ধারাবাহিক ঈশ্বরের বাগান - 2 পর্ব (4)
যখন পুলিশ হেডকোয়াটারে ফিরলাম তখন পূবের আকাশ মোরগফুলের মত লাল হয়ে গেছে। সকাল পাঁচটা বেজে পঞ্চান্ন। পুলিশের লোকজন দিনার লাশটা যখন প্যাক করছিল তখন হেডকোয়াটারে বসেই কাঞ্চনকে ফোন করে সব বললাম।
খবরটা শুনে মেয়েটা চমকে গেলেও দ্রুত সামলে নিল। দুইচার জন পুলিশ কান পেতে আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছিল বলেই সাবধানে কথা বলছিলাম।
ইনস্পেকটর মিজান মোল্লা হাজার প্রশ্ন করেছেন আমাকে । ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে, চেষ্টা করেছেন তথ্য বের করার জন্য। আমি বারবার উত্তর দিয়েছি, জানি না দিনা ইসলাম কেন অত রাতে নদীর ধারে গিয়েছিল। আলিজান মীর্জার ব্যাপারে একটা শব্দও বলিনি।
শেষে মিজান হালকা হুমকি দিয়ে জানালেন ওসি মঞ্জুর কাদেরের হাতে আমাকে তুলে দেবেন।
কাল রাত থেকে এই চুলের হুমকিটা কয়েক হাজার বার দিয়ে ফেলেছেন। আমি ও জানালাম, আমার কোন আপত্তি নেই।
অনেক সময় পর মিজান যেন দয়া করেই ছেড়ে দিলেন আমাকে। অবশ্য আটকে রাখার মত কোন জোরালো লজিকও ছিল না।
ক্লান্ত পায়ে রাস্তায় নেমে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা কাঞ্চনের বাসায় চলে গেলাম। নগর খানপুরের ওখানে থাকে।
মেয়েটা দরজা খুলে দিতেই অবাক হলাম। এত সকালেও একদম ফিটফাট। ঝকঝক করছে নতুন আলপিনের মত।
‘ ভেতরে এসো।’ বলল। ‘ তোমার জন্য কফি বানিয়েছি। বাজি ধরে বলতে পারি ওটা দরকার তোমার।’
কাঞ্চন, লম্বা এবং শ্যামলা। শান্ত চেহারার একটা মেয়ে। ইঁদুরের ফাঁদের মত থমথমে মুখ দেখে কোন যুবক উৎসাহ দেখানর চেষ্টা করবে না। আমরা এক সাথে অনেক দিন কাজ করেছি। আমার প্রথম কর্মচারী। শক্ত ধাতুতে গড়া। একে অপরের ভাল বন্ধু । তরল কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেনি।
‘কফি লাগবে না।’ শান্ত গলায় বললাম।
বারবার দিনার চেহারাটা ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। কত দুপুর আর সন্ধ্যা মেয়েটা সস্তা আলুর চপ আর বেগুনি খেয়ে কাজ করেছে।টার্গেটের পিছু নিয়েছে। সামান্যতেই খুশি হত। ব্যাবিলন ক্যাফেতে বসলে ওর ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে পাশের চেয়ারটা আমার জন্য দখল করে রাখতো। মায়া !
‘ তুমি দিনার এপার্টমেন্টে যাও। শেষের রিপোর্টের কোন একটা কপি নিশ্চয়ই ওর বাসায় আছে। ওটা চাই আমার। বুঝতে পারব কার পিছু নিয়েছিল। কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত । আমি যাচ্ছি আলিজান মীর্জার সাথে দেখা করে সব জানাতে। ‘
‘ তুমি বলার আগেই সব সামাল দিয়েছি আমি।’ শান্ত গলায় বলল কাঞ্চন ।’ খানিক আগেই আলিজান মীর্জার সাথে দেখা করে ফিরেছি। আর বেণীমাধবকে পাঠিয়ে দিয়েছি দিনার এপার্টমেন্টে।’
‘ মনে হয়েছে তুমি অমন কিছু করবে।’ কৃতজ্ঞচিত্তে বললাম। আবারও আবিষ্কার করলাম কাঞ্চন আমার প্রতিষ্ঠানের সম্পদ । ‘ মীর্জা সাহেব কি বললেন ?’
‘ঘুমিয়ে ছিলেন। সব শুনে এমন ভাব করলেন যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। মেয়েটা অপদার্থ কোন কাজের না অমন ও বললেন। ‘
বড় একটা পেয়ালাতে কালো কফি ঢেলে আমার হাতে তুলে দিল কাঞ্চন। চিনি ছাড়া। ও মনে করে চিনি ছাড়া কফি দ্রুত শক্তি ফিরিয়ে দেয়। ‘ পুলিশকে বলেছ দিনা আলিজানে জন্য কাজ করছিল ?’
‘ নাহ, তবে ইনস্পেকটর মিজান বোকা না। আমার পিছনে লেগে থাকবে। আজ বা কাল ও ঠিকই ধরতে পারবে। আমাকে চেনে অনেক দিন। আমার কাজের ছক জানে। তেমন বিপদ হলে আলিজান মীর্জা নিশ্চয়ই আমাদের পাশে থাকবেন ?’
‘মোটেই না।’ শূন্য পেয়ালাতে আরও কফি ঢালতে গিয়ে বলল কাঞ্চন। ‘ উনি পরিষ্কার বলে দিলেন পুলিশ বা মিডিয়া যদি জানে উনি আমাদের ভাড়া করেছিল উনারই স্ত্রীর পিছনে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য তবে আমাদের একদম পথে বসিয়ে দেবেন। অনেক মন্ত্রী মিনিস্টার উনার বগলের বন্ধু ।’
‘উনি আমাদের পাশে থাকবেন না ?’
‘কেন থাকবেন ? আমরা ভাড়াটে চাকর। নিজের মান সম্মান বাঁচাতে উনি পিছিয়ে যাবেন স্বাভাবিক।’
‘সমস্যা নেই। কাজটা আমরা চালিয়ে যাব। উনার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি এটা মনে রাখতে হবে।’
‘দিনা কেন খুন হল ? তোমার কি মনে হয় ?’
‘আমার মনে হয় যে লোকটা অনিতা ম্যাডামকে ব্ল্যাকমেইল করছিল দিনা ওকে চিনে ফেলেছে। বা হাতে নাতে ধরে ফেলেছিল। লোকটা দিনাকে সারাজীবনের জন্য চুপ করিয়ে ফেলল।’
‘কি ভাবে মারা গেছে ?’
‘পয়েন্ট ফিফটি ফাইভ পিস্তল দিয়ে আনুমানিক পনের গজ দূর থেকে গুলি করেছে কেউ। আমি ভাবছি একটা কথাই। মেয়েটার কাপড় খুলে নেয়া হয়েছিল কেন?
শূন্য পেয়ালা রেখে উঠে দাঁড়ালাম। ‘ পুলিশের অপেক্ষায় থাকব না আমি। দিনা আমার কর্মচারী। খুনিকে ধরা আমার দায়িত্ব। নইলে আরেকজন আমার কর্মচারীর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস পাবে।আজ থেকে নতুন কোন কেস আর নেব না আমরা । যতদিন না আলিজান মীর্জা সাহেবের কাজ শেষ হচ্ছে এবং দিনার খুনি ধরা না পড়ছে সব ক্লায়েন্টের ফিরিয়ে দেব। ‘
‘পুলিশ অফসার মিজান তোমার বন্ধু। ওকে পাশে রাখা যায় না ? তুমি, মিজান আর আলিজান মীর্জা এক সাথে বসে কথা বলে দেখ।’ কাঞ্চন বলল।
‘কোন আশা দেখছি না। মিজান রিপোর্ট লিখে ফেলেছে। সেটা দিয়েছে আবার ওসি মঞ্জুর কাদেরের কাছে। কাদের সাহেব আমাদের প্রতিষ্ঠানটা দুই চোখে দেখতে পারেন না। বাঘের মত থাবা মেরে বসে আছেন উনি। বদলির সময় হয়ে গেছে উনার। যাবার আগে কোন ছুতায় যদি আমাদের শেষ করে দিতে পারে সেটা উনি ছাড়বেন না। তারপর ধর আলিজান মীর্জা সাহেবের কথা। উনি কসম খেয়ে বলবেন আমাদের উনি চেনেন না। কোন কাজের জন্য আমাদের ভাড়া করেননি। তার বউ অন্যের জনিস চুরি করে অমন অপবাদ আমরা ছড়াচ্ছি। উল্টা মানহানির মামলা না ঠুকে দেয়। সাথে ওসি মঞ্জুর কাদের সাহেবকে সামান্য টাকা দিলেই উনি আমাদের জেলে ভরবেন । হাউ মাউ করে কেঁদেও প্রমাণ করতে পারব না আলিজান মীর্জা আমাদের ভাড়া করেছেন। আমাদের অর্ধেক ফি দিয়েছেন ক্যাশে। সেটা আবার দিনা ইসলামের কাছে। অফিসে ফোন করেছেন একবার। সেটা আবার ল্যান্ডলাইনে। বলে বসবেন চাকর বাকর কেউ ফোন দিয়েছিল। আজ পর্যন্ত মোবাইলে একটাও ফোন করেননি। নিজেদের পিঠ নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে।’
‘ প্রথম অ্যাকশনটা কি নিতে চাইছ ?’
‘রোজভিলায় যাচ্ছি। অনিতার সাথে কথা বলল।’
‘মনে হয় না কোন লাভ হবে। মাতারি ভেগেছে ।’ হতাশ ভাবে মাথা নাড়ল কাঞ্চন।
‘ তুমি জানলে কি করে ?’ অবাক হলাম।
‘আলিজান মীর্জা সাহেবকে বলেছিলাম অনিতার সাথে দেখা করতে চাই। উনি বললেন শহরের বাইরে নাকি কোথাও গেছে। ফিরতে দেরি হবে কয়েকদিন। আমার তো মনে হয় বুড়ো ভামটা বউকে নিরাপদ কোন জায়গায় পাচার করে দিয়েছে।’
‘অনিতার খোঁজ পেতেই হবে। খুনি কে সেটা ও একমাত্র জানে।’
‘ব্ল্যাকমেইলার যে খুনি অমন ভাবছি কেন ? অনিতার কোন গোপন প্রেমিক হতে পারে না ? বলল কাঞ্চন।
‘ আলিজান মীর্জার মেয়ে রিতু, ওর সাথেও কথা বলতে হবে। সৎ মাকে দেখতে পারে না। মনে হয় তথ্য পাওয়া যাবে। মশিউর রহমান নামে এক বুড়ো ভাম আছে। রাতের বেলায় হাঁটতে গিয়ে দিনার ব্যাগ পেয়েছিল। ওর সাথে কথা বলতে হবে। কিছুই দেখেনি সেইরাতে মনে হয় না। হয়তো খুন হতে দেখেছে। হয়তো অনিতাকে প্রেমিক সহ দেখেছে। কে জানে অনিতার প্রেমিক হয়তো মশিউর বুড়োকে টাকা পয়সা দিয়েছে । মুখ বন্ধ রেখেছে ব্যাটা। ‘
‘ আর কিছু ?’
‘জুবায়ের আলম এবং রেডড্রাগন ক্লাবের মালিক দীলির খাঁন খুশনবীশ এই দুইজনের উপর নজর রাখতে হবে। দিনার রিপোর্টে মনে হচ্ছে দুই ব্যাটাই অনিতার প্রেমিক। বাইরের আচার খাওয়া মানুষ।’
‘ বেণীমাধব আর জাকির দুইজনকে লাগিয়ে দেব দুই শয়তানের পিছে ?’ বলল কাঞ্চন।
‘না বেণী লাগুক। আর জাকির অনিতার খোঁজে যাক। অনিতার অতীত জীবনের খোঁজ করাও দরকার। পোক্ত কিছু হাতে পেয়ে যাব।’
আচমকা ডোরবেল বেজে উঠলো। এতই অকস্মাৎ দুইজনেই চমকে উঠলাম।
‘পুলিশ ?’ ফিসফিস করে বললাম।
‘বেণীমাধব। ওকে বলেছি দিনা ইসলামের বাসা থেকে রিপোর্টের কপি নিয়ে সোজা আমার বাসায় আসতে।’ দরজার দিকে যেতে যেতে বলল কাঞ্চন।
বেণীকে নিয়ে ফিরে এলো কাঞ্চন।
‘প্রতিশোধ নিতে হবে ওস্তাদ।’ বিষণ্ণ চেহারার বেণী আমাকে দেখেই বলল। ‘ পুতুলের মত মেয়েটাকে খুন করেছে।’
‘কিছু সুত্র পেয়েছ ওর বাসায় ?’ নিচু গলায় বললাম। মনটা আবার খারাপ হয়ে গেছে।
বেণীর চেহারা লাল। অনেক কষ্টে ভাবাবেগ সামলে নিল।
‘হ্যাঁ, রিপোর্টের ডুপ্লিকেট পেয়েছি টেবিলে। আরেকটা জিনিস পেয়েছি ওর সোফার তলায়। মনে হয় না জিনিসটা দিনার।’
কথা শেষ করে পকেট থেকে জিনিসটা বের করে আমাদের চোখের সামনে দোলাতে লাগল।
রঙধনুর মত ঝিকিমিকি করে উঠলো হীরার নেকলেস।
অনিতা মীর্জার গলায় ওটা দেখেছি।
আমি আর বেণী যখন ব্যাবিলন ক্যাফেতে পৌঁছলাম , সকাল সাড়ে আটটা বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি । জাকির অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য।
সেই টেবিল, যেখানে চারজন বসতাম। আজ একটা খালি। খচ করে উঠলো বুকের ভেতরে। আমার কর্মচারীকে গুলি করে কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে এই শহরে। প্রতিজ্ঞা করলাম আবার।
আমাদের দেখেই কাউনটারের পাশ থেকে টেবিলের সামনে চলে এলো ভুলু সাহা। ব্যাবিলনের মালিক। মুখে বসন্তের দাগ। গলায় তুলসীর মালা। কপালে পাখীর গুয়ের মত চন্দনের ফোঁটা।
‘সব ভগবানের লীলা।’ গামছা দিয়ে পরিষ্কার টেবিলটা খামখাই মুছতে মুছতে মিহি গলায় বলল সে। ‘মাত্র লোকাল কাগজে খবরটা দেখলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল বাদল ভাই। মেয়েটা খুব ভাল ছিল। ফুলের মত মেয়েটা । আপনার কি মনে হয় ? কোন শালায় অমন কাজটা করলো ?’
‘জানি না, কিন্তু জেনে যাব।’ জবাব দিলাম। পরোটা, ডিমভাঁজা আর চা দিন , প্রচুর কাজ আমাদের হাতে।’
‘ দিচ্ছি বাদল ভাই।’ রঙ জ্বলা ধূসর ফ্যানেলের শার্টের হাতায় মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল ,’ আপনাদের কোন কাজে লাগতে পারলে খুশি হব।’
চন্দনের ফোঁটা চলে যেতেই জাকির বলল , ‘এখন কি করতে চান বাদল ভাই ?’
‘আমাদের তিনজনের এক সাথে কাজ করতে হবে। খুব সতর্ক ভাবে।’
‘মিজান মোল্লা মনে হয় না আমাদের পক্ষে ?’ জাকিরের প্রশ্ন।
‘ মিজান কিছু করার আগেই কেসটা আমরা সমাধান করে ফেলব।মিজান অনেক কিছুই জানে না, যা আমরা জানি। প্রশ্ন একটাই অনিতা মীর্জার নেকলেস দিনার সোফার নীচে গেল কিভাবে ? ‘
‘সোফার নীচে ?’ বেণীর দিকে ফিরে তাকাল জাকির।
‘হ্যাঁ, মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল বেণীমাধব। ‘ কি মনে করে ওর কামরা সার্চ করছিলাম যেন। তখনই চোখে পড়লো সোফার নীচে। ওস্তাদ জানলেন কি ভাবে এটা অনিতা ম্যাডামের নেকলেস?’
‘কাল রাতে অনিতা আমার বাসায় এসেছিল তখন ওর গলায় দেখেছিলাম।’ সংক্ষেপে অনিতার আগমন এবং নাটক সব বললাম।
‘ জিনিসটা দিনার সোফার তলায় গেল কিভাবে সেটাই মাথায় খেলছে না।’
ট্রে করে পরোটা, ডিমভাঁজা আর চা এনে টেবিলে রাখল এক কর্মচারী।
তেলতেলে মুখে ভুলু সাহা এসে দাঁড়িয়ে বলল , ‘ পুলিশ কি লাশ ফেরত দিয়েছে ? আহারে ফুলের মত মেয়েটা । উনার দাফন কাফন…।’
‘ভাই আপনি নিজের দাফন কাফন নিয়ে চিন্তা করেন ঠিক আছে ?’ খেঁকিয়ে উঠলো জাকির।
দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল ভুলু সাহা।
শোকাকুল বেদনামাখা গলায় বলল,’ আপনাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছি। আসলে ভগবানের লীলা । ফুলের মত মেয়েটা।’
হেঁটে চলে গেল ক্যাশটেবিলের সামনে।
ওখান থেকে কান পেতে রইল আমাদের দিকে। যতবার উনার সাথে চোখাচোখি হচ্ছিল ততবারই শোকার্ত একটা ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছিল।
মনে হচ্ছিল কষে একটা লাথি মেরে আসি।
শালা ফুল বিশেষজ্ঞ।।’
‘ দিনার শেষ মুভমেন্ট নিয়ে একটু খোঁজ নাও তুমি।’ চেয়ার ঘুরিয়ে ভুলু সাহার দিকে পিঠ করে বসে বেণীমাধবকে বললাম । যাতে দোকানদারের কুৎসিত চেহারাটা দেখতে না হয়। ‘ কি ধরনের পোশাক পরে দিনা বের হয়েছিল কোন আইডিয়া আছে ?’
‘ওর আলমারি চেক করেছি ওস্তাদ।’ মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে বলল বেণী। ‘ নীল রঙ্গের সালোয়ার কামিজ যেটা রেগুলার পড়তো সেটাই নেই ওখানে।’
‘ নেকলেসটা কি করেছেন বাদল ভাই।’ চায়ের কাপে চিনি মেশাতে মেশাতে জানতে চাইলো জাকির।
‘ অফিসের সিন্দুকে রেখে দিয়েছি। আলিজান মীর্জার মুখ থেকে কথা বের করতে ওটা কাজে লাগবে । নাস্তা শেষ করেই উনার সাথে দেখা করতে যাব।’
‘আমার কাজ কি ?
‘ তুমি সেই মশিউর রহমানের উপর চোখ রাখ। মিজানের কথা মতে লোকটা পিপিং টম। রাতের বেলা ছাদে বসে নদীর পারের নর নারীর গোপন মেলামেশা দেখতে পছন্দ করে। মিজানের কাছে যা বলছে আমার ধারনা দেখেছে তারচেয়েও বেশি। ভামটা রাজনীতি করে। তাই মিজান মোল্লা সালাম দেয়। টাকার লোভ দেখিয়ে হলেও মশিউরের কাছ থেকে খবর বের কর। খরচ নিয়ে চিন্তা করবে না। অফিস থেকে তুলে নেবে।’
এঁটো প্লেট এক পাশে সরিয়ে জাকির বলল, ‘ কাহিনিতে একটা জিনিস বেখাপ্পা। অনিতা ব্ল্যাকমেইলারকে ভালই টাকা দিয়েছে। তো ব্ল্যাকমেইলার দিনাকে মারতে গেল কেন ?’
‘কয়েক কিস্তি টাকা পেয়েছে ব্ল্যাকমেইলার। হতে পারে আরও বড় একটা এমাউন্ত চেয়েছে। সেটাই দিচ্ছিল অনিতা। লেনদেনের সময় দিনা ঘটনা চক্রে সেখানেই উপস্থিত ছিল।’
‘তারপরও বাদল ভাই মনে রাখবেন দিনা চালু মেয়ে। হাতে নাতে ধরা পড়বে সেটা বিশ্বাস হয় না। আড়াল থেকে নজর রাখছিল। ধরা পড়লো কি ভাবে ? নাকি অনিতা ওকে চিনিয়ে দিয়েছে । সেটাই বা করবে কেন ? ব্ল্যাকমেইলারকে বাঁচাতে ? কোন একটা ব্যাপার আছে বাদল ভাই যেটা আমাদের চোখে পড়ছে না ।’
‘ অনিতা হয়তো তার দুই প্রেমিকের কোন একজনের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়েছিল দিনার সামনে । তখন হয়তো্‌। ‘ খানিক চিন্তা করে বলি।
‘আর যাই হোক এই দুই প্রেমিক ব্ল্যাকমেইলার না বাদল ভাই। দুইজনেই বেশ ধনী । টাকা পয়সাওয়ালা।খুন খারাবিতে ওরা জড়াবে সেটাও বিশ্বাস হচ্ছে না। ‘ বলল জাকির।
‘ অমন হতে পারে অনিতাকে অনুসরণ করছিল দিনা। রাতে সাড়ে দশটায় অনিতা এলো আমার বাসায়। দিনা ছিল বাইরে হয়তো। আমার বাসা থেকে বের হয়ে অনিতা দেখা করে ব্ল্যাকমেইলারের সাথে। দিনা সাহসী মেয়ে। ভয় ডর নেই ওর। নিশ্চয়ই অনুসরণ করেছিল অনিতাকে। আচমকা চোখে পরে যায়। ব্ল্যাকমেইলার আতঙ্কিত হয়ে বা রাগের মাথায় গুলি করে ওকে। পুরো ঘটনাটা ঘটেছে আমার বাড়ির মাত্র এক মাইল দূরে। এটা ও পয়েন্ট কিন্তু।’
‘আপনার কেন মনে হচ্ছে না গুলিটা অনিতা করেছে ?’ আচমকা জানতে চাইলো জাকির।
মাথা নাড়লাম।
‘ নাহ আমার যুক্তি তেমন বলে না। পয়েন্ট ফোরটি ফাইভের মত পিস্তল বেশ ওজনের আর বড়। অনিতার মত মেয়ে মানুষ ওটা ব্যবহার করে বিশ্বাস হয় না। তাছাড়া মেয়েটা সাপের মত ধূর্ত কিন্তু খুনি বলে মনে হয় না ।’
‘ জানি না।’ কাঁধ ঝাঁকাল জাকির। ‘ ভদ্রমহিলাকে এখন দেখিনি কাজেই মন্তব্য করতে পারছি না । নেকলেসটা দিনার কাছে গেল কিভাবে ?’
‘ আমার ধারনা কেউ ওটা আমাদের ফাঁসানোর জন্যই দিনার রুমে রেখেছে। ধরা যাক বেণীর বদলে পুলিশ গেল ওর কামরা সার্চ করতে তখন নেকলেস পেলে সহজেই ট্রাক করতে পারতো এই নেকলেস অনিতার। তখন পুলিশ যেত অনিতার কাছে। আর দিনার মৃত্যুর জন্য অনিতাকে ও পুলিশ দায়ী করতো। কে জানে আড়ালে কে খেলছে।’
‘ আলিজান মীর্জার মেয়েটা না তো ?’
‘ রিতু ? অসম্ভব কিছু না। মাকে দেখতেই পারেনা ।’
‘ কিন্তু মেয়েটা তো ল্যাংড়া।’ প্রতিবাদ করলো বেণী। ‘ দিনার ফ্ল্যাট চারতলায়। আর সেই বিল্ডিঙে লিফট ও নেই।’
‘ সে নিজে করবে অমন কোন কথা আছে ? কাউকে ভাড়া করতে পারে না ? টাকাওয়ালা মেয়ে। তুমি খবর নাও দিনার বিল্ডিঙে কে কে থাকে। রাত এগারোটা থেকে রাত তিনটে পর্যন্ত অচেনা মুখ কেউ গেছে কি না ভেতরে। এর আগে হবে না। তখন অনিতা আমার বাসায় ছিল। নেকলেস ওর গলায়। যা ঘটার ঐ সময়ের মধ্যে হয়েছে ।’
‘ অনিতাকে খুঁজে বের করে কথা বলাতে পারলে আমাদের অর্ধেক কাজ হয়ে যাবে।’ বলল জাকির।
মাথা নাড়লাম।
আমি যাচ্ছি আলিজান মীর্জার কাছে।’ বললাম। তুমি যাও মশিউর রহমানের কাছে। কেন যেন মনে হচ্ছে ব্যাটা খুনিকে বা অনিতাকে নদীর তীরে দেখেছে সেই রাতে। বেণী যাও দিনার এপার্টমেন্টে। যদি দেখ পুলিশ ঘুরঘুর করছে তবে গায়েব হয়ে যাবে। দুপুরে এখানেই ভাত খাব আমরা। দেখা যাবে কার কাজ কতদূর হয়েছে।’
ব্যাবিলন ক্যাফে থেকে বের হয়ে গেলাম তিনজন।
রোজভিলার বাইরে অচেনা একজন গার্ডকে দেখা গেল। লোহার মূল ফটক বন্ধ। মনে হয় না সহজে আজ কোন অতিথি ভেতরে ঢুকতে পারবে। দারোয়ানটা বয়সে তরুণ। বটল গ্রিন রঙা ইউনিফর্ম পরে বেশ একটা ভাবের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। একটা কাঠি মুখে । সেটাই চিবোচ্ছে। চোখদুটো ঘুম ঘুম ভাব। ভেড়ার চোখের মত। সুদর্শন বলা যায়। তবে এই ধরনের সুন্দর চেহারার ছোকরা আমার ভাল লাগে না। চেহারায় পাকনা পাকনা একটা ভাব আছে। বয়স তেইশ চব্বিশ হবে। দুনিয়া পরোয়া করে না অমন একটা ভাব। রাস্তা ঘাটে অমন চেহারার ছোকরা প্রচুর পাওয়া যায়। ঝামেলাবাজ।
দারোয়ানের খানিক দূরে গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিন অফ করে বের হয়ে এলাম। শান্ত বন্ধুত্ব মাখা গলায় বললাম, ‘ গাড়ি নিয়ে ভেতরে যাওয়া যাবে ? না হেঁটে যাব ?’
অনেক সময় পর ফিরে তাকাল আমার দিকে। পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে খ্যাঁকরে গলায় বলল , ‘ কি বললেন ?’
‘ আমি জানতে চেয়েছি হেঁটে যাব না গাড়ি নিয়ে যাব।’
অনেক সময় নিয়ে মুখের কাঠি চিবিয়ে বলল ,’ কোনটাই করবেন না। চলে যান গেইটের বাইরে থেকেই।’
‘ না, ভাই। ভীষণ জরুরী কাজ আছে।’ অনুনয় করলাম। ‘ আমার নাম বাদল চৌধুরী। তুমি গিয়ে তোমার বসকে আমার নাম বল। অবশ্যই দেখা করবেন আমার সাথে। নাম বললেই হবে।’
পকেট থেকে দামী একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলো দারোয়ান। হাতের তালুতে নিয়ে তামিল সিনেমার নায়কদের মত বিচ্ছিরি রুচিহীন ভঙ্গিতে লোফালুফি করলো সেটা। বের করে আনল একটা সিগারেট। ঠোঁটে রেখে একই বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে লাইটার লোফালুফি করে আগুন জ্বেলে ধরিয়ে লম্বা টান দিল। ধোঁয়া ছেড়ে মুচকি হেসে আমার দিকে চেয়ে বলল, ‘ বাড়িতে কেউ নেই। চলে যায়।’
অতিরিক্ত সিনেমা ছোকরার মাথা খেয়ে ফেলেছে।
‘ খুব জরুরী।’ ছোকরার ব্যবহার গায়ে মাখলাম না। বড় লোকের বাড়ির দারোয়ান সব সময় ভয়ংকর হয়। ‘ ব্যাপারটা পুলিশ পর্যন্ত গড়াতে পারে।’
আবার অনেক সময় ধরে সিগারেট টানল। চোখ কুঁচকে কেমন একটা তেছরা ভঙ্গিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। শোলে মুভির আমজাদ খানের মত।
‘বুড়া এক ঘণ্টা আগে বের হয়ে গেছে বাইরে ।’ মুচকি হেসে বলল। ‘ কোথায় গেছে সে প্রশ্ন করবেন না। জানি না। এবার খোকা বাবুর মত আপনি ভেগে যান। সকাল সকাল ঝামেলা ভাল লাগে না।’
হারামিটার কথা এক চুল ও বিশ্বাস করলাম না। ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে একটা মাছিকেও গলতে দেবে না বাড়ির ভেতরে। কে জানে আলিজান মীর্জাই তেমন কোন হুকুম দিয়েছে কি না !
নইলে বাড়ির দারোয়ান অত সাহস পায় কোত্থেকে ? এও বুঝলাম ওর সাথে তর্ক করা বৃথা।
গাড়িতে উঠে ফিরে চললাম। আমাকে ইউ টার্ন নিতে দেখা পর্যন্ত চেয়ে দেখল ব্যাটা। তারপর চলে গেল গার্ড হাউজের দিকে।
বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে গাড়ি চালাতে লাগলাম। পিছন দিকের একটা জায়গা পছন্দ হল যেখান গাড়ি পার্ক করলে বাড়ির মূল ফটক থেকে
আমার গাড়িটা কারও চোখে পরবে না।
ইঞ্জিন অফ করে দেয়ালের সামনে গেলাম। আট ফুট উঁচু দেয়াল। ওটা বেয়ে উঠার জন্য দড়াবাজ হবার দরকার পরে না। সামান্য কায়দা জানলেই হয়।
চোখের পলকে লাফ দিয়ে উঠে বাড়ির ভেতরের নরম মাটিতে লাফিয়ে পড়লাম। আবিষ্কার করলাম , চারিদিকে ফুলের বাগান, ভেতরে ব্যাঙের মত বসে আছি।
সকাল মাত্র সাড়ে নয়টা। আলিজান মীর্জা নেই, ভাল কথা । কিন্তু অনিতা বা রিতুকে পাওয়া যাবে, আমি নিশ্চিত।
বাগান থেকে বাড়ি অনেক খানি পথ। ধীর কদমে হাঁটা ধরলাম, খানিক পর পর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে দেখছিলাম। প্রতি মুহূর্তেই আশা করছিলাম লোহার ফটকের কাছ থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠবে।
সুইমিং পুলটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড়। নিঃসঙ্গ। খাঁ খাঁ করছে।
কোন দিক দিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকব বুঝতে পারছিলাম না। পরক্ষণেই দেখলাম রাবার বিছানো একটা পথ গেছে বাড়ির দিকে। টাকা থাকলে যা হয়। গোসল শেষে পায়ে যাতে মাটি না লাগে সেইজন্য এই নাটক।
সুইমিং পুলের শেষ মাথায় বড় বড় হাস্নাহেনা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে বাড়ির দরজাটা দেখতে পেলাম।
মস্ত বাড়িটা প্রায় রাক্ষসপুরীর মত নিঝুম। জানালার কাচে সকালের রোদ লেগে রাংতার মত ঝিলিমিলি করছে।
ঝোপের আড়াল থেকে বের হতেই মুখোমুখি হলাম।
আজ বাগানে মালি নেই , দরজার কাছে খানসামা নেই।
মেয়েটা বসে আছে হুইলচেয়ারে।
ফিরোজা রঙ্গের সিল্কের ঢোলা জামা এর প্যান্ট পরনের। পায়ের পাখীর পালক দিয়ে বানানো জুতা। হাঁটুর উপর ট্রে। টোস্ট, মাখন আর নীল কাঁচের পেয়ালা ভর্তি চা।
চেহারায় বিষাদ মাখা। জীবনে কোন সুখ নেই অমন ভাব। কোথায় যেন চেয়ে আছে। দুনিয়ায় কোন দিকেই খেয়াল নেই।
আমার ছায়া পরেছে তার পায়ের কাছে। তারপরও সাথে সাথেই ফিরে তাকাল না।
দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে ভোগা মানুষের মত হাতের টোস্ট নামিয়ে রাখল তশতরীর উপর। আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে চমকে উঠলো।
‘হ্যালো, আমি বাদল। চিনতে পেরেছেন আমাকে ?’
‘আপনি এখানে কি করছেন ?’ বেহালার তারের মত টানটান হয়ে গেল শরীরটা। চোখের তারায় ক্রোধ।
‘ আলিজান মীর্জা সাহেবীর সাথে দেখা করতে এসেছি। উনি কি ভেতরে আছেন।’
খানসামাকে দেখার আশায় কাঠের দরজার দিকে চাইলাম।
‘লাল আপনাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে ?’ চোখ গরম করে চেয়ে আছে মেয়েটা। বয়সের তুলনায় ওর চোখের ভাব প্রকাশ একটু বেশিই। না দেখলে বুঝা মুশকিল পিচ্চি একটা মেয়ে এত রাগ দেখাতে পারে।
‘লাল ? অহ বাইরের সেই জাম্বুরার মত ছোকরাটা ? নিজেকে তামিল সিনেমার নায়ক মনে করে যে । দারুন সব বেয়াদপ বেছে বেছে আপনারা কাজে রাখেন।’
মেয়েটার মুখটা শক্ত হয়ে গেছে ।
‘ আপনি ভেতরে ঢুকলেন কি ভাবে ?’ কয়েক ধাপ চড়ে গেল গলা।
‘ দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকেছি। শুনুন , সুন্দর সকালটা নষ্ট করতে চাই না। আপনার আব্বুকে দরকার। খুব জরুরী।’
‘ বললাম তো উনি নেই। আপনি চলে যান।’
‘সেইক্ষেত্রে অনিতা ম্যাডামের সাথে কথা বলতে হবে আমার।’
‘উনিও নেই।’
‘খুব খারাপ কথা। উনার একটা হীরার নেকলেস রয়ে গেছে আমার কাছে।’
চামচ দিয়ে চায়ের পেয়ালা ঘাঁটছিল মেয়েটা। পরিষ্কার দেখলাম আঙ্গুলের গিঁট শক্ত হয়ে গেছে ।
‘জিনিসটা খুব দামী। ফেরত দিতে চাই। বলতে পারবেন অনিতা ম্যাডামকে কোথায় পাওয়া যাবে।’
‘ জানি না।এবং এই সব কেয়ারও করছি না। ‘ আচমকা খিঁচিয়ে উঠলো মেয়েটা । আঙ্গুল তুলে সদর দরজা দেখিয়ে বলল , ‘ এখনই চলে যান বলছি।’
‘আপনাকে মোটেও ঝামেলায় জড়ানোর ইচ্ছা নেই।’ বললাম। ‘ কিন্তু অনেক সিরিয়াস ব্যাপার ঘটে গেছে। আপনার আব্বু আমাকে হায়ার করেছেন অনিতা ম্যাডামকে অনুসরণ করার জন্য। একটা মেয়ে উনাকে ফলো করছিল। মেয়েটা খুন হয়ে গেছে। তার বাসায় অনিতা ম্যাডামের হিরের নেকলেস পাওয়া গেছে।’
‘ আমার বাপ আর তার ছুকরি বউয়ের কোন ব্যাপারে কোন রকম আগ্রহ নেই আমার।’ আগের চেয়ে অনেক শান্ত গলায় বলল রিতু। ‘ জাস্ট আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যান।’
‘ দেখুন আমি চাই…।’ কথা শেষ করতে পারলাম না। মনে হল রিতু চোখের ইশারা দিয়ে কাউকে কিছু বলছে। ঘুমঘুম চোখে বিড়াল যে ভাবে ইঁদুর দেখে, চেহারায় সেইরকম একটা ভাব।
ঝট করে পিছন ফিরে তাকালাম।
আমার কয়েক গজ পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বেয়াদপ জাম্বুরা মার্কা চেহারার ছোকরা। লাল। এত নিঃশব্দে এসেছে কিচ্ছু টের পাইনি। দুই হাত মুঠো পাকিয়ে রেখেছে। মুখে টেঁসরা হাসি। আত্নবিশ্বাসে ভরপুর চেহারা।
‘ তুই ভেতরে আসলি কি ভাবে ?’ খাস পেশাদারি বুলি বের হয়ে এলো লালের মুখ দিয়ে । ‘ তরে কি কইছিলাম ? তারপরও ভিতরে আইসছ ?’
‘বাদল সাহেবকে সুন্দর করে বাইরের রাস্তা দেখিয়ে দাও। আর কখন যেন ফেরত না আসেন সেই সবকটাও শিখিয়ে দিও।’
ভিক্টোরিয়ান যুগের মঞ্চনাটকের নায়িকাদের মত ভাবলেশহীন গলায় কথাগুলো বলে তস্তে মাখনের প্রলেপ দেয়ার কাজে মন দিল রিতু।
কুৎসিত হাসি ফুটল লালের মুখে, ‘ আমি কথা দিচ্ছি উনি আর কখনই এই বাড়ির দিকে ফিরে আসবেন না।
ফিরে চাইল আমার দিকে। ‘ স্যার চলুন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’
আর কথা বলা অর্থহীন।
দুনিয়ার সমস্ত মনোযোগ দিয়ে টোস্টে মাখন দিচ্ছে। কি ঘটছে কিছুই জানে না যেন। ক্ষমতা থাকলে মেয়েটাকে ফিল্মফেয়ার এ্যাওয়ার্ড দিতাম।
‘ অনেক সমস্যা মিটে যেত আপনি যদি শুধু বলতেন অনিতা ম্যাডাম কোথায় আছেন।’ শেষ চেষ্টা হিসাবে বললাম।
‘কথা কানে যায় না ধেন্ধা ?গেইট ঐ দিকে। ‘ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল লাল। আমার আরও কাছে চলে এসেছে ছোকরা।
‘মুখের ভাষা ঠিক কর।’ শান্ত ভাবে বললাম। কথা শেষ হবার সাথে সাথেই ঘুষিটা মারল লাল। এত দ্রুত যে কিছুই দেখিনি। গায়ের জোরে মারেনি কিন্তু ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়ে গেল।
বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মুখের রক্ত মুছে বললাম, ‘ চল গেইটের বাইরে। নতুন চাকরি তাই তো পাছায় চর্বি বেড়ে গেছে।’
রিতুর দিকে ফিরেও চাইলাম না। রাগে শরীর রি রি করছে।
গটগট করে হাঁটা ধরলাম লোহার ফটকের দিকে।
পিছে পিছে হিরো মার্কা ভাব নিয়ে অনুসরণ করছিল লাল।
আমি জানি ওকে ক্লাস দিতে পারব। ওর চেয়ে দুই ইঞ্চি লম্বা আমার শরীর। অজন বিশ কেজি বেশি। ক্রোধ শক্তি যোগাচ্ছিল।
বেশ খানিক নিরাপদ দূরে থেকে আমাকে ফলো করছিল লাল। গেইটের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় শামুকের মত সময় নিয়ে গেইট বন্ধ করে গুটি গুটি পায়ে বাইরে এলো সে।
অসহ্য লাগছিল ওর নাটক।
ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। দূরত্ব মেপে নিয়ে ওর চোয়াল লক্ষ্য করে ঘুষি মারলাম। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে। জীবনে কারও দিকে এত রাগ নিয়ে আঘাত করিনি। আমার প্রিয় এবং সেরা হিট কায়দা। জীবনেও ব্যর্থ হয়নি।
ঠিক বিদ্যুৎগতিতে মাথাটা সরিয়ে নিল শয়তানটা। ওর মুখের তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে গেল আমার আঘাত। ভারসাম্য হারিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়তেই আমার মুখ লক্ষ্য করে পরপর পাঁচটা ঘুষি মারল লাল।
টলে উঠে পরে গেলাম শক্ত সিমেন্টের মেঝেতে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাঁটুর উপর ভর করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম।
ঝাপসা চোখে দেখলাম লাল এগিয়ে আসছে আমার দিকে।
ঝাপসা চোখে দেখলাম লাল এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কিন্তু বাঁধা দেব সেই অবস্থা নেই আমার।
আরেকটা ঘুষি মারল।
মনে হচ্ছে শক্ত হাতুড়ি দিয়ে আমার চোয়ালে আঘাত করা হয়েছে।
চিৎ হয়ে পরে গেলাম।
আকাশে পাতলা কয়েক ফালি মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আবিষ্কার করলাম বমি আসছে।
অপষ্ট ভাবে লালের গলা শুনলাম, ‘ আর কোন দিন এই বাড়ির সামনে দেখলে লাফ লাশ ফালাইয়া দিমু শূয়রের বাচ্চা।’
ঘন একটা ছায়ার মত চোখের সামনে দাঁড়ালো কেউ। ঘাড়ের কাছে শক্ত বুটের লাথি পড়লো।
আগুনের উপর ছাইয়ের মত উড়তে লাগলো আমার চিন্তা- চেতনা- বোধ- অনুভূতি।
বাড়ির সামনে আসতেই দেখি মোটর সাইকেলের উপর প্রায় আলকাতরার মত এক পুলিশ বসে নাকের ভেতর থেকে হাবিজাবি জিনিস বের করে আনছে। জিনিসগুলো দেখে প্যান্টের মধ্যে মুছছে।
চেহারায় বিরক্তির ভাব। যেন বরফ যুগের পর থেকেই আমার জন্য বসে আছে।
চোখাচোখি হতেই দারুন রকম একটা দেঁতো হাসি হাসলো । বখসিস চাওয়ার আগে অমন করে পুলিশের লোকজন।
সারাটা রাস্তা নিজেকে গালি দিতে দিতে ফিরেছি। ব্যাথায় প্রাণ বেড়িয়ে যাচ্ছে। লালের উপর যত না রাগ তারচেয়ে বেশি বিম্বিসা জন্মেছে নিজের উপর। ঘাড় নাড়তে পারছি না। চোয়ালে ব্যাথা।
ইহ জিন্দেগীতে অমন মারধর খাইনি। তাও আবার সস্তাদরের দারোয়ানের হাতে।
‘ আপনি আবার কোন খেদমত করার জন্য বসে আছেন সেটা জানতে পারি।’ ভদ্রতার ধার না ধেরে চাঁছাছোলা গলায় বললাম। ‘ কোন ঠোলাকে বাড়ির সামনে দেখলে ভাল লাগে না।’
পুলিশটা আমার মুখের আর ঘাড়ের দিকের ফোলা অংশ অনেক সময় নিয়ে দেখল । চেহারায় সহানুভূতি ফুটিয়ে বলল , ‘ আহা কি সুন্দর লাল, নীল, সবুজ আর বেগুনি রঙ ধরেছে জায়গাগুলো । নিশ্চয়ই জীবনানন্দ দাশের মত ট্রামের নীচে পড়েছিলেন ?’
‘নাহ ট্রাম হতে যাব কেন ? ঠ্যালা গাড়ির নীচে পড়েছিলাম। আপনার কোন সমস্যা ?’
পুলিসটা গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে জানালো তার কোন সমস্যা নেই।
‘ইয়ে থানার ওসি মঞ্জুর কাদের সাহেব আপনার সাথে কথা বলতে চায়।আপনাকে যেতে হবে আমার সাথে।’
‘আপনি গিয়ে উনাকে বলুন উনার সাথে খোশগল্প করার মত সময় নেই আমার। নারায়ণগঞ্জ খুব ছোট শহর । কেউ যদি জানে উনার মত ঘুষখোর ওসির সাথে বসে আড্ডা দিয়েছি, সবাই ভাবছে আমিও ঘুষের ভাগ পাই।’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বললাম।
‘ উনি বলেছেন আপনি যেতে না চাইলে যেন আপনাকে ধরে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে নিয়ে যাই।’ নরম সুরে বলল পুলিসটা। ‘ অযথা ঝামেলা করবেন না প্লীজ। আমরা পুলিসরা ওসির সুনজরে পড়ার জন্য কাউকে ধরে নিয়ে যেতে বললে বেঁধে নিয়ে যাই।’
‘হ্যান্ডকাফের কথা বলেছে ব্যাটা।’ খামাখাই চোখ পাকিয়ে বললাম।
‘হ্যাঁ একটু বেশি বলেছেন কিন্তু থানার ওসিরা সবই করতে পারে। উনি উনার পোষা সাংবাদিক দিয়ে লোকাল খবরের কাগজে নিউজ ছাপতে পারেন আপনি একজন মাদক সম্রাট। ঝামেলা করবেন না প্লীজ। গত রাতের খুনের ব্যাপারে উনি খানিক কথা বলতে চান।’
দরদ মাখা গলায় বলল পুলিশটা।
‘ ঠিক আছে শর্ত একটাই আপনি মোটর সাইকেল দিয়ে আগে আগে যাবেন। আমি আমার গাড়ি দিয়েই আপনার পিছু পিছু অনুসরণ করব ।চাই না সারা দুনিয়ার লোক দেখুক পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।’
বিনাবাক্য ব্যায়ে দুইজন দুইজনের বাহনে উঠে পড়লাম।
বেশিক্ষণ লাগল না পুলিশ হেডকোয়াটারে পৌঁছতে।
লোকটাকে ধন্যবাদ দিয়ে লবিতে উঠেই মিজান মোল্লাকে দেখতে পেলাম। খুব চিন্তিত লাগছে । গোল মুখটা চিন্তার ভারে লাল টম্যাটোর মত লাগছে।
‘কি ব্যাপার মিজান ভাই ? কোন সমস্যা ?’
‘ ওসি সাহেব তোমার সাথে কথা বলতে চান।’ মিজান জবাব দিলেন। ‘ খুব সাবধানে এবং সতর্ক ভাবে কথা বলবে। উনার ধারনা গত রাতের খুনের ব্যাপারে তুমি আমাদের যা বলেছ তারচেয়ে বেশিকিছু জানো। উনার মেজাজটা কুমিরের মত হয়ে আছে । সো, নিজের দিকে খেয়াল রেখ।’
পাথরের ব্লক বসানো লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় দরজা। পিতলের নেইমপ্লেটে লেখা- মঞ্জুর কাদের।
মিজান মোল্লা এমন ভাবে টোকা দিলেন যেন ডিমের খোসা দিয়ে দরজাটা বানানো হয়েছে।
ব্যাপারটা সিরিয়াস। কিন্তু হেসে ফেললাম।
কামরাটা বেশ বড় ।
মনেই হয় না থানার কোন ওসির বসার ঘর। অভিজাত ক্লাবের চেয়ারম্যানের রুম মনে হচ্ছে। মেঝেতে অভিজাত কার্পেট। সোফা এবং টেবিল বেশ দামী। সবগুলোই কোন না কোন অপরাধীদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া।
সিনেমার পর্দার মত বড় টিভি দেয়ালে সেঁটে আছে। ক্রিকেট খেলা চলছে ।
দেয়ালে প্রধান মন্ত্রীর ছবি ঝুলছে। ছবিটা নির্বাচনের জয় পরাজয়ের সাথে সাথে বদলায়। আরেক দেয়ালে ফুল লতা পাতার কেমন একটা অয়েল পয়েন্টিং শোভা বাড়াচ্ছে। চিনি ছবিটা । নামি এক শিল্পীকে মাতাল অবস্থায় ধরে উনার কাছ থেকে ছবিটা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। ওসি মঞ্জুর কাদের অবসর গ্রহণ করলে উনার বাসায় চলে যাবে ফুল লতা পাতা।
দুই জানালার মধ্যখানে ধাউস সাইজের টেবিল। জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের শীতলক্ষ্যা, নতুন গজিয়ে উঠা বাণিজ্যিক দালান বাড়ি, আর মাছ ধরার নৌকা দেখা যাচ্ছে।
টেবিলের পিছনে বিরিয়ানির ডেকচির মত শরীর নিয়ে মুখ কালো করে বসে আছেন ওসি মঞ্জুর কাদের। উনি কে সেটা প্রমাণ করার জন্য টেবিলের উপর পিস্তলটা রেখে দিয়েছেন। বৃক্ষ তোমার নাম কি ? নার্সারিতে পরিচয়।
টেবিলের উপর আরেকটা তিনকোণা কাঠের টুকরোয় উনার নাম আবার লেখা। যাতে কেউ ভুলে না যায়।
কাদের সাহেবের বয়স পঞ্চাশের উপর। শরীরটা চর্বির দোকান। মাথার চুল পাতলা। চোখদুটো ভেজা নুড়ি পাথরের মত চকচকে। ক্ষমতার দম্ভ ফুটে বের হচ্ছে। স্বাভাবিক , প্রতি শুক্রবারে সংসদ সদস্য সাহেবের সাথে বসে মদ খায়।
‘বসো।’ শাদা তুলতুলে বেলুনের মত হাত তুলে একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন । ‘ খানিক আলাপ চারিতা করা দরকার তোমার সাথে।’
‘ নিশ্চয়ই।’ বলেই সাবধানে চেয়ারে বসলাম। ব্যাথায় শরীরটা টনটন করে উঠলো। অজান্তেই মুখটা কুঁচকে গেল।
ওসি মঞ্জুর কাদেরের সাথে এটাই আমার প্রথম মোলাকাত। রাস্তা ঘাটে অনেকবার দেখেছি। ফাউ খাবারের লোভে অনেক রেস্তোরাঁর ভেতরে বসে বসে আড্ডা দিত সেটাও দেখতাম। উনার নিষ্ঠুরতার অনেক গল্প কানে এসেছে। সামান্য পকেটমারের জন্যও উনি তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। প্রতিদিন মার থেকে বাঁচার জন্য পকেটমারের কাছ থেকে দশ হাজার করে টাকা নেন।
টাকা দিতে না পারলে ছয় থেকে আট জন পুলিশ মিলে মারধর করে দুর্বল রোগা আসামির উপর।
উনার আমলে লকআপে বেশ কয়েকটা খুন হয়েছে। সবগুলো আসামিই নাকি আত্নহত্যা করেছে।
লোকটার দিকে আগ্রহভরে চেয়ে আবিষ্কার করলাম উনিও আমার দিকে কৌতূহলী চোখে চেয়ে রয়েছে ।
মিজান মোল্লা দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছেই। সিলিঙের দিকে চোখ রেখে গভীর চিন্তায় মগ্ন। কামরার ভেতরে আক্ষরিক অর্থেই কবরের নীরবতা।
মিজান মোল্লার মত লোক ঠাণ্ডা হয়ে গেছে । এইবার বুঝলাম মঞ্জুর কাদেরের নাম কেন আতঙ্কজনক। খোদ একই ইউনিফর্ম পরা মানুষের কাছেই সে এক দুঃস্বপ্ন।
‘ কাল রাতের মার্ডারের ব্যাপারে কি জানো ?’ ওসি কাদের শুরু করলেন।
‘তেমন কিছু না। মিজান ভাই যখন লাশটা খুঁজে পেলেন আমিও পাশে ছিলাম। ওটাই শুরু এবং শেষ।’ বললাম।
উনি ড্রয়ার টান দিয়ে খুলে বের করে আনলেন সিগারেটের প্যাকেট। এমন ভাবে প্যাকেটটার দিকে রক্তচক্ষু মেলে চেয়ে রইলেন যেন খুনের ব্যাপারে প্যাকেটটা সব জানে কিন্তু উনাকে বলছে না।
‘খুনের মোটিভ কি মনে হয় ?’ কথার কথা এমন ভাবে বললেন।
‘ ধর্ষণের ব্যাপার মনে হয়।’
‘ মেডিক্যাল রিপোর্ট কিন্তু সেইরকম কিছু বলে না।’ চোখ দিয়েই যেন আমাকে খেয়ে ফেলবেন অমন একটা ভঙ্গি করে বললেন। ‘ কোন ধস্তাধস্তি বা আঁচড়ের চিহ্ন নেই। গুলি করার পর সুন্দর করে কাপড় খুলে খুনি সেটা নিয়ে ভেগে গেছে।’
অনেক বেছে একটা সিগারেট তুলে নিলেন। আমি জানতাম আমাকে সিগারেট অফার করবেন না। সেটা সত্য প্রমাণ করে প্যাকেট ড্রয়ারে রেখে বন্ধ করে দিলেন।
‘দিনা ইসলাম তোমার কর্মচারী, এবং তোমার জন্য কাজ করছিল কোন একটা প্রজেক্টে। তাই কি ?’ জানতে চাইলেন।
‘ঠিক।’ জবাব দিলাম।
‘ কাজেই এই ব্যাপারটায় তোমার জানা উচিৎ সবচেয়ে বেশি ।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন ওসি কাদের।
‘ কিছুটা জানি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি জানি ওটা ঠিক না। মেয়েটা কাজের মধ্যেই মারা গেছে।’
‘ তেমন কোন শত্রু ছিল ওর?’
”না।’
‘কোন প্রেমিক?’
‘যতদূর জানি নেই।’
‘কেন মনে হচ্ছে ছিল না?’
‘তেমন কোন ব্যাপার হলে আমাকে বলতো।’
‘ কোন আইডিয়া আছে অত রাতে শীতলক্ষ্যার বরফ কল এলাকায় গিয়েছিল কেন ?’
‘ অত রাত বলতে ?’
‘চোখ বুজে সাড়ে বারোটার উপর হবে।’
‘জানি না।’
‘ তোমার বাড়ির কত কাছে খুনটা হয়েছে। নাকি রাতের বেলা তোমার বাসা থেকেই ফিরছিল ?’
‘আমরা এক সাথে কাজ করি কিন্তু এক সাথে ঘুমাই না।’ নরম সুরে বললাম।
‘তাই নাকি ?
‘আমার কর্মচারীর কাছে আমি বড় ভাইয়ের মত। কর্মচারী আমার চাকর না।’
এতক্ষণে যেন উনি লাইটার খুঁজে পেলেন। সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন ,’ গত রাতে সাড়ে এগারটা থেকে সাড়ে বারোটা এই সময়ে কি করছিলে ?’
‘ ‘ঘুমাচ্ছিলাম।’
‘গুলির শব্দ পাওনি ?’
‘আমি যখন ঘুমাই, ভাল করেই ঘুমাই।’
উনার সাগর কলার মত আঙ্গুল দিয়ে সিগারেটটা চোখের সামনে নিয়ে অনেক সময় নিয়ে ছাই পরীক্ষা করলেন। সন্দেহ নেই পুরো ব্যাপারটা উনি উপভোগ করছেন।
‘কাল রাতে তোমার বাসায় কোন গেস্ট এসেছিল ?’
‘এসেছিল।’
‘কে সে ?’
‘একজন ভদ্রমহিলা। বিবাহিতা। আমার ক্লায়েন্ট, কিন্তু পরিচয় দেয়া যাবে না।’
‘আচ্ছা ?’ যেন ঢাকাই মুভির কোন পার্ট করছেন অমন একটা মুখের ভাব করে বললেন, ‘মহিলার চুলের রঙ লাল ? কালো পোশাক ছিল ?’
আমার মনে হচ্ছে যে কোন মুহূর্তে ওসি কাদের আমার ঘাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
খুব ভাল হত কালকে রাতে যদি কোন ক্লাবে বসে তাস খেলতাম। সাক্ষী মাক্ষি থাকতো ।নিরাপদে থাকতাম।
‘না, লাল চুল বা কালো পোশাক ছিল না।’
‘তোমার সমস্যা হচ্ছে, নিজেকে মস্ত চালু মাল ভাব।’ দম নিয়ে নিজেকে সামলাতে সামলাতে বললেন। ‘ তোমার প্রাইভেট ডিটেকটিভ ফার্ম দুই চারটে কাজ ভাল দেখিয়েছে সেই সাথে পাখা গজিয়ে গেছে তোমার। পাখা কি ভাবে ছেঁটে দিতে হয় জানি। দিনা ইসলাম কোন ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করছিল, খুন হয়েছে মেয়েটা। আর তুমি খুনিকে আড়াল করতে চাইছ না তো ?’
আমার প্রায় মুখের উপর ঝুঁকে এলেন তিনি। চেহারা থেকে মানুষের ভাব গায়েব হয়ে পৈশাচিক একটা ভাব ফুটে উঠেছে।
‘ আপনি নিজে নিজেই কাহিনি বানিয়ে আমাকে শোনাচ্ছেন। আমার বলার কিছু নেই।’ শান্ত গলlয় বললাম।
মিজান মোল্লা এই প্রথম একটু নড়ে চড়ে দাঁড়ালো। কিন্তু আগের মতই পাথর হয়ে রইল। এক ইউনিফর্মধারী আরেক ইউনিফর্মধারীর পক্ষেই থাকবে। এটা শুধু ট্রেনিঙের অংশ না। নিজেদের নিরাপত্তা আর চাকরি বাঁচানোর অংশ।
‘লাল চুলের একটা মেয়ে কাল রাতে তোমার সাথে দেখা করে সেই মেয়েটা দিনা ইসলামের বাসায় গেছে। মেয়েটা কে ? নাম বল ।’
চেঁচিয়ে উঠলেন ওসি কাদের।
‘নাম জানি না।’
‘ মেয়েটা বেশ টাকা পয়সার মালিক। ওর গলায় হীরার নেকলেস ছিল বাদল। এবার বল দিনা ইসলামের বাসায় গিয়েছিল কেন মেয়েটা ?চুপ করে থাকবে না। কথা বল। এই মেয়েটা তোমার ক্লায়েন্ট। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছ না তো বাদল ? ‘
‘ আপনার চিন্তা ভাবনায় বাঁধা দেয়ার আমি কোন রাম গোপাল ?’
অনেক খানি শান্ত হয়ে গেলেন ওসি কাদের
‘ দেখ বাদল আমি তোমার ফার্মের গ্যারান্টির ব্যাপারটা জানি। সবাই জানে তুমি ক্লায়েন্টের কোন তথ্য প্রকাশ কর না। দেখ দুনিয়ায় কাজের অভাব নেই। এই একটা কাজে আমাদের সহযোগী হিসাবে কাজ কর। তোমার ক্যারিয়ারের জন্য ভালই হবে। নিজেও নিরাপদে থাকতে পারবে। বলে ফেল হীরার নেকলেশ পরা মেয়েটা কে ?’
‘আপনি নিশ্চয়ই আশা করছেন না হীরার নেকলেশ পরা সব মেয়েকেই আমি চিনব ? ভুল ভাবে দেখছেন। উনাকে আমি চিনি না।’
অধিক শোকে পাথর বলতে একটা কথা শুনেছি। দেখিনি। কিন্তু ওসি কাদের অধিক শোকে সিমেন্ট হয়ে গেলেন।
দুই মিনিট আমার দিকে কটমট করে মরিচা বাত্তির মত জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রইলেন। ‘ এটাই তোমার শেষ কথা ?’
‘ হ্যাঁ, আমাকে উঠতে হবে। দুঃখিত আপনার কোন উপকারে লাগতে পারলাম না। বাসায় অনেক কাজ। মোজা আর জামাকাপড় ময়লা হয়ে গেছে। লন্ড্রি করতে হবে।’
‘ নিজেকে অনেক বাহাদুর মনে কর তাই না ? ভাল, খুবই ভাল। এখন থেকে তোমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপের উপর আমি নজর রাখব। চেষ্টা করব ব্যক্তিগত ভাবে তোমাকে ফাঁসানোর জন্য। পরের বার এত অল্প সময়ের জন্য থানায় আসবে না সেই গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি তোমাকে বাদল। পুলিশের সাথে হিরোগিরি তোমার … দিয়ে বের করব । ‘
শান্ত গলায় বললেন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম ।
‘ধন্যবাদ ভয় দেখানর জন্য।’ বললাম। ‘ এই অফিসে বসে আপনি মাদক আর পতিতা ব্যবসায়ীদের সাথে মদ খান অমন একটা ছবি আছে আমার কাছে। সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদাবাজরা মাসে মাসে আপনাকে টাকা দিয়ে যায় অমন হাজার জিনিস নিয়ে সুন্দর করে লেখা একটা রিপোর্ট আছে আমাদের কাছে। অফিসে রাখিনি। সব কর্মচারীর কাছে একটা করে আছে। আমাদের কারও কিছু হলে সেটার কপি দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় চলে যাবে। সব সাংবাদিক আপনার পোষা কুকুর না। দুই একজন সাংবাদিক প্রমোশনের জন্য পাগল হয়ে থাকে । অমন কেউ এই খবর পেলে আনন্দে বগল বাজাবে।’
মনে হচ্ছে মুখের পেশীগুলো সব কাঁপছে ওসি মঞ্জুর কাদেরের।
‘দেখ তর কি অবস্থা করি খান…পোলা।’
থরথর করে বললেন।
বের হয়ে গেলাম থানা থেকে।
Series Navigation<< ঈশ্বরের বাগান – প্রথম পর্বঈশ্বরের বাগান – তৃতীয় পর্ব >>

মতামত জানান