আমরা কিভাবে এলাম, পৃথিবীর সৃষ্টি কিভাবে আর কেনই বা এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের তৈরী? এই নিয়ে বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন ধরনের ধারণা দেয়া হয়েছে। সেগুলো যদিও আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে কোনভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়। তারপরও সেসব তথ্য জানতে বেশ ভালো লাগে। আজকে আমরা খিচুড়িতে আলোচনা করব হিন্দু পুরাণে বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, শুরুতে আজকের গঙ্গা নদী ছিল স্বর্গে, ভগবান বিষ্ণুর তত্ত্বাবধানে। তারপর একদিন ভগবান বিষ্ণু গঙ্গা নদীকে  পৃথিবীতে পাঠানোর কথা চিন্তা করলেন। যথারীতি পাঠিয়েও দিলেন। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেল। প্রবল স্রোত নিয়ে যখন গঙ্গা পৃথিবীর দিকে তেড়ে আসছিল যে দেখে মনে হলো পুরো পৃথিবীই বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এইসমস্যা থেকে বাঁচাতে রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হলে ভগবান শিব। তিনি  গঙ্গাকে তাঁর চুলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করলেন এবং ধীরে ধীরে প্রবাহিত করলেন পৃথিবীর বুকে। গঙ্গার অববাহিকায় ধীরে ধীরে পৃথিবী জেগে উঠলো, জন্ম নিলো গাছ, বিভিন্ন প্রানী – জীবজন্তু এবং মানুষ।
এই হলো হিন্দু পুরাণে বর্ণিত অনেকগুলো সৃষ্টি তত্ত্বের মধ্যে একটি।  অন্য আরেক জায়গায় সৃষ্টির কথা বলে হয়েছে আরেকভাবে।

 

সেখানে বলা হয়েছে, শুরুতে আমাদের এই মহাবিশ্ব ছিল একটা  গভীর সমুদ্র। সেই সমুদ্রের তলদেশে ছিল  “অনন্ত শীষ” নামে একটা বিশালাকার সাপ। এই সাপের কুন্ডলিতে ঘুমিয়ে ছিলেন ভগবান বিষ্ণু। ঘুমন্ত দেবতা বিষ্ণুর নাভী থেকে তৈরি পদ্মফুলের মধ্যে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসেছিলেন চার মাথাওয়ালা দেবতা ব্রহ্মা। শুরুতে ব্রহ্মা নিজেও জানতেন না তিনি কে, আর তাঁর কাজ কি? ভগবান বিষ্ণু তাঁকে তাঁর আত্মপরিচয়  দেন এবং জানান যে তাঁর কাজ হচ্ছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করা। এরপর ব্রহ্মা বহুদিন ধ্যনমগ্ন হয়ে থাকার পর একদিন তিনি সমুদ্রের তলদেশ একটা অদ্ভুত “ওঁ” ধ্বনি শুনতে পান। এরপর ব্রহ্মা যে পদ্মটিতে বসেছিলেন সেটিকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেন। প্রথম অংশ থেকে তিনি তৈরি করেন, স্বর্গ। দ্বিতীয় অংশ থেকে তৈরি করেন, আকাশ এবং শেষ অংশ থেকে তৈরি করেন পৃথিবী এবং পৃথিবীকে তিনি পরিপূর্ণ করেন গাছ পালা, পাখ পাখালি ও বিভিন্ন ধরনের জীব জন্তু দিয়ে। পৃথিবীকে তিনি ধীরে ধীরে আরো বেশি জনবহুল করে তোলার পরিকল্পনা করলেন, এইজন্য তিনি প্রাণীকে দিলেন প্রজনন ক্ষমতা। প্রত্যেকটি প্রাণীকে তিনি নারী-পুরুষের বিভক্ত করে দেন। যাতে একজন নারী এবং একজন পুরুষ মিলে প্রজনন ঘটাতে পারে এবং ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে পৃথিবীকে।

 

ভগবান বিষ্ণু

 

হিন্দু পুরাণের সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে আরেকটা কাহিনীও বেশ প্রচলিত। সেটি হচ্ছে, শুরুতে এই মহাবিশ্বে ছিল অনন্ত জলরাশিতে পরিপূর্ণ সাগর। সেই গভীর সাগরে কোন আলো ছিলনা, কেবল অন্ধকার আর অন্ধকারে ছেয়ে ছিল চারিদিক। এই অন্ধকার সমুদ্রের মধ্যেই একসময় উৎপন্ন হলো একটি সোনার ডিম সদৃশ্য বস্তুর। সোনার ডিমটি সেই অন্ধকার সমুদ্রে দিয়ে প্রায় নয় মাস ভেসে চললো। নয়মাস পরিভ্রমনের পর এক সময় সেই ডিম সদৃশ্য ফেটে ফেলে তাঁর থেকে বেরিয়ে আসেন প্রজাপতি। প্রজাপতিকে ঠিক দেবতাও বলা যায়না আবার দেবীও বলা যায়না। কারণ তিনি ছিলেন নারী এবং পুরুষের সব ভালো গুনগুলোর সমহারে তৈরি।

 

প্রজাপতি সেই সোনালী ডিমের খোসার মধ্যে কোন প্রকারের কথা বলা বা নাড়াচাড়া করা ছাড়াই প্রায় একবছর কাটিয়ে দিলেন ভাসতে ভাসতে। একবছর পর প্রথম তিনি মৌনতা ছেড়ে বের হোন। তিনি যে প্রথম শব্দটি বলেন, সেটি থেকে তৈরি হয় পৃথিবী, তিনি যে দ্বিতীয় শব্দটি বলেন সেটি থেকে তৈরি হয় আকাশ যেটিকে তিনি আবার কয়েকটি ঋতুতে বিভক্ত করেন। যেহেতু এই গভীর মহাশূন্যতায় প্রজাপতি ছিলেন একা তাই একসময় তিনি খুব একাকীত্ব বোধ করতে শুরু করেন। এই সমস্যার সমাধান করতে তিনি নিজেকে দুটি সত্ত্বা- নারী এবং পুরুষে বিভক্ত করেন এবং উভয়ে  মিলে তৈরি করেন প্রথম দেবতা, সকল বস্তু এবং মানব জাতিকে। এরপর তিনি সময় তৈরি করেন। প্রথম জন্ম নেয়া দেবতার নাম ছিল অগ্নি, যাকে বলা হয় আগুনের দেবতা। অগ্নি দেবতার জন্মের পরপরই মহাবিশ্ব প্রথম আলোর দেখা পায়। এই সময় প্রজাপতি এক দিন কে দুটি অংশ অর্থাৎ দিবা এবং রাত্রিতে বিভক্ত করে দেন।
এরপর ধীরে ধীরে অন্য দেবতা এবং দেবতাদ্রোহী অশুরগণের জন্ম হতে থাকে। প্রজাপতি ভালো এবং মন্দের পার্থক্য তৈরি করেন। ভালো দেবতাকে তিনি ভালো স্থান দেন আর মন্দ অশোরদেরকে তিনি পৃথিবীর গভীরে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু এক সময়ে প্রজাপতি তাঁর নিজের মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। যে কীনা হরীণীর বেশে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। প্রজাপতি হরিণের বেশে পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং তাঁর মেয়েকে তারা করে বসেন। হরীণী নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড়াতে শুরু করে, কিন্তু মহা শক্তিধর প্রজাপতির কাছে কোন ভাবেই পেরে উঠতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সমর্পণ করে।
এদিকে প্রজাপতির এই ভয়াবহ অপরাধ ক্রোদ্ধ করে তুলে অন্য দেবতাদের। তারা সবাই মিলে প্রজাপতিকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এই জন্য সৃষ্টি করা এক ভয়ানক দানব, যার নাম দেয়া হয় “রুদ্র”।

দানব রুদ্র প্রজাপতির সন্ধানে পুরো পৃথিবী চষে বেড়াতে শুরু করে, একসময় খোঁজে পান হরিনরুপী প্রজাপতিকে। সাথে সাথেই ক্ষিপ্র গতিতে তীর ছুড়ে মারেন প্রজাপতির দিকে, তীরের ক্ষ্রিপ্তটা এতটাই বেশি ছিলযে তা শুধু প্রজাপতিকে ভেদ করে তা নয়  তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে অন্ধকার আকাশের সাথে মিশিয়ে দেয় একেবারে। 
হিন্দু পুরাণ অনুসারে এই কারণে আজও  রাত হলে আকাশে তারার মধ্যে প্রজাপতির হরিণের মতো মাথার দেখা পাওয়া যায়।

মতামত জানান