ধারাবাহিক রুপকথার গল্প - 3 পর্ব (7)

এক ছিল রাজা, তার ছিল বেজায় জামা-কাপড়ের শখ। কোনো রাজার শখ থাকে হাতি-ঘোড়া, সৈন্য-সামস্ত নিয়ে যুদ্ধ খেলা; কোনো রাজার শখ থাকে সোনা-বসানো খাটে শুয়ে গুণীদের গান শোনা-_কিন্তু এই যে আমাদের রাজা, তার শখ ছিল সাজ-গোজের, ছবির মতো সাজতে পারলেই তিনি খুশি। অত যে তার এশ্বর্য, তা খরচ হত কেবল জামা-কাপড় কিনে। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় পোশাক চাই তার, সেজে গুজে, গাড়ি চড়ে একবার ঘুরে আসতে পারলে আর-কিছুই তিনি চাইতেন না। লোকে যেমন বলে, “রাজা বসেছেন তার সভায়, তার সম্বন্ধে সবাই বলত, “রাজা আছেন তার সাজ-ঘরে।’
মস্ত শহরে তিনি থাকেন, দিন-রাত সেখানে ফুর্তি আর তামাশা। রোজ লোক আসে দেশ-বিদেশ থেকে। একদিন এল দুজন জোচ্চোর; এসেও বলে বেড়াল তারা তাতি, এমন মিহি সুতোর কাপড় তারা বুনতে পারে যা কেউ ভাবতেও পারে না। আশ্চর্য তার রং, আশ্চর্য বুনোন। আর সবচেয়ে আশ্চর্য একটা গুণ সে-কাপড়ের-_যদি কেউ হয় নিরেট বোকা, কি তার কাজের অযোগ্য, তাহলে তো সে চোখেই দেখতে পাবে না!
“চমৎকার, চমৎকার!” রাজা মনে-মনে ভাবলেন। “ও-কাপড় যদি আমি পরি, তাহলে বুঝতে পারব আমার রাজত্বে কে-কে আছে অযোগ্য, আর কোনগুলো নিরেট বোকা। কী মজাই হবে তখন ! এই কাপড়ই আমার চাই-_এক মুহূর্ত দেরি না হয়।”
এই ভেবে তিনি জোচ্চোরদের অনেকগুলো টাকা আগাম দিয়ে দিলেন_ এক্ষুনি কাজ আরম্ত হোক। তারা খাটাল মস্ত দুটো তাত, আর এমন ভাব দেখাল যেন সারাদিন সেখানে কাজ করছে। আসলে কিন্তু তাদের তাতে মোটেই সুতোর বালাই নেই। তারা চেয়ে নিলে সাত কাহন সোনা আর সাত বস্তা সবচেয়ে দামি রেশম__নিয়ে সেগুলো আত্মসাৎ করলে। তারপর শূন্য তাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করবার ভান করতে লাগল। রাজা ভাবলেন, ‘দেখে আসি ওদের কাজ কতদূর এগোল। কিন্তু যেই তার মনে পড়ল অযোগ্যরা সে-কাপড় চোখে দেখতে পাবে না, কেমন একটু অস্বস্তি লাগল তার। নিজের সম্বন্ধে তার ভয় আছে এ-কথা অবিশ্যি তার মনে হল না। তবু, আর-কেউ আগে গিয়ে একবার দেখে আসুক_না ব্যাপারখানা কী। রাজ্যের সবাই সে কাপড়ের আশ্চর্য গুণের কথা জেনে গেছে; সবাই ভাবছে–এবার দেখা যাবে লোক কী ভীষণ বোকা। রাজা ভাবলেন, “আমার বুড়ো মন্ত্রীকেই আগে পাঠাব । তিনি তো খুব বুদ্ধিমান শুনি, আর তার কাজ তার চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। তিনিই ঠিক বুঝবেন, কাপড়টা কেমন হচ্ছে? ০ ঠোকাঠুঁকি করছে। “কী কাণ্ড ” বুড়ো মন্ত্রী নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বড়ো করে তাকালেন, \”আমি তো৷ কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে !” কিন্তু মুখে তিনি সে-কথা প্রকাশ করলেন না। দুই জোচ্চোর সবিনয়ে তাকে কাছে আসতে বলল। “দেখুন, রং গুলো কি ভালো নয়? রাজপুত বুড়ো মন্ত্রীর চোখ কেবলি বড়ো হতে লাগল। কিন্তু কিছুই তিনি দেখতে পেলেন না, কেননা দেখবার কিছুই ছিল না তো ওখানে। “রামচন্দ্র! সত্যি কি আমি এতই বোকা? আমি তো কখনো তা ভাবিনি, লোকেও তা মনে করে না! কী উপায় হবে, লোকে জানলে ! আমি মন্ত্রী হবার অযোগ্য? তাই তো, তাই তো !” এই ভেবে বুড়ো মন্ত্রী তার চশমার ফাক দিয়ে মিটমিট করে তাকিয়ে.বললেন, “তোমাদের কাজ খুব ভালো হয়েছে, আমি মহারাজকে এ_কথাই বলব যে আমি দেখে খুব খুশি হয়েছি। চমতকার রং আর কী অদ্ভুত কারুকার্য! “বেশ কথা, সে তো বেশ কথা,’ জোচ্চোরেরা বলল। তারপর তারা গম্তীরমুখে রং গুলোর নাম বলল, বিচিত্র নক্শাটা বুঝিয়ে দিলে ভালো করে। মন্ত্রী মন দিয়ে সব শুনলেন, তারপর রাজার কাছে গিয়ে সেই কথাগুলোই আউড়ে গেলেন। এদিকে জোচ্চোরেরা আরো টাকা নিল, নিল আরো সোনা, আরো রেশম। বূলল কাপড় বুনতে ও-সব লাগবে। সব তারা থলিতে ভরে রাখলে, এতটুকু সৃতোও তাতে উঠল না। কিন্ত সেই তাতের সামনে বসে তারা একটানা কাজ করে যেতে লাগল। কয়েকদিন পর রাজা তার একজন খুব বিচক্ষণ পারিষদকে কাপড় দেখতে পাঠালেন। মন্ত্রী যা দেখেছিলেন, ইনিও তা-ই দেখলেন। তাকাতে-তাকাতে তার চোখ ব্যথা হয়ে গেল যেহেতু খালি ভাত ছাড়া আর কিছু নেই, খালি তাত ছাড়া আর কিছু তিনি দেখতে পেলেন না। “সুন্দর হচ্ছে না জিনিসটা? কী বলেন?” বলে জোচ্চোরেরা নানাদিক থেকে কাল্পনিক কাপড়টা দেখাল, কাল্পনিক নকশাগুলোর ছ্থাদ বুঝিয়ে দিলে ভালো করে পারিষদ ভাবলেন, “আমি তো বোকা নই ! তবে কি রাজপারিষদ হবার অযোগ্য? কিন্তু একথা তো কেউ কখনো বলেনি। যাই হোক, এদের টের পেতে দিলে চলবে না। এই ভেবে তিনি সেই অদৃশ্য বস্ত্রের খুব প্রশংসা করলেন, ‘সুন্দর রং, সুন্দর নক্শা ! তারপর রাজার কাছে গিয়ে বললেন, মহারাজ, যা কাপড় হচ্ছে আপনার, এমনটি আর কখনো কেউ দেখেনি।’ এতদিন শহরের লোকের মুখে আর কোনো কথা নেই। না জানি কী আশ্চর্য কাপড় বোনা হচ্ছে রাজার জন্যে এমন আর কি কেউ কোনোদিন দেখেছে? রাজার খেয়াল হল নিজে গিয়ে একবার ব্যাপারটা দেখে আসবেন। সারা পড়ে গেল শহরে। সঙ্গে গেল তার একদল বাছাই-করা লোক-__তার মধ্যে আছেন সেই বুড়ো মন্ত্রী, আছেন সেই বিচক্ষণ পারিষদ। পুরোদমে জোচ্চোররা তখন বুনছে, প্রাণপণে বুনছে__তার না আছে টানা, না আছে পোড়েন।
“কী, সুন্দর! না?” বুড়ো মন্ত্রীমশাই আর সেই বিচক্ষণ পারিষদ প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন। “মহারাজ, নক্শাটা একবার দেখুন! আর রঙেরই-বা কী বাহার!” উৎসাহের ঝৌকে খালি তাতটা বার-বার তারা আঙুল দিয়ে দেখাতে লাগলেন-_কেননা তারা তো জানেন অন্য সবাই দেখতে পাচ্ছে চমৎকার !
রাজা মনে মনে চমকে উঠলেন। “কী সর্বনাশ ! আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে ! কী সর্বনাশ ! বোকা নাকি আমি? না কি রাজা হবার অযোগ্য ? এর চেয়ে সর্বনাশ আর কী হতে পারে আমার।’ তারপর সবাইকে শুনিয়ে ভারিক্কি চালে বললেন, “খুবই সুন্দর হয়েছে। আমরা সানন্দে এর প্রশংসা করছি।” মৃদুভাবে মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে তিনি শূন্য তাতের দিকে তাকালেন__হায়রে। এ-কথা বলবার তার উপায় নেই যে কিছুই তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। সঙ্গে দলবল যারা ছিল তারা চোখ বড়ো করে বার বার তাকাল, কিন্তু অন্যদের চাইতে বেশি দেখতে পেল না তারা। তবু সমস্বরে তারা রাজার কথারই প্রতিধ্বনি করে উঠল, “খুব সুন্দর তো 1” ‘কী সুন্দর”! ‘কী আশ্চর্য ! “কী চমৎকার ! এসব ছাড়া কারো মুখে অন্য কথা নেই। চারদিকে ফুর্তির বান ডাকল যেন; সবাই বলল, “সামনের মাসে রাজপ্রাসাদ থেকে যে-মস্ত মিছিল বেরোবে তাতে মহারাজ এই পোশাকটিই যেন পড়েন।’ রাজা খুশি হয়ে জোচ্চোরদের উপাধি দিলেন, “তস্তবায় চন্কলা ”
কাল মিছিল বেরোবে। সন্ধে থেকে সারারাত যোলোটা মোমবাতি জ্বালিয়ে জোচ্চোররা খেটেছে। শহরের লোক দেখছে আর বলাবলি করছে, “সাবাশ বটে ! কাল ভোরের আগে পোশাক একেবারে তৈরি করে দেয়া তো চাই।’ জোচ্চোররা এমন ভান করলে যেন তাত ছুঁচ দিয়ে তারা সেলাই করল; তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, “পোশাক তৈরি।
রাজা স্বয়ং এলেন তার জমকালো ঘোড়সওয়ারের দল নিয়ে। জোচ্চোররা কুর্নিশ করে দাড়াল, তারপর এমনভাবে হাত তুলল যেন কিছু ধরে আছে “এই তো ইজের; আর এইটি কৃর্তা, এই চাপকান’, এমনি তারা বলতে লাগল। “মাকড়সার জালের মতো হান্কা, পরলে মনে হবে না কিছু পরেছেন। কিন্তু সে-ই তো এ-কাপড়ের কেরামতি ।
“ঠিক কথা” বলল ঘোড়সওয়ারের দল। কিন্তু তারা কিছুই অবিশ্যি দেখতে পেল না, যেহেতু দেখবার কিছু তো ছিলই না।
জোচ্চোররা তখন বলল, মহারাজা, যদি দয়া করে বশ্ত্রত্যাগ করেন, বড়ো আয়নার সামনে নতুন পোশাকটা পরিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি।
মহারাজ তো বন্ত্র ত্যাগ করলেন, আর তারা এক-এক করে নতুন পোশাকের বিভিন্ন দেখলেন।
বাঃ ! কী চমতকার দেখাচ্ছে! জোচ্চোররা একসঙ্গে বলে উঠল, কী চমৎকার মানিয়েছে ! মানিয়েছে! নকশার কী কারুকার্য, রঙের কী বাহার ! পোশাক হয়েছে বটে একখানা 1”
মিছিলের মালেক এসে বললেন, “মহারাজ, ছত্রধারীরা বাইরে অপেক্ষা করছে, মিছিল এখনই বেরোবে?

“আমি তো প্রস্তৃত। দ্যাখো তো আমাকে ঠিক মানিয়েছে কিনা?
বলে রাজা আবার আয়নার দিকে তাকালেন, তার নতুন পোশাক বিশদভাবে অনেকক্ষণ ধরে দেখছেন এমন ভাব করলেন।
বান্দারা নিচু হয়ে মেঝেতে হাত রাখল, তারপর হাত মুঠো করে উঠে দাড়াল, যেন রাজার উডভুনির লুটিয়ে-পড়া আচল ধরে রয়েছে। পাছে কেউ লক্ষ করে ফ্যালে যে তারা কিছুই দেখছে না এই ভয়ে তারা অস্থির। মণি-মুক্তোর ঝালর-বসানো রাজছত্র। রাস্তার দুদিকে যত লোক ভিড় করে দাড়িয়েছিলো সবাই বলাবলি করলে, “তুলনা হয় না রাজার এই নতুন পোশাকের ! কেমন মানিয়েছে একবার দ্যাখো ! উদ্ভুনির আচলখানাই-বা কী! একথা কেউ জানতে দিতে চায় না যে সে নিজে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, কেননা তাহলেই প্রমাণ হবে যে হয় সে নিরেট বোকা, নয়-তো তার কাজের অযোগ্য সে। এত বাহবা রাজার কোনো পোশাকই কখনো পায়নি।
শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটি ছেলে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “ওমা ! রাজা দেখছি কিছুই পরেন নি। রাজা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘শোনো একবার বোকা ছেলেটার কথা।
কিন্তু কথাটা কানাঘুষোয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আন্তে-আসন্তে সবাই বলতে আরম্ত করল, “আমাদের রাজা দেখি কিছুই পরেননি।”
ক্রমে কথাটা রাজার কানে কেমন ঠেকল। তার মনে লাগল কথাটা, কেননা তার যেন মনে হল যে কথাটা ঠিক। কিন্তু মনে মনে তিনি ভাবলেন, “মিছিল করে বেরিয়েছি যখন, যেতেই হবে মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে।’ আর বান্দারা আরো বেশি শক্ত করে মুঠি চেপে ধরল; আচলই নেই, অথচ আচল ধরে ধরে নিয়ে চলল তারা।

 

Series Navigation<< কুচ্ছিৎ প্যাঁকারুনববর্ষে মৃত কিশোরী >>

মতামত জানান