বাইরে ভীষণ তান্ডব শুরু হয়েছে বৃষ্টির- থেমে থেমে এই আসছে, আবার দৌড়ে পালাচ্ছে। যেন প্রকৃতির সাথে লুকোচুরি খেলছে আপন মনে । কেউ বলার নেই, কওয়ারও নেই। এসময় জানালার পাশটায় উদাস মনে দাঁড়িয়ে আছে প্রারম্ভিকা। তাকিয়ে আছে দূরের ঐ মাঠটায়। কিন্তু দেখতে পাচ্ছেনা কাউকেই। বিকেল বেলা- তবুও নেই কোন শোরগোলের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। সবই যেন নীরব স্তব্ধ। আকাশে একটাও পাখি উড়ছেনা আজ। যাচ্ছেনা কোন কর্ম ব্যস্ত মানুষ। ভেসে আসছেনা কুকুরে কুকুরে ঝগরা লাগার ঘেউ ঘেউ শব্দের তীব্র হুঙ্কার। বাড়ছে কেবল নিরবতা, আর ক্রমে ধেয়ে আসছে আঁধারের হাতছানি। তাই এভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর, জানালাটা বন্ধ করে নিজের বিছানায় এসে বসল ও। এরপর লাইটটা অন করে টেবিল থেকে একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করে দিল। কোন এক অখ্যাত আনাড়ি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই এটি। নাম- “আমরাও মানুষ”! প্রতিবন্ধিদের জীবনাচরণ ফুটে ওঠেছে এখানে। নবীন লেখকের লেখা হলেও বেশ ভালই বলতে হবে। তাই কখন যে নিজের অজান্তেই বইটার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, টেরই পায়নি প্রারম্ভিকা।

গল্পের কাহিনীটা এরকম। একটা দশ বারো বছরের ছেলে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধি সে। নাম শাওন। মুখ থেকে অনবরত লালা ঝরে তার। তাছাড়া গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ে যেতে ভীষণ ভাল লাগে ওর। প্রায়ই দেখা যায় তাকে বড় রাস্তায় দৌড়ুচ্ছে কোন গাড়ির পেছনে। আর মুখের লালায় ভিজে একাকার হয়ে আছে তার পরনের জামাটা। দেখে মনে হতে পারে, বাপ-মা হীন কোন অনাথ ছেলে হবে হয়তো- যদিও ওর বাবার পয়সার অভাব নেই। তবুও অবুঝ এ ছেলেটির প্রতি যেন তাদের কোন দায় নেই। তারা মেতে আছে আরেক ছেলে অয়নকে নিয়ে। যে শাওনের চেয়ে বছর খানেকের ছোট। পড়ছে একটা ভাল উচ্চবিদ্যালয়ে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তাদের বিশ্বাস, অয়ন পড়া-শোনা শেষ করে একদিন অনেক বড় হবে। তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে মানুষের সামনে। কিন্তু শাওন! ওর দ্বারা কি এসব হবে? ওতো বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি! ভাল-মন্দ বোঝারই ক্ষমতা নেই ওর! কিন্তু বাপ-মা হিসেবেতো তার প্রতিও কিছু করণীয় রয়েছে তাদের! একথাটিই অনেকক্ষণ ধরে বুঝাতে চেষ্টা করছে আবির। ভার্সিটিতে পড়ে ও। পাশাপাশি একটি সামাজিক সংস্থা পরিচালনা করে- যার মূল উদ্দেশ্য এদেশের প্রতিটি শিশুকে তার অন্যতম মৌলিক অধিকার শিক্ষা লাভের পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা। এ লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে সে। কাজেই এলাকায় তার একটি ভাল ইমেজ রয়েছে। সবাই ভাল হিসেবে জানে তাকে। তাই শাওনের ব্যাপারে আবিরের কথাগুলো শোনার পর ওর বাবা-মাও স্থীর করল, ওকে শহরের কোন প্রতিবন্ধি স্কুলে ভর্তি করে দেবে। এতে যদি ছেলেটার কিছু উন্নতি হয় তো হল, নতুবা আর কিছুই করার নেই তাদের। কপালে যা আছে তাই হবে তার!

পরদিন আবিরকে সাথে নিয়ে শাওনের বাবা ওকে ভর্তি করিয়ে দিল একটি স্কুলে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে সেখানে। তাছাড়া যারা যারা এ স্কুলে পড়ে, তাদের সবাই প্রতিবন্ধি। তাই ছেলেকে অবহেলা বা কটু চোখে দেখার মত কেউ নেই সেখানে। ভেবে মনে মনে শান্তি অনুভব করলেন বাবা। যতই হোক, নিজের ছেলেতো! সে ভাল হোক, আর প্রতিবন্ধি! কম হলেওতো মায়া লাগে! নিজের রক্ত যে! একথা অস্বীকার করার জো নেই। যাইহোক, ছেলেকে একটা অজানা অচেনা জায়গায় রেখে চলে এলেন তারা। বাড়ি এসে যেন স্বঃস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন- যাক! এতদিন পর তাহলে ছেলের একটা গতি হল। এখন আর অযথা দুঃশ্চিন্তা মাথায় আসবেনা ওকে নিয়ে। তবে এর সবই সম্ভব হয়েছে আবিরের জন্য। তাই ওকে ধন্যবাদ দিতে ভুল করলেননা তিনি। শাওনের মা ও কৃতজ্ঞতা জানালেন নিজের মত করে। সেইসাথে বললেন, “তোমার ভরসাতেই ছেলেটাকে ওখানে দিলাম বাবা! তুমি একটু খোঁজ খবর রেখো ওর! তুমিতো রোজই শহরে যাও ভার্সিটির জন্য! মাঝে মাঝে না হয় একটু খোঁজ খবর নিলে!” আবির স্বান্তনা দেয়, “আপনি কিচ্ছুটি চিন্তা করবেননা খালাম্মা! আমার উপর বিশ্বাস রাখুন, দেখবেন আপনার প্রতিবন্ধি ছেলেটি একদিন দেশের বোঝা না হয়ে কেমন মূল্যবান মানব সম্পদে পরিণত হয়!” সত্যি হয়েছিলও তাই! শাওন একদিন তার জড়তাকে পরাজিত করতে পেরেছিল। দেখিয়ে দিয়েছিল সবাইকে, “তোমরা আমাদের অবহেলা কর কেন? আমরাও মানুষ। মানছি প্রতিবন্ধি- তবে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা পেলে আমরাও অনেক কিছু করতে পারি। ঘৃণা না করে ভালবেসে দেখই না, আমরা কেমন প্রতিদান দিতে জানি!” বইটা পড়া শেষ হতেই দুচোখ বেয়ে অশ্রুর ঢল নামতে লাগল প্রারম্ভিকার। কিন্তু কোন শব্দ করতে পারলনা চিত্কার করে। আল্লাহ তাকে সেই ক্ষমতা দেননি। তাই হৃদয়ে জমে থাকা সমস্ত আবেগ যেন বিদ্রোহ করে ফুলে ফেঁপে গলা দিয়ে বের হয়ে আসতে চাইল ওর। কিন্তু তাও আসল কই? শুধু হা করে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে দেখা গেল তাকে।

বইটা অনেকবার পড়েছে সে। যখনই ইচ্ছে হয় একটানে পড়ে শেষ করে। বেশ ভাল লাগে তার বইটি । নিজেরও সাধ জাগে, শাওনের মত সেও যদি ভর্তি হতে পারত কোন প্রতিবন্ধি স্কুলে! যেখানে তাকে কেউ ঘৃণা করবেনা, বকবেনা- কেবল ভালবাসবে! কিন্তু সে জানে, এ স্বপ্ন তার সত্যি হবেনা কোনদিনও। তার বাবার যে ওতো পয়সা নেই! তাই এখন যে স্কুলে আছে, সেখানেই পড়তে হবে তাকে। অন্যের অপমান আর টিটকারি সহ্য করে যতদূর পড়া যায় পড়বে! আর যখন পারবেনা, তখন বন্দি পাখির মত হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে ঘরের ভিতরে। কি আর করবে সে, সমাজে যে সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার নেই তার! কারণ সে প্রতিবন্ধি! কিন্তু সমাজের সুস্থ মানুষগুলোকে বলতে ইচ্ছে করে খুব, “আমি কি নিজের ইচ্ছেতে প্রতিবন্ধি হয়েছি? তাহলে আমার কি দোষ? তোমরা কেন বুঝনা? আমিও যে তোমাদেরই মত সুস্থ সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই! আপন করে নিতে চাই সবাইকে! তোমরা কি পারনা আমাকে তোমাদের একজন হিসেবে মেনে নিতে? তোমাদের মেয়ে, বোন ও বন্ধু হিসেবে ভাবতে? ভালবাসতে আপন করে?” কিন্তু তার জিজ্ঞাসাগুলো জিজ্ঞাসাই থেকে যায়। কারো কাছে প্রকাশ করতে পারেনা অবলীলায়! এমন সময় মাগরিবের আযান ভেসে এল কানে। প্রারম্ভিকা বইটা রেখে ওযূ করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। তখনো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল- যা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছিল প্রকৃতিকে। কিন্তু মানব মন পূর্ণ হয়ে ছিল ময়লা স্তূপে। এখনো যে আছে , তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই!

মতামত জানান