চায়ের পেয়ালা একটার গায়ে আরেকটা লেগে টুংটাং শব্দ করে। সে সাথে এসে মিশে যায় চা পানরত মানুষের গুঞ্জন। দুরে কোথাও থেকে হঠাৎ হঠাৎ  ভেসে আসে চেচামেচির শব্দ। কানে তালা লাগানো “বুম…” করে একটা মটর সাইকেল চলে যায়। কোথায় যেন সন্ধ্যায় পড়তে না বসায় মা তার বাচ্চাকে দু ঘা কিল বসিয়ে দিলেন। বাচ্চা কাঁদছে, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। মা ও চেচিয়ে চলেছে সমানতালে। সমস্ত কিছু ঘটে মাত্র কয়েক মিনিটে। সবকিছু কেমন ঘোল পাকিয়ে যায় মাথায়। শব্দগুলো একটার সাথে আরেকটা পেচিয়ে কেমন যেন খিচুড়ি বনে যায় কানে। আমি দেখি আর শুনি। আর তাই প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই এখানটাতে এসে বসি।

দেখি ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ। শুনি ভালো কথা, মন্দ কথা। আমি কোন কাতারে?


ভালো মানুষের কাতারেই হওয়ার কথা। কিছুদিন আগে যখন বাড়ি থেকে ফিরছিলাম,  বাসে ভিক্ষা করতে উঠেছিল এক ভিক্ষুক। পুরো বাসের মধ্যে কেউ তাঁকে ভিক্ষা দেয়নি। আমি দিয়েছিলাম। ভিক্ষা দিয়ে একটা ছবিও তুলেছিলাম তাঁর সাথে। সেটা আমার ফেসবুকে আপলোড করতে রাতারাতি ভাইরাল হয়েগেল সেটা। যারা যারা ছবিটা দেখেছে তাদের মধ্যেই অনেকেই হয়তো আমাকে দেখে উৎসাহী সবে এমন মহৎ কাজে। তারা ভালো কাজ করলে সে পুন্য আমিও নিশ্চয় পাবো। তাঁরউপর আবার ছবিটার কারণে আমার ফলোয়ারও বেশ বেড়েছে। এতে আমার বেশ লাভই হয়েছে বলতে গেলে। এই যেমন,  কয়েকটা অখ্যাত পত্রিকা “ আমার ওয়ালে তাদের লিংক শেয়ার দিব” এই শর্তে আমাকে নিয়ে বেশ রসিয়ে কয়েকটা খবরও প্রকাশ করে ফেলেছে। দুটো প্রকাশনীও যোগাযোগ করেছে যে আমার “স্ট্যাটাস সমগ্র” নামে একটা বই বের করার ব্যাপারে। অবশ্য ঐ এক ছবিটা বাদে আমার ওয়াল জুড়ে মৌলিক তেমন কিছু নাই। কয়েকটা ব্লগ ঘেটে ঘুটে, বিখ্যাত সব লোকের উক্তি জুড়ে দিয়ে যেসব জ্ঞানগর্ভ বক্তিতা ঝেরেছি ওগুলো ভালো পাঠকের হাতে কোনভাবে পড়লেই ধরা খেয়ে যাব। ফেসবুকে ধরা খেলে ভয় নেই, এডিট এবং ডিলিট নামের দুটো রক্ষা কবচ  আছে আমার। কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা নেই। উলটো পাব্লিকের দাবরানি খাওয়ার আশংকা আছে।
তবে ফলোয়ার বাড়াতে সবচেয়ে লাভ যেটা হয়েছে, তা হচ্ছে প্রচুর মেয়ে ভক্ত জুটেছে আমার। তাদের সাথে দেশের ভালো মন্দ নিয়ে দিন রাত চ্যাট করি। সমাজের ছেলেগুলো যে দিনরাত ফেসবুক চালাতে চালাতে নিজের জীবনটা ধ্বংস করে দিল এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করে রাত কাবার করে দেই তাদের সাথে।
শেষে “ভালো কাজে, শান্তি মেলে” গোছের একটা স্ট্যাটাস মেরে ঘুমিয়ে পড়ি।
আমি এখন বলতে গেলে ফেসবুকের ভালো লোকদের একটা আদর্শ।

বেশ খানিকখন ধরে একটা স্বল্পবসনা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে দোকানটার ঠিক বিপরীত পাশে। নজর পড়তে মনে মনে মেয়েটার নিন্দা করে নিলাম। মনে মনে গুছিয়ে নিলাম আজকে গিয়ে একটা এই নিয়ে একটা ভয়ানক স্ট্যাটাস মেরে দেব। অনেক লাইক শেয়ার পাওয়া যাবে। কে জানে ভাইরালও হয়ে যেতে পারে। লুকিয়ে মেয়েটার একটা ছবিও তুলে নিলাম। ছবি দিলে স্ট্যাটাসটা আরো পোক্ত হবে। কিছুদিন আগেই একটা ব্লগে এই ধরণের একটা ব্লগ দেখেছিলাম। সেটা থেকে মেরে দেয়া যাবে, শুধু স্থান কাল পাত্র খানিকটা বদলের দিলেই চলবে।
অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতেও বার কয়েক তাকালাম মেয়েটার দিকে। গুঞ্জন কমে এলো। ভালো কথা থেমে গেল। যারা মন্দ কথা বলছিলো তারা আরো রসিয়ে বলতে থাকলো। ভালো মানুষরা কোন কথাই বললোনা। কেবল মাঝে মাঝে চেয়ে আর চোখে দেখতে লাগলো। ঠিক আমার মতো। হয়তো তারাও একটা স্ট্যাটাস দেয়ার কথা ভাবছে। একটু পরেই মেয়েটা সেখান থেকে চলে গেলো। আমি আবার শব্দ শোনায় মনোযোগ দিলাম। চায়ের কাপের শব্দ, মানুষের শব্দ, গাড়ির শব্দ। সব আবারো কেমন যেন ঘোল পাকিয়ে গেল। সহসা মনে হলো সবমিলিয়ে যেন হাজারো মানুষের একটা সমস্বরের আর্তনাদ শুনছি। ঠিক যেন জাহান্নাম থেকে ভেসে আসছে। মনে কেমন ভয় ধরে গেলো।
আমি তো ভালো মানুষ,  তাহলে জাহান্নামের শব্দ কেন শুনতে পাচ্ছি? 

মতামত জানান