ধারাবাহিক ক্ষুদে বিজ্ঞানীর ক্লাব - 14 পর্ব (28)

গল্পটা সবাই জানে। একদম ছোটবেলায় আমাদের পাঠ্য বইতে ছিল।
সিসিলির রাজা হাইরো (Hiero) ছিলেন বেশ ধর্মপ্রাণ মানুষ। একবার এক যুদ্ধে
জয়লাভের পর তিনি ঠিক করলেন মন্দিরে দেবতার জন্য একটা স্বর্ণের মুকুট তৈরি
করবেন। দেবতা যাতে খুশি হয়। মকুটটা হতে হবে একদম খাঁটি সোনার।
রাজভাণ্ডার থেকে পরিমাণ মত স্বর্ণ দেয়া হল স্যাকরাকে।
আর সেই স্যাকরাও দারুন দেখে একটা মুকুট বানিয়ে দিল। এই দিকে বাজারে বেশ গুজব
সেই স্যাকরা নাকি স্বর্ণের বদলে মুকুতে বেশ খানিক রুপা মিশিয়ে দিয়েছে। বাকি সোনা নিজেই হাপিস করেছে।
তখন রাজা হিরো আর্কিমিডিসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- এমন কোন উপায় আছে যাতে মুকুট না ভেঙ্গে এই জালিয়াতির ব্যাপারটা ধরা যায় ?
ব্যাপারটা শুনে বেশ চিন্তায় পরে গেলেন আর্কিমিডিস। ভদ্রলোক বেশ বুড়ো একজন মানুষ। জ্ঞান চর্চা করেন। অংক, জ্যামিতি হাবিজাবি ভাল বুঝেন। সিসিলি দ্বীপের
জ্ঞানী মানুষ বলতে সবাই তখন আর্কিমিডিসকেই বুঝত।
তিনি চিন্তা করতে লাগলেন।
কিভাবে ? কিভাবে মুকুট না ভেঙ্গে বুঝা যায় ওটা একদম খাঁটি সোনার তৈরি নাকি খাঁদ
মেশানো হয়েছে।
ভাবতে ভাবতে তিনি গোসল করতে গেলেন।
পেল্লাই সাইজের একটা বাথটাবে গোসল করতেন তিনি।গরম পানি সাবান হেন তেন তো নিশ্চয়ই থাকত।
বাথটাবে বসা মাত্র বেশ খানিক পানি পিচিত করে বাইরে পরে গেল।সাথে সাথে মগজ
খুলে গেল আর্কিমিডিসের। হায় হায়। একদম সহজ তো।
সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছেন তিনি।
চেঁচিয়ে উঠলেন- ইউরেকা। ইউরেকা। মানে – পেয়েছি।
তখন জামা কাপড় না পড়েই রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে রাজার দরবারে পৌঁছে গেলেন।
সবাই গোল্লা গোল্লা চোখে চেয়ে আছে তার দিকে।
তো বাথটাবে বসে আর্কিমিডিস কি ভাবে সেই মুকুটের রহস্যের সমাধান পেলেন ?
তিনি দেখলেন বাথটাবে বসা মাত্র বেশ খানি পানি বাথটাবের বাইরে পড়ে গেল।
নিশ্চয়ই সেই পানির আয়তন আর বাইরে উপচে পড়া পানির আয়তন সমান হবে।
এবং তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন- কথাটা সত্য। কোন জিনিসকে পানিতে ডোবালে
সেই জিনিসটা পানিতে যতটুকু ডুবে আছে তার সমান আয়তনের পানি সরিয়ে দেবে।
দারুন একটা সূত্র বের করে ফেললেন তিনি।
আর্কিমিডিস মুকুটটা পানিতে ডুবালেন । দেখলেন কতটুকু পানি উপচে পড়ে।
এরপর সমান ওজনের সোনা ডোবালেন। দেখলেন মুকুট ডোবানোর সময় বেশি পানি উপচে পড়ছে।তারমানে জিনিসটা একদম খাঁটি সোনার তৈরি না।
খাঁদ আছে।
স্যাকরাকে ধরা হল। বেচারা ভয়ে সব স্বীকার করলো। লোভে পড়ে সে অমন তস্করগিরি
করেছে।
যে লোক পানিতে জিনিস ডুবিয়ে চোর ধরতে পারে তার কাছে কিছুই লুকানো থাকে না।
তো এই হচ্ছে আর্কিমিডিসের সেই গল্প ।
তো কি মনে হয় ? ঘটনা বা গল্প কি সত্য ?
ইতিহাস কি বলে ?
অন্য কোন কাহিনি নেই তো ?
ইতিহাসবিদরা আরও একটা গল্প বলেন।
রাজা হাইরো আর্কিমিডিসকে বিশাল সাইজের এক জাহাজ বানানোর কাজে নিযুক্ত করেন।
সেই সময়ের সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর চেয়ে ১৫গুন বেশি বড় হবে। জাহাজটার নাম হবে সিরাকুসিয়া ( SYRACUSIA) ।
জাহাজ তো আর্কিমিডিস বানাবে না। বানাবে শ্রমিকরা। উনি শুধু কায়দাটা বলবেন।
কিভাবে বানাতে হবে।
রাজা হাইরোর স্বপ্ন তার বানানো জাহাজটা হবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাহাজ।
মিসরের শাসক টলেমীকে উপহার দিয়ে চমকে দেবেন তিনি।
কিন্তু এমন বিশাল প্রায় রাজপ্রাসাদের সাইজের জাহাজ কি সমুদ্রে ভেসে থাকতে পারবে ?
আর্কিমিডিসের সময়ে এটা খুবই অসম্ভব একটা জিনিস। যেন জিজ্ঞেস করা হয়েছে- পাহাড় কি উড়তে পারবে ?
এনা পাহাড় থেকে পেল্লাই সব পাইন গাছের গুড়ি আনা হল।
স্পেন থেকে মোটা মোটা দড়ি আনা হল। আর জাহাজের খোলে মাখানোর জন্য
ফ্রান্স থেকে আলকাতরা আনা হল।
জাহাজে কি থাকবে ?
জাহাজের ডেকে ৮ টা প্রহরীদের জন্য টাওয়ার থাকবে। যেখানে দাঁড়িয়ে দূর দূর পযন্ত
নজর রাখা যাবে। কপিকল থাকবে। এক একটা কপিকল যাতে ১৮০ পাউনড ওজনের পাথর ছুড়ে মারতে পারে শত্রুপক্ষের উপর।
যাত্রীদের জন্য সুইমিং পুল আর স্নানঘর থাকবে। সারাক্ষণ গরম পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
লাইব্রেরী থাকবে বই আর পাথরের মূর্তি ভর্তি। দেবী আফ্রোদিতির একটা মন্দির থাকবে। এমন কি ব্যায়াম করার জিম ও থাকবে।
আর্কিমিডিসের জন্য কঠিন কাজ যেটা তা হলো রাজা হাইরো বড় বড় চারটে
কার্গো দিতে চান সাথে।
একটায় থাকবে ৪০০ টন খাদ্যশস্য। ১০ হাজার জার ভর্তি নোনা মাছের আচার।
৭৪ টন মিষ্টি পানি। পান করার জন্য। এবং ৬০০ টন উল।
সাথে থাকবে ১ হাজার যাত্রী। যাদের মধ্যে ৬০০ জন হচ্ছে সৈনিক।
সাথে কুড়িটা ঘোড়া আলাদা আলাদা আস্তাবলে।
সবাই দাবি করলো এই রকম জাহাজ কখনই বানানো সম্ভব না। একদম না।
সেটা নিয়েই ভাবছিলেন তিনি।
এবং গোসল করতে গিয়ে বাথটাবে বসে ভাবছিলেন, কিভাবে ভারি বাথটাবের পানি উপচে পড়ে ?
তখনই আইডিয়া পেলে গেলেন। ২ হাজার টনের সিরাকুসিয়া জাহাজটা যদি ২ হাজার টন
পানি অপসারণ করে। তবে সেটা কেরেমেরে করে ভেসে থাকবে। যদি ৪ হাজার টন
পানি অপসারণ করে তবে বেশ ভালই ভেসে থাকবে।
আর যদি ১ হাজার টন পানি সরিয়ে দেয়… ইয়ে রাজা হাইরো তখন মোটেও খুশি হবে না।
এই সুত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আজও। আর্কিমিডিস প্রিন্সিপাল বলে। এই জন্যই পেল্লাই সাইজের বিশাল সহ মালবাহী জাহাজ ভেসে থাকতে পারে ছোট ছোট সব নৌকার মত।
জাহাজের তলাকে বলে কীল (keel)। এই কীল যথেষ্ট ভারি করতে হবে । এবং যথেষ্ট চেপটা হতে হবে যাতে প্রচুর পানি সরিয়ে দিয়ে জাহাজটাকে ভাসিয়ে রাখতে পারে।
এখন কোন কাহিনীটা সত্য ?
যাক। জাহাজের কীল কে গ্রিক ভাষায় করোনা (korone) বলে।
আর মুকটকে ইংরেজিতে বলে ক্রাউন ।
তো ইতিহাসবিদরা কি এই দুই কাহিনি মিশিয়ে ফেলেছিলেন ?
আজ আর বলা সম্ভব না।
কোন প্রমান নেই ।
আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি সেই জাহাজটা যখন মিসরের বন্দরে গিয়ে পৌঁছেছিল
তখন সেখানকার লোকজন কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল এমন ভাসমান একটা প্রাসাদ দেখে।

সেই আমলের টাইটানিক ছিল যেন।

Series Navigation<< খাবারে বিষআবহাওয়ার খোঁজ খবর >>

মতামত জানান