ভ্রমণ কার না ভালো লাগে!
রাফির ভ্রমণ পরিকল্পনায় আগ্রহ দেখিয়ে বললাম। ছেলেটা ভীষণ এডভেঞ্চারাস। অসংখ্য পাহাড়-পর্বত আর সমুদ্রের মাটি-পানি গায়ে মেখেছে সে। গতবার রাঙ্গামাটির কোন পাহাড়ি অঞ্চলে যেন ঘুরে আসল। পাহাড়ের ভারী বাতাসে সেবার কালো ভূত হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। সবাই প্রথম দেখায় তাকে কোন আগন্তুক ভেবেছিল। দ্বিতীয় বারে বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বলেছিল- “একি! তুইতো রাফি দেখছি।”

রাফির ভ্রমণ পরিকল্পনায় ইতিবাচক সাড়া দিয়ে তার ভ্রমণ কাতর মনে রীতিমতো নাড়া দিয়ে বসি। তারপর থেকেই সে ভ্রমণের আগাগোড়া কষতে আরম্ভ করে দেয়।
কোথায় যাবে? পাহাড়ে না-কি সমুদ্রে? সেখানে কী করবে?
ভ্রমণের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? নতুন কোন উদ্দেশ্যে না-কি আগের মতোই সাদামাটা ঘুরোঘুরি? ভূতুড়ে হলে কেমন হয়? এরকম হাজারো পরিকল্পনা তার মাথায় আনাগোনা করছে। আনাগোনা করছে বৈকি মনে মনে পরিকল্পনা করে মাথায় সেটও করে নিচ্ছে। ভ্রমণ পটু মানুষ হিসেবে রাফির কাছে এসব ছক কষাকষি কোন অসামান্য বিষয় নয়। অসংখ্য বার এসবের সম্মুখীন হয়েছে সে তাই জগ থেকে পানি ঢেলে খাওয়ার মতোই সহজ ব্যাপার হয়ে গেছে এসব।

গতবার আমি যাইনি। অবকাশ হয়নি তাই যেতে পারিনি। ভ্রমণ-টমন আমারোও পছন্দ। বন-বাদাড়, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্রে নিজেকে আবিষ্কার করতে কার না ভালোলাগে! এবার হাতে ব্যাপক ছুটি পড়ে আছে। শীতকালীন ছুটি। তাই যখন সুযোগটা পেয়েছি তখন রাফির মতো আমাকে আর ঠেকায় কে? তাই, রাফির মতো এবারের ভ্রমণ পরিকল্পনায় আমিও খানিকটা মাথা ঘামাই।

কিন্তু ভ্রমণ নিয়ে আমার যতোই নখ খোটা হোক। আমার সিদ্ধান্ত সে এতোটুকুও গ্রাহ্য করবে না। রাফি ভীষণ গোঁয়ার ধাঁচের লোক। নিজে যা বলবে তাই করবে। অন্যদের চিন্তা-চেতনায় সে ডানে-বায়ে মাথা নাড়াবে। একদম কেয়ারলেস একটা মানুষ। কী আর করবো! নিরুপায় হয়ে তার পরিকল্পনায় আমাকে মাথা ঝাঁকাতে হয়েছে শুধু।

রাফির মতে, এবার কোন পাহাড় আর সমুদ্র নয়। ভিন্নধর্মী কিছু করবে ঠিক করেছে। ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় নূতন কিছু যোগ করবে। সাদামাটা ঘুরোঘুরি, মাটি-পানিতে গড়াগড়ির বদলে রোমাঞ্চকর কিছু করবে। যা তার ভাবনা তাই হবে এবার। তাই রাফির ইচ্ছায় অনিচ্ছা করতে পারিনি।

ভ্রমণ গন্তব্য বেশি দূরে নয়। আমাদের শহর ছেড়ে অদূরবর্তী একটি মফস্বল এলাকায় ঠিক হয়েছে। বাংলাদেশের এতো পর্যটন ভূমি থাকতে সেখানে কেন? — আমার প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নের কোন যথার্থ উত্তর মিলেনি। কেবল চোখ দু’টিকে রহস্যময় করে বলে গেল — দেখলেই বুঝতে পারবি। এই উত্তরের কোন মর্ম বুঝতে না পেরে আমার ভেতরে শুধু রহস্যের জমাট হচ্ছিল। রহস্যময় অজানা বিষয়গুলো যে কতটা আনন্দদায়ক তা শিরায় শিরায় উপলব্ধি হচ্ছিল তখন।

নদীপথে ভ্রমণ যাত্রা ঠিক হয়েছে। গাড়িতে করে কাঁচাপাকা রাস্তায়ও যাওয়া যেত। কিন্তু মফস্বলের গ্রামটিতে ঢুকতে একাধিকবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয় এমনকি ঠেলাগাড়িতেও চড়তে হয়। সদ্য বর্ষাবসান হলেও গ্রামীণ সরু এঁটেলমাটির পথগুলো এখনো কাদাটে হয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। অন্যদিকে নদীপথে সরাসরি গন্তব্যস্থলে পৌঁছনো যায়। তাই দুপুরের সূর্য মাথায় রেখে পাঁচঘণ্টার ভ্রমণ যাত্রায় আমরা ভিড় করি।

ইঞ্জিনের নৌকোটা গর্জন করে সরু নদীটির পাশ ধরে এগুচ্ছিল। নদীটি কোথাও মোটা আবার কোথাও চিকন। নদীর দুধারে বাংলার সৌন্দর্যের সমারোহ। সবুজ গাছগাছালির ভিড়ে কোথাও টিনের ঘর কোথাও ছাউনির। দু’ধারের সৌন্দর্যে দৃষ্টিপাত করতে করতে সূর্যটা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে। সময়টা যে কখন সুরুৎ করে উড়ে গেল। ঠিক খেয়াল করতে পারিনি। ডুবে ছিলাম নদীর দু’ধারে।

ভ্রমণ স্পট সম্পর্কে তখনও আমি সম্পূর্ণ অবগত নই। এমনকি ভ্রমণ উদ্দেশ্যও আমাকে জানায়নি সে। আমার কৌতূহল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিবোধও হয় বেশ। সর্বোপরি আমি একজন মানুষ না-কি? একজন মানুষের পক্ষে এতটা কৌতূহল বহন করা অমনুষ্যত্বের প্রকাশ বৈকি। তাই ভ্রমণের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে তাকে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বলাতে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করে মনুষ্যত্ব বজায় রাখি। আমার এতো এতো জিজ্ঞাসার পরেও তার মুখ ফুটে বেশি কিছু বার হয়নি। একদম গোঁয়ারে লোক। শেষে সেও তার গোঁয়ারে অস্তিত্ব বজায় রাখল।

ভৌতিক অভিজ্ঞতার উদ্দেশ্যে নাকি সে ভ্রমণ করছে। এককথায় ভৌতিক অভিযান বলা হয় যাকে। এছাড়া আর একটি কথাও বার করতে পারিনি। কথাটি বিশ্বাস হয় না আমার। মনে মনে সংশয়ের সুতো কাটছি কেবল। খাঁটি গোঁয়ারে লোক সে, তার মুখে আসল উদ্দেশ্যটি কি এখন আদৌ শোনা সম্ভব! মিথ্যে কথা বলেছে—এমন নিশ্চয়তা জাগে। অন্যদিকে ভৌতিক অভিযান শোনে আমার ভয়ের কুণ্ডলী পাকতে শুরু করে। যদি সত্যিই ভৌতিক অভিযান হয়। তবুও সংশয় থাকে।

সূর্যটা এতক্ষণে মাটির তলায় ডুব দিয়েছে। গন্তব্যের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গেছি আমরা। নদীর ধারে চির সবুজের সৌন্দর্য তখন পৈশাচিক আঁধারে রূপ নিয়েছে। ঘন কালো হয়ে আছে দু’পাশ। যেন আমাদের অনিষ্ট করার জন্যে ওঁত পেতে আছে কেউ। সঙ্গে রাফির ভ্রমণ উদ্দেশ্যের কথা মনে হল। ভৌতিক অভিযান। মনে হতেই গা কাঁটা দিয়ে উঠল। একটা শিহরণ অনুভূত হলো সারা গায়ে। তখন পেছন থেকে আচমকা কেমন শব্দ শুনতে পাই। কেমন টুংটাং শব্দ যেন। অনবরত শব্দটি জোরালো হচ্ছিল। আমার পেছনেতো কেউ নেই। তাহলে অনবরত শব্দটি করছে কে? ভূত নয়তো? আমার সামনে রাখা ব্যাগটিকে একমাত্র ভরসা ভেবে জড়িয়ে ধরি তখন। ভয়ে চোখের পাতাজোড়া কাঁপছিল। কখন যে ঘাড় মটকে দেয় কে জানে! ভয়ে ভীষণ কাবু হয়ে যাই। একবারের জন্যেও রাফিকে বলার সাহস করতে পারিনি। জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যেন।

নৌকোটা গন্তব্যে এসে নোঙর করে। সবাই একে একে নামতে শুরু করে। রাফিও নেমে যায়। আমিও সবার ভিড়ে সন্তর্পণে নামতে গিয়ে সাহস যোগিয়ে একবার পিছনে তাকাই। পেছনের টুংটাং শব্দ করা স্বত্বাটিকে দেখার জন্যে। তাকিয়ে যা দেখি তা শুনলে যে কেউই আমাকে বোকা নয়তো ভীতুর সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিবে। তখন নিজেকেই নিজের কাছে খুব ভীতু লাগছিল আসলে। এরকমটা কেউ করে!

চালাকি করেও যদি তখন একবারের জন্যে পেছনে তাকাতাম তাহলে খালি কাঁচের বোতল দুটির ঘর্ষণের শব্দকে ভূত ভেবে মিছিমিছি ভয় পেতাম না। যাইহোক, ভূত ছিলনা এই বেশি। যদি ভূত হতো তখনতো ঠিকিই ঘাড় মটকে দিত। চালাকি বার করে দিত বেশ করে।

নৌকো ছেড়ে ঘাটে দম ছাড়তেই অন্যান্য যাত্রীরা সবাই স্ব স্ব উদ্দেশ্যে চলে যায়। ঘাট একেবারে জনশূন্য হয়ে যায়। আমরা একটি পুরনো আম গাছের নিচে দাঁড়াই। আমাদের থেকে প্রায় পঞ্চাশ কদম তফাতে একটা ছোট্ট দোকান দেখা যাচ্ছিল। সেখানকার একমাত্র দোকান সেটি। কোন ইলেক্ট্রিসিটি নেই, হারিকেনের টিমটিমে আলো পুরো দোকান জুড়ে।

নৌকায় বোকামির ধকল আমার তখনও সারেনি। অন্যমনস্ক হয়ে ছিলাম কিছুটা। নৌকোয় ভ্রমণ সম্পর্কে রাফিকে টুকটাক জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু নৌকো ছাড়ার পর খানিকটা চুপ হয়ে যাই। কোথায় যাব? কী করব? এসব কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। কেবল বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলাম রাফিকে কী মনে করে যেন হন্তদন্ত হয়ে দোকানের দিকে ছুটে যেতে। দোকানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন। সবে সন্ধ্যা হলো মাত্র, এখনি দোকান বন্ধ করার কারণ জিজ্ঞেস করল রাফি। দোকানির মুখে কিছু অমঙ্গল ঘটনের আশংকা শোনা যায়। এখানে নাকি সন্ধ্যার পর মানুষের থাকা মঙ্গলকর নয়। এরকম আরো কিছুকথা। তারপর দোকানির কাছে রাফি একটি বাংলোর ঠিকানা জানতে চাইল। বাংলোর নাম শুনেই দোকানির মুখ লুকানোর উপক্রম হলো। তখন আলো স্বল্পতা থাকলেও হারিকেনের আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মুখটা শুষ্ক হয়ে যায় তার।

কাউকে উপকার করার পর যখন উপকৃত ব্যক্তি বলে,”আমাকে উপকার করলেন কেন? আমিতো স্বয়ং নিজের অপকার করার উপায় খুঁজছি।” তখন উপকারী ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি যেমন হয় ঠিক তেমনি মুখাবয়ব দোকানির চোখেমুখে ফুটছিল।

তখন নিজেকে একরত্তি সান্ত্বনা দিয়ে দোকানি ঢিবঢিব করে তাকিয়ে বলল,”আমিতো সেই পথেই যাচ্ছি, বাবু। আমার সঙ্গে যাইতে পারবেন।” তারপর দোকানে তালা মেরে হু হু হাটতে থাকে সে। যেন কেউ ধাওয়া করছে তাকে। আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা যেন।

এদিকে দোকানির কথায় সম্মতি দেয়ার ফুরসত না পেয়ে রাফিও খানিক তফাতে হাটতে শুরু করে। আমি রাফির ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছিলাম তখন। রাফি দু’পা এগুলে আমিও দু’পা আগাই। নার্ভাস ছিলাম পুরোদমে। ভাবছিলাম বাংলোতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আস্ত একটা ঘুম দিবো। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার নৌকো ভ্রমণে শরীরটা ঢলে পড়ার উপক্রম। চোখে ঘুমের রেশ। নিভু নিভু লাগছিল চারদিক। ঘোর অন্ধকারের ভেতর দিয়ে কেবল হারিকেনের আলোয় এগুচ্ছিলাম আমরা। সবে আধঘণ্টা হলো সূর্য অস্তমিত হয়েছে। এখনি অমাবস্যার অভিশপ্ত অন্ধকার। চাঁদের ছিটেফোঁটাও দৃষ্টিগোচর হলো না। মেঘে ঢাকা পড়েছিল নিশ্চয়ই। কেবল পূব আকাশে শ’খানেক তারা ঝিলমিল করছিল।

হঠাৎ দোকানি থেমে গিয়ে পেছনে মুখ ফেরায়। হারিকেনটা মুখের কাছে নিয়ে আমাদের দেখার পণ্ডশ্রম করে। তারপর অন্ধকারে ছোঁড়ে বলে,”এই লন, বাবু। আইসা পরছি। সাবধান থাকবেন।” দোকানির থেকে প্রায় পনের-বিশেক পা পেছনে আমরা হাঁটছিলাম। তার বা পাশের দু’তলা বাংলোটা দেখিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় সে। ঘোর অন্ধকারে হারিকেনের ক্ষুদ্র আলোটাও চোখে পড়েনি। সবটা মিলেমিশে অন্ধকারে একাকার হয়ে যায়। তখন মিশকালো অন্ধকার চারপাশ জুড়ে। কোনকিছুতে চোখ বুলানোর জো নেই।

ছেঁকে ধরা অন্ধকারে বাংলোর নিচ তলায় মোমবাতির আলো দোলছে। দোদুল্যমান আলোয় লক্ষ্য করে আমরা বাংলোর দিকে যাই। বারান্দায় পৌঁছে আধ-খোলা দরজায় কড়া নাড়ি। দু দু’বার কড়া নাড়ার পরও কোন সাড়াশব্দ পাইনি। তারপর আমরা ইতিউতি মুখ ফেরাতেই একজন প্রৌঢ় লোক আচমকা পুরো দরজাটা খুললেন। হঠাৎ লোকটিকে দেখে রাফি ভড়কে যায়। হাতে হারিকেন সহ লোকটার লিকলিকে শরীরের উপর মেটে রঙের ভারী বস্ত্র চোখ পড়ে। শণের মতো চুল পুরো মাথা জুড়ে। কোটরাগত চোখ দুটো পিটপিট করে তাকিয়ে ছিল। তার মুখাবয়বে কোন অনুভূতি উপলব্ধ হয়নি। দিব্যি নিরস চেহারা তার। এমন নির্জনে যার বসবাস তার চেহারায় আবার রস থাকবে! এটাই স্বাভাবিক।

তারপর রাফিকে কিছু বলতে গিয়ে দেখলাম থেমে গেল। তার আগেই প্রৌঢ় লোকটি বলল,”ভেতরে আইসেন, বাবু।” কোন গড়িমসি বিনা আমরাও ঢুকে পড়ি। দেখলাম রাফির মুখে বাঁকা হাসির রেখা। সিদ্ধি লাভের হাসি হয়তো।

হারিকেনের আলোয় অন্ধকার ডিঙিয়ে বাংলোয় যা দেখছিলাম তা বহু পুরনো বলে আঁচ করতে ভুল হবে না কারো। আমাদের ডানে কারুকাজ করা একটি দোলনা চোখে পড়ল। তার পাশে আয়না ঘেরা টেবিলে ছত্রভঙ্গ হয়ে আছে গুটিকয়েক জিনিসপত্র। সবগুলোয় ধুলোবালি বসে ধূসর হয়ে গেছে। এমনকি প্রতিটি আসবাবপত্রে যত্ন-আত্তির অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। নিচ তলায় কেউ থাকেনা তাই হয়তো এতো অবহেলার আভাস পুরোটা জুড়ে। আমাদের বা পাশে উপর তলার ন-দশেক সিঁড়ি হারিকেনের আলোয় ঠাওর করা যাচ্ছিল। লোকটি সিঁড়ি বেয়ে উপর তলায় পৌছায়। রাফির সঙ্গে সঙ্গে আমিও লোকটির পেছনে হাটি। উপর তলায় পাশাপাশি তিনটি কক্ষ চোখে পড়েছে। তার একটিতে লোকটি প্রবেশ করে। পেছনে থেকে আমরাও প্রবেশ করি। কক্ষের একপাশে একগুচ্ছ মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয় লোকটি। কক্ষটি বেশ ঘুচানো ছিল। সৌখিন জিনিসপত্রে ভরপুর। দেয়ালে চারটে তৈলচিত্র চিকচিক করছে। মোমবাতির তিরতিরে আলোয় কক্ষটির আপাদমস্তক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তৈলচিত্রের একটিতে মানুষের ছবি ছিল বলে মনে হলো, ঠিক আঁচ করতে পারিনি। মুখের দিকটা কেমন ঝাপসা লাগছিল। পুরনো ছবি; নিশ্চয়ই রঙের ঔজ্জ্বল্য লোপ পেয়েছে। ওদিকে বেশি সময় ক্ষেপণ না করে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে খাটে বসে পড়ি। রাফিকে দেখলাম কক্ষের এদিক-ওদিক আনাগোনা করছিল। খুটে খুটে পুরোটা কক্ষ দেখছিল সে। আমাদেরকে কক্ষে প্রবেশ করিয়ে লোকটি চলে গেল।

যাওয়ার সময় বলে গেল,”হাত, মুখ ধুইয়া নেন, বাবু। আমি খাওনের যোগাড় করতাছি।” আমাদের সব দায়-দায়িত্ব যেন তার ঘাড়ে। “রাফি এসব ব্যবস্থা করল কীভাবে?” তখন জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তাকে জিজ্ঞেস করার ফুরসতই বা পেলাম কোথায়। সব যেন ঘোর পাকানো ছিল তখন।

রাফি কক্ষের ইতিউতি ঘুরে এককোণে সোনালী পাড়ের কালো আয়না ঘেরা টেবিলটির কিনারে গিয়ে খানিক খুঁটাখুঁটি করে। তারপর আচমকা আমাকে ডাক দেয়।
আমার মুখ ফেরানোর আগেই সে আনন্দ কিংবা আশ্চর্য মাখা কণ্ঠে সহসায় বলে,”পেয়েছি, পেয়েছি। ভূতের খামচি নিশ্চয়ই। ভীষণ ভয়ানক দেখতে। এখানে পরিবেশটা বেশ ভূতুড়ে, তাই না?”

টেবিলের পাশে দেয়ালের উপর তিনটি আঙ্গুলের খামচির দাগ দেখে তার এতো উত্তেজনা। ভূতুড়ে অস্তিত্বগুলো সে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। ভূতের ভয় পাওয়ার জন্যে তার এতো কাতরানো লক্ষণীয় ছিল। তখন আমার অন্তরিন্দ্রিয়ে তার ভ্রমণ উদ্দেশ্য প্রকাশ হয়। নৌকোয় সে সত্য কথাই বলেছিল। আমার সব ভ্রমণ রহস্য মিলিয়ে যায় তখন। তার একান্ত ভৌতিক অভিযানে বেরিয়ে তার আগেই আমি ভূতের ভয় পাই। নৌকোয় কী বোকামিই না করলাম তখন! বড্ড বোকামি ছিল ওটা। রাফিকে বলা যাবে না। শুনলেই তিরস্কার করবে কেবল।
তাই ওসব না বলে তাকে বললাম,”হ্যাঁ, ভূতুড়ে পরিবেশ আর ভূতের ভয় সবিই আছে কিন্তু ভূত-টুত কোথাও নেই। এসব ভ্রম বুঝলি। আসলে ভূত বলতে কিছু থাকেনা।”

আমার কথায় রাফির মুখটা কেমন মলিন হয়ে যায়। মনে হলো তার ভ্রমণ উদ্দেশ্যে গড়মিল করে ফেলেছি। যাকগে, ওদিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে হাত, মুখ ধুতে যাই। লোকটি খাবার নিয়ে আসবে বলেছে। বড্ড খিদে লেগেছে। খেয়ে-দেয়ে ঘুমোবো এটুকু হলেই বেশ। ভয়-টয় আমার লাগবে না আর। এমনিতেই বড় ভয় পেয়েছি।

কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট একটি বাথরুম ছিল। ওটাতে ঢুকে পড়ি। বাথরুমের দেয়ালে অসংখ্য খামচির দাগ চোখে লাগে। সত্যিই খুব ভয়ানক। ভূত-টুত কি সত্যিই আছে? নাহলে এসব কার খামচি? কে জানে? থাকতেও পারে! থাকগে, এসবে মনোযোগ খাটালে কেবল ভয় বাড়বে। আবারো কোন বোকামি করে বসবো পরে। মিছিমিছি ভয় পাবার দরকার নেই। তাই হাত-মুখ ধুয়ে সোজা বাথরুম থেকে বেরিয়ে যাই।

রাফি তখনো খুঁটা খুঁটি করছে সারা কক্ষে। যত্তসব পাগলামি তার। ভূতের ভয় পাওয়ার জন্যে কী কেউ ভ্রমণ করে! যাইহোক, এই উসিলায় নৌকো ভ্রমণটাতো হয়ে গেল। আবার অনেকদিন পর গ্রামে আসা হলো; এতটাও মন্দ নয়। বড্ড সান্ত্বনা দিলাম নিজেকে। তারপর রাফিকে ডেকে হাত-মুখ ধুতে বললাম। আর আমি খাবারের অপেক্ষায় টেবিলে বসে পড়ি। খানিক পরেই প্রৌঢ় লোকটি খাবার নিয়ে আসে। বেশি দেরী হয়নি তার। দু’হাতে ধোয়ো উঠা খাবার দেখে আমার খুদা বেড়ে যায় তখন। কিন্তু রাফির সাথে একসঙ্গে খাব ভেবে সামলে নিয়েছি। তারপর লোকটিকে বসতে বললাম। সেও বসে পড়ল আমার বিপরীতে একটি চেয়ারে। কোন গড়িমসি নেই তার মাঝে। একেবারে সোজাসাপ্টা, নীরস একটা লোক। আবার তাকে ঘিরে সব যেন রহস্যময়। লোকটার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা জাগে তখন। এমন ভূতুড়ে বাড়িতে কীভাবে থাকে সে? আর এখানে কী আদৌ ভূত আছে? এরকম রহস্যময় প্রশ্নের যথার্থ উত্তর তার থেকেই পাব। তাই রাফি আসার আগে লোকটির সঙ্গে কথা বললে মন্দ হবে না।

লোকটি কোথায় যেন তাকিয়ে ছিল এক ধ্যানে। চোখে-মুখে কোন সাড়াশব্দ নেই তার। তাই গলা খেকুর দিয়ে বললাম, “শুনলাম এই বাংলোতে না-কি ভূত-টুত আছে। আপনি এখানে থাকেন কীভাবে?”

আচমকা আমার কথা শুনে ধ্যানভঙ্গ হয়ে উত্তর দেয়,”বহুদিন হইয়া গেছে, বাবু। তাই মায়ার বান্ধুন ছাইড়া যাইতে পারিনা। মনে লয় না।” তারপর চুপ হয়ে যায় সে। কোথায় যেন হারিয়ে যায় হুট করে।
তাই আবারো আমি জিজ্ঞেস করলাম,”আপনি কী ভূতে বিশ্বাস করেন? আর এই বাড়িতে কি সত্যিই ভূত আছে? না-কি সবিই মিথ্যে গুজব? আমার আবার এসব ভূত-টুতে বিশ্বাস হয় না।”

আমার প্রশ্ন শুনে লোকটি আচমকা আমার চোখে চোখে তাকায়। চোখগুলো ঈষৎ লাল বর্ণের হয়ে যায় তার। গাড় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। যেন ঝলসে দিবে আমাকে। তারপর নিজের মাথাটি গলা থেকে ছিঁড়ে আলাদা করে টেবিলে রাখে সে। ছেঁড়া জায়গা থেকে চিরচিরিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। ছেঁড়া মাথার চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে আর বড় দুটি দাঁত বার করে বলেছিল,”মিথ্যা হইবো ক্যান, বাবু। এইবার ঠিকিই বিশ্বাস হইবো আপনের।”

সূর্যটা পূবের আকাশে তাক হয়ে জানালা ভেদ করে আমার চোখে পড়ে। অনেকটা সকাল হয়ে গেছে। ঘুম ভেঙ্গে লাফ দিয়ে উঠলাম। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম সবিই ঠিকঠাক। কোথাও রক্তের ছাপ পেলাম না। নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্ন ছিল ওটা। নয়তো কোন ভ্রম আবারো।
তখন রাফিকে দেখলাম কক্ষে ঢুকল। আমাকে দেখে বলল,”গ্রামটা বড্ড সুন্দর। সকালের মৃদু হাওয়ায় ঘুরে আসলাম খানিকটা। রাতে তুই আচমকা মাথা ঘোরে পড়েছিস, তাই অতো সকালে ডাকিনি। এখন কেমন লাগছে তোর?”
রাফির কথা শুনে নিশ্চিত হয়ে গেলাম; কিছুই ঠিক নেই এখানে। থাকা যাবে না আর। কিন্তু রাফি যে বড্ড গোঁয়ারে লোক; আরো কদিন না থেকে কি সে ফিরবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, সেতো এখনো ভূতই দেখেনি।

মতামত জানান