১৯৫৪ সালের ৭ই এপ্রিল মানে আজকের দিনে চীনের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের হং কং-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন চ্যান  কং-স্যাং। এই নামের মানে হলো- হংকং-এ জন্ম। জ্যাকি চ্যানের যখন জন্ম হয় তখন তার বাবার আর্থিক অবস্থা  তিনি এতোই খারাপ ছিলো যে, তিনি চ্যানকে বিক্রি করে হসপিটালের টাকা পেইড করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চ্যানের বাবার বন্ধুর বাঁধার মুখোমুখি হয়ে তিনি সেটা আর করেননি।

ছোটবেলা থেকেই জ্যাকির বাবা প্রতিদিন ভোরে তাকে কুং-ফু শেখানোর জন্য নিয়ে যেতেন। তার বাবার বিশ্বাস ছিলো, কুং-ফু জ্যাকির চরিত্র গঠন থেকে শুরু করে ধৈর্য ধারণ ও শক্তি সামর্থ্যকে বাড়িয়ে তুলবে, আর সে হবে অনেক বেশি সাহসী।

মাত্র ৭ বছর বয়সে জ্যাকি চায়না ড্রামা একাডেমীতে অভিনয় করার সুযোগ পান। তারপর সেখানেই কাটে তার জীবনের পরবর্তী ১০ টি বছর। এই একাডেমীর উদ্দেশ্য ছিলো অপেরার জন্য প্রস্তুত করা। ছাত্ররা কোনো নির্দেশনা অমান্য করলে বা কোন ভুল করলে স্কুলে বেদম প্রহার করা হতো তাদের। দেখা যেতো, বছরের পর বছর বাবা মাকে একটি পলকের জন্যও দেখার সুযোগ ছিলো না তখন, বা দেখা হলেও তা হতো খুব অল্প সময়ের জন্য। এই একাডেমীতে পড়ার সময় ৮ বছর বয়সে প্রথম সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পান তিনি। ১৭ বছর বয়সে তিনি চায়না ড্রামা একাডেমী থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। কিন্তু সমস্যা হলো, যেই অপেরার জন্য এতোবছর স্কুলে সাধনা করেছিলেন, ততদিনে চাইনিজ অপেরা আর আগের মতো জনপ্রিয়তায় নেই। তাই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর জ্যাকি ও তার সহপাঠী বন্ধুরা অপেরায় না গিয়ে অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের জন্য অন্য কোন কাজ জোগাড় করাটা ছিলো বিরাট চ্যালেঞ্জিং কাজ কারণ, তাদের স্কুলে কখনো সিলেবাসের বাইরে কিছুই শেখানো হয়নি। উপার্জনের জন্য তখন একটা মাত্র পথ সামনে খোলা ছিলো আর সেটা হলো, স্ট্যান্ট পারফর্ম অথবা এমন কোন কাজ করা যার জন্য কোন দক্ষতার প্রয়োজন হয় না । পরবর্তী কয়েকবছর ধরে জ্যাকি স্ট্যান্টম্যান হিসেবে কাজ করেন।

হংকং চলচ্চিত্র শিল্পের দুরবস্থা তৈরি হলে বাবা মায়ের চাপের মুখে পড়ে তাকে অস্ট্রেলিয়া চলে যেতে হয়। সেখানে যেয়ে তিনি কন্সট্রাকশনের কাজে যুক্ত হন আর সেখানেই তাঁর নতুন নাম হয় ‘জ্যাকি’। তাঁর স্ট্যান্ট চোখে পড়ে উইলি চ্যান নামক এক ভদ্রলোকের। উইলি চ্যান হংকং-এর সিনেমায় কাজ করতেন। জ্যাকির স্ট্যান্ট দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি জ্যাকিকে পুনরায় হংকং যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং জ্যাকিও সেই প্রস্তাব লুফে নেয়।     

১৯৭৬ সাল! যখন জ্যাকি চ্যানের বয়স ২১ বছর তখন তাঁর প্রথম ছবি মুক্তি পায়। কিন্তু জ্যাকির এই সিনেমাটি খুব একটা সফলতার মুখ দেখতে পায় না। এর কারণ ছিলো, সিনেমায় জ্যাকি চ্যানের প্রতিভা ঠিকমতো উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন এর পরিচালক। ১৯৭৮ সালে ‘স্ন্যাক ইন দ্য ঈগলস স্যাডো’ সিনেমায় প্রথম মূল চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যাকি চ্যান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। একে একে অভিনয় করেছেন-’রাস আওয়ার’, ‘হু অ্যাম আই’, ‘দ্য মিথ’, ‘দ্য ফরেনার’ এর মতো বিখ্যাত সিনেমায়।   এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় দুইশ’র বেশি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন। তিনি মার্শাল আর্টের মধ্যে হাস্যরসাত্মক কৌতুক নিয়ে এসে নতুন এক ধারা প্রবর্তিত করে চমকে দেন সবাইকে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি শারীরিক কসরতপূর্ণ মারামারির দৃশ্য, হাস্যরসাত্মক ভঙ্গি ও আবির্ভাব, অপ্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহার ও স্ট্যান্ট দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত হয়েছেন।

 

অভিনয় জীবনের প্রথম থেকেই নিজস্ব অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন জ্যাকি চ্যান। তাঁর অভিনেতা পরিচয় তাঁকে হংকং ‘অ্যাভিনিউ অফ স্টার’ ও হলিউড ‘ওয়াক অফ ফেম’- এ স্থান করে দিয়েছে। জিতেছেন অস্কার। চলচ্চিত্র ভূবনে অসাধারণ কৃতিত্বের স্মারক হিসেবে অস্কার অ্যাকাডেমির অষ্টম গভর্নরস অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননার পেয়েছেন তিনি। 

 

 

জ্যাকি চ্যান সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ

  • অভিনয় জীবনের ৫৬ বছর শেষে ২০০ সিনেমায় অভিনয় করার পর জ্যাকি চ্যান অস্কার পেয়েছিলেন।
  • মালয়েশিয়া সরকার তাঁর অভিনয় এবং বিশ্বপরিচিতির জন্য তাঁকে `দাতুক` উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
  • জ্যাকি চ্যান একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গায়ক। তিনি এখন পর্যন্ত ৫ টি ভাষায় ২০ টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন।
  • ব্রুস লি’র একটি সিনেমায় স্ট্যান্টম্যান হিসেবে সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন তিনি।
  • ‘ড্রাগন লর্ড’ সিনেমার একটি দৃশ্যে তিনি মোট ২৯০০টেক নিয়েছিনেন।
  • জ্যাকি চ্যান বিভিন্ন মহিলার সাথে সম্পর্ক করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি জোয়ান লিনকে বিয়ে করেন। জোয়ান লিন হংকংয়ের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী ছিলেন। বিয়ের পর তিনি অভিনয় থেকে অবসর নেন। তিনি এখন সফল ঘরণী। যাই হোক, জ্যাকি চ্যান যে মহিলাকে বেশি ভালোবাসতেন তিনি হলেন তেরেসা টেং যিনি চীনে সুপরিচিত গায়িকা ছিলেন। তিনি সে তথ্য তাঁর আত্মজীবনীমূলক বইতে উল্লেখ করেছেন।
  • তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘নেভার গ্রো আপ’-এ তিনি উল্লেখ করেছিলেন- চলচ্চিত্র জগতে পা রাখার পর যৌনকর্মীদের কাছেও গিয়েছিলেন তিনি।
  • তাঁর অভিনিত অনেক চরচ্চিত্রের থিম সঙ্গীতেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন।
  • পরিচালক হিসেবে জ্যাকি চ্যানের ডেবু হয় ১৯৭৯ সালে ‘দ্য ফেয়ারলেস হায়েনা’ মুভি দিয়ে।

মতামত জানান