ধারাবাহিক ঈশ্বরের বাগান - 1 পর্ব (4)
ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি।
গাড়ি ড্রাইভ করে রোজভিলায় যাচ্ছি। বাড়ির মালিক আলিজান মীর্জা অপেক্ষা করছেন আমার জন্য।
বেলা এগারোটা।গরমের একটা দিন।
ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন । আমি অফিসে ছিলাম না। ফোন ধরেছিল আমার ডান হাত। মানে সহকারী কাঞ্চন । ভদ্রলোক কেন ফোন করে আমাকে খুজছেন সেটা তিনি কাঞ্চনকে বলেননি। আর কাঞ্চন উনাকে কথা দিয়েছে আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রোজভিলায় গিয়ে দেখা করব।
সাথে সাথে দৌড় দিয়েছি । রোজভিলা, শহরের ধনী বাড়িটার একটা। বিশাল জায়গার উপর অমন বাড়ি যারা বানায় তাদের ক্লায়েন্ট হিসাবে পেতে ভাল লাগে।
কে না জানে রোজভিলার কথা !
অফিসে প্রবেশ করা মাত্র কাঞ্চন তাড়া দিল আমাকে। আলীজান মীর্জাকে ও চেনে। বিখ্যাত । প্রায়ই খবরের কাগজের চিপাচাপায় উনার ছবি ছাপা হয়। স্টার শিপিং কোম্পানির প্রেসিডেন্ট । প্যাসিফিক এলাকায় জাহাজ তৈরির কারখানা আছে কয়েকটা।
দুই বছর আগে উনার স্ত্রী মারা গেছে গাড়ি দুর্ঘটনায়।
ইদানীং উনি একদম অল্প বয়সের কোন একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন। মেয়েটা উঠতি মডেল ছিল।
আমার ধারনা উনার গিন্নিকে নিয়ে কোন সমস্যা হয়েছে। তাই আমার সাহায়্য চাইছেন। কে না জানে বুড়ো বয়সে কচি বউ হ্যানডেল করা কি পরিমাণ ঝক্কির !
আবার হয়তো উনার মেয়ে রিতুর কোন সমস্যা ! শুনেছি গাড়ি দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যুর জন্য বাপকে দোষী মনে করে। আবার মেয়ে হয়তো অনেক শত্রু বানিয়েছেন বাপের বস্তাভর্তি টাকার কল্যাণে।
‘লোকটা টাকার কুমির বুঝলে !’ পইপই করে আমাকে ক্লাস দিয়েছিল কাঞ্চন। ‘ যে কাজই দিক না কেন রাজি হয়ে যাবে। মন বদলানোর সুযোগই দেবে না। মনে থাকে যেন।’
‘তুমি এমন ভাবে বলছ কেউ শুনলে মনে করবে তুমিই এই প্রতিষ্ঠানের মালিক। আর আমি কর্মচারী।’ উজ্জল হাসি হেসে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলেছিলাম।
‘বারে, অফিসের ভাল মন্দ দেখতে হবে না আমার ?’ কপট গাম্ভীর্য মুখে রেখে বলেছিল কাঞ্চন। চেহারায় কেমন সিরিয়াস ভাব। না হেসে পারিনি।
একশো একর জায়গা জুড়ে রোজভিলা। অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে বাগান, লন, সুইমিং পুল, আর সুপারির মত কি সব গাছে ভর্তি। মাত্রাতিরিক্ত রকম বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু টাকা থাকলে সেটা অন্যকে দেখাতে না পারলে কি লাভ ?
টাকাওয়ালা মানুষের বাড়িতে গেলে কেমন যেন হীনমন্নতায় ভুগি। নিজেকে কেমন যেন মিসকিন মনে হয়।
বিশাল লোহার গেইটের বাইরে নিজের গাড়ি রাখতেই ডাকাতের মত এক দারোয়ান ভেতরে ঢুকতে দিল। পারকিং প্লেসে ছয়টা গাড়ি পার্ক করা। বিস্কুটের ক্রিম আর আকাশী নীল রঙের দুটো গাড়ি দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ভীষণ দামী।
পিচ ঢালা একটা পথ চলে গেছে রোজভিলার দিকে। গেইট থেকে ভিলা যতটুকু দূর সেটা একটা ফুটবল খেলার মাঠ বলা যায়। আরামসে চ্যাম্পিয়ন লীগ খেলা যাবে। পথের দুই ধারে বাগান। জরির টুকরোর মত উজ্জল রঙ্গের ফুলগুলো চোখে খোঁচা দিচ্ছে।
দুইজন নেপালি চেহারার মালি ইয়া বড় কাচি দিয়ে বাগানের নাম না জানা গাছের ডালাপালা ছেঁটে দিচ্ছে। চেহারায় কোন বিকার নেই বাগানিদের। আমার দিকে ফিরে ও দেখল না।
বাড়িটা দেখে ঢোক গিললাম। কয়টা কামরা আছে এই বাড়িতে ? শাদা বাড়ি। সবুজ কাঠের ফ্রেঞ্জ উইনডো। স্বপ্নিল। সুখী মানুষদের বাড়ি। দুই পাশের হলদে- কমলা আর হাওয়াই মেঠাই রঙ্গের বাগানবিলাসের ঝাড়গুলো দেখছিলাম। আচমকা মেয়েটার উপর চোখ পড়তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। হুইল চেয়ারে বসে সোজা চেয়ে আছে আমার চোখের দিকে, মোটেও অবাক হয়নি।
নার্ভাস হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে মেয়েটা যেন বুঝে ফেলেছে আমার পকেটে আধছেঁড়া একটা মানিব্যাগ আছে। ভেতরে ময়লা কয়েকটা নোট মাত্র।
কত বয়স হবে মেয়েটার ? বেশি হলে চব্বিশ থেকে পচিশ । ছোট খাট চেহারা। মুখটা অখণ্ড পালিশবিহীন হীরার মত রুক্ষ। চোখের তারায় বিষণ্ণ বাসা বেঁধেছে। বয়সের তুলনায় যে উদ্দীপনা থাকার কথা নেই। পান্না রঙের সালোয়ার কামিজ। এই গরমেও একটা চাদর দিয়ে পা ঢেকে রেখেছে।
না বললেও বুঝেছি , আলিজান মীর্জার মেয়ে। রিতু।
মাথা ঝুঁকিয়ে যতটা সম্ভব সুন্দর করে একটা হাসি উপহার দিলাম। যে কোন মেয়ে বর্তে যেত। উনার কিছুই হল না। ভাল করে চেয়েও দেখল না। বরফ মুখে চেয়ে রইল।
‘আপনি ইউনিভারসেল সার্ভিস থেকে এসেছেন ?’ পাথুরে গলায় জানতে চাইল।
মেয়েটার হাতে কি একটা পেল্লাই সাইজের বই। তর্জনী বইয়ের পেটের ভেতরে রেখে বুকমার্কের কাজ চালাচ্ছে।
‘জী ম্যাডাম।’ কয়েক লিটার বিনয় বেশি ঢেলে বললাম।
‘সেইক্ষেত্রে সামনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করা ঠিক হয়নি আপনার। বাইরের লোক, কর্মচারী, বা সার্ভিসম্যান বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে আসবে। এটাই রোজভিলার নিয়ম।’
‘ধন্যবাদ। পরের বার তাই করব।’ মুচকি হেসে জবাব দিলাম।
জবাব না দিয়ে বইয়ের পাতায় মন দিলেন।
সামনের দিকে হাঁটা ধরলাম।
‘ বললাম না পিছনের দরজা ব্যবহার করতে।’ রুক্ষ গলা মেয়েটার।
‘ম্যাডাম আপনার উপদেশ প্রথম বারই শুনেছি। পরের বার পিছনের দরজা দিয়েই আসব। আরও ভাল হত আপনার পিতা আলিজান মীর্জা সাহেব যদি ফোনে এইসব বলে দিতেন।’
রাগের ছাপ ফুটে উঠল মেয়েটার চেহারায়। যেন ভাবছে কি উত্তর দিয়ে শায়েস্তা করবে আমাকে। তার আগেই পুরোদস্তর ইউনিফর্ম পরা খানসামা এসে সেগুন কাঠের দরজা দরজা খুলে দাঁড়ালো, চেয়ে আছে আমার দিকে।
মনটা তেতো হয়ে গেল। কোটিপতির বাচ্চাদের এইসব ভাব জ্বালা ধরিয়ে দেয়।
খানসামাকে পছন্দ হল। চেহারায় মসজিদের হুজুরদের মত নূরানি একটা ভাব। গম্ভীর। মোমের মত পালিশ করা চামড়া। কড়া ইস্ত্রি কড়া ইউনিফর্ম। সব মিলিয়ে ফাটাফাটি কাণ্ড।
নিজের পরিচয় দিতেই তম্বা মুখে জানালেন উনার স্যার আমার জন্য অপেক্ষায় আছেন।
খানসামা আমাকে গাইড করে নিয়ে চললেন । পথ ধরে নিয়ে চল সখা আমি তো পথ চিনি না কিসিমের। প্রথমেই বিলিয়ার্ড খেলার রুম। দেখে ক্লাব ঘরের ভ্রম জাগে। দেয়াল ভর্তি পেইন্টিং। কেউ না বললেই বুঝা যায় দামী। দুনিয়া টাকার গোলাম।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলা উঠা যায়। খানসামা সাহেব ঢং করে লিফটে তুলে নিলেন। বুঝিয়ে দিলেন অনেক কিছু। দোতলায় লম্বা এক করিডোর। মনে হচ্ছে মাইল খানেক লম্বা। মেঝে শাদা কালো বক্স টাইলস। করিডোরের শেষ মাথায় ইয়া বড় এক কামরা। সেটা নাকি আলিজান মীর্জার স্টাডি রুম।
বাইরে আমাকে দাড় করিয়ে দরজায় নক করে ভেতরে গেলেন খাঁনসামা। ফিরে এলেন দম ফেলার আগেই। মাথা নিচু করে বললেন , স্যার আপনার অপেক্ষায় আছেন। ভেতরে যান।’
আলিজান মীর্জা সাহেব দেখতে তার নামের মতই কেউকেটা। খবরের কাগজে পড়েছি মাত্র তিনশো কোটি টাকার সম্পত্তি আছে উনার। লম্বা এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী। গায়ের রঙ পোড়া। ধনী সুলভ নয় মোটেও। দুই চোখ বাদামী। বিড়াল চোখ। কোন ভাব নেই। বয়স পঞ্চাশ পেড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। সেই তুলনায় শরীর পোক্ত। মাথার চুল পাতলা। পায়ের চকচকে জুতা চিৎকার করে তার টাকাপয়সার বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল। কটমট করে চেয়ে আছেন আমার দিকে। রিক্সাওয়ালা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে দুই এক টাকা বেশি চাইলে বেশির ভাগ মানুষ অমন করে চেয়ে থাকে।
‘আপনিই বাদল চৌধুরী।’ কারন ছাড়াই ঘেউ করে উঠলেন ।
উনি কি আমাকে কালা ভেবেছেন নাকি ? আর সবার সাথে এইভাবেই কথা বলেন ? মানুষ সহ্য করে ?
জবাব না দিয়ে মাথা নাড়লাম। জানি টাকা পয়সাওয়ালারা অন্যের কথা শুনতে চায় না। নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছেই দৈববানীর মত লাগে উনাদের।
‘ইউনিভারসেল সার্ভিস থেকে এসেছেন ?’ লোকটা যেন নিশ্চিত হতে চান সঠিক ব্যক্তির সাথেই কথা বলছেন কি না ।
‘ঠিকই ধরেছেন স্যার।’
সন্দেহ মাখা কুতকুতে চোখে খানিক চেয়ে রইলেন আমার দিকে। কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। সোজা চলে গেলেন জানালার দিকে। বাইরে চেয়ে রইলেন খানিকটা সময়। কি দেখছেন উনিই জানেন। আমার আপত্তি করার কারন নেই। এই যে অপেক্ষা করাচ্ছেন সেটার মুল্যও আদায় করে নেব আমি।
বাইরের দিকে চেয়েই আচমকা বলে উঠলেন , ‘আপনি এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু কিছু তথ্য আমি পেয়েছি। লোকমুখে। লোকের কথা তেমন পোক্ত লাগে না আমার। নিজের মুখে যদি কিছু বলতেন খুশি হতাম।’
‘ নিশ্চয়ই।’ খুশি হলাম । নিজের মুখে নিজের বিজ্ঞাপন দিতে খারাপ লাগে না। ‘ আমি শুনেছি ধনী লোকজন ব্যক্তিগত সার্ভিস পেতে পছন্দ করেন। সেইজন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে তারা পিছ পা হন না। আর্মিতে জয়েন করতে চেয়েছিলাম। পরিচিত এক মেজর পাঁচ লাখ নিয়েছিল ঘুষ হিসাবে। টাকা হজম করে ফেলেন তিনি। চাকরি পাইনি।
‘ তখন হাত খালি। একদম ফকির অবস্থা। ঠিক করলাম ধনী মানুষদের সার্ভিস দেব। সব ধরনের সার্ভিস।সেই ফলশ্রুতিতে আগামী সপ্তাহে আমার ইউনিভারসেল সার্ভিসের তিন বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই তিন বছরে আমি মস্ত কিছু হয়ে গেছি তা নয়। ছোট্ট প্রতিষ্ঠান। সবার বেতন দিতে পারি। তারচেয়ে বড় কথা কাজটা আমি উপভোগ করি। প্রতি পল প্রতি মুহূর্ত।
যে কোন ক্লায়েন্টের যে কোন কাজ আমরা উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে করে থাকি। যদি সেটায় আইনের বাঁধা বা আমার রুচিতে না বাঁধে। বিবাহ বিচ্ছেদ হতে শুরু করে আপনার পোষা কুকুর হারিয়ে গেলেও সেটা আমরা খুঁজে দেব। কেউ আমাদের ক্লায়েন্টকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে, ব্যাপারটা আমরা দেখব । আপনার সন্তান গোপনে ড্রাগ কিনতে যাচ্ছে ? আমরা নজর রেখে জানাব। আপনার মেয়ে, ছেলে বন্ধুদের সাথে গ্রুপ ট্যুরে গিয়ে কি কি করছে ? জানাব। হাজার ধরনের কাজ করি আমরা, মোদ্দা কথা এমন কাজ যে ক্লায়েন্ট ফেঁসে গেছে, কিন্তু একা সামাল দিতে পারছে না। যাকে ক্লায়েন্ট হিসাবে গ্রহণ করি তার সমস্যা নিজের বলেই মনে করি। এবং জান দিয়ে তাকে রক্ষা করি। ফি একটু বেশি নেই। তবে সেটা একবারই। ভদ্রলোকদের মত গ্যাঁড়াকলে ফেলে টাকা আদায় করি না। নো বখশিশ । নো কমিশন। শুধু মাত্র ধনী লোকজনদের সার্ভিস দেই আমি। কাজ না হলে লোল দিয়ে গুনে টাকা ফেরত দেই। ‘
আরও কিছু বলতাম। দম নেয়ার জন্য খানিক থামতেই উনি বিরক্ত হয়ে বললেন , ‘হ্যাঁ, আমিও প্রায় ওরকম কিছু শুনেছি লোকমুখে। ‘ জানালার পাশ থেকে সরে এলেন । ‘ বসুন, কি ড্রিঙ্ক নেবেন ?’
সোফার বসতে বসতে জানালাম, আমি মোটেও ড্রিংক করি না। নাকে মুখে মিথ্যা। সম্ভবত আলিজান মীর্জা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। দেয়ালের ককটেল ক্যাবিনিটের দিকে এগিয়ে গেলেন। অভিজাত একটা বারে যা যা থাকার কথা তাই আছে। লম্বা দুটো হাই বল গ্লাস নিয়ে সহজ একটা ছন্দে পানীয় বানাতে লাগলেন তিনি।
অভস্ত্য গতিবিধি। প্রায়ই বানিয়ে গিলেন।
একটা গ্লাস আমার হাতের নাগালের সামনে রেখে অন্য গ্লাসটা মুঠোয় রেখে তম্বা মুখে চেয়ে রইলেন। যেন বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন গ্লাসটা নিয়ে।
‘আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন।’ নরম গলায় বললাম। ‘ আপনার কাজে লাগতে পারলে খুশিই হব, বিশ্বাস করুন।’
বিষাদ মাখা মুখে উনি চেয়ে রইলেন আমার দিকে।
‘ আপনার ব্যাপারে অনেক খোঁজ নিয়ে তারপরই আপনাকে ডেকে এনেছি।’ খানিক নার্ভাস গলায় বললেন। ‘আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি ঠিকই পারবেন।’
কথা শেষ করে লম্বা একটা সময় ধরে উনি চুপ মেরে গেলেন।
হাইবল গ্লাসটা তুলে চুমুক দিলাম। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। হারামজাদা কি বানিয়েছে এটা। হাতি পর্যন্ত মাতাল হয়ে যাবে।
‘সব কিছু বিস্তারিত বলার আগে একটা বিচ্ছিরি জিনিস আপনাকে দেখাতে চাই। আচমকা বলে উঠলেন আলিজান মীর্জা। ‘আজকেই আবিষ্কার করেছি। আপনার প্রতিক্রিয়া কি হয় সেটা আগে দেখতে চাইছি। আসুন আমার সাথে।’
করিডোরের শেষ মাথায় নরম আলোয় মাখামাখি একটা বেডরুমে নিয়ে গেলেন তিনি। মিষ্টি সৌরভে অনুমান করলাম কোন মেয়ে থাকে এই কামরায়। প্রমাণ পেলাম সুন্দর আয়না সহ পেল্লায় ড্রেসিং টেবিল দেখে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নেইল পলিস, লিপস্টিক সহ আরও কিছু একান্ত মেয়েলী জিনিস।
আখরোট কাঠের আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। টান দিয়ে বের করে আনলেন বাছুরের চামড়ার একটা সুটকেস। আমার পায়ের সামনে নামিয়ে বললেন, ‘ জিনিসটা খুলে দেখুন।’
গোড়ালির উপর ভর করে বসে সুটকেসটা খুললাম। দুনিয়ার সব হাবিজাবি জিনিস দিয়ে ভেতরটা ভর্তি। তিনটে ভিন্ন সাইজের জুতা, একটা সোনার সিগারেট কেস, কয়েকটা ওয়ালেট, বেশ কয়েকটা হীরার আংটি, নাম করা হোটেল আর রেস্টুরেন্টের নাম, লগো খোঁদাই করা কয়েকটা চামচ-কাটাচামচ, হাফ ডজন জিপো লাইটার, কয়েক জোড়া মেয়েলী সিল্কের মোজা- প্রাইজ ট্যাগ লাগান আছে এখনও। উজ্জল পাথর বসানো সোনালী কাঁচি, স্বর্ণের পেপার নাইফ, বেশ কয়েকটা সুইস আর্মি নাইফ, তিনটে দামী ঝর্ণা কলম, আর বিঘৎ খানেক লম্বা জেড পাথরের নগ্ন নারীমূর্তি।
জিনিসগুলো দেখে উনার মুখের দিকে তাকালাম। এখনও কিছু বলছেন না। সুটকেসটা নিয়ে জায়গা মত রেখে দিলেন।
‘এটাই দেখাতে চেয়েছিলাম।’ খানিক ফিসফিস করে বললেন যেন। ‘ চলুন স্টাডি রুমে ফিরে যাই।’
ফিরে গিয়ে হাইবল গ্লাস হাতে বসতেই প্রশ্ন করলেন , ‘ কি বুঝলেন ?’
হোটেলের চামচ আর জুতা না থাকলে সাধারণ শিশুসুলভ সংগ্রহ মনে হত।’ বললাম । ‘কিন্তু এখন ব্যাপারটা অন্য রকম মনে হচ্ছে। কোন ক্লিপটোমানিয়াকের কাজ মনে হচ্ছে, জানেন তো, অন্যের জিনিস দেখলেই চুরি করে অনেকে। বলছি না এটা সেই কেস। কিন্তু হতে পারে।’
‘আমার ও তাই মনে হচ্ছে।’ বড় একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন আলিজান মীর্জা।
‘কেউ মজা করে অমন …।’ বলতে চাইলাম।
‘ মোটেও মজার কিছু না।’ ঝাঁঝাল গলায় বললেন তিনি। ‘ বিয়ের পর আমার স্ত্রী কে নিয়ে নানান জায়গায় দাওয়াত খেতে গেছি। জিনিসগুলো আমি ভাল করেই চিনি। জেড পাথরের মূর্তিটা মল্লিক সাহেবে বাসায় দেখেছি, সোনার পেপার নাইফটা চাকলাদার সাহেবের টেবিলে ছিল, চামচগুলোতে তো রেস্টুরেন্টের নাম লেখাই আছে। ওখানেই ডিনার করতে গিয়েছিলাম। নাহ, এটা কোন রকম রসিকতা না।’
‘আমাকে দিয়ে ঠিক কি করাতে চাইছেন আপনি ?’ জানতে চাইলাম।
জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলেন তিনি। বাক্স খুলে একটা সিগার বের করে অনেক সময় নিয়ে আগুন ধরালেন সেটায়। দেখলাম উনার হাত দুটো কাঁপছে।
‘ব্যাপারটা বিব্রতকর।’ মিনিট খানেক পর মুখ খুললেন আলিজান মীর্জা। ভাবলেশহীন শান্ত কণ্ঠস্বর । ‘ বলতে গেলে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে তেমন কিছুই জানি না । ঢাকার এক অভিজাত হোটেলের ফ্যাশন শোতে ওকে প্রথম দেখেছিলাম। উঠতি মডেল। সিনেমায় নামার ইচ্ছা ছিল। পরিচয়ের তিন সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায় আমাদের। বিয়েটা তেমন ঢাক ঢোল পিটিয়ে হয়নি। একটু সাদামাটা ভাবে গোপনে করেছিলাম।’
‘গোপন করার কারন ?’
‘ আমার মেয়ে, ওর মা মারা যাবার পর ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায়। বিরাট শক ছিল ওর জন্য। নিজেও পঙ্গু হয়ে গেছে। মনে হত অনিতা মানে আমার নতুন স্ত্রীকে ও সহজে মেনে নেবে না। সেইজন্য।’
‘মনে হচ্ছে এখনও আপনার মেয়ে আপনার গিন্নিকে পছন্দ করেন না?’
‘ কথা বলে না, মেলামেশা করে না ব্যস। আমি আসলে জানতে চাই আমার স্ত্রীর আসলেও চুরি করার বাতিক আছে কি না।’
‘আপনি কি কখনও তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছেন ? কোন রকম ব্যাখ্যা দাবি করেছেন ? ‘
ফাপা দৃষ্টিতে উনি চেয়ে রইলেন আমার দিকে । ‘ অবশ্যই না। অনিতা সহজ পাত্রী না। সোজা বলে না বসবে।’
‘ ব্যাপারটা অমন ও তো হতে পারে কেউ তার বদনাম করতে চাইছে। সুনাম নষ্ট করতে চাইছে। তার অজান্তে জিনিসগুলো এই ব্রিফকেসে রেখে দিয়েছে।’ সহজ সুরে বললাম।
‘আপনার ধারনা এই কাজটা কে করতে পারে ?’ বরফের মত শীতল গলা আলিজান মীর্জার।
‘সেটা আপনি আমার চেয়ে ভাল করে জানেন। আমি শুধু পেশাদারি দৃষ্টিতে আমার চোখে পড়া একটা এঙ্গেল জানালাম। আপনি, আপনার গিন্নি এবং মেয়ে তিনজনের মধ্যেই তো কাহিনীটা । আপনার মেয়ে উনার সৎ মাকে সহ্য করতে পারেন না। পয়েন্ট না এটা ? ‘
এক লহমায় উনার চেহারাটা কুৎসিত হয়ে গেল। লাল চোখে বললেন , ‘এর মধ্যে আমার মেয়েকে আনবেন না।
ভদ্রলোকের ক্রোধ কমে আসার জন্য খানিক সময় দিলাম।
‘আপনি কি মনে করে উনার আলমারি খুলতে গেলেন সেটা আগে বলুন তো । এমনিতেই ? নিশ্চয়ই লিপস্টিক খুঁজতে যাননি। একদম খামাখা ওটা খুলেছেন নাকি কিছু খুজছিলন ?’
পেশাদারি ভাবটা ফিরে এলো আমার।
‘আমি বিশ্বাস করি আমার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে,’ জোড় গলায় বললেন তিনি। ‘ প্রমান সংগ্রহের জন্য ওর সুটকেস খুলেছিলাম। এমন কিছু যদি পাই যাতে আমার অনুমান সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারি।’
‘আপনার কেন মনে হচ্ছে যে কেউ আপনার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করছে ?
‘প্রত্যেক মাসে ওকে আমি হাত খরচের জন্য কিছু টাকা দেই।’ শান্ত কাটা কাটা স্বরে বলতে লাগলেন তিনি। প্রত্যেকটা শব্দের উপর আলাদা করে জোড় দিচ্ছেন । ‘ ইচ্ছামত খরচ করে মেয়েটা। যত না দরকার তার থেকেও বেশি। চেক দিয়ে বা এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা তুলে নেয়। সব কিছুর একটা করে রিসিট চলে আসে আমার কাছে। অনিতা জানেও না। গত তিন মাসে প্রচুর টাকা তুলছে ।’
‘ প্রচুর বলতে কি রকম ?’ জানতে চাইলাম। মনে মনে ভাবছি, ঠিকই আছে । টাকার গাছ বিয়ে করলে অমন ফল তো পাড়বেই।
‘ পাঁচ লাখ, দশ লাখ এবং তিন লাখ।’
‘টাকা দিয়ে কি করছে মানে কিভাবে খরচ করছে জানেন ?’
‘চেক কেটে তুলেছে । নগদ টাকা কি করেছে বলতে পারব কেমন করে।’
‘ আপনি ভাবছেন আপনার গিন্নিকে কেউ চুরি করতে হাতে নাতে ধরে ফেলেছে। এবং সেই লোক বা লোকেরা ব্ল্যাকমেইল করছে ?’
‘ অসম্ভব কিছু না।’ মুখ কুঁচকে বললেন তিনি । ‘ আমি চাই চব্বিশ ঘণ্টা অনিতার উপর নজর রাখবেন আপনি। কোন কোন মার্কেটে যায়, কোন ক্লাবে যায়। কার কার সাথে মেলামেশা করে সব খেয়াল রাখবেন , নিয়মিত সেই তথ্য জানাবেন আমাকে। বিশেষ করে কার কার সাথে মেলামেশা করে। ওটা বেশি দরকারি। অনিতা যেন টের না পায়। কোন রকম বিব্রতকর পরিস্থিতি যেন না হয় সেটাও খেয়াল রাখবেন।’
মোটেও কঠিন কাজ না। এমন কাজের জন্য একটা মেয়ে আছে আমার কাছে। ওর নাম দিনা । আগেও এই কাজ করেছে স্পেশাল ভাবে ট্রেইনড করা। আপনি চাইলে আজ দুপুর থেকেই দিনাকে কাজে লাগিয়ে দেব। এই তো চান তাই না ?’
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন আলিজান মীর্জা ।
‘কাল দুপুর তিনটার সময় দিনা আপনাকে রিপোর্ট দেবে । ফোনে করলে ভাল হয় ? নাকি কোথাও দেখা করবে। মেয়েটা আপনার বাড়িতে আসবে না। নিরাপত্তার খাতিরেই ।’
‘ আথেলেটিক ক্লাবটা ভাল হয়।’
উঠে দাঁড়ালাম।
‘ আরেকটা কথা স্যার । আমি চাই না আর অন্য কেউ জানুক আপনি আমাকে ভাড়া করেছেন। সেটা দুইজনের জন্যই ভাল।’
‘নিশ্চয়ই, আপনি কি বলতে চাইছেন ?’ খানিক বিরক্ত হয়ে তাকালেন আমার দিকে।
‘আপনি যখন আমার অফিসে ফোন করেছেন তখন মোবাইলে ফোন দিয়েছেন না ল্যান্ডলাইন ব্যবহার করেছেন ?
‘ল্যান্ডলাইন। কেন ?’
‘এই লাইনের এক্সটেনশন আছে বাড়ির অন্য কোন ফোনে ?’
‘আছে বটে।’
‘আচ্ছা। আপনি ফোন করা মাত্র আমি দৌড়ে চলে এসেছে। বাইরে আপনার মেয়ে রিতু ছিল। উনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছেন, আমি ইউনিভারসেল সার্ভিস থেকে এসেছি কি না ! আমি কে সেটা উনার জানার কথা না ।ল্যান্ডলাইনে আর ফোন করবেন না। মোবাইল। এবং আড়ালে গিয়ে।’
ধাক্কাটা ভালই খেলেন ভদ্রলোক।
খানিক বিচ্ছিরি ধরনের নিরবতা।
‘আচ্ছা, সতর্ক থাকব আমি। আপনি কাজ শুরু করুন।’ বললেন ।
কথা শেষ হতেই দরজার বাইরে খানসামা এসে দাঁড়ালেন । আগের মতই হাত ধরে নিয়ে চল সখা ভাব।
‘ অনিতা ম্যাডাম কি বাড়িতেই আছেন ?’ কথার কথা অমন একটা ভাবে প্রশ্ন করলাম।
চোরা চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন , ‘ মনে হয় উনি সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছেন। দেখা করবেন নাকি ?’
‘নাহ । তিনজনের জন্য বাড়িটা অনেক বড় হয়ে যায়। আপনি পথ হারান না মাঝে মাঝে ?’
কৌতুকটা পছন্দ করলেন না খানসামা। তম্বা মুখে বললেন, ‘ বিদায় স্যার।’
বাইরে ঝিকিমিকি রোদ। আশা করছিলাম রিতু ম্যাডামকে দেখতে পাব। উনার ছায়াও নেই।
চুলোয় যাক।
লনের উল্টা দিকে তাকাতেই মেয়েটাকে দেখলাম। লম্বা, মাখনের মত চামড়া। মাথা ভর্তি চুল। বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী। বয়স সাতাশ থেকে ত্রিশ হবে। এত দূর থেকেও বুঝলাম চোখ দুটো অনেক বড় বড়। কোন সঙ্কোচ ছাড়াই সুইমিং শর্টস আর টি শার্ট পরে বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছে।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ফিরে তাকাল। অদ্ভুত রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো ওর পাতলা ঠোঁটে।
হাসি দিয়েই এই মেয়ে হাজার যুবক খুন করে ফেলতে পারবে। বুড়ো আলিজান মীর্জার দোষ কি ?
টি শার্ট এত ছোট যে ওটার ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে গেছে।
বাঁকের কাছে গিয়ে ফিরে তাকাল মেয়েটা ।
পেন্সিলে আঁকা ভ্রু নাচিয়ে আরেক বার সেই হাসিটা হাসল। তারপর হারিয়ে গেল।
বেকুবের মত দাড়িয়ে রইলাম। দরদর করে ঘামছি।
অর্কিড বিল্ডিঙের দশ তলায় মাত্র দুই কামরা নিয়ে ইউনিভারসেল সার্ভিসের অফিস। শহরের ব্যস্ততম জায়গা। বিল্ডিঙের নীচে ডজন ডজন গাড়ি পার্ক করা। বিচিত্র সব অফিস, দপ্তর ভর্তি চারিদিকে। পিছনের রাস্তায় হংস সিনেমা হল। উল্টা দিকে ব্যবিলন বার।
কাঞ্চনের সাথে কথা বলে আলিজান মীর্জার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে একটা ফাইল খুলে নিলাম। উনার কাজ আমাদের। তারপর সোজা দৌড়ে গেলাম ব্যবিলন বারে।
ওরা অপেক্ষা করছে আমার জন্য।দিনা, জাকির আর বেণীমাধব।
আমার তিন কর্মচারী। যাদের জন্য টিকে আছি আমি ।
ব্যবিলন বারের সবচেয়ে কোণার টেবিলটা দখল করে বসে আছে ত্রিরত্ন। নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ দিয়ে অন্য একটা চেয়ার আমার জন্য দখল করে রেখেছে দিনা।
সালামের মত ভঙ্গি করলো সবাই।
‘বাদল ভাই এত দেরি করলেন ? সকাল থেকেই বসে আছি আপনার জন্য।’ হাসিমুখে বলল দিনা।
মেয়েটা সুন্দরী, চেহারায় বাচ্চা বাচ্চা ভাব, চালাক। সব মিলিয়ে কাজের।
‘তোমাদের সবার জন্য কাজ আছে।’ বসতে বসতে বললাম । ‘ তোমাদের মাথায় আমলকির আচারের বদলে যে মগজ আছে সেটার প্রমাণ করতে হবে ।’
‘ কাল সারা রাত ডিউটি করে এসেছি ।আমাকে বাদ দিন বাদল ভাই।’ ঘুমঘুম গলায় বলল বেনিমাধব।
‘শেষ যে কাজ দিয়েছিলেন সেটার রিপোর্ট অফিসে দিয়েছি বাদল ভাই।’ বলল জাকির। ‘ মন্ত্রী আব্দুর রউফ ক্যাসিন ব্যবসায়ে পুঁজি ঢেলেছেন। প্রমাণ আছে আমার হাতে। তিনটে হোটেল কিনেছেন সিঙ্গাপুরে।’
জাকির লম্বা, শ্যামলা গায়ের রঙ। নাকের নীচে গোঁফ আর মাথা ভর্তি চুলে বেশ সুদর্শন লাগে সবার চোখে। বেণীমাধব উল্টা। বেঁটে এবং বেশ মোটা। মুখটা লাল। যেন গরমে কষ্ট পাচ্ছে। একদম আলাদা চরিত্র হলেও কাজে দুইজনেই সেরা। ওদের সঙ্গ উপভোগ করি।
কর্মচারী মনে হয় না, যেন ছোট বেলার বন্ধু ।
‘আমার কাজের …।’ বলা শুরু করলো দিনা।
ট্র্যাফিক পুলিশের মত হাত বাড়িয়ে ওদের থামিয়ে দিলাম। ‘ নতুন প্রজেক্ট। আগের রিপোর্ট অফিস থেকে নেব। খাবারের অর্ডার দিয়েছ না উপবাস থাকবে সবাই।’
খাবারের অর্ডার দিয়ে দিনাকে বললাম , ‘ দুপুর তিনটেয় তুমি এথেলেটিক ক্লাবে যাবে। আলিজান মীর্জা তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবেন। উনার গিন্নির একটা ছবি দেবেন তোমাকে। চোখ কান খোলা রাখবে। সারাক্ষণ অনুসরণ করবে ভদ্রমহিলাকে। সামান্য হলেও বিপদ বা ঝামেলা হতে পারে। কোন দোকান থেকে যদি কিছু চুরি করেন বা কোন পুরুষের সাথে বেশি মাখামাখি করেন ছবি তুলে নেবে। আমি চাই কাজটা সুন্দর আর নিখুঁত ভাবে করবে।’
‘ এই ধরনের কাজ আমাকে দিলে ভাল হত বাদল ভাই।’ অভিযোগ করলো জাকির। সুন্দরী মেয়েদের অনুসরণ করা বেশ জেমস বন্ড মার্কা ভাব আছে।’
সবাই হাসলাম।
‘আমার মনে হয় আপাতত এই নিরীহ কাজে সবাই জড়িয়ে পড়তে পারি।’ অন্যমনস্ক গলায় বললাম।
কেন বললাম জানি না। মন বলছে।
সবাই চুপ করে রইল।
নীরবতা ভাঙ্গল বেণী ‘ জানি বাদল ভাই। এইজন্য আপনি আমাদের বস না বড় ভাই। আশা করি বড় ভাই খাবারের বিলটা দিয়ে দেবে।’
দুইদিন পর।
শীতলক্ষ্যা নদীর পারে আমার চার কামরার ছোট বাড়ির বারান্দায় বসে আছি। হাতে হাইবল গ্লাস ভর্তি সোনালী অনল।
অফিস থেকে আসার সময় দিনার রিপোর্টটা নিয়ে এসেছি। পড়ছি।
টানা অনুসরণ করেছে দিনা। সব দিক বিবেচনায় দিনার মতামত- অনিতা ম্যাডামের মধ্যে জিনিসপত্র চুরি করার কোন রকম প্রবণতা দেখা যায়নি। রোজই মার্কেটে গেছেন। কেনাকাটা করেছেন। নগদে বা কার্ডে বিল দিয়েছেন।
কিন্তু আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে উনি জুবায়ের আলম নামে একজন লোকের সাথে গোপনে দেখা করেন। দুইদিনে দুইবার। এবং দুইজনেই বেশ সতর্ক। যেন আশংকা করছে কেউ তাদের অনুসরণ করছে।
গলদা চিংড়ির জন্য বিখ্যাত এমন একটা রেস্টুরেন্টে অনিতা আর জুবায়ের আলম গিয়ে বসে । রেস্টুরেন্টটা শহর থেকে বেশ দূরে। নির্জন। এবং পরের দিন একটা গ্রীক রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা করেছে। দুটো জায়গার মধ্য মিল হচ্ছে শহর থেকে দূরে, এবং সম্ভবত আলিজান মীর্জার বা অনিতার পরিচিত কেউ ওখানে ভুলেও যায় না।
গাড়ির লাইসেন্স প্লেট থেকে দিনা জুবায়েল আলমের নাম ঠিকানা বের করেছে। ওমর খৈয়াম অ্যাভিনিউতে বাংলো টাইপের এক বাড়িতে থাকে। মুভিস্টারদের মত জামাকাপড় পরে। রুপালি রঙ্গের দামী গাড়ি চালায়। এবং মনে হয় বেশ টাকা পয়সার মালিক।
বেশ সন্দেহজনক চরিত্র।
সন্দেহ করার মত দ্বিতীয় চরিত্র হচ্ছে দীলির খাঁন খুশনবীশ ।
বেশ ডাঁট মারা চরিত্র। রেড ড্রাগন নামে একটা অভিজাত ক্লাবের মালিক। নাম আছে ক্লাবটার ।
গতকাল সন্ধ্যা সাতটার সময় সেই ক্লাবে গিয়ে ঘণ্টা খানেক সময় কাঁটিয়ে এসেছে। কিন্তু দীলির খাঁন ব্যস্ত থাকায় দেখা করতে পারেনি। বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে নজর রেখেছে দিনা।
দীলির খাঁন মালটার নাম শুনেছি। কখনও মুখোমুখি হইনি । প্রচুর টাকা কামায় ক্লাবটা দিয়ে। জুয়ার আসর বসে। সীসা বারের নামে সব ধরনের মাদক পাওয়া যায়। পুলিশ আর প্রশাসন সুন্দর ভাবে ম্যানেজ করছে। থানায় মাসিক চাঁদা পাঠিয়ে দেয় মিষ্টির বাক্সের ভেতরে করে। বাক্সের উপরে কয়েকটা চমচম। নীচে পলিথিনে টাকা। উপরে চিঠি- ওসি সাহেবের ছেলের সুন্নতে খৎনার উপহার। কখনও – নববর্ষ আপনার জন্য বয়ে আনুক আপনার জন্য…। হেন তেন।
দুই শয়তানের পিছনে বেণীমাধব আর জাকিরকে লাগাব বলে ভাবছি তখনই গাড়ির হেড লাইট দেখতে পেলাম।
আমার বাড়ির দিকেই আসছে।
ঘড়ি দেখলাম , রাত সাড়ে দশ। গরমের রাত। জায়গাটা বড্ড সুনসান । তারচেয়ে বড় কথা কোন মেহমানের আশা করছি না। কারও আসার কথা না। ভেবেছিলাম গাড়িটা চলে যাবে। কাঠের গেইটের বাইরে ওটা থামল । হেড লাইট নিভে গেল।
জায়গাটাতে পাকা জামের মত অন্ধকার। গাড়িটার সাইজ বিশাল। যেন জাহাজ। ড্রাইভারকে দেখতে পাচ্ছি না। দিনার রিপোর্টটা দ্রুত ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
আমি নিশ্চিত কেউ ভুল করে চলে এসেছে আমার এলাকায়।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভার নামতেই আবিষ্কার করলাম আগন্তুক একজন মেয়েমানুষ।
বারান্দায় আলো নেই। খোলা দরজা দিয়ে কামরার ভেতরের আলো ফালি হয়ে বাইরে এসেছ ।
সেই আলো বাগানের অন্ধকার দূর করতে পারেনি। মেয়েটা সহজ ভঙ্গিতে এসে যখন বারান্দায় দাঁড়ালো তখন হতভম্ব হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
অনিতা মীর্জা। আলিজান মীর্জার স্ত্রী।
বারন্দায় দাঁড়িয়ে রহস্যময় এক ভঙ্গিতে হাসছে। কালো সিল্কের গাউনের ড্রেস পরে আছে। গলার কাছে বিপদজনক ভঙ্গিতে ভি কাট দেয়া। চরিত্র খারাপ হয়ে যায় অমন কিছু দেখলে। সেখানে আবার আগুনের ফিতার মত জ্বলছে হীরার নেকলেস।
চুপচাপ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল । মনে হল চোখ দিয়েই সম্মোহন করে ফেলেছে আমাকে।
‘হ্যালো।’ খসখসে কেমন একটা গলায় বলল সে । ‘আর লোকজন কোথায় ? নাকি আপনি একা থাকেন ?’
বিপদ। আমার মাথার ভেতর থেকে ফিসফিস করে বলে উঠলো কেউ।
তারপরও বেকুবের মত চেয়ে রইলাম। জবান আটকে গেছে।
‘ ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ খিলখিল করে হেসে উঠলো অনিতা । ‘ আপনার দিনা না ফিনা মেয়েটা ওকে বোকা বানিয়েছি। জানেও না আমি এখন কোথায়।’
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে ঢুকে পড়লো খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে। আরাম করে বসলো সোফায়। নিরাপদ দূরত্বে জানালার কাছে দাঁড়ালাম। পরিস্থিতি ভাল ঠেকছে না। দ্রুত ভাবছি। আমি একা থাকি মেয়েটা জেনে শুনেই এসেছে।
‘এখানে কেন এসেছেন ?’ কয়েক কদম হেঁটে অনিতার সামনে গিয়ে বললাম।
দুইজন দুইজনে চোখের দিকে চেয়ে রইলাম। মেয়েটার বড় বড় চোখের তারায় ক্রোধ, বিস্ময়,ঘৃণা।
‘আমাকে অনুসরণ করছিল কেউ। জানতে পারি কেন ?’
বিস্ময়ের ধাক্কা কাবু করে ফেলল, জানলো কিভাবে দিনা ওকে অনুসরণ করছে। দিনাকে আমরা আদর করে অদৃশ্য বালিকা বলতাম। সাবজেক্টের চোখে ধূলা দিয়ে দিনের পর দিন অনুসরণ করতে পারে। এই প্রথম ধরা পরে গেল !
নিজেকেই দোষ দিলাম। টানা একজন অনুসরণ করলে ঝুঁকি থাকেই । কেন যে বেণীমাধবকে সাথে দিলাম না !
‘সেটা আপনি আলিজান মীর্জাকেই জিজ্ঞেস করে নেবেন। উনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন না যখন জানতে পারবেন আপনি এখানে এসেছেন।’ জবাব দিলাম।
হেসে ফেলল। সুন্দর, উজ্জ্বল দাঁত মেয়েটার।
‘অনেক কিছুই আমি করি যেটা তিনি পছন্দ করেন না।’ হাসতে হাসতে বলল অনিতা। ‘ নতুন করে আরেকটা যোগ হলে কিছুই হবে না।’
‘আমি ব্যস্ত আছি। আপনি আসতে পারেন।’
‘তাহলে জলদি জলদি শেষ করি।মেয়েটা অনুসরণ করছিল কেন আমাকে ?’
‘বললাম তো আলিজান মীর্জা সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নেবেন।’
‘দুনিয়ার সব পুরুষ আমার সাথে কথা বলতে পারলে বর্তে যায়। আপনি দেখছি উল্টা। ড্রিংক দেবেন একটা ?’
কষে ধমক দিতে গিয়ে ও পারলাম না। দেয়ালের সাথেই মিনি বার। দুটো হাইবল গ্লাসে পানীয় মেশাতে লাগলাম। এই দীর্ঘ সময়টা বড্ড অস্বস্তিকর।
‘আপনি একাই থাকেন ?’ পানীয়ের গ্লাস হাতে নিতে নিতে বড় বড় চোখের পাতা ঝাপতে বলল।
আবার সেই বিচ্ছিরি প্রশ্ন।
‘আমার বাসা খুঁজে পেলেন কিভাবে ?’
‘অহ, কঠিন কিছু না। আপনার নাম জেনেছি খানসামার কাছ থেকে। আপনার গাড়ির পিছনের স্টিকার থেকে জেনেছি ইউনিভারসেল সার্ভিসের গাড়ি। টেলিফোন গাইডে নাম খুঁজতেই ঠিকানা পেয়ে গিয়েছি।’
‘ বাহ প্রাইভেট ডিটেকটিভদের ভাত তরকারি মেরে ফেলবেন দেখছি।’
‘আপনি কি প্রাইভেট ডিটেকটিভ ?’
‘ মোটেও তেমন কিছু না।’
‘আপনার ইউনিভারসেল সার্ভিসের কাজটা কি আসলে ?’
‘ বৈধ এবং রুচিকর যে কোন কাজ করি ।’
‘কোন ভদ্রমহিলাকে অনুসরণ করা রুচিকর কাজ মনে হয় আপনার ?’
‘সেটা নির্ভর করবে মহিলাটা কতখানি ভদ্র তার উপর।’
‘আমার স্বামী কি আপনাকে ভাড়া করেছে ? আমার পিছনে গুপ্তচরগিরি করার জন্য ?’
‘কি জানি ! উনার সাথে কি নিয়ে কথা হয়েছে ভুলে গেছি।’
হাইবল গ্লাস থেকে এক চুমুক পানীয় গিলে টকাস করে নামিয়ে রাখল টেবিলের উপর। সরু চোখে চেয়ে রইল আমার মুখের দিকে। যেন চেহারার ভাঁজ থেকে পেটের ভেতরের কথা বের করতে চাইছে।
‘মেয়েটা আমাকে অনুসরণ করছে কেন ?’ আবার প্রশ্ন।
‘জিলিপির মত একটা প্রশ্ন বারবার করছেন। বিরক্তকর।’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেন অনিতা। কামরার চারিদিকটা কৌতূহলী চোখে নজর বুলিয়ে নিলেন। কোটিপতির স্ত্রীকে মুগ্ধ করবে তেমন কিছু নেই, আমার ছুটা বুয়া ফুয়াদের মা রোজ সকালে এসে বাড়িটা পরিষ্কার করে। কাজেই শূয়রের খামারের চেয়ে একটু ভাল পরিবেশ। আসবাবপত্র গুলো দুর্দান্ত কিছু না। সস্তা। কাজ চালানোর মত।
কার্পেটটা ঘেয়ো কুকুরের চামড়ার মত। দেয়ালে একটা পেইন্টিং ঝুলছে। এর মানে না আমি শিল্প রসিক। কারন দেয়ালের সেই জায়গায় সিমেন্ট চটে গেছে।
‘খুব বেশি টাকা পয়সা কামান দেখে মনে হয় না।’ জানতে চাইল সে।
‘চলে যায়।’ হাইবল গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঘুরাতে লাগলাম। নানান এঙ্গেল দিয়ে আলো পরে হলদে অ্যাম্বার রঙ্গের পানীয়টা মায়াবী দেখাচ্ছে।
‘ বাড়ির অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনার আর্থিক অবস্থা কেরসিন।’
মনে হচ্ছে আলোচনা সিরিয়াস মোড় নেবে।
‘ টাকা পয়সার চাহিদা একেক জনের কাছে একেক রকম।’ মুচকি হেসে বললাম। ‘ আমার দিন চলে যায়। হিরের আংটি বা দামী স্যুট পরতে পারি না। অনেক চাকরিজীবীর চেয়ে ভাল আছি। সবচেয়ে বড় কথা আমার পেশায় রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার অভাব নেই।’
কথাগুলো মনে হয় জায়গা মত আঘাত করেছে। এক মুহূর্তের জন্য চেহারাটা গোলাপি রঙ ধরে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
‘ আমি যদি আপনাকে দুই লাখ টাকা দেই আপনার কাজে লাগবে সেটা কি বলেন ?’
কেন যেন মনে হচ্ছে পরিস্থিতিটা বিপদজনক হচ্ছে ধীরে ধীরে। আলিজান মীর্জা আমার খদ্দের। এই মহিলা না।
কিচেনের সামনের টুল থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ‘ দুঃখিত ম্যাডাম, আপনাকে আসতে হবে। অন্য কখন যদি আপনি আমার ক্লায়েন্ট হন তখন আপনার কাজ করব। এখন না। আমি আমার ক্লায়েন্টের পক্ষে জান দিয়ে কাজ করি। এটাই আমার মূলধন।’
উনার চেহারা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।
‘ আপনি ঠিকই বলেছেন।’ বলল সে। ‘আপনার এখানে আসা উচিৎ হয়নি আমার। কিন্তু কি করব বলুন? কেউ পিছু নিলে আমার ভাল লাগে না। ভাল কথা, আপনি খুব ভাল ককটেল বানাতে পারেন।আরেকটা দিন। খেয়ে চলে যাব।’
হাত বাড়িয়ে হাইবল গ্লাসটা নিলাম। বিরক্তিমাখা মুডে পানীয় বানাতে গিয়ে খেয়াল করলাম পায়ের উপর পা তুলে বসলো অনিতা মীর্জা। সিল্কের পোশাকটা উপরে উঠে গিয়ে আতঙ্কজনক সুন্দর শাদা পা দেখা গেল।
কিশোরী মেয়েদের মত দুই পা নাচাতে লাগল।
‘পা নামিয়ে বসুন।’ হাইবল উনার হাতে তুলে দিয়ে বললাম। ‘ সামনেই নদী। খোলা বাতাসে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। পানীয় শেষ হলে চলে যাবেন । প্রচুর কাজ আমার। ‘
অন্য কেউ হলে রেগে যেত। উনি সুন্দর হেসে বলল , ‘ সারাদিন কাজ করলে চলে ? বিনোদনের দরকার আছে না ?’
‘ নিশ্চয়ই , কিন্তু ক্লায়েন্টের বউয়ের সাথে বিনোদন করি না।’ টিটকারি না মেরে পারলাম না।
‘ আমি মীর্জাকে মোটেই কেয়ার করি না।’ তাচ্ছিল্য মাখা গলায় বলল। ‘ বসুন পাশে গল্প করি।’
‘ড্রিংক শেষ করে চলে যান।’
টেবিলের উপর গ্লাস নামিয়ে রেখে মদির এক হাসি হেসে সোজা চলে এলো আমার সামনে। এত কাছে যে মিষ্টি পারফিউমের ঘ্রাণে মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো।
‘ আপনি চাইলে আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারি।’ আমার কনুই আলতো করে ধরে বলল ।
‘আপনি সারারাত থাকলেও লাভ নেই। কোন তথ্যই আমার মুখ থেকে বের করতে পারবেন না। আলিজান মীর্জা আমার ক্লায়েন্ট।’
‘আপনি হয়তো মত বদলে ফেলতেও পারেন।’ বলেই সামনে ঝুঁকে এসে চুমু খেল আমার ঠোঁটে। দুই হাত পেঁচিয়ে ধরল আমার গলা। সর্পিণীর সহদোরার মত। অভিজ্ঞা রমণী । আবিষ্কার করলাম আমিও সারা দিচ্ছি আদিম সেই আহ্বানে।
কয়েক মুহূর্ত লাগল নিজেকে ফিরিয়ে আনতে। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ আপনি এক্ষণই বের হয়ে যান। আমি দেখতে চাই আপনি নিজের গাড়িতে গিয়ে বসেছেন। ‘
ফিরে গিয়ে সোফা থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটা তুলে নিল।
এত শক্ত করে সেটা ধরেছেন যে আঙ্গুলের ডগাগুলো শাদা হয়ে গেছে। আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বলল ‘ আপনার ক্লায়েন্টকে বলে দেবেন আমার পিছনে এক হালি কুকুর লেলিয়ে দিলেও হাতে নাতে কিছুই ধরতে পারবেন না উনি। আর হ্যাঁ ডিভোর্স দিতে চাইলে মোটা টাকা দিতে হবে উনাকে। উনি কি ভেবেছিলেন উনার প্রেমে পরে বিয়ে করেছি উনাকে। মোটেই না। বুড়ো ভামটার টাকা দেখেই গলে গিয়েছিলাম। আর আমার পিছনে না লেগে উনার লেংরা মেয়ে মাগিটার পিছনে গোয়েন্দাগিরি করলে ভাল হত। ‘
উনার কণ্ঠে ক্ষোভ বা ক্রোধ কিছুই নেই। কিভাবে শান্ত রেখেছেন কে বলবে ?
আচমকা খিলখিল করে হেসে উঠল, ‘ আর সত্য কথা বলতে কি , আমার দেখা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বেকুবটা হচ্ছেন আপনি। নিজেও জানেন না কি জিনিস হারালেন।’
হাসতে হাসতে মেয়েটা চলে গেল কামরার বাইরে।
তার গলার হিরের নেকলেসটা চুমকির মত ঝিকিমিকি করছিল কামরার উজ্জ্বল আলোতে । বারান্দার বাইরে যেতেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল ।
বিছানার পাশের টেলিফোনটা বিচ্ছিরি শব্দে বেজে উঠলো। পুরানো আমলের কালো কুত্তার গু রঙ্গের সেই ফোন। রিঙটোনের শব্দ শুনে মনে হয় খিঁচুনি রোগ আছে ওটার।
ঘুমঘুম চোখে লাইট জ্বেলে টেবিল ঘড়ি থাবা মেরে চোখের সামনে আনলাম। রাত তিনটে বেজে চার মিনিট।
‘ কে বাদল নাকি ?’ কানের ভেতরে ঘেউঘেউ করে উঠলো একটা কণ্ঠস্বর। ‘ আমি মিজান। পুলিশ হেডকোয়াটার থেকে বলছি। ঘুম ভাঙ্গাতে হল বলে দুঃখিত। আমাদের এক কনস্টেবল টহল দিতে গিয়ে নদীর পাড় থেকে মেয়েদের একটা হ্যান্ডব্যাগ কুঁড়িয়ে পেয়েছে। ভেতরের কাগজপত্র দেখে বুঝলাম দিনা ইসলাম নামের এক মেয়ের ব্যাগ ওটা। তোমার কর্মচারী তাই না ?’
‘ ব্যাগ ফেরত দেয়ার জন্য সকালে ফোন দিলেই পারতে।’ বিরক্তি প্রকাশ করলাম।
‘ব্যাপারটা এত সোজা না। ব্যাগের ভেতরে সবই আছে। মোবাইল ফোন নেই। ওর নাম্বার পেয়েছি ভিজিটিং কার্ডে। ফোন দিয়েছি। ধরছে না। আর কনস্টেবল যেখানে ব্যাগটা পেয়েছে সেইখানের বালিতে রক্তের দাগ আছে, আমি ওখানেই যাচ্ছি। ভাবলাম তুমি হয়তো আমার সাথে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করবে।’
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।
‘ কোথায় পেয়েছ ব্যাগটা ?
‘ তোমার বাড়ির কাছ থেকে দশ মিনিট হাঁটার পথ। নির্জন মত জায়গা। অপেক্ষা কর আমি আসছি। তোমাকে তুলে নেব।’
জামা কাপড় পরা শেষ হতে না হতেই বাইরে গাড়ির শব্দ । লাইট অফ করে দৌড়ে বাইরে গেলাম। কাঠের ফটকের বাইরে পুলিশের জিপ গর্জন করছে । উর্দি পরা দুইজন কনস্টেবলের সাথে মিজান বসে আছে।
মিজান বেঁটেখাট মানুষ। মুখটা লাল। নাকটা ঠিক পাঁচ টাকা দামের সিঙ্গারার মত। মুখের সাথে বেখাপ্পা। জাঁদরেল অফিসার। নানান কাজে আমরা একে অপরকে সাহায়্য করেছি। লোকটাকে পছন্দ করি। সে মনে হয় না আমাকে অপছন্দ করে।
গাড়িতে কোনভাবে বসতে না বসতেই চলতে শুরু করলো ওটা।
‘ হয়তো ব্যাপারটা ততবেশি সিরিয়াস না।’ বলল মিজান । ‘ কিন্তু রক্তের ব্যাপারটার জন্যই মনটা খুঁত খুঁত করছে।’
‘অমন বিচ্ছিরি জায়গায়, এত রাতে আপনার কনস্টেবল গিয়েছিল কি করতে ?’
‘ঐ এলাকায় মশিউর রহমান নামে বুড়ো এক ভাম থাকে। রাতের বেলায় দূরবীন নিয়ে ছাদে বসে থাকে। কিছু নারীপুরুষ নদীর তীরে লীলাখেলা করতে যায়। বুড়ো সেটা দেখেই আনন্দ নেয়। আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। সেই মশিউর সাহেব হাঁটতে গিয়েছিল। ব্যাগটা দেখতে পেয়ে থানায় ফোন দিয়েছে। ভাল করেই চিনি বুড়োকে। একটা মাছি মারার ক্ষমতা নেই ওর। ভাল কথা, দিনা এত রাতে ওখানে কেন ?ডিউটিতে ছিল নাকি ? ‘
‘ ঠিক বলতে পারব না।’ সতর্ক ভাবে জবাব দিলাম।
দুনিয়া উল্টে গেলেও ক্লায়েন্টের ব্যাপারে কোন তথ্য ফাঁস করব না। করিও না।
‘আমরা জ্যগা মতন আইছি স্যার।’ আচমকা বলে উঠলো এক কনস্টেবল।
‘গাড়ি থামাও। আর বাতেন তুমি সার্চ লাইট জ্বালাও।’
ছোট কিন্তু শক্তিশালী আলোর বীম ফালি করে দিল অন্ধকার। বেশ দূরে নদী। চারদিকে বালির ছোট ছোট টিলা। এত দূর থেকেও নদীর কলকল শব্দ শোনা যাচ্ছে। ওখান থেকেই সাঁই সাঁই করে ভেজা বাতাস এসে আমাদের কাপিয়ে দিচ্ছে। বালি উড়ছে মরুভূমির ভুতের মত।
‘বাতেন তুমি গাড়িতে থাক। বাঁশির শব্দ পেলেই চলে আসবে।’ বলেই মিজান আমার হাতে একটা টর্চ দিয়ে বলল , ‘ বাদল সাহেব আপনি আর রুস্তম ডান দিকে যান। আমি উল্টা দিকে খুঁজছি।’
‘ মশিউর ব্যাটাকে ফোন করে ডেকে আনলে ভাল হত না। জায়গাটা সহজেই খুঁজে পেতাম।’ বালির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললাম।
‘উনাকে আর ঝামেলায় ফেলতে চাইনি। তবে জায়গাটায় এক টুকরো পাথর রেখেছেন যাতে খুঁজে পাই।’
বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না। খানিক দুরেই বেলেপাথর। সাথে রক্তের চিহ্ন। দিনার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো। লক্ষ্মী একটা মেয়ে। বাচ্চা বাচ্চা একটা ভাব আছে চেহারায়। অনেক দিন কাজ করেছে আমার সাথে।
হাঁক দিতেই মিজান আর বাতেন চলে এলো।
‘বালির উপর দিয়ে কিছু একটা টেনে নেয়া হয়েছে।’ বলল মিজান। ‘ ভাল করে চারিদিকটা খোঁজ।’
অন্ধকারে চারটে টর্চ লাইটের আলো নানান কায়দায় নাচতে লাগল।
এখানে বড় বড় নেপিয়ারের ঘাসের দঙ্গল।
দূরে দুইটা টর্চের আলো থেমে গেল এক জায়গায় । এত দূর থেকে দেখলাম ওরা হাঁটু ভাঁজ করে বসে কি যেন দেখছে।
গলা শুকিয়ে গেছে আমার।
‘বাদল।’ ধারালো গলা মিজানের । ‘ আমরা মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছি।’
নরম বালির উপর হেঁটে গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ালাম।
টর্চের আলোতে দেখলাম পুতুলের মত পরে আছে সে। বালিতে চিত হয়ে আছে। চুল, মুখ, চোখ ভর্তি বালি । একদম নগ্নিকা। মাথাটা পাথর দিয়ে তুবড়ে দিয়েছ কেউ। ওর আঙ্গুল মুঠো করা। চেহারায় ভয়ের ছাপ।
টর্চের আলোতে দৃশ্যটা দেখে আমার শরীরটা কেমন ছমছম করে উঠলো।
Series Navigationঈশ্বরের বাগান – দ্বিতীয় পর্ব >>

মতামত জানান