আজ ২৭শে মার্চ। ১৯৮২ সালের এই দিনে আমরা হারিয়েছিলাম বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী ফজলুর রহমান কে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফরিদপুর উপজেলার শিবচর উপজেলার ভান্ডারিকান্দি গ্রামে হলেও জন্মগ্রহণ করেন ঢাকায় ১৯২৯ সালে। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর রহমান খান, যিনি একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন।

 

 

বিখ্যাত এই প্রকৌশলী পুরান ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যট্রিক পাশ করেন ১৯৪৪ সালে। ১৯৪৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, শিবপুর) ভর্তি হন। চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালে পঞ্চাশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ঢাকায় ফিরে এলে তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাকি পরীক্ষা সমাপ্ত করেন ৷ সেই পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তারপর তিনি ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ফজলুর রহমান খান ১৯৫২ সালে যুগপৎ সরকারী বৃত্তি ও ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন ৷ সেখানে ১৯৫৩ সালে তিনি ইলিনয় ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে কাঠামো প্রকৌশল (স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ক্ষেত্রে সনদ এবং ১৯৫৫ সালে তত্ত্বীয় ও ফলিত বলবিজ্ঞান ক্ষেত্রে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (মাস্টার অফ সায়েন্স) সনদ লাভ করেন। ওই সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমুর-এ যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়।

ফজলুর রহমান খান শিকাগোর একশ তলা উঁচু জন হ্যানকক সেন্টার এবং একশ দশ তলা উঁচু সিয়ার্স টাওয়ার(বর্তমানে উইলিস টাওয়ার)- এর নকশা তৈরি করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ডস কর্তৃক ‘কন্সট্রাকশনস ম্যান অব দি ইয়ার’ মনোনীত হওয়ার পর ১৯৭১ সালে শিকাগোর ওন্টারিও সেন্টারে একটি ফলকে তাঁর সম্বন্ধে মন্তব্য লেখা হয়- ‘ইনোভেশন ফলোজ প্রোগ্রাম’। তিনি ১৯৭২ সনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ড’-এ ম্যান অব দি ইয়ার নির্বাচিত হন। পাঁচবার (৬৫, ৬৮, ৭০, ৭১, ৭৯ সালে) স্থাপত্য শিল্পে সবচেয়ে বেশী অবদানকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত হবার গৌরব লাভ করেন তিনি। উল্লেখ্য, তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন৷ এ সময় তহবিল সংগ্রহে কাজ করেন। বাঙালিদের জন্য ‘বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি ওয়েলফেয়ার অ্যাপিল’ নামে শিকাগোভিত্তিক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমানে উইলিস টাওয়ার)

স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফজলুর রহমান খানের খন্ডিত প্রাচীর ফ্রেম পদ্ধতি (shear wall frame interaction system), ফ্রেমড্-টিউব স্ট্রাকচার (framed tube structure) এবং টিউব-ইন-টিউব স্ট্রাকচার (tube in tube structure) স্ট্রাকচারাল পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি বিধান করেন। উচ্চ ভবন নির্মাণ হয়ে ওঠে অর্থনৈতিকভাবে সহজসাধ্য। ফ্রেমড্ টিউব পদ্ধতিতে কলামগুলি বিক্ষিপ্তভাবে স্থাপিত না হয়ে বরং কাছাকাছি স্থাপিত হয় এবং স্প্যান্ড্রেল বীম প্রতি তলায় কলামগুলিকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে। এই পদ্ধতি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৬৪ সালে শিকাগোর ডিউইট চেষ্টনাট ভবনে। তেতাল্লিশ তলা উঁচু রিইনফোর্সড কংক্রিট টাওয়ারটির নকশা করেছিলেন স্কিডমুর ওইংস ও মেরিল (SOM)-এ কর্মরত ফজলুর রহমান খান ও তাঁর সহকর্মীগণ। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও দৃঢ় টিউবুলার পদ্ধতিটি (tubular form) হাই রাইজ ভবন নির্মাণে একটি স্ট্যান্ডার্ড মান হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

ফজলুর রহমান খান স্ট্র্যাকচারাল সিস্টেম (সোর্স- ইন্টারনেট)

ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এফ. আর খান প্রতিটি স্থাপত্য ক্রমের জন্য প্রযোজ্য স্ট্রাকচারাল সিস্টেম উদ্ভাবন করেন। শিকাগোর SOM-এর প্রধান স্থপতি ব্রুস জে গ্রাহামের সহযোগিতায় এফ. আর খান শিকাগোর একশ তলা জন হ্যানকক ভবনের জন্য ট্রাসড্ টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম (trussed tube structural system) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

জন হ্যানককের মডেল নিয়ে ফজলুর রহমান খান

পরে তিনি বান্ডলড্ টিউব (bundled tube) নামক আর একটি স্ট্রাকচারাল সিস্টেম প্রয়োগ করেন। এই পদ্ধতি শিকাগোর ১১০ তলা উঁচু সিয়ার্স টাওয়ারের (বর্তমানে উইলিস টাওয়ার) জন্য ছিল অত্যন্ত কার্যকর। ১৪৫৪ ফুট উঁচু ভবনটি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং অপেক্ষা উচু এবং বেশি স্থান জুড়ে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতি ইউনিটে এর খরচ হয়েছে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর চেয়ে কম। এই নতুন পদ্ধতি স্থাপত্যিক স্থান সংকুলানে অত্যন্ত কার্যকর। এখন উঁচু টাওয়ার বাক্সের আকারের মতো করে তৈরি হয় না, কেননা টিউব স্ট্রাকচারে ভবন যে কোনো আকৃতি নিতে পারে। ফজলুর রহমান খান কর্তৃক উদ্ভাবিত ফ্রেমড্ টিউব স্ট্রাকচার, ওয়াল ফ্রেম ইন্টারএ্যাকশন, ট্রাস্ড টিউব, বান্ডলড্ টিউব এবং কম্পোজিট সিস্টেম আজকের প্রচলিত স্কাইস্ক্র্যাপার্সে ব্যবহৃত হচ্ছে। সৌদি আরবের জেদ্দা বিমান বন্দরে আরবের ঐতিহ্যবাহী বেদুইনদের তাঁবু আর আধুনিক কারিগরি দক্ষতার মিশ্রণে নির্মিত হজ টার্মিনালটি (৮০,০০০ হজ যাত্রী যেখানে একত্রে একনাগাড়ে ৩৬ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে সক্ষম) ফজলুর রহমান খানের আরেক বিশাল স্থাপত্যিক কীর্তি।

ফজলুর রহমান খান ১৯৭২ সালে আরবানার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যালুমনি এওয়ার্ড, ১৯৭৩ সালে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অব সায়েন্স এবং ১৯৮০ সালে লেহাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব ইঞ্জিনিয়ারিং সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর প্রয়ানের পর ১৯৮৩ সালে আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব আর্কিটেক্টস ফজলুর রহমান খানকে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য এআইএ ইন্সটিটিউট সম্মাননা প্রদান করে।

জেদ্দার হাজী টার্মিনাল

একই বছর মুসলিম স্থাপত্যে অসাধারণ অবদানের (জেদ্দার হাজী টার্মিনাল) জন্য তাঁকে ‘আগা খান’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। ইলিনয়ের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৯৮৭ সালে ফজলুর রহমান খানকে মরণোত্তর ‘জন পারমার’ সম্মানে ভূষিত করে এবং সিয়ার্স টাওয়ারের লবিতে স্পেনীয় ভাস্কর কার্লোস ম্যারিনাস নির্মিত এফ. আর খানের ভাস্কর্য স্থাপন করে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পদকে’ ভূষিত করে এবং তাঁর স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

ফজলুর রহমান খান স্মরণে স্মারক ডাকটিকেট

 

মতামত জানান