ধারাবাহিক ক্ষুদে বিজ্ঞানীর ক্লাব - 13 পর্ব (28)

ইস্কুল জীবনে এক স্যার একবার ক্লাসে বলেছিলেন-
অ্যাঁই তরা জানিস সক্রেটিস স্বেচ্ছায় বিষ খেয়ে মারা গিয়েছিলেন। সেই বিষের নাম ছিল হেমলক।
কিছু একটা না বললে খারাপ দেখায়। তাই বুক চিতিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম- স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সম্ভবত বিষ খেয়েছিলেন। তার একটা গানে আছে ,আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান। শোনেননি স্যার?
স্যার সম্ভবত গানটা শোনেননি।তাই মারধর খেলাম যৎপরোনস্তি।
শুভেচ্ছা হিসাবে আমার কান দুটো রেডিয়োর নবের মত ইচ্ছেমত মুচড়ে দিলেন তিনি। কান ধরে বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে রইলাম নিঃসঙ্গ নাবিকের মত।”
দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা খাচ্ছি সবই বিষ। বিশ্বাস করুন। একদম বাড়িয়ে বলছি না।
সব খাবারের ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত রঙ বা কেমিকেল। ফল পাকানো হতে মাছ সংরক্ষণের জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে নানার বিষ।
বিষ আমার বিষ ওগো বিষে ভুবন ভরা।
উপায় নেই বিপদে পড়ে খাচ্ছি।
কিন্তু এমন কোন খাবার আছে যা আমরা জেনে শুনে ঝুঁকি নিয়ে খাই?
হ্যাঁ, তেমন ও আছে।
১- পাফার ফিশ – বাংলাদেশে এটা পটকা মাছ হিসাবে অনেকে চেনে। আগে প্রায়ই পত্রিকাতে সংবাদ হত- পটকা মাছ খেয়ে অমুক জায়গাতে একই পরিবারে
এত জনের মৃত্যু।
মাছটা দেখতে বিদঘুটে। নিজেকে নিজে ইচ্ছামত বেলুনের মত ফোলাতে পারে।
জাপানিরা বলে ফুগু । এই বিষে ভরা মাছটা জাপানিদের খুব প্রিয়।শিমোনোসেকির
হায়েদোমারি বাজার হচ্ছে জাপানের একমাত্র বাজার যা ফুগু মাছের জন্য বিখ্যাত।
প্রতি বছর এই বাজারে ২ হাজার টন ফুগু মাছ বিক্রি হয়। অভিজাত আর দামি
হোটেলগুলোতেই পাওয়া যায় এই পাফার ওরফে ফুগু।
সব বাবুর্চি এটা রান্না করতে পারে না। দুই থেকে তিন বছর ট্রেনিঙের পর মাত্র ৩০% বাবুর্চি পাস করে।
তখন এই বাবুর্চিদের খুব দাম বেড়ে যায়। পাস করার পর প্রথম দিনের রান্না বাবুর্চি
নিজে খায়। সে বেঁচে থাকলে খদ্দেরের জন্য রান্না করার সার্টিফিকেট পায়।
পটাশিয়াম সায়ানাইডের চেয়ে ও হাজার গুণ বিষাক্ত এই মাছ। দাম ও বেশ
চড়া।
২ । মাশরুম -আমি নিজে টনে টনে মাশরুম খেয়েছি। রান্নায় ব্যবহার করেছি খদ্দেরের জন্য। কিন্তু বনে জঙ্গলে ক্যাম্প ফায়ারে গিয়ে অচেনা মাশরুম ভুলেও খাইনি। এতটা ঝুকি নেয়ার কোন মানে হয়না। কারন বেশ কিছু প্রজাতির মাশরুম বিষাক্ত। কাজেই সাধু এবং অসাধু উভয়ই সাবধান।
আমাদের দেশে বিষাক্ত মাশরুম নেই। বাজারে যা বিক্রি হয় বেশ ভাল কোয়ালিটির।
বিষাক্ত মাশরুম রান্না বা গ্রিল করতে গেলে গোলাপী রঙ ধারন করে।
বাইরের দেশগুলোতে গাইড বই পাওয়া যায়। যে গুলোতে ছবিসহ বিষাক্ত মাশরুমের
বর্ণনা দেয়া থাকে।
বিষাক্ত মাশরুমগুলোর গাল ভরা নাম থাকে। যেমন- মৃতুর টুপি, ধ্বংসের দেবদূত,বোকার
ফ্যানেল। জ্যাকের লণ্ঠন। এই সব হাবিজাবি আর কি।
বিষাক্ত মাশরুমগুলো বেশির ভাগই দেখতে সুন্দর হয়।
৩। ক্যাস্টর অয়েলঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট বেলায় জ্বর হলে দুই চামচ ক্যাস্টর অয়েল খাওয়ান হত তাকে। দারুন টোটকা।
বাইরের দেশগুলোতে চকলেট আর ক্যান্ডি বানাতে প্রচুর পরিমানে ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার করা হয়। তবে এর দানাতে রয়েছে Toxic. মাত্র একটা দানা খেলে মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়।আর চারটে খেলে আস্ত ঘোড়া পযন্ত মারা যায়।
৪। এলডার বেরিঃ হাস্নাহেনা ফুলের মত দেখতে এই জিনিসটা ।
আটা বা ময়দা গুলে সাথে ডুবো তেলে ভেজে এটা খায় মানুষ। ফুলকপি
ভাজার মত স্বাদ। হালকা বিষ থাকায় খাওয়ার পর অনেকেরই পেট ব্যাথা
আর বমি বমি ভাব হয়। তবু কেন লোকজন এটা খায় আল্লাহ ই জানেন।
৫। আপেলঃ হায় ,হায়। আদম আর ইভের প্রিয় ফলে বিষ ! না, আসলে বিষ রয়েছে
আপেলের দানাতে। cyanide নামের বিষ । এক কাপ পরিমাণ আপেলের দানাতে
যে পরিমাণ বিষ আছে তাতে পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ একজন মানুষ অনায়াসে অক্কা পেতে
পারে। কাজেই আপেল চিবুনর সময় এই বান্দার কথা খেয়াল রাখবেন
দয়া করে।
৬। টমেটোঃ আগে লোকজন বেশ ধন্ধে ছিল। টমেটো কি ফল না সবজী?
বেশ বাদানুবাদ হয়েছে এ নিয়ে। শেষে ১৮৭৩ সালে আমেরিকার কোনও একটা
কোর্ট রায় দিয়েছে টমেটো আসলে একটা সবজী। এর আগে অনেকেই অসুস্থ রোগীকে
দেখার জন্য ঝুড়ি ভর্তি করে টমেটো নিয়ে যেতেন। ভাবুন একবার !
এই টমেটো গাছের পাতায় রয়েছে Glycoalkaloids নামের বিষাক্ত কেমিকেল
।যা খেলে পেট ব্যথা , নার্ভাসনেস আর বিষণ্ণতায় ভোগে মানুষ।
কাজেই রান্নার সময় যেন টমেটো গাছের কোন অংশ রান্না হয়ে না যায়।
৭। রুবারব( Rhubarb)ঃ বাংলায় একে রেউচিনি গাছ বলে। ঘরের কোনে সহজেই এই গাছটা হয়। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে এর শেকড় ওষুধ হিসাবে ব্যবহার
করছে চিনারা। এর এর নরম পাতা ব্যবহার করছে রান্নার কাজে। বিশেষ করে
পুডিং বানাতে। কিন্তু এর পাতাতে রয়ে গেছে অচেনা বিষ। বিষ থেকে বাচার উপায়
হচ্ছে সেদ্দ করে পানিটা ফেলে দেয়া। কোন ভাবে বিষটা রয়ে গেলে কোমাতে
আক্রান্ত হয় মানুষ। দুর্বল হয়ে যায় স্মৃতিশক্তি । হারিয়ে ফেলে চিন্তা চেতনার
ক্ষমতা।
৮।আমণ্ডঃ সুস্বাদু এক ধরনের বাদাম।
কত কাজেই না লাগে। কেক, বিস্কুট, দৈইয়ের উপরের আস্তরণ- কত কী।
কিন্তু এতেও আছে cyanide নামের বিষ। তখনই এটা বিপদ যখন
কাঁচা খাওয়া হয়। এই জন্য নিউজিল্যান্ড এর আমেরিকাতে কাঁচা আমনড কেনা বেচা নিষিন্ধ । রোষ্ট করা আমনড খাওয়ার সময় তেঁতো স্বাদ লাগলেও সাবধান হয়ে যাবে।
বিষাক্ত খাবারের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
অনেক সময় এই সব খাবার দিয়েই কায়দা করে খুন করা যায়। কেউ
টের ও পাবে না খুনটা তুমি করেছ ,
শুনবে কায়দাগুলো ?

Series Navigation<< বদলে যাবার গল্পআর্কিমিডিস রহস্য >>

মতামত জানান