনস্টেবল টিপস দিলো ও সি মনঞ্জুর কাদের আসছে আমাদের এখানে। তোমার সাথে কথা বলতে চায় নাকি।’
‘ উনাকে বলবে আমি কো থায় সে খবর তুমি জান না। কাল সকালে তোমার বাসায় দেখা করব। আমার মোবাইল এখন থেকেই অফ কর্রে রাখছি।’
দৌড়ে ভাগলাম। লিফট দিয়ে নিচে নেমে গাড়ি চালু করতেই দেখি পুলিসের জিপ এসে থেমেছে আমার অফিসের নিচে। জিপের জানালায় মস্ত বড় মুখ নিয়ে খাই খাই চেহারা কর্রে বসে আছেন ওসি মন্ঞ্জুর কাদের।
আগের বার যেখানে গাড়ি পার্ক করেছিলাম এবার ও সেই জায়গায় রাখলাম।
‘খানিক হাঁটতে হবে। ‘ বললাম । ‘জুবায়ের আলমের বাড়ি পথের শেষ মাথায়।’
গাড়ি থেকে নেমে এলো জাকির। নীল লাল সিল্কের একটা রুমাল কায়দা করে গলার মধ্যে বেধে নিল। ভাব সাবে যেন গুণ্ডা পাণ্ডা একটা চরিত্র ফুটে উঠে।
‘ সমস্যা নেই। ‘ বলল জাকির। ‘ রাস্তা তো গরমে বাকরখানি হয়ে আছে। জুবায়ের সাহেব যদি বেলের শরবত বা কমপক্ষে লেবুর শরবত খাওয়ায় তবে দুঃখ থাকবে না।
‘সেই সম্ভবনা খুবই কম ।’ দিনার পোশাক একটা বাদামি রঙ্গের ব্যাগে করে এনেছিলাম । সেটা বগলে ঢুকিয়ে নিলাম । ‘ উনার কাছে লোহার বেশ কিছু অস্ত্র পাতি আছে। কে জানে কোপ ফোপ খাওয়ায় কি না ?’
‘ শুনেই ভাল লাগছে।’ বলল জাকির।
গাছের ছায়ার তলা দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে গেলাম দুইজনে।
‘ ভদ্রলোক যদি বাসায় থাকে তবে কথায় ব্যস্ত রাখবে।’ বললাম । ‘ আমি চুপি চুপি ভেতরে গিয়ে আগের জায়গায় দিনার কাপড় রেখে দিয়ে ফিরে এসে চাপ দিয়ে খবর বের করব। আরও ভাল হয় যদি দেখি উনি বাড়ি নেই।’
‘ যদি পুলিশে ফোন দেয় ? অন্যের বাড়িতে জোর করে অনুপ্রবেশের দায়ে কিনত্তু পুলিস আমাকে ছানা বানাতে পারে। ‘ ঠোঁট উল্টে বলল জাকির।
‘ ঝুঁকি আছেই।’ সত্য কথাই বললাম। ‘ ওটাই আমাদের পেশা। খেয়াল রাখতে হবে মোবাইল যেন হাতে না নেন।’
লোহার পেল্লাই ফটক ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম । বাগানে কেউ নেই। কার্নিশে কবুতর পায়খানা করছে।
‘ ব্যাটা মশিউরকে খুন করে পালিয়ে যায় নি তো ?’ সন্দেহ প্রকাশ করলাম।
‘ আমি দরজায় গিয়ে নক করি ?’ জানতে চাইল জকির ।
‘হ্যাঁ, সাহেবকে কথা বলে আটকে রাখবে। দোতলায় গিয়ে ফিরে আসতে আমার কমপক্ষে তিন মিনিট লাগবে।’
দরজার সামনে দাড়িয়ে বেল চাপলো জাকির।
খানিক দূরে দাড়িয়ে দেখছি আমি। জাকির আমার দিকে ফিরে ইশারায় জানালো ভেতরে কেউ নেই। ইশারায় বললাম আবার বেল বাজাতে। তাই করলো।
ঠিক তখনই আগাম কোন রকম সতর্ক ছাড়াই কানের কাছে গমগম করে উঠলো ভারি একটা কণ্ঠস্বর , ‘ আপনারা কে ? কি চাই ?’
মাত্র পা বাড়িয়েছিলাম। গর্জন শুনে ফিরে দেখি প্রায় ষাঁড়ের মত এক পুরুষ দাড়িয়ে আছে । মাথা ভর্তি কালো চুল। গায়ের রঙ বাদামী । বেশ অভিজ্যাতের ছাপ । সুদর্শন বলা যাবে না । তবে মেয়েরা ফিরে তাকাবে। হাব ভাব সফল ব্যক্তিদের মত ।
একদম চিন্তা না করেই বুঝলাম উনিই জুবায়ের আলম। দিনার বর্ণনা মতে মুভিস্টারদের মত পোশাক পড়েন । চাল চলনেও ।
এই মুহুরতে উনি খোবানী ফলের রঙের সিল্কের জামা আর সাদা লিলেনের প্যানট পরে আছেন। প্যান্টের ক্রিজ এত ধারালো যে পাউরুটি কাটা যাবে । পায়ে বাছুরের চামড়ার শাদা জুতা। উঁকি দিচ্ছে বাদামি মোজা। অসুরের মত লোমশ হাতে সোনার ঘড়ি । গলায় সবুজ টাই। দর্জির দোকান থেকে নিজের নাম সেলাই কর্রে নিয়েছেন টাইয়ে ।
‘আপনি নিশ্চয়ই জুবায়ের আলম ?’ জানতে চাইলাম ।
‘ যদি হই তাহলে খুশি হন ?’ ফাটা বাঁশের মত গলা ভদ্রলোকের । যে কেউ কথা বলতে গেলে থতমত খেয়ে যাবে।
মোটেও পাত্তা দিলাম না।
ইউনিভার্সেল সার্ভিসের একটা কার্ড ধরিয়ে দিলাম উনার হাতে। খানিক সময় নিয়ে দেখে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন , ‘ দুঃখিত , এই মুহুরতে আপনাদের কোন সার্ভিসের দরকার নেই আমারি। বাড়ি পরজন্ত আসার জন্য ধন্যবাদ। কখনও দরকার মনে করলে জানাব ।’
‘ আপনাকে কোন সার্ভিস নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি না।’ বললাম । ‘ আমাদের এক ক্লায়েনটের মিসেস আপনার কাছের বান্ধবী । খানিক আলোচনা করা দরকার । আশা করছি আমাদের সাহায্য করবেন । ‘
ভদ্রলোকের চেহারা থেকে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের ভাব চলে গিয়ে সতর্কতা ফুটে উঠলো । হাত তুলে লোহার গেইট দেখিয়ে বললেন , ‘ আবারও দুঃখিত । সময়ের খুব অভাব আমার। তাছাড়া অচেনা যার তার সাথে আড্ডা মারি না আমি।’
‘আমাদের যে তথ্যগুলো দরকার, পুলিশের কাছে গেলেই পেয়ে যাব।’ বললাম । ‘ কিন্তু পুলিশদের তো আপনি চেনেন। কথার বলে পুলিশ টাকার গন্ধ পেলে ওদের মায়ের ভাতারকেও ছাড়ে না। সেইদিক দিয়ে আমরা কিন্তু ভদ্রলোক। আমাদের কাছ থেকে আপনি অন্তত ব্যবহারটা ভাল পাবেন।’
ট্রাউজারের পকেট থেকে এক হাত বের করে চারকোনা চোয়াল খানিক ঘষল সে। চেহারায় বরফ ঢাকা পাহাড়ের গাম্ভীর্য । ‘ কি চান আপনারা ? যা বলার জলদি বলুন।’
‘দুঃখিত । আমাদের বিষয় বস্তু খুব জটিল, এই খানে দাড়িয়ে বলা যাবে না। ভেতরে চলুন। বসে সব বলি। নাকি ? ‘
এক মুহূর্ত ইতস্তত করল লকটা। বার কয়েক জাকির আর আমার চেহারা দেখল । শেষে বিরক্ত মাখা গলায় বলল , ‘ ঠিক আছে চলুন।’
হনহন করে দরজা খুলে ভেতরে চলে গেলেন জুবায়ের আলম । দেখার প্রয়োজন মনে করলেন না আমরা আসছি না দাড়িয়ে আছি। কামরার ভেতরে ঢুকে সোজা চলে গেলেন লিকার ক্যাবিনেটের দিকে। কাচের পাল্লা খুলে ফেলতেই দেখলাম ভেতরে দারুণ সব বোতল দিয়ে ভর্তি । ক্যাবিনেটের মধ্যখানে পিচ্চি একটা ফ্রিজ ও আছে। সারা জীবনে যতগুলো হোমবার দেখেছি এটা সেরা।
বেশ কিছু ফুল লতা পাতার খাঁজকাঁটা টাম্বলার ও আছে।
আড় চোখে দেখলাম হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে জাকির।
একটা গ্লাস বেছে নিয়ে হুইস্কি দিয়ে অর্ধেক ভর্তি করলেন। মিনিফ্রিজ থেকে বরফ আর সোডা বের করে গ্লাসে ঢেলে বন্ধ করে দিলেন ক্যাবিনেট। আমাদের অফার করবেন না বুঝে গেলাম।
‘আপনার খেজুরে আলাপ শেষ করুন।’ ধপাস করে সোফার বসে বললেন ষাঁড় ।
প্রথম চুমুক দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর বগল থেকে বাদামি ব্যাগ করে তার কোলে ফেলে বললাম , ‘ এই জিনিস আপনার আলমারিতে এলো কি ভাবে ?’
ব্যাগ থেকে দিনার কাপড় বের করে উল্টে পাল্টে দেখে অবাক হয়ে তাকালেন । চেহারায় নির্জলা বিস্ময়। ‘ এই সব কি ?’
‘এই কাপড় আপনার আলমারিতে এলো কি ভাবে ?’ একই প্রশ্ন আবার করলাম। কঠিন চীজ ।
দিনার কাপড় দুটো মেঝেতে ফেলে দিলেন জুবায়ের আলম। গ্লাসে বড় বড় কয়েকটা চুমুক দিয়ে পাশের টেবিলে রেখে বললেন, ‘ আপনি কি মাতাল ? না কি গরমে মাথা খারাপ হয়ে গেছে ?’
‘ কোনটাই না। কয়েক ঘণ্টা আগে আমি আপনার বাসায় গোপনে ঢুকেছিলাম। দোতলায় কাঠের আলমারি মধ্যে পেয়েছি এই পোশাক।’
‘তাই নাকি ?’ ভদ্রলোকের চেহারায় নির্জলা বিস্ময় ফুটে উঠলো । টিটকারির হাসি হেসে বললেন, জিনিসগুলো আপনি নিয়ে গেছেন ? আবার ফিরিয়ে এনেছেন ? কি সব কাহিনি বানান ভাই । দুর্বল লজিক।’
‘ পরীক্ষা করার জন্য নিয়েছিলাম। রক্তের কোন দাগ পাওয়া যায় কি না সেটা জানতে চেয়েছিলাম।’
আচমকা সোজা হয়ে বসলেন জুবায়ের আলম। উজ্জল হয়ে উঠলো দুই চোখ । ‘ রক্তের দাগ ? কি বলছেন ?’
‘দিনা নামের একটা মেয়ে আমার কর্মচারী ছিল। নারায়ণগঞ্জের বরফকলের ওখানে খুন হয়েছে মেয়েটা । ওর পোশাক এই সব। আপনার আলমারিতে এলো কি ভাবে ? ‘
‘আমি জানি না ।জানতে চাইও না। এই বঙ্গ বাজারের কাপড় নিয়ে বিদায় হন আমার চোখের সামনে থেকে।’
‘ দিনা মেয়েটার খুনের পিছে আপনারও হাত থাকতে পারে।’ শান্ত গলায় বললাম। ‘ সেইরকম প্রমাণও আমাদের হাতে আছে। মেয়েটা অনিতা মির্জার উপর নজর রাখছিল। অনিতার সাথে আপনার পাউরুটি আর মাখন মার্কা সম্পর্ক । ‘
শেষের কথাটা যেন মস্ত আঘাত করলো লোকটার মুখে। সামনে কাঁটা তারের বেড়া দেখে যেন থমকে গেল বুনো মোষ ।
‘সস্তা কায়দা। ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছেন মনে হচ্ছে।’
‘কল্পনার থ্রিলার কাহিনি বানিয়ে লাভ নেই।’ বললাম। ‘ নিহত মেয়েটা আমার কর্মচারী । সাধারণ তদন্ত করছি আমি। মেয়েটার কাপড় আপনার আলমারিতে এলো কি ভাবে ? ‘
‘ ভাল, ভাল, ভাল।’ হাসি মুখে মাথা নাড়লেন তিনি। সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে পকেটে হাত ভরে মোবাইল ফোন বের করতে করতে বললেন, ‘ আমি ফোন করে পুলিশ ডাকছি। সস্তা ব্ল্যাকমেইলার কি ভাবে শায়েস্তা করতে হয় ভাল করেই জানা আছে আমার। আপনার রোমাঞ্চ উপন্যাস যা বলার পুলিশের সামনেই বলবেন।’
জাকির ছায়ার মতই উনার পিছনে দাড়িয়ে ছিল। থাবা মেরে বসল আচমকা। বাচ্চাদের হাত থেকে খেলনা ছিনিয়ে নেয়ার মত করে মোবাইলটা নিয়ে গেল । চাপ দিয়ে মোবাইলের ব্যাটারি আর সিম খুলে ফেলে সবগুলো জিনিস সাজিয়ে রাখল টেবিলের উপর। হাসিমুখে জুবায়ের আলমের দিকে ফিরে বলল , আরও মোবাইল আছে নাকি ?’
লোকটার প্রতিক্রিয়া হল দেখার মত। পাই করে ঘুরে হাতুড়ির মত মুঠো দিয়ে ঘুসি বসিয়ে দিল জাকিরের মাথায়। ভালই মেরেছে। ছিটকে টেবিলের সাথে বাড়ি খেয়ে মেঝেতে পরে গেল জাকির।টেবিলটা ও উল্টে পাল্টে চার ঠ্যাং উপরে দিয়ে পরে রইল ।
এবার চিলের মত উড়ে এলো আমার দিকে।
তৈরিই ছিলাম।
উনি আমাকে ঘুষি মারতেই চট করে মুখটা সরিয়ে নিলাম। ভারসাম্য হারিয়ে আমার সামনে চলে এলেন । যেন ঈদের কোলাকোলি করতে চান। গায়ের জোড়ে সাহেবের চোয়ালে মেরে বসলাম।
খটাশ করে শব্দ হলও। ভালই লাগল শব্দটা শুনে । দুই কদম পিছিয়ে গেলেন উনি। চোখ বড় বড় হয়ে খোসা ছাড়ান লটকার মত দেখাচ্ছে। ভদ্রতা বজায় রেখে চিত হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন। শব্দ শুনে মনে হল দৈত্য পরে গেল।
‘ দারুণ কাজ দেখিয়েছেন বাদল ভাই ।’ মেঝে থেকে উঠে জামার কলার ঠিক করতে করতে বলল জাকির । ‘ এবার আমরা খানিটা মদ্যপান করব । দেখি কোন শালা বাধা দেয়।’
‘আমার জন্যও ভাল করে এক পেগ বানাও দেখি ।’ অজ্ঞান দৈত্যের দিকে চেয়ে বললাম ।
চোয়াল ডলতে ডলতে লিকার ক্যাবিনেটের দিকে গেল জাকির । দুই গ্লাস ককটেল বানিয়ে একটা তুলে দিল আমার হাতে। এক চুমুকে অর্ধেক খালি করে গ্লাসটা সোফার পাশের টেবিলে রেখে বসে পড়লাম । জুবায়ের আলমের জন্য খানিকটা খারাপ লাগছিল। ভদ্রলোক হয়তো সত্যি সত্যি কিছুই জানেন না। উনার আচরন অপরাধীদের মত মনে হয়নি । কে জানে কেউ হয়ত উনাকে ফাঁসাতে চেয়েছিল। আমার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারেনি ।
‘ যদি পুলিশি ঝামেলা না চাই তবে আরেকটু কায়দা করে কাজ করতে হবে আমাদের । ‘ বললাম ।
জাকির নিজের গ্লাস খালি করে আরেকটা ককটেল বানানো শুরু করেছে। জীবনেও ওকে এত খুশি দেখিনি ।
‘আমাদের কোন দোষ নেই ।’ জবাব দিল জাকির । ‘ নন্দলাল বাবুই প্রথম মারামারি শুরু করেছে। আমরা আত্নরক্ষার চেষ্টা করেছি মাত্র। তবে ব্যাটাকে দিয়ে কথা বের করতে হবে।’
সোডার বোতলটা নিয়ে জুবায়েরের মুখে মাথায় হিসসস করে স্প্রে করে দিল।
জুবায়ের আলম ধীরে ধীরে চোখ খুলে আমাদের দিকে তাকালেন।
‘উঠে পড়ুন স্যার ।’ বিনয়ের সাথে সোডার বোতলটা দেখিয়ে বলল জাঁকির । ‘ অনেক কথা আছে আপনার সাথে। দয়া করে নিজেকে জ্যাকি চ্যান প্রমাণ করতে যাবেন না। তাহলে পরের কিস্তির ঘুম আর ভাঙবে না।’
জুবায়ের আলম টালুমালু করে উঠে দাঁড়ালেন । গলার ঝুলানো টাই দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিলেন । অন্য সময় হলে হেসে ফেলতাম।
বিড়ালের মত গুটি গুটি পায়ে গিয়ে বসে পড়লেন সোফায় ।
‘আমরা প্রথম থেকেই শুরু করি ।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম । ‘ কাঠের আলমারিতে এই কাপড় গেল কি ভাবে ?’
লম্বা সময় চুপ থাকার পর দাঁত মুখ খিচিয়ে বললেন, ‘ কতবার বলব ? আমি জানি না কি প্যাঁচাল পারছেন । টপিকের মাথা মুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।’
সমস্যা হল, আমারও সেই রকম মনে হচ্ছে।
‘ঠিক আছে। আপনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। আমি বুঝিয়ে বলছি । তিনদিন আগে আলিজান মির্জা সাহেব আমাকে ভাড়া করেছিলেন। উদ্দেশ উনার স্ত্রীর উপর আমি যেন নজর রাখি। কেন সেটা জানার দরকার নেই। দিনা নামে এক মেয়ে আমার হয়ে মির্জার স্ত্রীর উপর নজর রাখছিল। সেই জানায় আপনি এবং অনিতা বেশ মেলামেশা করতেন। এবং সেটা
গোপনে। গতরাতে কে যেন মেয়েটাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে যায়। ওর লাশ পাওয়া গেছে বরফকল গুদারা ঘাটের ওখানে।
পুলিশকে আমরা এইসব জানাইনি । কারণ আমাদের ব্যবসার পলিসি ক্লায়েন্টকে নিরাপদ রাখব। নিজেরাই তদন্ত শুরু করেছি। অনিতা মির্জা গায়েব হয়ে গেছেন ঘটনার রাত থেকেই। আমি গোপনে আপনার বাসায় এসেছিলাম। ভেবেছি অনিতা লুকিয়ে আছে আপনার কাছেই। ওকে পাইনি। কিন্তু আপনার আলমারিতে দিনার এই কাপড় পেয়েছি। জিনিসদুটো আপনার কাছে কেন এর একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আমি পাওনা। সেটা দিতে না পারলে ধরে নেব মেয়েটার খুনের জন্য আপনার হাত আছে। তখন আমি বৈধ অবৈধ সব রকম অ্যাকশন নিতে বাধ্য হব। মনে রাখবেন দিনা জানত আপনি আর অনিতা রঙ্গলীলা করেন। হয়ত হাতে নাতে আপনাদের ধরে ফেলেছিল। মাথা গরম করে গুলি করে বসেছেন আপনি। এতক্ষণ ধরে যে বয়ান দিলাম সেটা বুঝতে পেরেছেন ?’
গোল্লা গোল্লা চোখে অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলেন ভদ্রলোক।
বিস্মিত গলায় বললেন, ‘ আরে ভাই কাল রাতে আমি শহরেই ছিলাম না। মাত্র ফিরলাম। দিনা না সিনা অকে চোখেও দেখিনি।’
আমি আর জাকির দ্রুত একে অপরকে দেখে নিলাম।
‘কোথায় ছিলেন কালকে রাতে ?’
ঢাকায়।’ লোকটার চেহারা থেকে আত্নবিশ্বাস আর প্রসন্নতা হারিয়ে গেছে। ‘ গত পরশু দিন আমি নিজের গাড়ি নিয়েই ঢাকা গিয়েছিলাম। বিশ্বাস না করলে গাড়ির ভেতরে যাত্রাবাড়ী হাইওয়ের টোলের রিসিট পাবেন।’
‘কোথায় রাত কাটিয়েছিলেন ?’
‘একটা মেয়ের সাথে।’
জাকির একটা কার্ড আর পেন্সিল বাড়িয়ে দিয়ে মিশুক দোস্তি মার্কা গলায় বলল, ‘ মেয়েটার নাম ঠিকানা লিখে দিন ।’
জুবায়ের আলম জাকিরের দিকে কাপালিকদের মত চোখে চেয়ে বললেন , ‘ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না ?’
‘উনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না। আপনার গল্পটা সত্যায়িত করে নিতে পারব। মেয়েটা সাক্ষী দিলে আপনি বরং নিরাপদেই থাকবেন। ‘
জুবায়ের আলমের মুখের হাসি দেখে মনে হল মুখের ভেতরে টক আম ঠেসে রেখেছেন।
‘মেয়েটার নাম লায়লা । গুলশান দুইয়ের ‘উতলা হাওয়া’ এপার্টমেন্টের চার তলায় থাকে।’ চিড়বিড় করে বললেন জুবায়ের আলম ।
‘আপনার প্রেমিকা। আপনার পক্ষেই বলবে তাই নয় কি ?’ বললাম।
‘ দারোয়ান আমাদের এক সাথে দেখেছে। লিফটম্যান ছোকরাটাও দেখে চেনবে। পাশেই একটা বার আছে। কাল সেখানেই ড্রিঙ্ক করেছি। বারম্যান ও সাক্ষী দেবে। আজ দুপুর তিনটের সময় উতলা হাওয়া থেকে বের হয়েছি। ‘
মেয়েটা দেখতে কেমন ?’ বেহায়ার মত বলল জাকির ।
ভদ্রলোক জবাব দিলেন না।
‘কিন্তু দিনার কাপড় কি ভাবে আপনার আলমারিতে গেল সেটা এখনও ক্লিয়ার না ।’
‘সেটা আমিও জানি না। ধারনা করছি আপনারা দুই পোঁঙটা পোলাপান মিথ্যা গল্প ফেঁদে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছেন । ‘
‘দোতলায় গিয়ে আবার চেক করতে চাই। মেয়েটার জুতা আর অন্তবাস পাইনি গতবার।’
নিশ্চয়ই পাবেন।’ কাপালিকের মত চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। সাগর কলার মত মোটা আঙ্গুল দিয়ে টেবিলে তবলা বাজাতে বাজাতে বললেন , ‘ ‘হয়তো তখন রেখে গেছেন। এইবার নিশ্চয়ই পাবেন।’
‘আমরা সেই কিসিমের মানুষ নই। চলুন, আপনিও আমাদের সাথে।’
ত্রিরত্ন দোতলায় উঠে এলাম মিছিলের সংগ্রামী সাথীদের মত করে ।
বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না। বাথরুমের তোয়ালের স্তূপের মধ্যে দিনার জুতাজোড়া জাকির খুঁজে পেল ।
‘ বাহ, একেবারে নিখুঁত ফাঁদ।’ আমাদের উদ্দেশ্যে টিটকারি মেরে বললেন জুবায়ের ।
কিন্তু মোজা বা অন্তর্বাস পাওয়া গেল না। অনেক খুঁজেও । বদলে অন্য কিছু মেয়েলি কাপড় পাওয়া গেল। ভদ্রলোক ব্যাখ্যা করলেন কোন এক মেয়ের সাথে উনার সম্পর্ক ছিল। সেই মেয়ের জিনিস ।
ঈর্ষা ভরা চোখে জাকির চেয়ে রইল ভদ্রলোকের দিকে ।
আমরা আবার নিচে চলে এলাম । বাদামি কাজগের ব্যাগে দিনার কাপড় আর জুতা জোড়া রেখে দিলাম মমতার সাথে। জুবায়ের আলম সাহেব কি মনে করে তিনজনের জন্যই হুইস্কি আর সোডা দিয়ে ককটেল বানিয়ে তুলে দিলেন আমাদের হাতে।
এতক্ষণে আমি নিশ্চিত ভদ্রলোক আসলেও কিছু জানেন না। জুতা জোড়া জখন আবিষ্কার করেছি তখন আড়চোখে চেয়ে দেখেছি উনার চেহারায় রাজ্যের বিস্ময় ।
‘আমাকে কি একজন খুনি বলে মনে করছেন ?’ অর্ধেক গ্লাস খালি হবার পর জানতে চাইলেন উনি।
‘মনে হচ্ছে জিনিসগুলো আপনাকে ফাঁসানোর জন্য বাসায় কেউ রেখে গেছে।’ মনের কথাটাই বললাম ।
‘আমি কসম খেয়ে বলছি কেউ আসলেও আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। কিন্তু কে হতে পারে ?’ ভদ্রলোক বেশ সিরিয়াস গলায় বললেন ।
‘সেটা তো জানি না, তবে পুলিশের হাতে এই জিনিসগুলো পড়লে মস্ত বিপদে পরে যেতেন আপনি। একজনকে পেলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যেত। অনিতা মির্জা । আপনার ধারনা আছে শয়তান মহিলাটা কোথায় আছে ? ‘
মাথা নিচু করে রইলেন জুবায়ের আলম । ‘ তিন দিন আগে ওর সাথে আমার শেষ দেখা। সেই রাতে আমরা ডিনার করেছিলাম ।’
‘ কিভাবে পরিচয় হয়েছিল ?’
‘কিল্লারপুলের ওখানে নদীর ধারে একটা খোলা জায়গায় বসে বসে ূর্যাস্ত দেখছিল। সে ছিল নিঃসঙ্গ । আমি ছিলাম ভাগ্যবান। স্বামীর সাথে সুখী না অনিতা ।’
‘কতদিনের পরিচয় আপনাদের ?’ কঠিন চোখে তাকালাম ।
‘মাত্র দশদিনের।’ কেমন একটা মসলা মাখানো হাসি হেসে বললেন , ‘ পাখি যদি উড়ে আসে দানা খাওয়ার জন্য আমি কি করতে পারি ?’
‘উনার সাথে কখনও কেনাকাটা করতে গিয়ে কোন রকম বেখাপ্পা জিনিস চোখে পরেছে ? বা আপনার বাসায় আসার পর কিছু চুরি গেছে আপনার ?’
কথাটা বুঝতে খানিক সময় নিলেন । আচমকা চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘ তাহলে এই ব্যাপার। আলিজান মির্জা সেইজন্য আপনাকে হায়ার করেছে। হাত টানের অভ্যাস আছে মহিলার ?’
‘আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।’
‘না, আমার কিছু চুরি যায়নি বা দোকান থেকেও কিছু গায়েব করতে দেখিনি ।’
মাথার চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে বললাম, উনি জানতেন উনাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। আপনাকে কিছু বলেছে ?’
‘হ্যাঁ, বলেছিল একটা মেয়ে ওকে ফলো করছিল নাকি।’
‘অনুমান করা হচ্ছে উনাকে কেউ ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল । জানেন কিছু ?’
‘নাহ, একদম নতুন জিনিস শোনালেন।’ আকাশ থেকে পড়লেন তিনি। তর্জনীর আঙ্গুল দিয়ে গ্লাসের গায়ে টোকা দিতে দিতে বললেন, ‘ কিন্তু শেষবার যখন আমাদের দেখা হয়েছিল অনিতা আমার কাছ থেকে টাকা ধার চেয়েছিল ।’
‘ কত ?’
কেমন একটা মসলা মাখানো হাসি হেসে বললেন, ‘ তা জানি না ধারের কথা বলতেই আমি বলেছি বিবাহিত মহিলাদের আমি টাকা ধার দেই না।’
‘ দিলীর খান খুশনবীশ নামে কাউকে চেনেন ?’
‘এই কাহিনিতে উনিও আছেন নাকি ?’
‘থাকতেও পারেন। চেনেন ?’
‘চিনি। উনার একটা ক্লাব আছে। রেড ড্রাগন ক্লাব। আগে মাঝে সাঝে যেতাম ।’
‘অনিতা কি রেড ড্রাগন ক্লাবে যেত ?’
মোটামুটি ছকটা ধরে ফেলেছি।
শক্ত হয়ে গেল জুবায়ের আলমের চেহারা । ‘ এত কথা জিজ্ঞেস করার মানে কি ?’
‘আবার মনে হচ্ছে সোডার পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে ব্যাটাকে।’ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল জাকির ।
‘অাদিত্য লাল নামে কাউকে চেনেন ?’ জানতে চাইলাম।
‘সেই ছোকরা ড্রাইভারটা তো ? চিনি। দুই একবার রেড ড্রাগন ক্লাবে এসেছিল।’
‘আমি তো ভেবেছিলাম ব্যাটা বাড়ির দারোয়ান ।’
‘হতে পারে। তেমন কিছু জানি না ওর নাম ছাড়া ।’
‘ অনিতার একটা ছবি পেয়েছি। মেয়েটা কি দিয়েছিল আপনাকে ?’
‘ছবিটা দারুণ না ?’ কেমন একটা মসলা মাখা হাসি দেখা গেল ভদ্রলোকের মুখে । ‘ হু, আমাকে গিফট করেছে ।’
ছবিটা কোথায় বা কবে তুলেছে জানেন কিছু ?’
‘রাজশাহীতে কোন একটা শো-তে নাকি তুলেছিল। বেশ কয়েক বছর আগে। ছবিটা আপনার কাছে ?
‘হ্যাঁ, ফেরত পাবেন না।’
দরকার নেই।’ মসলা মাখা হাসি দেখা গেল আবার । ‘ অমন প্রচুর ছবি আছে আমার কাছে। কাপড় চোপর ছাড়া মেয়েদের এইসব ছবি এক কথায়…।’
‘আমরা চলে যাচ্ছি। এই যে আড্ডা দিলাম সেটা জনে জনে বলে বেড়ানোর দরকার দেখি না।’ বললাম ।
বাদামি কাগজের ব্যাগটা তুলে জাকিরকে ইশারা করলাম । কারো দিকে না চেয়ে গটগট করে সোজা বাইরে গিয়ে দাঁড়াল । আমিও বের হয়ে গেলাম।
পাথরের কুঁচি বিছানো পথ হেঁটে বাগানের বাইরে গিয়ে বড় রাস্তায় নামলাম দুই সহযোগী ।
‘ গরুটাকে সেই রকম একটা ঘুষি মেরেছেন বাদল ভাই । এক কাপ চা আর আধা কেজি জিলিপি পাওনা আপনার ।’
আচমকা বলে বসল জাকির ।
‘ সন্দেহের তালিকা থেকে আমরা প্লে বয় জুবায়েরকে বাদ দিতে পারি । ‘ চিন্তিত ভাবে বললাম । ‘ সন্দেহ ফিরে আসে লালের উপর । ব্যাটা কি করছিল জুবায়েরের বাড়িতে ? কি খুঁজছিল ?’
গাড়িতে উঠে বসলাম । ‘ তুমি জুবায়েরের গল্পের সত্যতা যাচাই কর । সত্যি সত্যি শহরের বাইরে ছিল নাকি ?’
‘ লায়লা মেয়েটার সাথে আজ সন্ধ্যায় দেখা করতে যাচ্ছি বাদল ভাই।’ বলল জাকির । ‘ মেয়েটা যদি পাত্তা দেয় ফিরতে দেরি হতে পারে ।’
‘ মনে হয় না তোমার চেহারা দেখে গলে যাবে । কাজ শেষ কর । ফোনে যোগাযোগ করবে না। আমাদের সবার ফোন কল রেকর্ড রাখবে ওসি কাদের ।’
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মিশে গেলাম গাড়ির অরণ্যে । শহরের দিকে যাচ্ছি।
Series Navigation<< ঈশ্বরের বাগান – তৃতীয় পর্বঈশ্বরের বাগান – পঞ্চম পর্ব >>

মতামত জানান