ধারাবাহিক ঈশ্বরের বাগান - 5 পর্ব (5)
তখন রাত নেমে গেছে। বাড়ির কাছে আসতেই চমকে গেলাম। ভেতরে আলো জ্বলছে । চোর তস্কর না। কারণ যেই থাকুক নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেনি । তারপরও সাবধানের মার নেই ভেবে সতর্ক পায়ে এগিয়ে গেলাম। নিঃশব্দে । বারান্দায় পা রাখতেই দেখি সোফার মধ্যে শিখা বসে ম্যগাজিনের পাতা উল্টে যাচ্ছে ।
পাশেই একটা গ্লাস। ফ্রিজ থেকে কোমল পানীয় বের করে নিজের মনে করে পান করছে। সাদা সালওয়ার কামিজ । সোনালি কাজ করা। পয়ে রঙ মিলিয়ে সাদা হাইহিল ।
প্রথম মনে হল চোখের ভুল না তো ?
বারান্দায় আলোছায়ার পরিবর্তনের জন্য ফিরে তাকাল শিখা । হালকা বিরক্তির সুরে বলল, ‘ ভেবেছিলাম আপনি বোধ হয় ফিরবেন না। ঘণ্টা খানেকের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছি।’
‘আমি যদি জানতাম আপনি অপেক্ষা করছেন তবে জলদি ফিরতাম। চাবি পেয়েছেন কোথায় ?’
‘আপনার অফিসে। কাঞ্চন আপার কাছ থেকে। জলদি চলুন । আমাদের বের হতে হবে।’
‘আমাদের ? কোথায় ?’
‘কোথায় হতে পারে বলুন ? অনিতার গাড়িটা পেয়েছি।’
‘রেড ড্রাগন ক্লাবে ?’
‘ওখানেই তো খোঁজ নিতে বলেছিলেন , নাকি ? ক্লাবের পিছনে একটা গাড়ির গ্যারেজ আছে। প্রচুর গাড়ির ভেতরে পার্ক করে রাখা। সহজে পাওয়ার কথা নয়। ‘
‘আপনি পেলেন কি ভাবে ?’
‘গ্যারাজের ম্যাকানিকের সাথে কথা বলে। বেচারা চোরা চোখে আমাকে দেখছিল। কথা বলতেই ধন্য হয়ে গেছে। আপনি বোধ হয় জানেন না ছেলেরা আমার সাথে কথা বলতে পারলে নিজেদের মহারাজা মনে করে।’
‘সেটা আমিও বুঝেছি।’ মেয়েটার কথার ধরন দেখে না হেসে পারলাম না।’এখনই বের হতে হবে ?’
‘হু, সম্ভবত আজ রাতে অনিতা আর দিলীর খান খুশনবীশ দুইজনকেই পাওয়া যাবে রেড ড্রাগনে। আপনি পোশাক পাল্টে নিন।’
বেড রুমে গিয়ে কাপড় পাল্টে টাই বাঁধছি শিখা দরজার সামনে দাড়িয়ে বলল, ‘ পিস্তল বা রিভলবার আছে আপনার ?’
‘ সর্বনাশ । ও সব লাগবে নাকি ?’
‘বেশ কিছু গুণ্ডা পাণ্ডা সব সময় রেড ড্রাগন ক্লাবে মজুদ থাকে। আমার অনুমান ভুল না হলে আজ রাতেও আছে। নির্ভর করছে আপনি ওখানে কোন রকম রকম ঝামেলা করতে চান কি না। যদি চান পিস্তল লাগবেই।’
‘আমি কোন রকম ঝামেলা চাই না। তাছাড়া পিস্তলের লাইসেন্স পাইনি আজও। প্রাইভেট ডিটেকটিভ হয়ে তো অবৈধ জিনিস রাখতে পারি না। আর ক্লাবে গুণ্ডা পাণ্ডা থাকবে কেন ? আমি তো ভেবেছি অভিজাত ভদ্রলোকদের জায়গা ওটা !’
‘অবশ্যই ভদ্রলোকদের জায়গা । কিন্তু মনে রাখবেন প্রতি রাতে ওখানে বড় বড় অঙ্কের জুয়া খেলা হয়। খেলোয়াড় বা সদস্যদের নিরাপত্তার জন্যই দিলীর খান খুসনবীশ কয়েক ডজন মারদাঙ্গা লোক রাখেন। এইসব লাইনে যেমন হয়। আপনার ভালর জন্যই বললাম। ওখানে আপনাকে খানিক গোবেচারা হয়ে থাকতে হবে।’
‘ চেষ্টা করব ।’ মাথার চুলে চিরুনি বুলিয়ে পকেটে মানিব্যাগ ভরে নিলাম। গোপনে দেখে নিলাম কত টাকা আছে।’
গাড়িতে বসে সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বললাম, ‘ আজ দুপুরে আদিত্য লালকে জুবায়ের আলমের বাসায় দেখেছি । গোপনে ঘুর ঘুর করছিল ব্যাটা।’
‘ওর ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।’ শীতল থমথমে গলায় বলল শিখা ।
‘সেকি ?’ আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বললাম। ‘ আমি তো ভেবেছিলাম লালের প্রতি আপনার ব্যক্তিগত ক্ষোভ আছে। সেইজন্যই আমাদের এজেন্সিতে যোগ দিয়েছেন ।’
‘ লালকে মেরামত করতে কারও সাহায়্য লাগবে না আমার। মুখামুখি লড়াইয়ে টিকতে পারবে না আমার সাথে। আমার চোখে ও একটা ড্রেনের ইঁদুর ।’
‘বুঝেছি। লালের ব্যাপারে না হোক আপনার নিজের ব্যপারে কিছু বলুন।’
বড় রাস্তায় গাড়ি নিতে নিতে বললাম।
খানিক চুপ করে রইল শিখা ।
যেন মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে কথাগুলো । কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে চুপ রইল।
‘আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার আগ্রহ নেই। তারপরও নিজের সম্পর্কে কিছু বললে খুশি হব ।’
পঞ্চবটীর দিকে গাড়ি ছুটাতে ছুটাতে আবার বললাম।
‘আমার রূপ ছাড়া আর কিছু নেই দুনিয়ায়।’ বাঁকা তিক্ত হাসি হেসে বলল শিখা ।
বুঝতে পারলাম জীবন মেয়েটাকে বড় রকমের আঘাত দিয়েছে কোন কারণ ছাড়াই । তিক্ত অভিজ্ঞতার অমনিবাস ।
‘কঠিন ভাবে বড় হয়েছি আমি।’ বলতে লাগল শিখা । ‘ বাবা ছিল মধুমিতা সিনেমা হলের টিকিট চেকার । মাসে তিনহাজার টাকা বেতন। খাওয়া পড়া কিছুই দিতে পারত না। মা কাজ করতেন গার্মেন্টসে । আমার যখন তিন বছর তখন গার্মেন্টসের ম্যানেজারের সাথে ভেগে যায় । মাকে দোষ দেই না । আমার বাপের কাছ থেকে কিছুই পাবে না জেনেও ছিল অনেক বছর । কি অদ্ভুত ব্যাপার মায়ের শোকে বাপ মদ খাওয়া শুরু করল । লিভার পচে মারাও গেল । দাদির কাছে মানুষ হতে থাকি । ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ি । টাকার অভাবে ওটা বন্ধ হয়ে যায় । ইশকুলের সামনে পলিথিন ব্যাগ বিক্রি করা দিয়ে জীবন শুরু করি । তখন থেকেই আমার ইচ্ছের মালিক আমি । পুরুষদের লোভী চোখ তখন থেকে বুঝি । তবে জীবন আমার কাছে মজার। ‘
সামনে গাড়ির টেল লাইটের ঝিকিমিকি । ব্যস্ত শহর। দূরের দালানবাড়ির খোপ খোপ আলো মগজের স্মৃতিতে কি সব মনে করিয়ে দিতে চায়।
‘ মজার লোভে আমার দলে ঢুকে পড়লে ভুল করেছেন।’ বলতে বলতে গাড়ির স্পীড বাড়ালাম ।
‘আপনি একটা আস্ত বেকুব ।’ হেসে ফেলল শিখা । ‘ টাকার দরকার হলে আমি ঠিকই পেয়ে যাই । জুয়ায় আমার হাত ভাল । রেড ড্রাগন ক্লাবে এক রাতে খেলতে বসলে লাখ টাকা কামিয়ে টেবিল ছাড়ি । নিজের চোখেই দেখবেন আজ । আরেকটা কথা আমার সাথে ভুলেও তাস খেলতে বসবেন না। হাজার রকম চুরি জানি আমি। ফতুর করে ফেলব। ‘
রেড ড্রাগন ক্লাবের পাশ দিয়ে কত হাজার বার গিয়েছি। ভেতরে ঢোকা হয়নি।
পারকিং চত্বরে গাড়ি থামিয়ে নামলাম। ক্লাবের সদর দরজার সামনেই কয়েকটা চোয়াড়ে চেহারার রংবাজ ছোকরা দাড়িয়ে আছে। ঝামেলাবাজ চেহারা । উগ্র ।
শিখাকে দেখে সবাই হাত নাড়ল। আমার দিকে ফিরেও চাইলো না ।
তিনতলা দালানের পুরোটাই রেড ড্রাগন । আলোতে ঝলমল করছে। ছাদ থেকে নিয়ন আলোর লাল রঙের একটা ড্রাগন প্যাচিয়ে নামছে যেন । প্রত্যেকটা কার্নিশে বড় বড় তারা জ্বলছে । বিদ্যুতের আলোর তারা ।
সদর দরজায় লাল কার্পেট বিছানো । সবুজ সাদা নরম আলো । মোটা কাপড়ের উর্দি পরা দারোয়ান দরজা খুলে দেয়।
ভেতরে টাইট জিনসের প্যান্ট আর সিল্কের বল প্রিন্টের জামা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে বুকে চাক্কু মারা দুই সুন্দরী । আমাদের দিকে চেয়ে মদির হাসি উপহার দিল । রেডিমেট এবং ফ্রি ।
শিখা বলল লেডিস টয়লেট থেকে ও দ্রুত গিয়ে আসবে । আমি যেন অপেক্ষা করি ।
আমাকে হ্যাঁ, না কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল মহিলা লেখা একটা দরজার ভেতরে ।
চারিদিকে লোকজনের ভিড় । সুবেশী নরনারী ।ভিড়ের মধ্যে রোগা রুক্ষ চেহারার একটা লোক সোজা চেয়ে আছে আমার দিকে। চেহারাটা শেয়ালের মত । চোখদুটোও ।
কয়েক কদমে আমার সামনে চলে এলো শেয়াল । টকসিডো গায়ে দেয়া। যা ভেবেছি , বাউন্সার হবে।
‘কাউকে খুঁজছেন নাকি ?’ বাদাম ভাঙ্গার মত টসটস শব্দ করে জানতে চাইলো। বিনয়ের লেশ মাত্র নেই ।
‘না।’ বললাম ।
জিভ বের করে ঠোট চেটে নিল বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে । আমার পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে চালবাজদের মত বলল, ‘ কারও জন্য অপেক্ষা করছেন ?’
বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে লেডিস টয়লেট দেখিয়ে বললাম , ‘ এখনই চলে আসবে।’
স্বস্তি পেল। তবে পুরোপুরি নয়।
‘রুটিন চেক। প্রায়ই উটকো লোক ঢুকে পরে । ‘ আগের চেয়ে নরম গলায় বলল। ‘ ক্লাবে শুধু সদস্যরা প্রবেশ করতে পারে। তবে চাইলে সাথে তাদের ওয়াইফ বা একজন বন্ধু আনতে পারে। আপনাকে আগে কক্ষনো দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। চেহারাটা একদম অচেনা ।’
‘ঘুম থেকে উঠলে আমার নিজের চেহারাই নিজে চিনতে পারি না।’ খেজুরে আলাপ পাড়লাম ।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল শেয়ালের । ‘ কার সাথে এসেছেন নামটা বলবেন ? মেম্বার লিস্ট দেখে মিলিয়ে নিতাম।’
‘উনার নাম শিখা । পুরো নাম বলতে হবে ?’
‘চিনেছি।’ এই প্রথম হাসল শেয়াল । ‘ আপনি তো মহাভাগ্যবান। শিখা ম্যাডাম তো কাউকেই পাত্তা দেন না।’
আরও কি কি বলতো শেয়াল । সদর দরজার সামনে কাকে দেখে যেন হনহন করে চলে গেল।
তখনই শিখা এসে দাঁড়াল আমার পাসে।
শেয়ালের মত দেখতে জেমস বন্ড সাহেবটা কে ?’ বুড়ো আঙ্গুল তুলে লোকটাকে দেখিয়ে জানতে চাইলাম ।
‘ও হচ্ছে রাজু । দিলীর খান খুশনবীসের গুণ্ডাবাহিনীর একজন । মানুষ ভাল। যদি আপনি ঝামেলা না করেন ।’
‘ ড্রিঙ্ক দরকার আমার। নার্ভ শিথিল করতে হবে ।’
আমরা লবি দিয়ে হেঁটে গেলাম সামনের দিকে। দুইপাশে দেয়াল। আয়নায় মোড়া । নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছিল অনেকগুলো করে । অগুনতি নরম আলো চুইয়ে পড়ছিল মাথার উপর থেকে।
করিডোরের শেষ মাথায় বিশাল কামরা। এক ডজন দামি টিউব আকৃতির চামড়া মোড়া চেয়ার আর সোফা দিয়ে সাজানো । পায়ের তলার কার্পেট এত নরম মনে হয় পানাপুকুরের উপর দিয়ে হাঁটছি ।
ঘোড়ার খুঁড় আকৃতির বার। চারজন সাদা পোশাক পরা বারটেন্ডার নিবিঘ্নে গতি আর দক্ষতার সাথে কাজ করছে ।
এমন জায়গায় বসলাম যেখান থেকে পুরো বারটা দেখা যায় সহজে।
বেশ কয়েকটা পানীয় শেষ করে ফেললাম দুজনে।
শহরের অন্য বারের চেয়ে মোটেও আহামরি না ড্রিঙ্কগুলো । কিন্তু দাম কয়েকগুণ বেশি ।
তিন নাম্বার গ্লাস শেষ করার পর শিখাকে বললাম ও যেন বসে এক রাউনড পোকার খেলে আসে ।
‘এই ফাঁকে আপনি কি করবেন ?’ বারটেনডার ইশারায় নতুন ড্রিঙ্কের অর্ডার দিতে দিতে জানতে চাইল শিখা ।
‘চারিদিকটা একটু ঘুরে দেখতে চাই। ক্লাবটার লে আউট সম্পর্কে একটু ধারনা দিন , আমাদের কবুতর কোথায় আছে বলে আপনার মনে হয় ?’
‘তিন তলায়। দিলীর খানের অফিস ওখানেই । সাথেই ছোট একটা লিভিং রুম আছে। বেশি রাত হয়ে গেলে দিলির খান ওখানেই ঘুমায়। ছুকড়িটা কথাও থাকলে তিনতলায়ই থাকবে ।’
‘ সাবধানে । কোন রকম ঝামেলা যেন না হয় । তাহলে ক্লাবের ভেতর থেকে জ্যান্ত বের হতে পারব না আমরা ।’
‘ সমস্যা হবে না। কেউ দেখলে বলল পথ ভুলে উপরে চলে এসেছি।’
নতুন ড্রিঙ্ক চলে এলো সামনে । দাম মিটিয়ে দিলাম ।
‘যান , উৎসাহ দেখিয়ে বলল শিখা । ‘ তবে দিলীর খান থাকলে তাকে বোকা বানাতে পারবেন না। অতিতে অনেকে সেই রকম চেষ্টা করেছিল। মার খেয়ে পালিয়েছে ।’
‘আপনার শুভকামনা দারুণ লাগল।’ তিক্ত গলায় বললাম। ‘ ড্রিঙ্ক শেষ করে জুয়া খেলতে বসে যান । যদি দেখেন আমি কোন রকম বিপদে পরেছি পালিয়ে যাবেন । ভুলেও থানায় যাবেন না বা পুলিশকে ফোন করবেন না। ওসি মঞ্জুর কাদেরকে আমি ঈদের আনন্দ দিতে চাই না।’
‘পুলিশে খবর দেব না।’ বলেই শেষ ড্রিঙ্কের শূন্য গ্লাস ঠস করে কাউনটারে রেখে উঠে দাঁড়ালো । ‘ দোতলায় জুয়ার বোর্ড । ওই পর্যন্ত দুইজন একসাথে যেতে পারব। ‘
হুইস্কির শেষ গ্লাসটা খালি করার পর মনের ভেতরে বেশ আস্থার ভাব এসে গেছে।
দুইজনে বারের কাউন্তার থেকে উঠে পা বাড়ালাম দোতলার সিঁড়ির দিকে।
সিঁড়ির গোঁড়ায় বাঁটুল ধরনের এক লোক দাড়িয়ে। গায়ে টকসিডো । দুই হাত পকেটে ভরে রেখেছে । চেহারা দেখে মনে হয় একঘেয়েমিতে ভুগছে। গালে ভাঙ্গা কাঁচির ফলার মত কাঁটা দাগ।
খপ করে আমার হাত ধরে খনখনে গলায় বলল, ‘ কোথায় যাচ্ছেন শুনি ?’
‘উনি আমার সাথে এসেছেন।’ জবাব দিল শিখা । ‘ অত কাজ দেখানোর দরকার নেই। দিলীর খান তোমার বেতন বোনাস জিন্দেগিতে ও বাড়িয়ে দেবেন না।’
ছোটলোক মচকে দেয়ার কায়দা মেয়েটা ভালই পারে । লোকটা কেমন চুপসে গেল। হতাশ মুখে অন্য দিকে তাকিয়ে সিলিঙের রঙ দেখতে লাগল।
খানিক উপরে উঠে জানতে চাইলাম, ‘ দিলীর খানের আরেক কুকুর ?’
‘ হ্যাঁ , মুন্না । দারুণ মারামারি পারে। আমি সামাল দিতে পারব। কিন্তু নিচের রাজুর কাছে পিস্তল আছে।’
আমরা দাড়িয়ে আছি লম্বা করিডোরে। সামনেই আলোকিত কামরা। ভেতর থেকে পোকার মেশিনের যান্ত্রিক শব্দ আর কয়েন পড়ার ঝনঝন শব্দ হচ্ছে ।
‘আমরা এখনই আলাদা হয়ে যাই।’
‘ হ্যাঁ, পোকার রুমে বার আছে। কাজ শেষ করে এখানেই চলে আসবেন। বেশি সময় নেবেন না কিন্তু।’ বলল সে।
কথা শেষ করেই পোকার রুমের ভেতরে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল ।
আমি পথ খুঁজছি অমন একটা ভান করে তিনতলার দিকে পা বাড়ালাম।
তিনতলা থেকে কারা যেন নেমে আসছে । দমে গেলাম। দেখি মোটা কালো এক ভদ্রলোক একজন তন্বীকে জরিয়ে ধরে টলতে টলতে নেমে আসছে । মদের তীব্র গন্ধ !
আমার দিকে ফিরেও চাইল না। দুইজনেই ব্যাস্ত !
কোন বাধা না পেয়ে উঠে গেলাম তিনতলায় । কেউ পিছন থেকে ধমকে উঠলো না বা গুলি করে বসল না।
লম্বা একটা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছি । দুই পাশে কয়েকটা দরজা । সব বন্ধ ।
কোন ধারনাই নেই কোন দরজার পিছনে কি আছে !
বুঝে উঠতে পারছি না কি করব । কোন দরজা খোলার চেষ্টা করব ?
আচমকা দশ ফুট দূরের একটা দরজা খুলে গেল।
টকটকে লাল শিফনের শাড়ি আর লাল সিল্কের ব্লাউজ পরা সুন্দরী একটা মেয়ে বের হয়ে এলো ভেতর থেকে।
মেয়েটা অনিতা মির্জা !
আধা সেকেন্ড ফাঁকা চোখে চেয়ে রইলেন আমার দিকে। চিনতে পেরে চমকে উঠলেন । মাঝরাতে বিছানার তলা থেকে ভূত বের হয়ে এলে আপনি যেমন করে উঠবেন তেমন হয়ে গেল অনিতার চেহারা। ফুঁপিয়ে উঠে শ্বাস নিয়েই দরজা ঠেলা দিয়ে ঢুকে পড়লেন কামরার ভেতরে। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেন দরজা বন্ধ করে দিতে।
বিদ্যুৎ গতিতে সামনে চলে গেছি। হাতের ঠেলা দিতেই ধাক্কা খেয়ে কামরার ভেতরে মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে গেল সে । ঝট করে উঠে অন্য আরেক দরজার দিকে দৌড় দিলেন ।
লাফ দিয়ে এগিয়ে অনিতার কবজি ধরে ফেললাম শক্ত করে ।
‘শান্ত হন, আপনার সাথে কথা বলা দরকার ।’ বললাম ।
ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলেন । চেহারাটা পুরানো হাতির দাঁতের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেছে । চোখ হয়ে গেছে লাল । বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে যেন ম্যারাথন দৌড়ে এসেছে ।
সেই রাতের মত মোহনীয় কামিনী লাগছে না তাকে । কেমন যেন ফ্যাঁকাসে আর বুড়ি বুড়ি ভাব চলে এসেছে চেহারায় । ক্লান্ত । পুরুষদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে যেন ।
আতংকিত চোখে চেয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন , ‘ বের হয়ে যান বলছি ।’
কামরাটা সুন্দর । বিশ্বাস হতে চায় না ক্লাবের উপরে এত সুন্দর একটা রুম আছে । আরামদায়ক দামি বিছানা । বিছানার চাদর , কুশন , কার্পেট আর দেয়ালের রঙ এক । ড্রেসিং টেবিলটা সৌরভের শিশি আর পাউডারের কৌটা দিয়ে ভর্তি ।
কামরার নানান জায়গায় শেডে নরম আলো জ্বলে কেমন বিহ্বল করা পরিবেশ বানিয়ে ফেলেছে।
কোটিপতির বউয়ের সুখে থাকার জায়গাই বটে ।
কিন্তু অনিতাকে দেখে সুখী মনে হচ্ছে না। মনে হয় গাড়ি দুর্ঘটনার পর বেঁচে থাকা একমাত্র যাত্রী ।
‘কোন রকম ঢং করবেন না । অনেক খুঁজে পেয়েছি আপনাকে। কিছু প্রশ্নের জবাব চাই আমি ।’
‘আপনার কোন প্রশ্নের জবাব দেব না। চলে যান আপনি ।’ আঙ্গুল তুলে দরজা দেখিয়ে বললেন অনিতা । অসুস্থ বুড়ি মহিলার মত হাত কাঁপছে ।
‘নেকলেস। অটা ফেরত চান না আপনি ?’
থমকে গেল মুহূর্তের জন্য। যেন মস্ত আঘাত পেয়েছে।
‘ আপনার কথার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।’
‘না বুঝার কিছু নেই । নেকলেসটা আপনি দিনাকে দিয়েছিলেন ? কেন দিয়েছিলেন ?’
দৌড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে চলে গেলেন । হ্যাঁচকা টান দিয়ে ড্রয়ার খুলে ফেললেন। জীবনে প্রচুর সিনেমা দেখেছি। এক লহমার মধ্যে বুঝে গেলাম পরের ঘটনাগুলো কি ঘটতে যাচ্ছে । ড্রয়ার থেকে হাত বের করতেই কামরার মায়াবী আলোতে উনার হাতে ঝিকিয়ে উঠলো পয়েন্ট ফোরটি ফাইভ অটোমেটিক পিস্তল ।
লাফ দিয়ে সামনে গিয়ে পিস্তলসহ হাত চেয়ে ধরলাম । মুঠোর মধ্যে টের পেলাম উনি পিস্তলের সেফটি ক্যাচ অফ করার চেষ্টা করছে।
‘বোকামি করবেন না, পিস্তল ফেলে দিন।’ চেঁচিয়ে বললাম।
আচমকা কনুই দিয়ে আমার মুখে মেরে বসলেন ।
ইঞ্জিনের পিস্টনের মত আঘাতটা লাগল মুখে ।
একই সাথে পায়ের হিল দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করলেন আমার পায়ে । মেয়েটার গায়ের পৈশাচিক শক্তি দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না।
আবার কনুই দিয়ে আঘাত করতেই হাতটা ধরে মোচর দিয়ে বসলাম গায়ের জোড়ে । ব্যাথায় ককিয়ে উঠলেন । পিস্তলের উপর থেকে আঙ্গুলগুলো নরম হয়ে গেল। আপনা আপনি খসে পড়লো কার্পেটের উপর । লাথি দিয়েই নাচতে নাচতে পিস্তলটা চলে গেল বিছানার তলায়।
হাঁটু ভেঙ্গে কার্পেটের উপর বসে পড়লেন অনিতা মির্জা ।
‘আমি দুঃখিত ।’ চাঁছাছোলা গলায় বললাম । ‘ নেকলেসটা দিনাকে দিয়েছিলেন কেন ?’
‘আমি কেন নেকলেস দিতে যাব ?’ জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে চেয়ে জবাব দিলেন অনিতা মির্জা ।
‘আপনি দিনার বাসায় গিয়েছিলেন তখন নেকলেস ছিল। যখন বেড়িয়ে গেছেন তখন গলায় নেকলেস ছিল না। সোফার নিচে জিনিসটা পেয়েছি আমি । আপনি কি দিনাকে জিনিসটা দিয়েছিলেন ?আমাকে যদি জবাব না দেন তবে পুলিস কল করব আমি । তখন নিশ্চয়ই মুখ খুলবেন ?’
কিছু চিন্তা করার মত মুখভঙ্গি করছিলেন তিনি। আচমকা লাফ দিয়ে বিছানার কাছে চলে গেলেন। উপুড় হয়ে খুঁজতে লাগলেন পিস্তলটা। দৌড়ে গিয়ে টেনে বের করে আনলাম।
পিছন থেকে দুই হাত কায়দা করে মুচড়ে ধরে রাখলাম । যাতে আঘাত করতে না পারে।
‘কেন কেন কেন ? একটাই প্রশ্ন আমার ।’
‘আমি ওকে নেকলেস দেইনি।’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলেন অনিতা । ‘ নেকলেসটা চুরি হয়ে গেছে আমার কাছ থেকে ।’
‘দিনার বাসা থেকে বের হয়ে আপনি শীতলক্ষ্যা বরফকলে দিকে গিয়েছিলেন কেন ?
‘আমি ? অসম্ভব । সেই রাতে আমি নদীর পারে মোটেও যাইনি ।’
একটা জিনিস বেশ বেখাপ্পা লাগচ্ছিল । অনিতা এক বারও উঁচু গলায় চিৎকার করেননি। উনার চোখে অজানা আতঙ্কের ছাপ ।
‘ভাল। আপনি যদি কিছুই না জানেন তবে বাড়ি ছেরে পালিয়ে এখানে লুকিয়ে আছেন কেন ? আলিজান মির্জা কি জানেন আপনি এখানে ?দিনা মেয়েটাকে যখন খুন করা হয় তখন আপনি সেখানে ছিলেন না ? কথা বলুন। চুপ করে থাকবেন না । ‘
উনাকে ছেড়ে দিতেই গিয়ে ধপাস করে বিছানার উপর বসে পরলেন। কোথায় যেন চেয়ে আছেন। সেই চোখে আতঙ্ক । জীবনে কাউকে এত ভয় পেতে দেখিনি ।
দরজা খোলার কোন শব্দ আমি পাইনি । কামরার ভেতরে কেউ প্রবেশ করেছে তেমন শব্দও পাইনি ।
কিন্তু জানি কেউ এসেছে । সামনের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় কারও ছায়া ছায়া কাঠামো নড়তে দেখলাম যেন ।
এবং ধীরে ধীরে পিছন ফিরলাম ।
দরজার নব ধরে দারিয়ে আছেন দিলীর খান খুশনবীস । মধ্যবয়স্ক । প্রায় চারকোনা শরীর , গায়ে অনেক , অনেক এবং অনেক দামি টকসিডো । মাথা ভর্তি চুল কপাল পর্যন্ত নেমে এসেছে । চোখদুটো পিচ্চি এবং গভীর । কালো জামের কথা মনে করিয়ে দেয় । কম ঘুমের ফলে চোখের নিচে ঘন কালির প্রলেপ । মুখের চামড়া পাতলা-ফ্যাকাসে । গায়ের রঙ বিবর্ণ । রোদে বের হয় না ।
ভদ্রলোককে শহরের নানান দামি রেস্টুরেন্টে নানান সময়ে দেখেছি । কথা হয়নি কক্ষনো । আমি উনাকে দেখেছি কিন্তু উনি আমাকে খেয়াল করেননি অমনটা হতেই পারে না। সবাইকে লক্ষ্য করেন উনি । সামনে দিয়ে একটা মাছিও উড়ে যেতে পারে না।
উনার ভাবভঙ্গিতে ব্যবসায়ী বলে মনে হয় না। যেন কোন ক্রিমিনাল লইয়ার অথবা জটিল কোন রোগের বিশেষজ্ঞ ।
কামরার পরিবেশটা টানটান ।
পিচ্চি কালোজামের মত চোখে দিলীর খান চেয়ে আছেন আমার দিকে ।
‘ নেকলেসের ব্যাপারে আপনি কি জানেন ?’ শান্ত গলায় জানতে চাইলেন তিনি । ভাব দেখে মনে হচ্ছে রাস্তার ধারের লেবুর হালির দাম জিজ্ঞেস করছেন ।
‘ আপনি এই জটিল বিষয়ে না থাকলেই ভাল করবেন ।’ বললাম । ‘ এখানে খুনখারাবি জড়িয়ে আছে ।’
‘নেকলেসটা কোথায় ?’ একই সুরে বললেন ।
‘ নিরাপদ জায়গায় আছে সেটা । কিন্তু আপনি যাকে নিরাপদ রেখেছেন সে যে খুন খারাবি করে এখানে ঘাপটি মেরে আছে সেটা জানেন ? নাকি এই সব তুচ্ছ ব্যাপারে আমি আমলই দেন না ।’
ভাবলেশহীন চোখে তিনি ফিরে তাকালেন অনিতার দিকে । ‘ এই লোকের ব্যাপারেই আপনি বলেছিলেন আমাকে ?’
অনিতা কলের পুতুলের মত মাথা ঝাঁকালেন ।
‘আপনি এখানে আসলেন কি ভাবে ?’ আমার দিকে ফিরে জানতে চাইলেন ।
শিখাকে ঝামেলায় ফেলার কোন ইচ্ছা নেই । বললাম , ‘ সোজা হেঁটে চলে এসেছি । কেউ তো বাধা দেয়নি ।’
কটমট করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন দিলীর খান । চেহারা দেখে মনে হল প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন । হেঁটে গেলেন কামরার দেয়ালের কাছে । কি একটা সুইচের মত আছে সেটা টিপে কামরার মাঝখানে শক্ত পজিশন নিয়ে দাঁড়ালেন।
যেন কিছু শুরু হতে যাচ্ছে।
আচমকা মনে হল দৌড়ে গিয়ে বিছানার তলা থেকে পিস্তলটা বের করে নিলে কেমন হয় ?
কিন্তু বিছানার তলায় ওটা কোথায় কতদূরে ঘাপটি মেরে রয়েছে কে বলবে ?
তাছাড়া খানিক উবু হয়ে বসতে হবে ওটা খুঁজতে হলে। হাত কনুই নিচে। পজিশনটা দুর্বল থাকবে আমার।
এত চিন্তার কিছু ছিল না। বেল চাপ দেয়ার প্রায় সাথে সাথে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল গাল কাটা মুন্না । মাত্র এক লহমায় যেন সব বুঝে গেছে অমন একটা হাসি ফুটে উঠলো চেহারায়।
হাতে পিস্তল !
‘আবর্জনা ভেতরে ঢুকল কেমন করে ? ‘ জানতে চাইলেন দিলীর খান খুশনবীস ।
‘শিখা ম্যাডাম মালটাকে এনেছে ।’ রাগের চোটে চিড়বিড় করে উঠলো গাল কাটা মুন্না ।
‘ শিখাকে ধরে নিয়ে এসো ।’ হুকুম দিলেন দিলীর খান।
সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ শব্দ করতে করতে নিচে গেল গালকাটা।
‘ তুমি ভেতর রুমে যাও ।’ অনিতার দিকে ইশারা করে বললেন দিলীর খান।
‘লোকটাকে আমি চিনি না ভাল মত ।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন অনিতা । আজেবাজে মিথ্যা কথা বলে আমাকে ভয় দেখাতে চাইছে এই লোক ।’
নর্দমা থেকে উঠে আসা বিড়ালের দিকে যেমন ভাবে আমরা তাকাই দিলীর খান অনিতার দিকে সেইভাবে তাকালেন।
প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেলেন অনিতা ।
মূল দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল গালকাটা মুন্না ।
ফিরেও চাইলেন না দিলীর খান । শান্ত গলায় বললেন, ‘ আরেকবার যদি কেউ এমন করে উপরে চলে আসে তবে তোমাকে আর রাজুকে সোজা উপরে পাঠিয়ে দেব ।’
মুন্না কিছু বলল না। খাই খাই চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে । পারলে এক গ্লাস জল দিয়ে আমাকে গিলে খেয়ে ফেলবে যেন ।
‘সহজ জিনিস কেন প্যাচাচ্ছেন আপনি ।’ বললাম । ‘ অনিতাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে এই ঝামেলা থেকে নিজে দূরে থাকুন । সেটা বেশি ভাল হয় না ?’
আমার দিকে চেয়ে থেকেই কামরার একমাত্র চেয়ারটা টেনে বসে পড়লেন দিলীর খান । উনার ভাব দেখে মনে হচ্ছে উনি একজন বুড়ো মানুষ । শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যাথা ।
‘আপনি দুনিয়াটা যত সহজ মনে করেন ততটা না আসলে ।’ পান্তুয়ার মত মুখ করে বললেন দিলীর খান ।
আবার দরজা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল শিখা । পিছন পিছন শিয়াল ওরফে রাজু ।
একটা জিনিস ভাল লাগল এত কিছুর পরও শিখাকে শান্ত দেখাচ্ছে । এক লহমায় কামরার ভেতরের পরিস্থিতি বুঝে অবাক হয়ে বলল, ‘ আরে তুমি এখানে এলে কি করে ? আর মিজান সাহেবের হাতে পিস্তল কেন ?’
দিলীর খান উনার সাদা আঙ্গুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললেন , ‘ উনাকে তুমি নিয়ে এসেছ ?’
‘হ্যাঁ। কেন আপনি কি নতুন মেম্বার চান না ?’
‘না চাই না। তুমি বা এই ফাতরা ভদ্রলোকের মত মেম্বার আমার ক্লাবে দরকার হয় না ।’
‘খুবই ভাল কথা ।’ হেসে ফেলল শিখা । ‘ সেটা ভদ্রভাবে বললেই হত । পিস্তল দেখিয়ে বলার দরকার কি ? বাদল , চলে আসো । দেশে যেমন ক্লাবের অভাব আছে ।’
শিখা বলল বটে কিন্তু এক ইঞ্চি নড়ার সাহস পেলাম না । মনে হচ্ছে একটু নড়লেই মুন্না গুলি করে বসবে । একটা আজুহাতের অপেক্ষায় আছে গাল কাটা ।
‘মেহমান নড়লেই গুলি করবে ।’ মুন্নার দিকে চেয়ে বললেন দিলীর খান । হাত নেড়ে কেমন একটা ইঙ্গিত করলেন।
পিছন থেকে এগিয়ে এলো রাজু । খপ করে ধরে ফেলল শিখার হাতের কবজি , সেটা মুচড়ে পিঠের উপর নিয়ে গেল চোখের পলকে । ব্যাথায় চেঁচিয়ে উঠলো শিখা । শরীর মুচরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় মেয়েটা । গায়ের জোড়ে ওর গালে চর বসিয়ে দেয় রাজু । বন্ধ কামরায়
পটকা ফোটার মত শব্দ হয় । পাক খেয়ে কামরার উল্টো দিকে চলে যায় শিখা । আছড়ে পড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর। সৌরভের শিশি আর পাউডারের বয়াম সহ আছড়ে পরে মেঝের উপর। কাচের বোতল শব্দ করে ভেঙ্গে যায় । ভুরুর উপর ভাঙ্গা কাচ বিঁধে রক্ত বের হয়ে আসে ফিনকি দিয়ে। আধখোলা চোখে অসহায়ের মত পড়ে থাকে শিখা ।
বেচারি !
পুরো ব্যাপারটা ঘটতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল।
এক লাফে পৌঁছে গেলাম রাজুর সামনে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেরে বসলাম ওর চোয়ালে। আধ পাক ঘুরে গেল আঘাতে। হাত থেকে পিস্তল খসে সেটা ব্যাঙ্গের মত লাফাতে লাফাতে গিয়ে থামল দিলীর খানের পায়ের সামনে ।
ঘুরে আমার মুখে ঘুসি মারল রাজু । দ্রুত বাউলি কেটে সরে আরেকটা ঘুসি মেরে বসলাম ওর মুখে। কোন রকম প্রতিবাদ না করে সিমেন্টের বস্তার মত ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল ।
আনন্দ করার মত উপায় নেই। কখন যে গাল কাটা মুন্না হাজির হয়ে গেছে টের পাইনি। ধিমাই করে মেরে বসল আমার মুখে । মনে হল ট্রেনের বগির সাথে ধাক্কা খেয়েছি।
সামলে নিয়ে ওর নাকের ব্রিজে কারাতে কোপের কায়দায় মেরে বসলাম । থমকে গেল মুন্না ।
একটু ও ব্যাথা পায়নি যেন । অবাক হয়ে গেলাম । সেটাই ভুল হল ।
ঝেড়ে একটা রদ্দা বসিয়ে দিল আমার ঘাড়ে । তখনই পিছন থেকে পিস্তলের বাট দিয়ে হাতুড়ির মত মেরে বসলেন দিলীর খান ।
হাজার হাজার বিজলি বাতি ঝিলিক দিয়ে উঠলো চোখের সামনে।
অতল একটা কালো গর্তের ভেতরে পড়ে গেলাম আমি।
কোন তল নেই । অন্ধকার ।
ছাদ থেকে লম্বা তারের মধ্যে নগ্ন একটা বাতি জ্বলছে । কটকটে আলো ছড়াচ্ছে স্বচ্ছ কাচের বাতিটা । আমার খানিকটা দূরে কাঠের প্যাকিং বাক্সের উপর দুইজন মানুষ বসে তাস খেলছে ।
কটকটে আলোর জন্য চোখ বন্ধ করে ফেললাম । ভাবতে লাগলাম, কি হয়েছিল আসলে । সব মনে পড়ে গেল।
প্রথমেই শিখার জন্য চিন্তা হতে লাগল । কোথায় আছে সে ?
মাথা না নাড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কামরার চারিদিকটা দেখে নেয়ার চেষ্টা করলাম ।
যা বুঝলাম কামরাটা বেশ বড় । । গোডাউনের মত । বড় বড় বাক্স প্যাটরা দিয়ে ভর্তি । রদ্দিকালের বাংলা সিনেমার ভিলেনের আস্তানার কথা খামখাই মনে পড়ে গেল । কোন জানালা নেই । শ্যাওলা পড়া ছাদ আর ঘেমে উঠা দেয়াল দেখে মনে হচ্ছিল জায়গাটা মাটির নিচে ।
এইবার তাস খেলোয়াড় দুই আমোদী ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম । রাজু আর গালকাটা মুন্না । ভালই খেলছে । সামনে টাকা । সিগারেটের ধোঁয়ার দুইজনকে বেশ রহস্যমানব লাগছে।
চুপচাপ মটকা মেরে পরে রইলাম ।
লোহার শক্ত একটা বিছানায় ফেলে রেখেছে আমাকে । হাত পা বেঁধে রাখার দরকার মনে করেনি ।
উঠে দাড়িয়ে অ্যাকশনে যাব সে চিন্তা মাথায় আনলাম না। গাল কাটা মুন্নাকে মারতে পারব কিন্তু রাজুর কাছে পিস্তল আছে।
যেন আমার চিন্তার তরঙ্গ ধরতে পেরেছে অমন ভাবে আচমকা রাজু বলে উঠলো , ‘ ফকিন্নির পোলার তো জ্ঞান ফিরে আসার কথা । বস ওর সাথে কথা বলবেন ।’
‘এত সহজে না ।’ তৃপ্ত গলায় বলল গালকাটা । ‘ আমার ঘুসি খেয়ে সহজে কেউ উঠে না ।’
দুইজনেই ফিরে চাইল আমার দিকে ।
পিস্তল তুলে রাজু বলল , ‘ পাকনামি করলেই মাথার ঘিলু বের করে আচার বানিয়ে ফেলব।’
এত দুঃখের মধ্যেও হুমকি শুনে হেসে ফেললাম ।
‘মুন্না তুই গিয়ে বসকে খবর দে ..দির পোলার জ্ঞান ফিরে এসেছে । আমি খেয়াল রাখছি ।
আমার দিকে করমচার মত লাল চোখে চেয়ে দেয়ালের সাথে রঙ্গে রঙ্গে মিশে থাকা লোহার দরজা খুলে বের হয়ে গেল মুন্না ।
‘শিখাকে দেখছি না যে ?’ থেঁতলানো আঙ্গুল দিয়ে চোয়ালে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম ।
‘উনার জন্য চিন্তা করতে হবে না। নিজের জন্য মোনাজাত ধর …দির পোলা ।’
জবাব দিল রাজু ।
পিস্তলটা এমন ভাবে ধরে রেখেছে ঝুঁকি নেয়ার কোন মানেই পেলাম না। অর্ধেক পথ পার হবার আগেই গুলি খেয়ে বসব । এত কাছ থেকে মিস করবে না রাজু ।
কবজিতে বাঁধা ঘড়ি দেখলাম । রাত এগারোটা বাজতে বিশ মিনিট বাকি । রেড ড্রাগন ক্লাবে এসেছি দেড় ঘণ্টা হয়েছে । ঘটনার উপর কন নিয়ন্ত্রণ নেই আমার । কি ঘটতে যাচ্ছে সেই ব্যাপারেও কোন ধারনা নেই ।
‘অন্যের জন্য চিন্তা না করে থাকতে পারি না।আমার মনটা খুব নরম । কোথায় আছে শিখা ? ‘
জবাব না দিয়ে সিগারেট টানতে লাগল রাজু । পিস্তলের নল আমার কপাল বরাবর ।
চারিদিক নিঝুম । কোথাও খোলা ট্যাঁপ থেকে টুপটুপ করে জলের ফোঁটা পড়ছিল নিয়মিত ছন্দে ।
ঘটাং করে মরচে পড়া লোহার গেইট খুলে প্রবেশ করলেন দিলীর খান খুশনবিস । শান্ত ভাবলেশহীন চেহারা । হাতদুটো কোটের পকেটে । কালো জামের মত পিচ্চি পিচ্চি চোখে চেয়ে আছেন আমার দিকে ।
পিছন পিছন নরকের প্রহরীর মত গালকাটা মুন্না ।
রাজু উঠে দাঁড়াল । পিস্তল হাতে আমার একদম কাছে দাঁড়াল । এত কাছে যে ওর শরীরের ঘামের আর সদ্য ধূমপানের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল ।
‘ক্ষমা করবেন বাদল সাহেব । ‘ বিনয়ের সাথে বললেন দিলীর খান । ‘ আপনি নিজের পরিচয় দেন নি কেন ? মস্ত বড় ভুল বুঝাবুঝি হয়ে গেছে । অন্য একজন মনে করে আপনার সাথে সামান্য বাজে ব্যবহার করে ফেলেছি ।’
লোকটার ভাব চক্কর দেখে অবাক হয়ে গেলাম ।
উঠে বসলাম । ‘ নাম ঠিকানা আতা পাতা বলার আগেই তো সিনেমা দেখান শুরু করলেন ।’ বললাম ।
‘তিনতলায় উঠে যাবার কোন দরকার ছিল না। আর অনিতার সাথে কথা বলেছি । কোন ভেজাল নেই । আপনি মুক্ত , চলে যেতে পারেন ।’
‘সুন্দর ভাবে বিদায় দিচ্ছেন আবার আপনার পাইক পেয়াদা আমার দিকে পিস্তল ধরে রেখেছে সত্যি আপনি মহান উদার বাদশা আগমগীর ।’ টিটকারি না মেরে পারলাম না।
টকটকে লাল হয়ে গেল রাজুর চেহারা । দিলীর খান মাথা নেড়ে ইশারা করতেই পকেটে পিস্তল ভরে নিরীহ বালক হয়ে গেল ।
‘আপনার লোকজন বেশ বফাদার । ভাল কথা অনিতা কোথায় ?’ বললাম ।
‘ লাথি মেরে ভাগিয়ে দিয়েছি।দশ মিনিট আগে চলে গেছে এখান থেকে । কোথায় গেছে বলতে পারব না।’ চামড়ার সিগারেটের কেস থেকে সিগারেট বের করে অফার করলেন আমাকে ।
‘অত দিনের প্রেম দশ মিনিট আগে ভেঙ্গে গেল ?’ আকাশ থেকে পড়েছি অমন একটা ভাব ভঙ্গি করে বললাম ।
‘প্রেম ফ্রেম না। অনিতার নেকলেসের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল আমার । আর কিছু না ।’ কিল খেয়ে হজম করে ফেললেন দিলীর খান । ‘ নেকলেসটা কোথায় আছে আপনি বোধহয় জানেন ?’
সিগারেট ধরিয়ে ইচ্ছা করেই উনার মুখের সামনে ধোঁয়া ছাড়লাম । ‘ সেটা তো ঠিকই আমি তো বাদল জুয়েলারসের মালিক ।’
‘আসলে অনিতা কথা দিয়েছে নেকলেসটা আমাকে দেবে সেইজন্য ওকে এই নিরাপদ জায়গায় থাকতে দিয়েছি।’ সরু আঙ্গুল দিয়ে নাক ঘষতে ঘষতে বললেন দিলীর খান ।
‘দারুণ তো ।’ হেসে ফেললাম । ‘ মানে যে কেউ আপনার কাছে এসে বললেই হবে , নিরাপদে থাকতে দিন ? বদলে আপনি থাকতে দেবেন। তাও আবার হিরা চুনি পান্নার বিনিময়ে । ব্যবসার নতুন দিগন্ত ।’
Series Navigation<< ঈশ্বরের বাগান – চতুর্থ পর্ব

মতামত জানান