ধারাবাহিক ঈশ্বরের বাগান - 3 পর্ব (4)
মিনা বাজারের ব্যস্ততম জায়গা পার হলে হাবিজাবি অনেক দোকান। হারমোনিয়াম তবলা মেরামত , আটা ময়দা ভাঙ্গানোর দোকান, একটা কুরিয়ার সারভিস।সাথে পাচতলা একটা দালান। এইখানে সব বাড়িঘর পুরানো। মেরামত করা হয় না কেন কে বলবে। পাচতলা দালানের নিচতলায় বড় করে সাইনবোর্ড- বক্সিং ক্লাব। নীচে ছোট করে লেখা- প্রপাইটার – শাহিন সর্দার।
ভেতরে ঢুকে গেলাম।
ঘাম আর ধুপের গন্ধ। কয়েক হালি চামড়ার বস্তা ঝুলছে। একগাদা মানুষ গ্লাভস পড়া হাতে ধপাধপ ঘুষি মারছে সেই বস্তার গায়ে। দড়ি দিয়ে লাফাচ্ছে কেউ কেউ। মেঝেতে ক্যানভাস বিছানো।
এখানে ওখানে লোহার রিঙ ঝুলছে। ব্যায়াম করার বেশ কিছু যন্ত্রপাতি রাখা কামরার নানান জায়গায়। উপর থেকে উজ্জল স্পট লাইট নেমে জায়গাাটাকে পেশাদারি একটা ভাব বানিয়ে ফেলেছে।
দেখেই পছন্দ হয়ে যায়। শহরের একমাত্র বক্সিং ক্লাব।
সমস্যা হল ভেতরে গরম।
একদম কোণার দিকে কাচঘেরা একটা রুম। ওটাই শাহিনের অফিস। পা বাড়ালাম সেই দিকে।
‘আরে বাদল না ?’ ডাক দিল কেউ। ‘ কি মনে করে ভাই ?’
ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো হেদায়েত উল্লাহ। নারায়ণগঞ্জের লোকার পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক। খেলাধুলার পাতা ভর্তি করা উনার কাজ। চেষ্টা করছেন বড় পত্রিকায় কাজ পাবার জন্য।
হেদায়েত উল্লাহ লম্বা। প্রায় সজনের মত রোগা। মাথায় গোলাপি টাক। চোখদুটো প্যাঁচার চোখের সাথে বদলা বদলি করা যাবে। চোখের নীচে আবার মাংসের পুটুলি। এই গরমেও লিলেনের কোট পরে আছে। প্রতি শীতে ডায়মন্ড সিনেমা হলের সামনে তিনশো টাকা করে এই কোট বিক্রি হয়। উনি একটা কিনে সারাবছর সেটা গায়ে দিয়ে ধোপার খরচ বাচিয়ে পরের বছর আরেকটা কিনেন।
মুখটা ঘামে স্যাতস্যাতে। ঠোঁটের কোণে সিগারেট ঝুলছে মেক্সিকান কিলারদের মত।
নমুনা বটে।
ঘাড়ের আর মুখের দাগ দেখে বললেন , ‘ আমরা থাকতে তোমার এই অবস্থা কে করল ? নাম বল ঐ শালার নামে বিরাট একটা রিপোর্ট লিখে দেশ ছাড়া করব।’
‘শাহিনের সাথে দেখা করতে এসেছি। আছে না ?’
‘ ওর রুমেই আছে।’ পরক্ষণেই চেহারাটা রাগী বানিয়ে বললেন , ‘ দিনার খুনের ব্যাপারে নতুন কিছু জানলে ? আমি বাজি ধরে বলতে পারি ঐ মশিউর শূয়রের বাচ্চা খুন করেছে। রোজ রাতে হারামজাদা নদীর পারে লুকিয়ে লুকিয়ে মানুষের হাবিজাবি কাজ দেখে। আমি একবার একটা ভদ্রমহিলাকে পটিয়ে পাটিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম নদীর পারে। কাজকর্ম শুরু করেছি আচমকা সামনে মশিউর বুড়া হাজির। ভয় পেয়েছিলাম রে ভাই। ভেবেছিলাম মহিলার স্বামী । মানীর মান আল্লাহ বাঁচায়। ‘
‘ খুনি যে কেউ হতে পারে।’ হাঁটতে শুরু করলাম। ‘ আপনি বরং মিজান মোল্লা বা ওসি মঞ্জুর কাদেরের কাছে গেলেই পারেন। ওরা সব জানে।’
‘আরে ভাই অত ব্যস্ত হবার আছেটা কি শুনি ?’ জামার হাতা ধরে বললেন হেদায়েত উল্লাহ। ‘ দাঁড়াও তোমাকে একটা মাল দেখাই। মেয়ে মানুষ অমন বক্সিং জানে কে বলবে? এক্কেবারে আইটেম ভাই। কিন্তু কে এই নায়িকা, সেটা আমাকে কেউ বলছে না।’
সাংবাদিক বুড়ো আঙ্গুল তুলে দেখালেন।
গোল মত এক জায়গায় চামড়ার ব্যাগে ঘুষি মারছে কয়েকটা ইঁচড়ে পাকা ছোকরা। সেখানেই কাঠের খটখটে একটা চেয়ারে মেয়েটা বসে আছে।
মেহেদি দেয়া লাল চুল। মুখটা লম্বাটে। চোয়ালের হাড়দুটো সামান্য উঁচু হওয়ায় চেহারায় প্রাচ্য দেশীয় ভাব লাগছে। ঘন চোখদুটো ভারি মিষ্টি।
রাতের ট্রেনের মত রহস্যময় চাহনি ।
পাকা জলপাই রঙ্গের ট্রাউজার আর টিশার্টে ফিগারটা মার মার কাটকাট লাগছে। পায়ে কালো রঙ্গের কাপড়ের টেনিস শু।
এই মেয়ে তো পাইকারি খুন খারাবি করবে দেখা যাচ্ছে।
চামড়ার বস্তায় কেউ ভাল মত ঘুষি মারলেই মেয়েটা ঠোঁট গোল করে শিস দিয়ে উঠছিল।
‘হ্যাঁ, বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী। ‘ বললাম । ‘ মাল ফাল না বলে নিজে গিয়েই জিজ্ঞেস করুন না কে সে ? কি তার পরিচয় ?’
‘আমার অত সাহস নেই ভাই। ডায়াবেটিস আর ব্লাড প্রেসারে ভুগছি। নতুন কোন প্রেশার নিতে পারব না। গত কাল এক তাগড়া ছোকরা মেয়েটাকে ডার্লিং বলে গায়ে হাত দিয়েছিল । মাত্র এক ঘুষিতে চিত করে ফেলেছে ছোকরাকে।’
হেদায়েত উল্লাহ আরও কিছু বলতো। বাইরের ফুটপাথের চায়ের দোকান থেকে কেউ উনার নাম ধরে ডাকতেই উনি আসছি বলে গায়েব হয়ে গেলেন।
শাহিন সর্দারের অফিস রুমটা পিচ্চি। এবং জঞ্জালে ভর্তি। দেয়ালে একগাদা পোষ্টার। বক্সিং ক্লাব খোলার পর যত বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল সবগুলোর একটা করে কপি দেয়ালে সেঁটে রেখেছে। সস্তাদরের যত পাতি নেতা আছে সবার সাথে একটা করে ছবি তুলে সেটাও সেঁটে রেখেছে। সিঙ্গেল বেডের সমান টেবিলের উপর কয়েক কেজি কাগজ পত্র আর ছয়টা ফোন রাখা। মানুষ চমকে যায় এত ফোন দেখে। আরও চমকে যায় ঘনঘন ফোন বাজার বহর দেখে।
অফিসের এক কোণে পুরানো জামানার প্রায় সিন্দুকের মত একটা কম্পিউটর। ওর সামনে বসে চুইংগাম চিবোচ্ছে আর ঝড়ের গতিতে কি সব টাইপ করছে প্রায় মমি হয়ে যাওয়া এক বুড়ো।
অফিসের ভেতরে কি মনে করে খানিক পর পর আতর ছড়িয়ে দেয় শাহিন সর্দার। মাজার মার্কা ভাব না এসে গোরস্তানের মত একটা পরিবেশ হয়ে গেছে।
‘কথা বলা যাবে শাহিন মামা ?’ পা দিয়ে দরজা বন্ধ করে জানতে চাইলাম।
দরবেশদের মত হাত তুলে সামনের চেয়ার দেখিয়ে দিল শাহিন সর্দার।
প্রায় আলুর মত শরীর, গায়ের রঙটাও আলুর মতই। টাক পরে চেহারাটা হামটি ডামটি মার্কা হয়ে গেছে সিল্কের বুক খোলা জামা। হাতে সোনার ঘড়ি।
‘বস বাদল। মোটেও ব্যস্ত না । সারা দুনিয়ার সময় আমার হাতে। ‘
শাহিন সর্দারের কথা শেষ হওয়া মাত্র উনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে এক সাথে তিনটে ফোন বেজে উঠলো পিং পিং শব্দ করে। দুইজন তাগড়া চেহারার লোক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে জানতে চাইলো পরের ম্যাচ কবে হবে।
তৃতীয় একজন জানতে চাইল উকিল পাড়ার ওখানে একটা মারামারি হয়েছে। শাহিন ভাই গিয়ে মীমাংসা করবেন কি না।
‘সব শূয়রের বাচ্চা বের হয়ে যা অফিস থেকে।’ খেঁকিয়ে উঠলো সর্দার।
লোকগুলো পালিয়ে গেল।
তিনটে ফোনের দুইটা রিসিভার কানে ঠেকিয়ে বলল, ‘ আমি ব্যস্ত আছি।’
তিন নাম্বার ফোন তুলে কানে ঠেকিয়ে কি সব শুনে জবাব দিল, ‘ মামদার পুতের মাথা ফাটিয়ে খানপুর হাসপাতালে ভর্তি কর।’
শেষে আমার দিকে ফিরে লাজুক গলায় বলল, ‘ সরি বাদল। নাও সিগারেট ধরাও। কি মনে করে ? অহ খুনের খবরটা পড়েছি মেয়েটাকে চিনতাম না তারপরও খারাপ লেগেছে। ‘
‘ মেয়েটা আমার সেরা কর্মচারী ছিল।বড় ভাইয়ের চোখে দেখত আমাকে।’ সিগারেটের প্যাকেট ফেরত দিয়ে বললাম । ‘ লাল নামে কাউকে চেনেন?’
‘ খুব কমন নাম আমাদের লাইনে। অন্য কোন নাম আছে ?’
টাক মাথায় ডান হাতের সবগুলো আঙ্গুল দিয়ে তবলা বাজানোর মত করে বলল।
‘ জানি না । দেখতে বেশ সুন্দর। বয়স তেইশ চব্বিশ হবে। ভাল মারা মারি পারে। খুব দ্রুত মুভ করে। মনে হচ্ছে বক্সিং শিখেছিল কখনও।’
‘চিনেছি। নড়ে চড়ে বলল শাহিন সর্দার। ‘ আদিত্য লাল। আমার ক্লাবের মেম্বার ছিল। মেয়ে মানুষের প্রতি দুর্বল না থাকলে এত দিনে বক্সিঙে চ্যাম্পিয়ন হতে পারতো। আমিই ট্রেনিং দিয়েছিলাম। তিনটে ফাইটে জিতেছিল। কাউকেই তিন মিনিটের বেশি রিঙে থাকতে দেয়নি। আমার ক্লাব ছেড়ে দিয়েছে ছয় মাস আগে।’
‘আমার সাথে সামান্য গোলমাল বেধেছিল।’ কলার সরিয়ে ঘাড়টা দেখালাম। ‘ বুটের আঘাত।’
‘ ব্যাটা পুরো মামদার পোলা। ‘ চোখ মেলে বলল শাহিন। ‘ ওকে এড়িয়ে চলবে। আমার মনে হয় দেশের সবচেয়ে টাফ বক্সার। একটা কেউটে সাপ। বাজিতে মারামারি করে। লাগল কি ভাবে ?’
‘রোজ ভিলার বাইরে দারোয়ানের অভিনয় করছে আজকাল। একটা কাজেই গিয়েছিল। তর্কাতর্কি লেগে গিয়েছিল।’
‘ দারোয়ান ?’ প্যাঁচার মত চোখ দুটো গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল সর্দারের। ‘ অসম্ভব। অন্য কেউ না তো ?’
‘কেন ?’
‘লালের টাকার অভাব নেই। মেম্বার থাকা কালীন দামী ক্রিম রঙা একটা গাড়িতে করে আসতো। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন জামা কাপড় পড়তো। সব দামী ব্র্যান্ডের জিনিস। জি স্টার একটা বেল্ট ওটার দামই বারো হাজার টাকা। সস্তাপুরে বাংলো টাইপের নিজের বাড়ি আছে মামদার ছেলের। বাড়িটা দেখলেই আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে। ‘
আমার মনে পড়লো লালের হাতে দামি ঘড়ি দেখেছিলাম।
‘ আপনি বলছিলেন ছোকরা মেয়ে মানুষের প্রতি দুর্বল।’
‘না আসলে উল্টা । মেয়ে পটানোর জন্য একেবারে হ্যারিপটার। মালকড়ি কি ভাবে কামায় জানি না। তবে টাকা থাকে না হাতে। সেইজন্য বোধ হয় বড়লোকের বাড়ির দারোয়ান হয়েছে। ‘
‘ ধন্যবাদ শাহিন মামা।’ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালাম। ঘাড়ে হাত দিয়ে বললাম, ‘লালের সাথে পরের বার দেখা হলে নীল বানিয়ে দেব।’
‘খুব কঠিন।’ গম্ভীর সুরে বলল সর্দার । ‘ ব্যাটা খুব ফাস্ট। তবে পারবে না সেটা বলছি না। যুত মত গলার নলীতে একটা ঘুষি দিতে পারলেই কেল্লা ফতেহ।’
দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে তাকালাম।
‘মামা বাইরে লাল চুলের মেয়েটা কে ? বড় বড় চোখ আর জলপাই রঙ্গের টি শার্ট পরনের। ‘
এনার্জি সেভার বাল্বের মত উজ্জল হয়ে গেল সর্দারের চেহারা, ‘ ওটা তো শিখা। পুরো নাম উম্মে হাবিবা শিখা। আজকে এসেছে নাকি ? আমার পুরানো মেম্বার। কয়েক সপ্তাহ দেখিনি। লালের ব্যাপারে অনেক তথ্য পাবে মেয়েটার কাছে। খুব মারকুটে মেয়ে। লালকে যদি কেউ নক আউট করতে পারে শিখাই পারবে।’
‘মেয়েটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন ?’ অনুরোধ করলাম।
ব্যাবিলন ক্যাফে দুপুরবেলায় খুব ব্যস্ত থাকে। রাজ্যের হৈ চৈ। শর্ষে ইলিশ আর পটল ভাঁজার জন্য অমনটা হয়। ক্যাফের পিছনে খোলা জায়গায় কাঠবাদাম গাছের তলায় কয়েকটা চেয়ার টেবিল পাতা আছে। ভুলু সাহার পেয়ারের লোকজন বসতে পারে শুধু।
আজ ওখানে বসব ঠিক করলাম।
দুর থেকে আমাদের আসতে দেখে জাকির আর বেণী হাত তুলল। শিখাকে দেখে বেশ অবাক দুইজনেই।
আমাদের রেগুলার টেবিল ছেড়ে চারজনেই খোলা জায়গায় বসলাম।
‘ আমরা কত খাটুনি করি, আর ওস্তাদ নায়িকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’ কৃত্রিম হতাশ ভঙ্গি করে দশজনে শুনতে পারবে অমন ফিসফিস করে বলল বেণী।
‘ বাচ্চারা চুপ করে বস।’ ধমক দিলাম। ‘ ওর নাম শিখা। ভাল বক্সিং জানে। লালকে ও ভাল করে চেনে।’
‘লালকে মারার জন্য আপনি ওকে ভাড়া করে নিয়ে আসছেন ?’ চোখ বড় বড় করে বলল বেণী । ‘ আমরা কি মরে গেছি ?’
‘আহা থাম তো। আজ থেকে শিখা আমাদের সাথে কাজ করবে। এই সব প্রাইভেট গোয়েন্দাগিরি ওর ভালই লাগে নাকি। ‘
‘ আমাদের দুইজনকে এক সাথে শিফট দেবেন ওস্তাদ।’ বেহায়ার মত হেসে বলল বেণী।
‘থামো । খাবারের অর্ডার দাও আগে।’
ওয়েটার অর্ডার নিয়ে গেল।
‘ জাকির , মশিউরের ব্যাপারে কি পেলে ?’ বরফ শীতল আইস কফির গ্লাস নিতে নিতে বললাম।
‘ বুড়ো ভামের সাথে করেছি।’ চোখ কুঁচকে শান্ত গলায় বলল জাকির। ‘ কড়ক ধরনের মাল। শীতলক্ষ্যা নদীর বরফকলের কাছাকাছি একতলা পুরানো দিনের একটা বাড়ির মালিক। সারাদিন ছাদে বসে টেলিস্কোপ দিয়ে নদীর তীরের মানুষজনদের উপর নজর রাখে। বিকারগ্রস্ত মানুষ।’
‘আসল কোন খবর বের করতে পেরেছ ?’
‘ ব্যাটা মিথ্যুক। ওর বলা গল্পটা হচ্ছে রাতের বেলা নদীতে মাছ ধরা দেখতে ও বের হয়েছিল। এমন সময় দিনার হ্যান্ডব্যাগ আর রক্তের দাগ দেখে পুলিসে ফোন দিয়ে সচেতন নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছে। ব্যাটাকে টাকার লোভ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সেই রাতে আর কাউকে দেখেছে কি না। ব্যাটা জবাব দিল, ঠিক মনে করতে পারছে না কাউকে দেখেছে কি না। তবে সময় চাইলো কয়েকদিন। যদি মনে পড়ে তবে নাকি ফোন দেবে আমাকে।’
‘আমার মনে হয় এই ফাঁকে ব্যাটা খুনি বা ব্ল্যাকমেইলারের সাথে ডিল করে কিছু আদায় করতে চায়।’ বললাম।
‘আমার ও তাই মনে হচ্ছে বাদল ভাই। লোকটা ঐ ধরনেই।’
‘আমি নিজে মশিউরের সাথে দেখা করব। মনে হয় চাপ দিলে বা পুলিশের ভয় দেখালে কাজ হবে।’
‘ আরেকটা ব্যাপার বাদল ভাই।’ বলল জাকির । ‘ রোজভিলার কাছাকাছি একটা পেট্রোল পাম্প আছে না ? ওটার সামনে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম অনিতা যদি ওখান থেকে গাড়ির তেল ফেল কিনে তবে কোন খবর পেতে পারি। কথা বলছিলাম পাম্পের এক কর্মচারীর সাথে। তখন সেখানে আলিজান মীর্জার ড্রাইভার এসেছিল কাকতালীয় ভাবেই । কর্মচারীটাই পরিচয় করিয়ে দিল। ড্রাইভার ছোকরা বেশ বাচাল। কিছু মানুষ আছে না ভাই , নিজের গলার স্বর নিজে শুনতে পছন্দ করে ? তেমনই। ব্যাটাকে পাঁচশো টাকার ঘুষ দিয়ে খবর বের করলাম। বললাম পত্রিকার লোক। অনিতা মীর্জার সাক্ষাৎকার নেব। ছোকরা জানালো যেই রাতে দিনা খুন হয়েছে সেই রাতেই নিজের গাড়ি নিয়ে অনিতা কোথাও চলে গেছে। আজও ফেরে নি।
‘ বাসায় ফেরেনি ?’ অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে বললাম।
‘হ্যাঁ, ড্রাইভার নাকি মীর্জা সাহেবকে ব্যাপারটা জানিয়েছে। উনি বলেছেন ব্যাপারটা উনি জানেন।’
‘ অনিতার গাড়ির নাম্বার টুকে এনেছি। অমন বিশাল সাইজের গাড়ি কোথাও পার্ক করলে সহজেই লোকের চোখে পড়বে।’
‘ কাজে লেগে পর জাকির। নারায়ণগঞ্জের সব কটা আবাসিক হোটেল, গ্যারেজ আর পারকিন এলাকায় খোঁজ নাও।’
শিখা এতক্ষণ চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিল। এই প্রথম বলল, ‘ ক্লাবগুলোতেও। বিশেষ করে রেড ড্রাগন ক্লাবটার দিকে খোঁজ নিও।’
‘ ভাল আইডিয়া।’ জবাব দিলাম । ‘ বেণী তুমি কি সকালবেলা রেড ড্রাগন ক্লাবের সামনে গিয়েছিলে ?
‘ গিয়েছিলাম।’ বেণীর জবাব। ‘ তেমন কিছু চোখে পড়েনি। ক্লাবটা জমজমাট হয় রাতের দিকে। এমন কি দিলীর খান খুশনবীস ও রাতেই আসেন।’
‘ অহ ভাল কথা জুবায়ের আলম নামের সেই ছোকরার খোঁজ নাও জাকির। অনিতা ওর বাড়িতে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকতে পারে। মেয়েটাকে ওখানে পেলে একটু ও অবাক হব না আমি।’
‘ দিনার প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে কোন কিছু পেয়েছ ?’
খাবারের প্লেট সামনে টেনে নিয়ে বেণীকে জিজ্ঞেস করলাম।
‘ হ্যাঁ, আমি যখন দিনার বাসার সামনে তখন পুলিশের লোকও ছিল। কিন্তু ওরা আমাকে চিনতে পারেনি । ভাল কথা, আমি অমন তথ্য জানি শুনলে অবাক হবেন। ‘
‘অনিতা সত্যি সত্যি সেই রাতে দিনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল তাই তো ?’ মুচকি হাসলাম।
‘হ্যাঁ, দিনার উল্টাদিকের ফ্ল্যাটে এক বুড়ি থাকে। আপনি জানেনই তো এইসব বুড়িদের চরিত্র কেমন হয়। অন্যের হাঁড়ির খবর না নিলে এদের পেটের ভাত হজম হয় না রাতে ঘুম হয় না। সেই বুড়ি রাত এগারোটা পনেরতে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরেছিল। আমার ধারনা বুড়ি ভেবেছিল দিনা কোন ব্যাটা ছেলে নিয়ে বাসায় ফিরছে। হাতে নাতে দিনাকে ধরে বেশ দুকথা শোনাতে পারবে অমন একটা ভাব ছিল ভেতরে। কিন্তু বুড়ি জানালো কালো গাউনের ড্রেস পরা একটা মেয়েকে দেখেছে। কিন্তু মাত্র এক ঝলক। বুড়ি ভালমত বর্ণনাও দিতে পারেনি। কিন্তু কালো গাউনের ড্রেস আর গলার নেকলেসের কথা বলেছে। ঠিক আধা ঘণ্টা নাকি ভেতরে ছিল । তারপর কালো গাউন চলে গেছে। উনি তারপর গেছেন ঘুমাতে। কারন উনার মতে নাটক দেখার আর কিছু নেই। রাত একটার দিকে দিনার রুমের টেলিফোনের শব্দে উনার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ফোন বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট পর দিনার কামরার দরজা খোলার শব্দ পান। সেই সাথে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। উনার ধারনা খুনি দিনাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে মেরে ফেলেছে। পুলিশের কাছে সেইরকম বলেছিল। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনলাম। ‘
‘ ব্যাপারটা খাপ খায় না।’ বললাম দিনা যদি রাত একটার সময় বাড়ি থেকে বের হয় একটা পয়তাল্লিশের আগে নদীর তীরের সেই জায়গায় পৌঁছতে পারবে না। আবার পুলিশ বলেছে দিনা খুন হয়েছে রাত সাড়ে বারোটার সময়।’
‘পুলিশ ভুল বলতে পারে না ?’
‘পারে, সেইজন্য অনিতাকে খুঁজে বের করা দরকার। উনি আমাকে লোভ দেখিয়ে উনার ক্লায়েন্ট বানাতে চেয়েছিল । দিনাকে তেমন কোন লোভ দেখিয়েছিল কি না কে বলবে। উনার নেকলেস দিনার সোফার নীচে সেটাই বিচ্ছিরি ব্যাপার। তুমি সেই বুড়ির সাথে আরেক বার দেখা কর। জেনে নাও অনিতা যখন বের হয়ে গেল তখন গলায় নেকলেস ছিল কি না। আর দিনা বের হয়ে যাবার পর কেউ এসেছিল কি না। কোন রকম শব্দ পেয়েছে কি না। আশেপাশের বাসায় কোন দারোয়ান থাকলে কথা বল। জায়গাটা নির্জন। কেউ না কেউ কিছু দেখতে পারে।আর রেড ড্রাগন ক্লাবে ঢোকার উপায় কি ?’
‘আপনি বললে আমি যেতে পারি।’ অনেক ক্ষণ পর আবার কথা বলল শিখা। ‘ আমি ঐ ক্লাবের মেম্বার। সপ্তাহে একদিন সাঁতার কাটতে যাই। এই সুযোগে ব্যাপারটার খোঁজ নিতে পারব। আপনি অনিতার গাড়ির নাম্বারটা দিন।’
‘ আজ সাঁতার জানি না বলে জীবনের কত আনন্দ মিস করলাম।’ বিড়বিড় করে বলল বেনী।
জাকির ওর কার্ডে গাড়ির নাম্বার আর বর্ণনা লিখে শিখার হাতে তুলে দিল।
‘ কার্ডে আমার নাম্বার আঁছে । আপনি যদি একা বোধ করেন তবে ফোন দিলেই চলে আসব। ‘ মিহি শয়তানি মার্কা একটা হাসি হেসে বলল জাকির।
‘ আপনার কি মনে হয় আমি নিসঃসঙ্গ জীবন যাপন করি ?’ পাল্টা জবাব দিল শিখা । চোখ ঘুরিয়েআমার দিকে ফিরে বলল, ‘ আপনার সাথে কোথায় দেখা করব ?’
অফিস আর বাসার ঠিকানা দুটোই শিখাকে দিলাম। তবে ব্যাবিলন ক্যাফে আমাদের মীটিং প্লেস ওটাও জানিয়ে দিলাম।
আমাদের সবাইকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ছন্দময় গতিতে হেঁটে বড় রাস্তার উপর গিয়ে দাঁড়ালো। এই শহরে আজও টিশার্ট-প্যান্ট পরা মেয়ে দেখলে সবার মুখ কাতলা মাছের মত হা হয়ে যায়। রিক্সাওয়ালা থেকে হনুমানের মত বুড়ো মানুষ পর্যন্ত চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে।
বাতাসে ওর চুল উড়ছে।
বাজার চলতি মুভিতে অমন দেখা যায়।
হাত বাড়িয়ে একটা রিক্সা ডাকল। উঠে বসে চলে গেল আমাদের চোখের আড়ালে।
‘অমন একটা পারমাণবিক বোমা কোত্থেকে যোগাড় করলেন ওস্তাদ?’ তোষামুদে গলায় বলল বেণী।
‘কে আসলে উনি ?’ জাকিরের পেশাদারী প্রশ্ন।
‘ খুব ভাল করে চিনি না।’ সত্য কথাই বললাম। ‘ বক্সিং ক্লাবে শাহিন সর্দার পরিচয় করিয়ে দিলেন। লালকে ভাল করে চেনে। ওর পিছনে মেয়েটাকে কাজে লাগাব। কেন যেন মনে হচ্ছে আমাদের সাথে ভাল কাজ করতে পারবে। আর এমনিতেও নতুন একজন লাগতো আমাদের। এই মেয়ে মারামারি করতে পারে। ওটাই বোনাস পয়েন্ট।’
ব্যাবিলন ক্যাফে থেকে বের হয় হাঁটতে গিয়ে মনে হল লালের ব্যাপারে আমি বেশি চিন্তাভাবনা করছি। অথচ দিনার খুনিকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার ছিল।
কিন্তু মাথার ভেতর থেকে লালের ব্যাপারটা বের করতে পারছি না।
কি মনে হতেই ভূমি অফিসে চলে গেলাম।
ওখানে আমার পোষা গরু আছে দুই একজন। একজনের হাতে খানিক টাকা দিয়ে পনের মিনিট অপেক্ষা করতেই কাগজ ঘেঁটে খবরটা দিল।
সামান্য খবর কিন্তু বুকের ভেতরে কাঁপন তুলে দিল। লালের বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিলাম। বাড়িটা রিতু কিনেছিল এক বছর আগে।
মানে দারোয়ান আর মালিক কন্যা…।
দিনাকে লাল খুন করতে পারে আইডিয়াটা পোক্ত হল। প্রমাণ দরকার।
মনিব কন্যার কেনা বাড়িতে চাকর থাকে এটা আদালতে টিকবে না।
নিজেকে নিজেই সান্তনা দিলাম। নাহ বাদল । কাজ ভালই এগুচ্ছে।
জুবায়ের আলম লোকটার কথা মনে পড়লো। অনিতার প্রেমিক। বেশ ধাই ঝকমক জীবন। কোন একটা বাংলো টাইপের বাড়িতে একা থাকে।
ঘুরে আসব নাকি ? কোন ক্লু পেতে ও পারি।
মড়ার আগে দিনা ব্যাটার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিল আমাকে। জায়গাটা চিনি। ওমর খৈয়াম এভিনিউ। গাড়ি ছোটালাম।
অনেক আগে এসেছিলাম। খুব অভিজাত আর ধনী মানুষদের বাসা। এক তলা বা দোতলা। বেশ ফাঁকা ফাঁকা। জুবায়ের আলমের বাড়ি সহজেই পেলাম।
বড় একটা ছাতিম গাছ বেশ ছায়াছায়া করে রেখেছিল। চারিদিকে গোরস্তানের মত নীরবতা। চারিদিকটা ভাল করে দেখে নিলাম। কেউ নেই।
গেইট খোলা। দারোয়ান নেই। বাগান আছে। হাবিজাবি ফুলের গাছ ভর্তি। খানিক হেঁটে গেলেই দোতলা বাড়িটা। পোড়া লাল ইট আর কাঠের তৈরি। কার্নিশে কয়েকটা কবুতর বসে ছিল। আমাকে দেখে গালভর্তি জল নিয়ে গড়গড়া করার মত শব্দ করে উঠলো।
বাইরে গরম। সব কিছু চুপচাপ যেন ঘাপটি মেরে আছে। খানিক ঘ ঘামছিলাম । দরজার বেলে বুড়ো আঙ্গুল চেপে ধরলাম।
বেজ বেজে উঠল। কয়েক বার চেষ্টা করে বুঝলাম ভেতরে কেউ নেই।
খালি বাড়ি। আচমকা মনে হল অনুপ্রবেশ করে দেখব নাকি ? কোন ক্লু পেয়ে যেতে পারি না ?
কিন্তু বাইরে যে আমার গাড়ি !
গাড়িটা নিয়ে চলে গেলাম খানি দূরে। একদম গলির মোড়ের কাছে একটা চায়ের দোকানের সামনে পার্ক করে আবার ফিরে এলাম জুবায়ের আলমের বাড়ির সামনে।
আবার বেল বাজালাম কয়েকবার। যদি কেউ এর মধ্যে এসে পড়ে !
কেউ নেই।
বাড়ির পিছনের একটা জানালা লক করতে ভুলে গিয়েছিল। পকেট থেকে চাকু বের করে অল্প সময়ের মধ্যে জানালার গ্রিলের স্ক্রু খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ভেতরে ছায়া ছায়া অন্ধকার।
কেউ চিৎকার করে উঠলো না। ঘাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো না কোন আততায়ী। কেউ থুলুস করে গুলি করে দিল না আমার কপাল বরাবর।
নীচতলাটা বিশাল। বসার ব্যবস্থা আছে। কোণে সিঁড়ি, ওটা দিয়েই দোতলা যাওয়া যায়।
নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে গেলাম। চোখ কান খোলা।
তেমন গোছান না। নিঃসঙ্গ পুরুষদের বাড়ি যেমন হয়। দেয়ালে কিছু হাবিজাবি জিনিস ঝুলছে। অ্যানটিক হবে। পুরানো দিনের কলের গান আর কালো রুটির মত রেকর্ড দেখে মনে হল লোকটা শৌখিন।
দেয়ালে চাইনিজ কুড়াল আর চ্যাপ্টা বর্শা সাঁটিয়ে রেখেছে কি মনে করে ?
একটা টেবিলে তামাকের টিন, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হুইস্কির বোতল, সোডার বোতল আর কয়েকটা খাঁজ কাটা গ্লাস আছে।
এইসব কিছুতেই আগ্রহ পেলাম না। শারলক হোমসের মত হাবিজাবি দেখে বড় বড় অনুমানে যেতে পারি না আমি।
সোজা দোতলায় চলে এলাম।
এবার মনে হল জুবায়ের আলম যদি দুপুরের ঘুম দিয়ে থাকেন ?
লালের সাথে মোকাবেলা করে আমার নার্ভ দুর্বল হয়ে গেছে।
যে লোকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে অমন চাইনিজ কুড়াল আর বর্শা থাকে বেডরুমে যে উনি বন্দুক নিয়ে ঘুমাচ্ছে না তাই বা কে বলবে ?
কান পাতলাম।
কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর মনে হল কেউ নেই ভেতরে। ঘুমন্ত কোন মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও পেলাম না।
সাহস করে দরজা খুলে ফেললাম।
সুন্দর একটা বাথরুম। দামি রুচিশীল আয়না। টার্কিশ বাথট্যাব। দেয়ালে তোয়ালে ভর্তি ক্যাবিনেট। বাথসল্ট, দামি সৌরভের শিশি। দাঁড়িগোঁপ কামানোর দারুন সব যন্ত্রপাতি। হিটিং মেশিন আছে। শীতকালে বাথরুমের মেঝে গরম থাকবে। বিলাসিতার সমস্ত আয়োজন।
পাশের কামরায় চলে গেলাম।
বেডরুম। দেখেই বোঝা যায় গত রাতেও এখানেই ঘুমিয়েছে জুবায়ের আলম। বিছানা কুঁচকানো। ডাবল বেড। মস্ত ড্রেসিং টেবিল। এক গাদা খেলাধূলা বিষয়ক পত্রিকা জমা হয়ে আছে মেঝেতে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে চলে গেলাম ।
ড্রয়ার খুলে দেখতে লাগলাম কিছু পাই কি না। চামড়ার ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি পেলাম একটা। খুবই সুন্দরী একটা মেয়ের ছবি। বিকিনি পরা। মারাত্নক ফিগার।
মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছিল কেমন যেন।
আবিষ্কার করলাম ওটা অনিতার ছবি। তবে সম্ভবত আরও আগের। হয়ত পাঁচ সাত, বা আরও বেশি আগের।
শাদা মার্কার কলমে ছবির নীচে লেখা- প্রিয়তম আলমকে ভালবাসাসহ- অনিতা।
এই ছবি দরকার আমার।
ছবিটা সাথে নিতে চাই। কিন্তু ফ্রেমটা অনেক বড়। কি মনে করে ফ্রেম থেকে ছবিটা বের করে আনতেই উল্টো পিঠে নজর গেল । রাবার স্ট্যাম্প করা একটা ঠিকানা-
মোমেন ফটোগ্রাফার। জোনাকি স্টুডিয়ো। রাজশাহী।
পকেটে ভরে ফেললাম।
বাকি ড্রয়ার ভাল করে খুঁজে দেখলাম। কাজে লাগবে এমন কিছু পেলাম না ।
জামাকাপড়ের আলমারি আর ওয়ার্ডরবের দিকে গেলাম।
দিনা ওর রিপোর্টে লিখেছিল জুবায়ের আলম মুভিস্টারদের মত জামাকাপড় পড়ে। হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। স্যুট আর কোট আছে এক ডজন। বিখ্যাত দর্জির দোকান থেকে বানানো জামা আছে কুড়িটা। দশজোড়া জুতা। টাই কতগুলো সেটা বলতে পারব না। আচমকা নীল রঙের কাপড় নজর পড়লো।
কয়েক মুহূর্ত লাগল জিনিসটা চিনতে। নীল রঙের সালোয়ার কামিজ। অনেক চেনা। দিনা প্রায়ই পড়তো। যে রাতে মারা গেছে সেই রাতেও ?
বেণীর কথা মতে দিনার আলমারিতে এই কাপড় খুঁজে পায়নি ও।
লাল নয় দিনাকে তাহলে জুবায়ের আলম খুন করেছে ?
ঠিক তখনই নীচতলায় পায়ের শব্দ পেলাম।
এতই আচমকা কি করব বুঝতে না পেরে দিনার পোশাকদুটো প্যাচিয়ে হাতে তুলে নিলাম।
দ্রুত বের হয়ে বারান্দায় পর্দার আড়ালে দাঁড়ালাম, নীচে নামতে গেলেই সিঁড়িতে আগন্তুকের মুখোমুখি হব।
শব্দ পেলাম সিঁড়ি বেয়ে ভারি পায়ে কেউ উপরে উঠে এলো। সোজা গিয়ে ঢুকল বেডরুমে। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে কি যেন ঘাঁটাঘাঁটি করছে।
টেবিলের কাগজপত্র ও ঘাঁটছে।
নিঃশব্দে সিঁড়ির কাছে এসে ফিরে তাকালাম। ব্যালকনি দিয়ে আসা খোলা আলোতে দেখলাম বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লাল। মুখে সিগারেট। পাথুরে মুখে বিরক্তি মাখা ক্রোধের চিহ্ন।
পপলিন কাপড়ের পাতলা হাতে সেলাই করা সামার স্যুট পরে আছে।
শাহিন মামা বলেছিল না কোটিপতির মত চলে লাল। সেই রকমই লাগছে। দারোয়ান ওর ছদ্মবেশ।
ঝুঁকি হয়ে যায়। পা টিপে টিপে নিচতলার সেই জানালা দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে এলাম বাইরে।
গ্রিল থাকুক খোলা। জুবায়ের জানুক চোর এসেছিল।
জমবে খেলা।
নিউমেট্রো সিনেমা হল ছাড়িয়ে শীতলক্ষ্যার পারে যখন গেলাম পিচ্চি একটা কাবাব শপের বাইরে বেণীর কমলা হলুদ মোটর সাইকেলটা নজরে পড়লো।
কাবাব শপটা বেশ বিখ্যাত। পর্র্দা দেয়া পিচ্চি পিচ্চি রুম আছে । ছেলে মেয়েরা গোপনে ক্থা বলতে চাইলে চলে আসে। খাবারের দাম বেশি। সাথে চেয়ে বখশিস নেয় ওয়েটাররা। তারপরও জনপ্রিয়তার ভাঁটা পরেনি।
বেণীকে দরকার ছিল।
Series Navigation<< ঈশ্বরের বাগান – দ্বিতীয় পর্বঈশ্বরের বাগান – চতুর্থ পর্ব >>

মতামত জানান