আমি যে শহরটাতে ছোট বেলায় থাকতাম সেটা ছিল ভারি নিঝুম এক শহর। তত বেশি দালানবাড়ি ছিল না।

বেশ ফাঁকাফাঁকা। অনেক বেশি ঝোপঝাড় আর গাছপালা ভর্তি। আকন্দ, বনজুঁই, বনতেজপাতা, আসাম লতা, দল কলস আর শেয়ালকাঁটার ঝোপে গিজগিজ করত চারিদিক। একটা আতা আছে। অসময়েও আতা ধরত। ঠিক বুড়ো মানুষের তোবড়ানো চেহারার মত।

আর ছিল দীঘল ঘাসে ভর্তি বিশাল এক মাঠ।

তারপর ও শহরটা আমার পছন্দ হত না। কারন এখানে আপেল গাছ নেই। আর শীতকালে বরফ পরে না।

তবে আমার শহরে একটা নদী ছিল। বেশ দুরে। রাতের বেলা বিদঘুঁটে ভৌ ও ও ও করে শব্দ হত। মা বলত ওটা ইসটিমারের শব্দ। আর প্রতেক ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঠং ঠং করে ও কিসের যেন শব্দ হত। ওটা নাকি গির্জার ঘণ্টার শব্দ। এত রাতে কে জেগে ঘণ্টা বাজায় কে বলবে!

তবে গির্জা দেখেছি। একটা বাঁটুল ধরনের দালান। ছাদে একটা ক্রুস আছে। ভেতরে অনেক মোমবাতি জ্বলে। একটা বুড়োমত লোক মোটা একটা বই পরে আর কাঁদে। সারাক্ষণ ক্ষমা চায় সে বিধাতার কাছে।

গির্জার পেছনে সাদা কবর আর সবুজ ঘাসের দঙ্গল।

কেমন গা ছমছম করে।

যেহেতু আমার শহরে শীতের সময় বরফ পরত না আর আপেল গাছ ছিল না তাই মনটা খারাপ থাকত। আরও একটা জিনিস ছিল না-সমুদ্র। কি বিচ্ছিরি ব্যাপার।

সমুদ্র নেই মানে জাহাজ নেই। আর জাহাজ নেই মানে নাবিক নেই। নাবিক নেই মানে সরাইখানা নেই। আর যেহেতু সমুদ্র নেই কাজেই তিমি মাছ ও নেই।

অথচ আমি যে ভেবে রেখেছি বড় হয়ে আমি তিমি শিকারী হব!

তিমি শিকারী হবার আইডিয়া বই থেকে পেয়েছি। আমাদের বাড়িতে সবুজ মোটা টিনের একটা তোরঙ্গ আছে।

ওটার ভেতরে উলের জামা কাপড় রাখি আমরা। সাদা সুন্দর ঘ্রানওয়ালা ন্যাপথালিন দেয়া থাকে।

শীত এলে মা বের করে দেয়। তখন গায়ে উলের জামা পরলে উম লাগে।

তো সেই তোরঙ্গের ভেতরে দারুন কিছু বই আছে। রাশিয়ান লেখকদের লেখা। রাশিয়ান লেখকদের নাম গুলো কেমন যেন- ধস্তাধস্তি, কুস্তাকুস্তি। বা আনাতল নিখলাই পাউরুটিভস্কি। বা মিলনজান্দার রাস্কিন।

আজব ধরনের নাম। তবে বই গুলোর নাম সুন্দর। যেমন ধরো, বাহাদুর পিঁপড়ে।

ধলা কুকুর কালো কান। চুক আর গেগ। গমের শীষ। সারকাসের হাতী। সাগর পারের রূপকথা।

হেনতেন আরও অনেক বই।

একটা বই ইয়া মোটা । ওটাই তিমি শিকারীদের নিয়ে। আহা কি একটা বই! পাতায় পাতায় কত সুন্দর সুন্দর ছবি। মনটা উদাস হয়ে যায় যে।

রঙ চঙ্গা ছবিগুলো দেখলে মন ভড়ে যেত। একেবারে জ্যান্ত। তুষার দেশের ছবি। যেখানে বরফ পরে। বরফের রঙ আমার বন্ধু পটলের দাদুর দাড়ির মত সাদা ধপধপে । আলস্কার ছবি আছে। বরফে মোড়া গ্রিনল্যান্ডের ছবি।

পালতোলা জাহাজে করে তিমি শিকারীরা যায়। হাঁটু পযন্ত লম্বা জ্যাকেট পরে। মাথায় ফারের টুপি। হারপুন ছুড়ে তিমি শিকার করে। তিমি মাছের চর্বি দিয়ে হলুদ রঙের মোমবাতি বানায়।

রাতের বেলা কাঠের লম্বা টেবিলে বসে খাবার খায়। তিমি মাছের ঝলসানো বড় বড় টুকরো। সাথে অনেক হলুদ লেবু। কড মাছের কমলা রঙ্গের ডিম। হাঙ্গরের পাথনার সূপ। স্যামন মাছ ভাঁজা ।সাথে সবুজ আর কালো জলপাইয়ের সালাদ। খয়েরি রঙ্গের বেকন ভাঁজা। বাদামী রঙ্গের পাউরুটি আর চিনেমাটির তশতরী ভর্তি মাখন তো আছেই। সাথে গ্লাস ভর্তি নীল রঙ্গের মদ।

তিমি মাছ শিকার করার মৌসুমটাতে ওরা জাহাজে করে চষে বেড়াত ঠাণ্ডা নীল সমুদ্রে। মাঝে মাঝে সমুদ্রে বড় বড় ঝড় উঠত। তখন নাকি এক একটা ঢেউ উঠত সাত আট তলা দালানের সমান। আর বাতাস হতো খোলা তলোয়ারের মত ধারাল।

বাতাসে আবার লবনের কুঁচি উড়ে যেত। দারুন ব্যাপার না?

তিমি শিকারীরা তখন খোলা ডেকে আসত না। ওরা কেবিনে কম্বল মুড়ি দিয়ে আড্ডা দিত। তাস খেলত।

গুড়ের রঙের বোতল দিয়ে ভর্তি থাকত সেলার রুম। ওগুলো রামের বোতল। রাম খেতে নিশ্চয় ভাল। কারন নাবিকেরা প্রায়ই রাম গিলে ঝগড়া করত।

বেকন ভাঁজা খায়। কিন্তু বেকন কি তাই বা কে বলবে আমাকে?

বন্ধু পটলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছে ওটা ছাপার ভুল। বেকন ভাঁজা না, বেগুন ভাঁজা হবে।

পটলের কথা ফেলি কি করে? ও অনেক কিছু জানে।

তিমি শিকারের মৌসুম শেষ হলে শিকারীরা বন্দরে ফিরে আসত।

কাঠের গোল পিপে ভর্তি থাকত তিমি মাছের সাদা চর্বি। আর সেলার রুম ভর্তি থাকত লবনে মাখান বড় বড় মাছের টুকরো।

বন্দরে জাহাজ ফিরে এলেই বিরাট হাঁক ডাক শুরু হত বন্দর জুড়ে।

নাবিক, খালাসি জাহাজের ক্যাপ্টেন সবাই ব্যাস্ত হয়ে পরত। তাগড়া জোয়ান লোক গুলো কাঠের বাক্স ভর্তি মাছের ফালিগুলো নামাত। উপরে দেয়া থাকত হীরের মত বরফের টুকরো।

আর সেই বাক্স ভর্তি নোনা মাছ আর পিপে ভর্তি তিমি মাছের তেল চলে যেত বহু দূর দূর দেশে।

মৌসুম শেষ হয়ে গেলে তিমি শিকারীরা বন্দরে আড্ডা দিত আর তাস খেলত। তিমি শিকারীদের তোয়াজ ছিল আলাদা। হেঁটে গেলে সবাই ফিরে তাকাত। তিমি শিকারী- বাপরে সহজ কথা!

সরাইখানাতে বসে সবাই চোখ বড় বড় করে শিকারীর মুখের গল্প শুনত।

পাশে ফায়ারপ্লেসে জ্বলত গনগনে আগুন।

সমুদ্রের ভয়াল ঝড়ের বর্ণনা দিত সে। বা রাগী একটা বিশাল তিমি মারতে গিয়ে কি ভাবে নাহেজাল হয়েছিল সেই রোমাঞ্চকর ঘটনার বর্ণনা দিত।

গল্প শুনতে সবাই পছন্দ করে।

বিশেষ করে দূর সাগরের গল্প কার না পছন্দ? কাজেই লোকজন বেশ জেঁকে বসে থাকত তিমি শিকারীর পাশ ঘেঁসে। আবার গ্রামের পথ ধরে যখন শিকারী যেত সবাই আঙ্গুল তুলে শিকারীকে দেখাত। আর শিকারী যে শুধু গপ্পো করে সময় পার করত ব্যাপারটা এমন না কিন্তু!

ফুরসত বলতে তেমন কিছু ছিল না তার। হারপুন মেরামত করত সে। পুরানো জাল রঙ করত। তিমি মাছের হাড় দিয়ে অনেক খেলনা বানাত সে। তিমি মাছের দাঁতে দারুন সব নকশা করে পরে বাজারে বিক্রি করত।

এভাবে দিনগুলো পার হয়ে যেত পাখীর পালকের মত।

পরের বছর আবার তিমি শিকারের মৌসুম চলে আসত।

পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার চলে যেত জাহাজে। পরিবারের কেউ বা বুড়ি মা কাঁচের বয়াম ভর্তি করে ভিনেগারে ভেজান মাংসের আচার বা বাঁধাকপির পুর ভর্তি পিঠা দিয়ে দিত।

আর জাহাজে উঠলেই শিকারীর পুরানো ইয়ার দোস্তোদের সাথে দেখা হত।

জীবনটা খুব খারাপ না কিন্তু!!!

আমার শহরে সমুদ্র নেই।

নদী আছে। তা তো আগেই বলেছি। দাদুর সাথে নদীর পারে গিয়েছি অনেকবার। সমুদ্রের মত বড় না হলে ও খারাপ না। অনেক নৌকা দেখতাম। বড় বড় ইস্স্টিমার ও যেত। এখানে ওখানে পরে থাকত হাতের তালুর মত ঝিনুকের খোসা। আর বড় বড় গুল্গলি শামুক।

নদীর পারে বড় বড় শন ঘাসের বন। হোগলার দঙ্গল। আর নেপিয়ারের ঘাসের স্তূপ।

সারাক্ষণ ভেজা একটা বাতাস বইত শনশন করে। অনেকে শামুক কুড়িয়ে আনে। শামুক পুড়িয়ে চুন বানায়। মাছ ধরার নৌকা থাকত বেশ কিছু। বাঁশের ঝুরি ভর্তি পয়সার মত মাছ গুলো ঝিকিমিকি করত।

ওদের জীবন ও ভাল। কারন ওরা নৌকায় রান্নাবান্না করত। ওখানেই খেত।

সবচেয়ে বড় কথা পিচ্চিগুলোকে ইশকুলে যেতে হত না।

কিন্তু ওদের জেলে বলে। জেলে শুনতে ভাল লাগে না। তিমি শিকারী অনেক ভাল।

তবে নদীর পারে গেলে দেখা যায় অনেকে ছিপ হাতে মাছ ধরছে। দেখতে বেশ লাগত।

কাঠের বড় একটা তক্তার উপর বসে থাকত ছিপ নিয়ে। চুপ চাপ তাকিয়ে থাকত ফাতনার দিকে। কালো কালো ছায়া ছায়া মাছ গুলো ঘুরে বেড়ায় জলের নীচে। উপর থেকে দেখা যেত। সাঝের বেলা লোকগুলো বালতি ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরত।

আহা, কি রোমাঞ্চকর।

যারা ছিপ ফেলে মাছ ধরত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে অনেকেই যারপরনাই বিরক্ত হত। চোখ পাকিয়ে তাকাতো দু একজন। ঠিক যেন করমচার মত লাল চোখ।

তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? খেঁকিয়ে উঠত কেউ।

মাছ ধরা দেখছি। মিনমিন করে বলতাম।

বেশি নড়াচড়া করিস না। সাফ জানিয়ে দিত।

কেন? অবাক হতাম।

আরে গাধা, নড়াচড়া করলে মাছ বুঝতে পারে উপরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। টোপ গিলতে চায় না। সন্দেহ করে। ভাবে হঠাৎ করে এমন মজার খাবার এলো কি করে। নিশ্চয় কোন ঘাপলা আছে।

মাছেরা তাহলে চালাক হয়?

হয় না আবার।

টোপ দেন কি দিয়ে?

বড়শীর সাথে?

হু

কি আবার। পচা মেথি, কেঁচো, পিঁপড়ের ডিম, বাসি পাউরুটি, হেনতেন। আর শোন তুই বেশি কিনারে দাঁড়াবি না। পড়ে টরে যাবি। নদীতে দানো আছে কিন্তু!

নদীতে দানো আছে আগেও শুনেছি। তবে ভয় পাইনি। এত সহজে ভয় পাবার বান্দা নই। তিমি শিকারীরা অনেক সাহসি হয়। কত বড় বড় তিমি মেরে ফেলে। আর এ হলো নদীর দানো। ফুঁউউ!

তবে এটা ঠিক নদীতে নামলে দানোর ভয় পেতাম না। ভয় পেতাম শেকলের। নদীর গভীরে শেকল নামে বিদঘুটে কি একটা থাকে। পা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায়।

আমার ধারনা গপ্পো হবে। অথবা বাচ্চা কোন অকটোপাস হবে। কোন ভাবে নদীতে চলে এসে ছিল। কে জানে!

তবে ফালতু গল্প।

তবে ছিপ ফেলে যে বুড়ো লোকটা মাছ ধরত সে অনেক কিছু জানে।

একবার বড্ডো অদ্ভুত জিনিস দেখেছিলাম। বললে বিশ্বাস করবে না। বড় একটা পাথর। ওটা নড়ে চড়ে বেড়াছে।

আবার দেখি পাথরটার গলা, মাথা আর হাত-পা অ আছে।

ভয়ে শরীরটা আইসক্রিমের মত ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। পালাতেও পারছিলাম না।

বুড়ো আমাকে অভয় দিয়ে বলল, ভয় পাসনে। ওটা তো কাছিম। কোন ক্ষতি করবে না।

সত্যি তাই।

কাছিম টা আমাকে দেখে দৌড়ে ভাগছিল।

পড়ে শুনেছি ওরা নাকি ডিম পারতে ডাঙ্গায় উঠে আছে। কাছিমের ডিম দেখেছি। ছোট হয়। তিতির পাখীর ডিমের মত।অনেকে খায়।

আমি কাছিম চিনি না দেখে ছিপ ফেলে যারা মাছ ধরছিল তাদের একজন বলল, ঐ তরা না হিন্দু! হিন্দুরা তো কাউটটা খায়। তুই কাউটটা চিনস না ক্যান?

বলে লোকটা কেমন বিচ্ছিছি ভাবে দাঁত বের করে হাসতে লাগল। দাঁতগুলো ময়লা আর কেমন হলুদ। ঠিক যেন খোসা ছড়ানো বাদামের মত।

না।

সত্যি কাছিম চিনতাম না। তাতে আমার বয়েই গেছে। বড় হয়ে আমি ক্রিসমাস আইল্যান্ডে বা দক্ষিন সাগরে যাব। তখন কত মজার মজার খাবার খাব। ঝলসানো ভারুই পাখীর মাংস।কড মাছের ডিম। আর কত কি!

আর তখন ও এই হলুদ দাঁতের লোকটা পিচ্চি পিচ্চি রয়না আর তিতপুটি মাছ ধরে তামাক পাতা চিবুতে চিবুতে বাড়ি ফিরবে।

হ্যাহ!

তবে বুড়ো লোকটা খিটখিটে মেজাজের হলে ও ভালই। অনেক কিছু জানে, মাঝে মাঝে টিনের একটা কৌটা থেকে কি যেন বের করে মুখে দিয়ে চিবোয়। ওটা নাকি বাবা না তালুই জর্দা। আমি অবশ্য জর্দা বলতে পারতাম না।

বলতাম দরজা।

তো বুড়ো আমাকে পিঁপড়ের ডিম দিয়ে চার বানান শিখিয়ে দিল। এই জন্য কতগুলো পিঁপড়ের বাসা ভাংতে হল।

খারাপ লাগল।

মা বলেছে, অন্যের বাসা ভাংলে নিজের বাসা ও ভেঙ্গে যায়।

পিঁপড়ে যে কি রকম পরিশ্রম করে না দেখলে বুঝতে পারবে না।

সারাক্ষণ কাজ করে ওরা। করতেই থাকে করতেই থাকে। ইয়া বড়বড় খাবারের টুকরো মাথায় নিয়ে দৌড় দেয়।

একবার দেখেছি বড় একটা মাছের কাটা নিয়ে টালমাটাল ভঙ্গিতে দৌড়ে যাচ্ছিল এক পিঁপড়ে বাহাদুর। আমারদের বাড়ির পাশে ছিল এক ভদ্রলোক। উনি নাকি প্রফেসর। যারা জাদু দেখায় বা হাত দেখে ভাগ্য বলে দেয় তাদের প্রফেসর বলে। যেমন প্রফেসর পাওনাদার বা জাদু সম্রাট প্রফেসর যাদব সরকার ।কিন্তু এই লোক তা করত না।

জরির পোশাক পরে জাদু ও দেখাত না। আবার আতশী কাঁচ চোখে মানুষের হাত ও দেখত না।

কে জানে কি রকম প্রফেসর!

পরে জানলাম যারা কলেজের বাচ্চাকাচ্চাদের পড়ায় তাদের প্রফেসর বলে। মানে মাস্টার। কিন্তু বড় মাস্টার।

তো, সেই বড় মাস্টার বলেছিল, মানুষ অনেক কম কাজ করে। আর পিঁপড়ের তুলনায় বহু বহু গুন দূরবল।

পিঁপড়ে তার শরীরের তুলনায় অনেক বেশি বোঝা বয়।

একটা মানুষ যদি বড় ৫ টনি একটা ট্রাক মাথায় নিয়ে বাইবাই করে দৌড়ে যেতে পারত তবে পিঁপড়ের সমান শক্তিশালী হত।

আমি কল্পনা করলাম রামধনিয়ার পিসে মশাই যে কিনা আমার শহরের সবচেয়ে তাগড়া মানুষ। সে মাথায় একটা ট্রাক নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।ট্রাকের ভেতরে ড্রাইভার আর হেল্পপার চিল্লাচিল্লি করছে।

ভয়ে।আর ট্রাকের গায়ে বড় করে লেখা – মায়ের দোয়া। সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন।

মানে হল – পুরো বাংলাদেশের ওজন মাত্র ৫ টন।

এখন কথা হল ৫ টন কতটুকু? মুদির দোকানদার পাকরাশি মশাইকে জিজ্জেস করেছিলাম। পাকরাশিদের দোকানটা অনেক পুরানো। ১ টাকা দিলে ১০ টা বাবুল বিস্কুট পাওয়া যায়। হলুদ বড় বড় বিস্কুট। বিস্কুটের গায়ে ইংরেজিতে কি সব লেখা। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের দাঁড়ির মত সাদা শনপাপড়ি ও পাওয়া যায়। মুরুলি ভাঁজা ও পাওয়া যায়। কৃষ্ণের আরেক নাম হল মুরুলীধর। কারন তিনি মুরুলি ভাঁজা খেতে পচ্ছন্দ করতেন।

যাকগে ।পাকরাশিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ৫ টন ওজন মাপার বাটখারা আছে নাকি।

বুড়ো ভামটা বলে, নারে বাবা। আমার কাছে ছটাক, আধপোয়া আর এক সেরি বাটখারা আছে।

আজব এক শহর!

একটা দরকারি জিনিস নেই!

আসলে বলতে চাচ্ছিলাম পিঁপড়ের বাসা ভেঙ্গে আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

ওরা কত কষ্ট করে বাসা বানায় তোমরা যদি দেখতে! ওদের মধ্যে কত পদের পিঁপড়ে যে আছে। কিছু পিঁপড়ে শুধু যুদ্ধ করে। মানে অন্য পিঁপড়ে এসে আক্রমন করলে ওরা তেড়ে এসে লড়াই করে। ওরা সৈনিক পিঁপড়ে। কিছু আছে কামলা পিঁপড়ে। ওরা সারাদিন কাজ করে। খাবার যোগার করে। মাটির নীচে সুড়ঙ্গ বানায়। কিছু পিঁপড়ে আবার চাষবাস করে। বিশ্বাস হয়!

সত্যি কিন্তু।

শুকনো পাতা যোগার করে দাঁত দিয়ে কেটে গোল বানিয়ে রাখে, যাতে ভেতরে শ্যাওলা হতে পারে।শুকনো পাতার ভেতরে যে শ্যাওলা হয় সেগুলো দাড়া দিয়ে কেটে গুহায় নিয়ে খায়।

আমরা তো এমনই তে কিছুই দেই না পিঁপড়েদের।

কিন্তু কি চালাক। কোথাও কিছু খাবার লুকিয়ে রাখো ঠিকই টের পেয়ে যাবে। এক দলা মিছরি বা বাতাসা লুকিয়ে দেখ, বেশিক্ষণ লাগবে না ওরা হাজির। প্রথমে একটা বা দুটো আসবে । পরে পিলপিল করে আসতেই থাকবে।

আসা যাবার পথে থেমে থেমে একজন আরেক জনকে কানে কানে কি যেন ফিসফিস করে বলে। কুশল বার্তা বলে বা খাবারের খোঁজ বলে হয়ত।

ওদের বাসা ভেঙ্গে যখন ডিম আনলাম তখন ওরা পাগলের মত দৌড়া দৌড়ি করছিল। আহা!

সব খাবার আর বাড়ি ঘর নষ্ট করে ফেললাম।

ঠিক করলাম আর কখন ও ভুলে ও পিঁপড়ের বাসা ভাংব না।

বুঝতে পারলাম ছোট ছোট কারনে আমার মন খারাপ হয়।

আর অনেকেই অনেক কাজ খামাখাই করে । বড়দের ইশকুল ছুটি হলে কত গুলো ছেলে ছোকড়া বড্ড হল্লা করে বাড়ি ফেরে। ওরা অযথাই গাছের ডাল পালা ভাঙ্গে। আর বড় একটা ডোবার মত আছে ওখানে দাঁড়ায় খানিকটা সময়।

ডোবাটা বেশ সুন্দর। নরম সবুজ ঘাসে ভর্তি। কত নাম না জানা জলজ লতা গুল্ম যে হয়ে আছে তার কোন লেখা জোখা নেই। কলমি লতা আর জলঝিঝির অভাব নেই। কতগুলো ব্যাঙের পরিবার থাকত ওখানে। কোন ঝামেলা করত না।

শুধু বৃষ্টি হলে ওরা দারুন হল্লা করত। ও হ্যা সন্ধ্যের সময় ওরা বেশ ডাকাডাকি করত। কারন তখন বেশ পোকা ধরতে পারত তাই। আর খেতে পেলে কে না খুশি হয়।

তাতে তো কারো সমস্যা হবার কথা নয়।

কিন্তু সেই বড় বড় স্কুল পড়ুয়া ছেলে গুলো দল বেঁধে দাঁড়াত ডোবার চারিদিকে। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিত বড় বড় পাথরের টুকরো। তারপর ডোবার ব্যাঙ গুলোকে নিশানা করে ছুরতে থাকত পাথরের টুকরোগুলো । সে এক করুন দৃশ্য। পাথরের আঘাতে পিচ্চি পিচ্চি ব্যাঙগুলো রক্তাক্ত হয়ে যেত। হাত পা থেঁতলে যাবার পর ও ওরা

পালাতে চাইত। মা -বাবা, পরিবার আর ডোবার নিরাপদ বাসা থেকে।

ব্যাঙ যন্ত্রনায় ছট ফট করত আর সেই ফাজিল গুলো ঠা ঠা করে হাসত।

খামোখাই ডোবার ব্যাঙ গুলো কে এমন করে মেরে কি মজা পেত ওরা কে বলবে?

দেখতে খুব খারাপ লাগত। আবার অনেকে কাঠের গুলতি নিয়ে অযথাই পাখী মারত। খাবারের জন্য মারলে কথা ছিল না । এমনিতেই। খয়েরি রঙের শালিক, যে গুলোর ঠ্যাং হলুদ রঙের সে গুলোকে মেরে কি লাভ? আর রং বে- রঙ্গের মাছ রাঙ্গা! ওরা তো কোন ক্ষতি করে না! কত কষ্ট করে নিজেদের খাবার নিজেরা যোগার করে। শুকনো খড় কুটো দিয়ে নিজেদের বাসা বানায়। আমি বাবুই পাখীর বাসা দেখেছি। কি সুন্দর! ভেতরে আলাদা আলাদা রুম আছে আবার। বাবুই পাখীর বাসার ভেতরে কাঁদা লেপে ওখানে জোনাকি পোকা রেখে দেয় ওরা। যাতে অন্ধকারে থাকতে না হয় পাখিদের। কি চালাক ওরা।

আমাদের বাড়ির পাশে বিশাল এক খোলা মাঠ ছিল। সবাই বলত বাঙলার মাঠ। আসলে হবে বাংলোর মাঠ। ওখানে ডাক বাংলো ছিল একটা। সরকারি বড় বড় কর্তা ফরতা থাকতো।

সেই বাংলোর সামনে ছিল চারটে বড় বড় নিম গাছ। নিম গাছের পাতা গুলো কি সুন্দর চিরকি মিরকি!

সারাদিন বানকুড়ালি হাওয়ায় সেই গাছ গুলো থেকে নিম পাতা খসে খসে পরত। সেই সাথে গোল গোল নিম ফল গুলো ও পরত।

আর সেই নিম ফল খাবার জন্য ভিড় করত রাজ্যের সব কাক। ওরা কা কা করে ওদের কাকাদের ডাকত আর নিম ফল খেত।

বিচ্ছিরি তেতো স্বাদের সেই নিম ফল গুলো এত আহ্লাদ করে কাক গুলো খেত কি করে কে জানে?

ওদের কাছে নিশ্চয় রসগোল্লার মত খেতে লাগে।

সেই মাঠে যে কত পদের পাখী আসে কে বলবে!

কাক, কাদাখোঁচা, কোকিল, খঞ্জন,শালিক, ঘুঘু, চড়ুই, চিল, ছাতারে, জলপিপি, টিয়া, চন্দনা, টুনটুনি, ডাহুক, তালচোঁচ, তিতির,বটের, দাঁড়কাক, দোয়েল, ধনেশ, নীলকণ্ঠ, পায়রা, পানকৌড়ি, পাপিয়া (চোখ গেলো), পেঁচা, ফিঙে, বক, বসন্ত বউরি, বাবুই, বাঁশপাতি, বুলবুল, ভরত পাখী, মধুপায়ী, মাছরাঙা, শকুন, শরাল, বালিহাঁস, সারস, হরিয়াল, হলদে পাখী, হাঁড়িচাঁচা।

আরও বলতে পারতাম। নাম মনে আসছে না।

কাঠ ঠোকরা নামে আরেকটা পাখী দেখতাম। সুযোগ পেলেই ওরা গাছের মোটা গুড়ি ঠুকরে ঠুকরে কি যেন বের করে খেত। পরে শুনেছি পোকা বের করে খায়।

আমি কখনও কখনও বাসি পাউরুটি বা বিস্কুটের গুড়ো নিয়ে বাংলার মাঠে গিয়ে বসতাম। সেই গুলো হারকে মারকে ছিটিয়ে দিলেই পাখীর ঝাঁক এসে খাওয়া শুরু করত। সাথে বিস্তর ঝগড়া করত। এক টুকরো রুটির জন্য ওরা চিৎকার করত-আমার! আমার!! আমার!!!

দুপুরের পর কত গুলো বড় বড় ছেলে মাঠে খেলতে আসে। বল খেলে। ফালতু একটা খেলা। একটা চামড়ার গোল্লা নিয়ে সবাই লাথি মারে। সে এক ধুন্ধমার ব্যাপার। তবে উত্তেজনাকর। অনেকেই আবার বসে বসে দেখে।

বড় খেলোয়াড়দের একজন জানতে চাইল, তুই খেলবি নাকি?

আমি তো মুখিয়েই ছিলাম। সাথে সাথে নেমে পড়লাম।বলটা পায়ের কাছে পেতেই কষে এক লাথি ঝাড়লাম। কি হল বলতে পারব না।

দেখি আমি চিতপটাংগ হয়ে নরম ঘাসের উপর পরে আছি। বল সামান্য দুরে গেছে মাত্র। সবাই দাঁত বের করে হাসছে। টুথ পেস্টের বিজ্ঞাপণে সবাই যেমন করে। সবার মুখ দেখতে লাগছিল আধখোলা দেশলাইয়ের বাক্সের মত।

বড় একটা ছেলে একটু কম হেসে বলল, ব্যাথা পেয়েছিস নাকি?

মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করলাম।

আমি আসলে ডিগবাজি চর্চা করছিলাম, বললাম চটজলদি।

ঠিক আছে তুই তাহলে দুধভাত।

দুধভাত কি?

তুই এই জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকবি। বল মাঠের বাইরে গেলেই দৌড়ে নিয়ে আসবি। ঠিক আছে?

খুশি হলাম। আরে এ তো বিরাট দায়িত্ব।

সেই মুহুত থেকে বড় বড় দায়িত্ব নেয়া শিখে গেলাম।

ওরা দমাদম বল লাথি মারত। আর বল বাইরে গেলেই ঝেড়ে দৌড় দিতাম। নিজেকে বেশ গুরুত্বপুন মনে হত।

তারপর থেকে নিয়মিত দুধভাত খেলোয়ার হিসাবে ওদের বল এনে দিতাম। ওরা খেলত। মাঝে মাঝে ওদের কেউ না আসলে আমাকে নিত সাক্ষী গোপাল হিসাবে। আমি সারা মাঠ ভর্তি ছুটছুটি করতাম। বল পায়ে পেতাম খুব কমই। দারুন চিল্লা ফাল্লার খেলা। ওরা লুঙ্গি কাছা দিয়ে খেলত। প্রায়ই লুঙ্গি খুলে যেত। গোল হওয়া নিয়ে দারুন ঝগড়া লাগত। মাঝে মাঝে চিৎকার দিয়ে বলত, ফাউল।

ফাউল মানে মুরগি, কিন্তু খেলায় মুরগি আসবে কোথেকে? আজব।

খেলা শেষ হলে আমার জামা কাপড়ের দশা দেখলে যে কেউ হাসবে। রাস্তার ফকিরের জামা ও এর চেয়ে বেশি পরিষ্কার থাকে।

আমি ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরতাম।

সন্ধা বেলা আবার স্নান করতে হত। রান্না ঘরের পাশে স্নানঘর। পাকা মেঝে। পিতলের কল ছাড়লেই ঠাণ্ডা পানি।

স্নান ঘরের বাইরে বাশক পাতা আর বুনো তুলসির ঝোপ। চকলেটের মত সাবান আচ্ছা মত ঘষে স্নান করতাম।

বাইরে হিমহিম ঠাণ্ডা।

কল্পনা করতাম সান্তা মনিকার নির্জন কোন প্রান্তরে আমাদের বাড়িটা। বাইরে কতগুলো নেকড়ে ঘুরে বেরাচ্ছে।

দুরে আমাদের শালগম খেত। রাক্ষসের দাঁতের মত এক একটা শালগম হয়েছে। ভালুক এসে রাতের বেলা শালগম চুরি করে খেয়ে যাবে।

মাঝ রাতে ঘামাচি পাউডারের মত তুষার পরবে। জানালার কাঁচে লেপটে থাকবে বরফ।

জানি এসব কিছুই হবে না। স্নান করা শেষ হলে আমাকে পড়তে বসতে হবে।

যেহেতু আমার কাছে হারপুন নেই। তাই বাঁশের একটা কঞ্চিকে হারপুন কল্পনা করে নিলাম।

যাতে তিমি শিকার করতে গেলে ভাল মত করতে পারি তাই চর্চা করা দরকার। কিভাবে করব? উপায় না পেয়ে দিশা হারিয়ে ফেললাম।

শেষে আইডিয়া এল। খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার সময় যত ঝোপ ঝাড় পরত সব গুলোকে হারপুন ইয়ে মানে সেই কঞ্চির টুকরো দিয়ে আচ্ছা মত আঘাত করতে করতে ফিরতাম। কল্পনায় দেখতাম নীল সমুদ্র রক্তে লাল হয়ে গেছে। আর মরে ভেসে আছে ইয়া বড় বড় তিমি মাছ। আমার সহকারী নাবিকেরা কপিকলে করে জাহাজের ডেকে তুলে আনছে তিমি মাছের মৃতদেহ। অনেক কাজ ওদের।

কায়দা করে চর্বি বের করে পিপেয় জমা করবে।

একদিন এমন এক ঝোপের আড়ালে বসে হিসু করছিল সেই প্রফেসর। আমি কি জানতাম নাকি? প্রায় মেরেই বসেছিলাম বেচারাকে।

বিরক্ত হয়ে বললেন, তুই খামাখা গাছদের কষ্ট দিস কেন?

গাছ কষ্ট পাবে কেন?

বারে ওদের ও তো প্রান আছে। জানিস না।

না তো।

আরে দেখ না। তুই এই যে বাচ্চা বট গাছের চারাটাকে মেরেছিস। দেখ কেমন দুধের মত কষ বের হচ্ছে। এটা তো গাছের রক্ত।

হায় হায়। তাই নাকি?

হুম। গাছের প্রান আছে রে বোকা।

আপনি তো মাস্টার তাই সব জানেন। বললাম।

মাস্টার না তো। প্রফেসর।মাস্টার তো আলাদা জিনিস।

হ্যাঁ। বললাম। ইস্কুলের স্যার দের মাস্টার বলে।

ঠিক। খুশি হলেন প্রফেসর।

যারা জামাকাপড় বানায় সেই দরজিদের ও মাস্টার বলে। আবার সিনেমার পিচ্চি অভিনেতাদের ও মাস্টার বলে ।যেমন মাস্টার ইমন সাহা।

সিনেমার পিচ্চি অভিনেতাদের ও মাস্টার বলে? প্রফেসর সাহেবের চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল। মুখ চোখ লাল।

হায় হায় । হাটফেল করে বসে নাকি লোকটা?

আমি সিনেমা দেখি শুনে সেই প্রফেসর সাহেব এত তোম্বা হয়ে গেছেন কেন কে বলবে?

সিনেমা দেখা দোষের নাকি? আমি তো দ্যা নিউ মেট্রো হলে গিয়ে মায়ের সাথে দু একটা সিনেমা দেখে ফেলেছি।

কাহিনির কোন আগা মাথা নেই। ঠুং ঠ্যাং তলোয়ারের লড়াই হয়। রাজপুত্রের পোশাক একেবারে বিয়ে বাড়ির বাজনাওয়ালাদের মত। একটু পর পর খামাখা গান।

একবার কাহিনিতে কি হল কে বলবে। সবার পানির সমস্যা। বৃষ্টি হচ্ছে না নাকি। এক সুন্দর মত মহিলা দুই হাত তুলে গান ধরলেন, বান্দা তুলেছে দু হাত। কবুল কর মোনাজাত।

হায়রে এর পর সে কি ঝড় বৃষ্টি। থামার এর কোন লক্ষণ নেই।

সিনেমা শেষ করে বাইরে আসে দেখি এক ফোটা ও পানি নেই কোথাও। সব শুকনো খটখটে।

বেশ অবাক কাণ্ড।

আসলে সিনেমা জিনিসটাই এই রকম।

আমার বেশি ভাল লাগে ছবিওয়ালা বই। মা প্রচুর বই পড়ে। কি সব নাম। যেমন- কাচারি বাড়ির আতঙ্ক।

জ্যান্ত মৃত্যু। হারাধন উকিলের হত্যা রহস্য। পুরানো মন্দিরের শয়তান।আবার কিছু সিরিজ ও পড়ে দেখি। দস্যু মকাদ্দাস বা অমুক গোয়েন্দা।

বইগুলোর নামেই বোঝা যায় ফালতু বই।

আর দুপুরের খাবারের পর রেডিয়োতে নাটক শুনতেই হবে। মাঝে মাঝে সিনেমার বিজ্ঞাপণ। মোটা হেঁড়ে গলায়

একজন বলে, হ্যাঁ ভাই, আসিতেসে। বনদর নগরী চট্রগ্রাম সহ সারা দেশে্‌ …আংশিক রঙ্গিন ছবি…হেনতেন।

এই রকম নিঝুম দুপুরে আমি বের হয়ে পরতাম বাড়ি থেকে।চুপিচুপি। বাইরে তখন ঝাঁ ঝাঁ রোদ। ঝোপ ঝাড়

গাছ পালা, লতা গুল্ম সব রোদে পুড়ছে।

রোদে পুড়ছে বিপিন বাবুর আমবাগান। রোদে পুড়ছে বাসক পাতার ঝোপ। রোদে পুড়ছে হলুদ স্বর্ণ লতা।

ঝোপ ঝাড় থেকে ঝাঝাল এক রকম ঘ্রান বের হয় রোদে পুড়ে। অনেক ক্ষণ সেই ঘ্রান নাকে গেলে কেমন ঝিমঝিম করে মাথার ভেতরে।

বাংলোর মাঠ এই সময় কেমন নিঝুম হয়ে থাকে। লিলুয়া বাতাসে লম্বা সবুজ ঘাস গুলো শনশন করে কথা বলে।

রোদে সবকিছু আরও সবুজ লাগে। নিম গাছের ফাঁক দিয়ে চিরকি মিরকি রোদের পরে কি রকম অদ্ভুত নকশা বানায় ।

দমকা বান কুড়ালি হাওয়া এসে পাক খায় । সবুজ টিয়া পাখীর পালক ঘুরপাক খায় বানকুড়ালি হাওয়ায়।

বিশাল এক তেপান্তরের মাঠে একা বসে থাকি। কত কিছু যে মনে আসে।

বিকেলের আগে একগাদা পিচ্চি আসে সবুজ ঘাসের মাঠে।

সবার হাতে চটের ব্যাগ। হাতে টিনের টুকরো। দেখেই বুঝা যায় ওরা খুব গরীব। ছেলেগুলোর হাফপ্যান্ট পরনের। খালি গা। কারো কারো নাক দিয়ে সিকনি ঝরছে। মেয়েগুলো একটু বড়। রং জ্বলা ফ্রক পরনের। মাথার চুল লাল। যেন টিভিতে দেখা বিদেশি মেয়েদের মত।

আসলে রোদে পুড়ে এমন হয়ে গেছে।

তেপান্তরের মাঠে অনেক কচু গাছ হয়ে থাকত। সারাক্ষণ বাতাসে দুলত ওদের ত্রিভুজ সবুজ পাতা।পিচ্চিগুলু টিনের টুকরো দিয়ে কুচ কুচ করে কচুর পাতাগুলো কেটে নিয়ে জমা করত নিজেদের চটের ব্যাগে। যার কাছে টিনের টুকরো নেই সে মশার কয়েল রাখার ভাঙ্গা স্ট্যান্ড ব্যবহার করত চাকু হিসাবে।

রোজ আসত ওরা।

ভাবলাম এগুলো নিয়ে বোধ হয় খেলে ওরা।

একদিন জানতে চাইলাম। ওরা যা বলল তা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল। ওরা নাকি এই কচু পাতা সেদ্দ করে ভাত দিয়ে খায়। রোজ।

এইজন্যই তো দেখতাম যেদিন বেশি পাতা পেত সাংঘাতিক খুশি হত ওরা।

মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

ভাবতেও পারছিলাম না। রোজ শুধু এই পাতা সেদ্দ রান্না করা হয়। এক পিচ্চি বলল -গরম ভাতের সাথে একটু লবণ আর শর্ষের তেল দিয়ে কচু শাক খেতে ভাল।

মাঝে মাঝে মাটি খুড়ে কচুর লতি, গাঁঢি ও পেত। একটা সজনে গাছ ছিল । ইস্কুলের হেড স্যারের বেতের মত সজনে ধরত। তাও নিত ওরা।

খারাপ লাগত। আমি কত ভাল ভাল খাবার খাই। অথচ ওরা…।পিচ্চি একটা মেয়ে বলল -ও বড় হয়ে রুটিওয়ালাকে বিয়ে করবে । ওর খুব বাটার বর্ণ খেতে ইচ্ছা করে। (কিন্তু একটা বাটার বনের দাম একটাকা) অথবা চা দিয়ে পাউরুটি।

শুনে ঠিক করলাম, খাবার নিয়ে মাকে আর কক্ষনও জ্বালাতন করব না।

সাঁঝের আগে বাড়ি ফিরতে হত। কারন নির্জন মত একটা জায়গা একা পার হতে হত। ওখানে আসলেই গা টা

কেমন ছমছম করে। রক্তচোষার গল্প বলেছিল মা। মাঝে মাঝে নাকি কোন কোন জায়গাতে বাচ্চাদের লাশ পাওয়া যেত। শরীরে এক বিন্দু রক্ত নেই।

আর ছেলে ধরার তো অভাব নেই। ওরা নাকি বাচ্চাদের আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে ঝপ করে বস্তার ভেতরে ভরে নিয়ে যায়।

পিচ্চি বাচ্চাদের নিয়ে কী করে?

অনেক কাজে লাগে নাকি।

শুনেছি বড় বড় পুকুর কাঁটার পর যদি পানি না উঠে তবে সেখানে বাচ্চদের কেটে রক্ত ফেলে দিলে পানি উঠে।

আবার ধরো গিয়ে লোহার বড় বড় পুল মানে যেগুলোকে ইংরেজিতে ব্রিজ বলে। সেই ব্রিজ যদি কম দামি লোহায় বানান হয় তবে নাকি টিকে না। ভেঙ্গে যায়।

তখন কি করা?

তখন ১০১টা পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চাকে কেটে রক্ত দিয়ে সেই ব্রিজ ধুইয়ে দিলে সাঁঙ্গাতিক শক্ত হয়। ব্যাপারটা সত্য হতে পারে। পটল ও এমন একটা কথা বলেছিল।

আর তেপান্তরের মাঠ পার হলে বড় যে একটা সরকারি পানির ট্যাঙ্ক আছে -সেই ট্যাঙ্কের গায়ে আমি নিজে রক্তের দাগ দেখছি।

ঐ ট্যাঙ্কটা নাকি বারবার ভেঙ্গে যেত। সেই রক্ত দেবার পর আর ভাঙ্গেনি। এখন কি সুন্দর টন টন পানি ধরে রাখে। আর আমাদের পুরো শহরে দুই বেলা সাপ্লাই দেয়।

ট্যাঙ্কের নীচ দিয়ে আসার সময় গা টা হিম হয়ে যেত। লাল রক্তের দাগে কি কি সব লেখা।

আরও একটু বড় হতেই ভয়টা ভেঙ্গে গেল। কারন ট্যাঙ্কের গায়ে বড় বড় করে লে্খা-হেকমত ভাইকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।

আর ওটা মোটেও রক্তের দাগ না।

মা মিথ্যে কথা বলেছে।

বাড়ি ফেরার পথে একটা মন্দির পড়ত।

অনেক পুরানো আর নিঝুম। ইটগুলো ক্ষয়ে গেছে মন্দিরের দেয়ালের। সেখানে মখমলের মত সবুজ শ্যাওলা।বড় বড় ঢেকি শাক হয়ে আছে। মন্দিরের ভেতরে মস্ত বড় একটা তাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে ঝুলছে বাবুই পাখীর হলুদ বাসা। মন্দিরের ভেতরে ঘুঁটঘুঁটটি অন্ধকার। ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে একটা। ধূপের মিষ্টি ঘ্রান।

একটা মাত্র বুড়ো পুরোহিত থাকে ভেতরে। একা।

সাঝবেলায় কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো দিত। তারপর একটা পেতলের ঘটিতে আতপ চাল,কাচা কলা,ঝিঙে এমন কিছু সবজি দিয়ে এক সাথে রান্না করে কলা পাতায় ঢেলে অন্ধকারেই বসে বসে খেত।

আমি অনেকবার জানতে চেয়েছিলাম, ঠাকুর আপনার একা ভয় করে না?

কিসের ভয়? অবাক হয়েছিল বুড়ো পুরোহিত। এটা ভগবানের বাড়ি না? উনি তো আমার সাথে থাকেন!

আমাকে দেখলেই স্বন মুদ্রার মত বাতাসা দিত সে।

মন্দিরের চারিপাশে ছিল বড় বড় ফণীমনসার ঝোপ। আর মান্দার গাছের দঙ্গল।

মন্দিরের পাশে পুরনো একটা বাড়ি। বাইরে সারাক্ষণ দুই বুড়ো লোক মাথা নিচু করে বসে থাকত। মনে হত কোন কারনে ওরা মাথা তুলতে পারছে না। মান-সম্মান সব শেষ হয়ে গেছে। আর কি সব চিন্তা করছে। ওদের সামনে কাগজের মোটা একটা টুকরো। সাদা-কালো ছক কাটা তাতে। আর অনেক কিম্ভুত গুটি সাজান। তা ও আবার সাদা কালো। চারটে গুটি দেখতে ঘোড়ার মাথার মত।

হায় হায় কি এত চিন্তা করে ওরা। কি এত সমস্যা?

কেউ মারা গেছে নাকি?

পরে জানতে পারলাম উনারা নাকি দাবা খেলে।

কি ফালতু খেলা। কথাবার্তা পযন্ত বলা যাবে না। আজব!

প্রফেসর সাহেব দিনরাত কি পড়ত কে বলবে? ইয়া মোটা মোটা বই। প্রচ্ছদে লেখা- ভৌত রসায়ন। মানে কি? ভৌত মানে ভুত? আর রসায়ন মানে মিষ্টির দোকান?

আর কাণ্ড দেখ- এত বড় মানুষ হয়ে খাতা ভর্তি a,b c,d লেখা।

আমাকে দেখলেই বলতেন- কি রে খেলা থেকে ফিরলি নাকি? আমি মাথা নেড়ে হ্যা বলতাম। জানতে চাইতাম কি করছে সে। বলত, যাদব বাবুর পাটী গণিত নিয়ে সমস্যার সমাধান করছেন।

যাদব বাবুকে চিনিস? জানতে চাইতেন।

বোধ হয় ফচুর জ্যাঠা মসাই হবেন। গত বছর যে জলপাইগুড়িতে গিয়ে অনেক লুচি আর আলুর দম খেয়ে মারা গেলেন। বলতাম।

আরে না। হাসতেন প্রফেসর। পাটীগণিতের জাদুকর হচ্ছেন এই যাদববাবু। দারুন সব জটিল সমস্যার অংক বানিয়েছেন উনি। ধরা যাক একটা চৌবাচ্চার চারটা নল আছে…চৌবাচ্চা চিনিস?

চারজন বাচ্চাকে চৌবাচ্চা বলে?

আরে নাহ। বড় জালাধার। ট্যাঁঙ্কির মতই আরকি…।

তো ধরা যাক একটা চৌবাচ্চায় চারটা নল আছে। ব্যাখা করলেন প্রফেসর সাহেব। একটা নল খুলে দিলে ট্যাঙ্কিটা ৪০ মিনিটে খালি হবে। আরেকটা ট্যাঙ্কি খুলে দিলে ২০ মিনিটে ট্যাঙ্কিটা ভর্তি হবে আর আরেকটা খুলে দিলে ১৫ মিনিটে খালি হবে…এখন সবগুলো ট্যাঙ্কি একসাথে খুলে দিলে কতক্ষণে ট্যাঙ্কি খালি হবে বা ভর্তি হবে?

ফাজলামো নাকি? বিরক্ত হলাম। দুনিয়ায় এমন পাগল আছে নাকি যে এমন বিদঘুটে কানড করবে?

ধরা যাক না। ধরা যাক বাডিওয়ালা এমন করলেন। তখন?

মোটেই না। এমন করলে সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। গাধা না হলে কেউ টাঙ্কির সব নল খুলে এমন ছেলে মানুষী কাজ করে না।

আরে অংকের খাতিরে না হয় ধরে নেই।

নাহ। অংক খুব ফালতু জিনিস। বিরক্ত হলাম আমি।

অনেক কায়দা করে ও প্রফেসর সাহেব বুঝাতে পারলেন না অংক জিনিসটা আসলেও ভাল। আর জ্যামিতি তো পুরাই বকোয়াজ জিনিস। খালি আঁকিবুঁকি।

আমার এ সব জেনে কি লাভ? কারন যারা বেশি পড়াশোনা করে তাদের মাথার ঘিলু কমে যায়। আমার বন্ধু পটল বলেছে আমাকে একথা। আর পটল যে অনেক কিছু জানে তা তো আগেই বলেছি।

আমি নিজেও দেখেছি বেশি পড়াশোনা করলে মাথায় টাক পড়ে যায়। বিশ্বাস কর। তোমরা কি

টাকমাথাওয়ালা কোন রিক্সাওয়ালা দেখেছ? নেই-তাই না? ওরা পড়াশোনা করে না যে।

আবার পড়াশোনা বেশি করলে চোখ ও নষ্ট হয়ে যায়। তখন চোখে চশমা দিতে হয়। চশমার কাঁচ বানান হয় বোতলের তলা দিয়ে। আর চশমা পড়ে তুমি যখন অন্য কারো দিকে তাকাবে তোমার চোখ দুটো দেখাবে ২ টাকা দামের রসগোল্লার মত বড় বড়।

বিপিনের দাদুকে যেমন দেখায় আরকি। বাপস কি ভয়ঙ্কর।

আসলে লেখাপড়া জিনিসটাই খারাপ। না থাকলে ভাল হত। কি ভাবে এটা শুরু হল কে বলবে!

তবে চাইনিজরা বলে লেখা আসলে ওদের মধ্যে আগে শুরু হয়েছিল।

অনেক দিন আগে চিন দেশে এক ভদ্রলোক ছিলেন। উনার নাম ছিল- সাং চিয়েন। এই সাং চিয়েন সাহেবের চেহারা নাকি ছিল ড্রাগনের মত। আর চোখ ছিল চারটে। সাঙ্ঘাতিক!

এক সাঝের বেলা সাং চিয়েন নাকি নদীর পাশে বসে ছিলেন। আকাশ ভর্তি ছিল চুমকির মত তারা।

তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন তারা গুলো। এই সময়ই একটা কচ্ছপ গুটি গুঁটি পায়ে হেতে যাচ্ছিল নদীর পাশ দিয়ে। কচ্ছপটার পিঠে হলুদ- কালো চিত্র বিচিত্র ছাপ ছিল।

আরও অবাক হয়ে সাং চিয়েন দেখলেন নদীর তীরের কাঁদা মাটি ভর্তি হাজারে বিজারে পাখীর পায়ের চিরকি মিরকি পায়ের ছাপ।

এ সব কিছুই দারুন ভাল লাগে গেল সাং চিয়েনের।

তিনি আকাশের তারাদের নকশা, কচ্ছপের খোলার দাগ আর পাখীর চিরকি মিরকি পায়ের ছাপের সব মিলিয়ে চিনাদের জন্য লেখার বর্নমালা বানলেন। আর তাতেই তো চিনারা লিখতে শিখল।

অর্থাৎ অনেক আগেই মানুষ লেখাপড়া জানত। বিরক্তকর। চীনারা ছাড়া ও অনেক প্রাচীন জাতি ও নাকি লিখতে পড়তে জানত।

ওরা ভাবত – ভাষা, বর্নমালা এইসব কোন মানুষ বানান নি। দেবতারা বানিয়েছে। যেমন মিসরীয়দের থথ নামে এক দেবতা ছিল। এর শরীরটা মানুষের মত। কিন্তু মুখটা ছিল আইবিস নামের একটা পাখীর মত। এই দেবতা থথ মিসরীয়দের ভাষা, বর্নমালা, অংক আর জ্যামিতি শিখিয়েছিলেন।

আর এখন যে ইরাক দেশটা আছে। আগে ওটার নাম ছিল মেসোপটেমিয়া ।মেসোপটেমিয়া কথার মানে হচ্ছে দুই নদীর মাঝের দেশ। গ্রিকরা এই নাম দিয়েছিল। ওখানে যে তাইগ্রিস আর ইউফ্রেতিস নামে দুইটি নদী ছিল।

আসিরিয়া নামে এক প্রাচীন সভ্য জাতি বাস করত ওখানে। ওরা ভাবত দেবতা নেবো ওদের জন্য

বর্নমালা বানিয়েছে।

আসিরিয়ানদের বর্নমালা গুলো দেখতে মজার। মনে হয় একগাদা লোহার পেরেক সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

এদের বর্নমালাকে কিউনিফরম লিপি বলে। কিউনিফরম মানে -তীরের ফলা।

প্রথম প্রথম ওরা পাথরে লিখত। কিন্তু ওখানে বেশি পাথর পাওয়া যেত না। আর পাথরে খোদাই করে লিখতে সময় ও লাগত বেশি। তাই মিসরীয়রা জলজ নল খাগড়া পিটিয়ে প্যাপিরাস নামে কাগজের মত জিনিস বানাল। আর আসিরিয়ানরা মাটির কাঁদায় লেখা শুরু করল। নদীর দুই তীর ভর্তি ও শুধু কাঁদা মাটি আর কাঁদা মাটি।

কাঁদার চাতকির মধ্যে লিখ। লেখা শেষ হলে আগুনে পুড়িয়ে ফেল। হয়ে গেল শক্ত বই।

মেসোপটেমিয়ার এলাকায় অনেক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আসলে যেখানে নদী থাকে সেখানেই মানুষ জন বসবাস করতে চায় তো, তাই।

সুমেরু, আক্কাদ, বেবিলন, আসিরিয়া এমন কত নামের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেখানে । আসিরিয়ার এক রাজার নাম ছিল আসুরবনিপাল। সেই প্রাচীন কালেই এই রাজা বিশাল এক লাইব্রেরি বানিয়েছিলেন। মোট ২২ হাজার মাটির চাকতির বই ছিল সেখানে। কিউনিফরম লিপিতে লেখা।

মাটি খুঁড়ে পুরো লাইব্রেরিটাই পাওয়া গেছে। আহা আমি যদি এমন দুই একটা চাকতি পেতাম।

পরে অবশ্য আমি বাংলার মাঠে অনেক খুঁজেছি।

ভাঙ্গা কলসির টুকরো ছাড়া কিছু পাইনি।

আমরা যেমন বা দিক থেকে ডান দিকে লিখি, মেসোপটেমিয়ার লোকেরা তেমনি লিখত। আমরা যেমন পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গেলে উল্টা পিঠে লিখি, ওরা ও কাঁদার গোল চাকতিগুলোর দুই পিঠে লিখত।

আজও ঐ সব জায়গার মাটি খুঁড়লেই এত এত মাটির ফলক, চাকতি আর সীলমোহর পাওয়া যায়।

তবে এই সব ভাষা হারিয়ে গেছে। কেউ পড়তে ও পারে না। লিখতে ও পারে না।

সবাই ভুলে গেছে।

মিসরীয়দের লেখা হয়ত তোমরা দেখে থাকবে। ওদের বর্ণমালাগুলো মজার। প্যাঁচা, ঈগল, সাপ এই রকম যত জীবজন্তু আছে সবার ছবি দিয়ে ওরা বর্ণমালা বানাত। একে বলে হায়ারোগ্লিফিক।

পিরামিড ভর্তি দেখবে এই বর্ণমালাগুলো।

তবে ওদের তো কাঁদামাটি ছিল না। ওরা পাথরে লিখত। খুব কষ্টের কাজ। তা ছাড়া নড়াচড়া করতে ও খুব অসুবিধে। তখনই প্যাপিরাসের উপর লিখতে শুরু করল। নলখাগড়া কেটে কলম বানাত। আর কালি ও বানাত নানান কায়দা করে। যেমন- গ্রিকরা কালি বানাত অকটোপাসের বা স্কুইডের কালি দিয়ে।

অকটোপাস আর স্কুইডের শরীরের ভেতরে কালি থাকে। হাঙ্গর টাঙ্গর আক্রমণ করলে সেই কালি ছিটিয়ে ওরা পালিয়ে যায়।

মিসরে লেখালেখির কাজ করত মন্দিরের পুরোহিতরা। মমি বানানোর কায়দা হতে শুরু করে কবে কবে নীল নদে বন্যা হয়েছে, কি পরিমাণ ফসল রাজকোষে জমা আছে সবই লিখে রাখতে হত।

সেই সাথে ফারাও রাজাদের জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনাও লিখে রাখতে হত।

মোদ্দা কথা প্রফেসর সাহেব আমার মাথা ঝালাপালা করে দিলেন।

আমিও বুঝতে পারলাম লেখাপড়ার হাত থেকে পালানোর কোন উপায় নেই। কি আর করা!

তোমরা হয়ত ভাবছ শুধু প্রফেসর সাহেবই বোধহয় অনেক কিছু জানেন। আসলে না। আমার শহরে অনেক জ্ঞানী মানুষ ছিল।

যেমন ধর বাসন্তী পিসীর বাবা।

উনি নদীর ওপারে পাটের মিলে কাজ করেন, তা ও আবার কি? কারখানার সমস্ত বেচা কেনার হিসাব রাখেন। সাঙ্গাতিক ব্যাপার। যদিও আমি শুনেছি অনেকে তাকে কেরানী বলে লুকিয়ে চুকিয়ে।

তো কেরানীর কাজ কি দোষের নাকি?

যারা যেটা না পারে সেই কাজের বদনাম করে। খামাখাই।

বাসন্তী পিসীর বাবাকে দেখতাম সন্ধ্যের সময় বাসক পাতা খুঁজে বেড়ান। বাসক পাতা দিয়ে নাকি

জণ্ডিসের ওষুধ বানান তিনি।

আমরা দাদু বলতাম। সেই দাদুই বললেন- জানিস পৃথিবীতে মোট ২০ হাজার পদের প্রজাপতি আছে।

হায় হায়।

না জানি না তো।

আর পৃথিবীতে প্রজাপতির জন্ম হয়েছিল ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে।

(এক মিলিয়ন সমান কত? দুই তিন কুড়ি হবে বোধহয়)

মিলিয়ন হিসাবটা যে অনেক বড় সেটা জানি।

টিভিতে আমরা তো সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান নামে একটা সিরিয়াল দেখি। ঐ সিরিয়ারের নায়ক

স্তিভ অস্টিন বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় মারা গিয়েছিল। তার শরীরের হাড্ডি গুড্ডি, মাথা-মুথা সব ভেঙ্গে গিয়েছিল। পরে অনেক টাকা খরচ করে বেচারাকে মেরামত করা হয়েছিল। শরীর ভর্তি নানান যন্ত্রপাতি

আর কলকব্জা ঠেসে দেয়া হয়েছিল। ফলে সে দূরের জিনিস পষ্ট দেখতে পেত। আর ঘোড়ার আগে দৌড়াতে পারত। গায়ে জোর হয়েছিল দারুন রকম। তো স্তিভ অস্টিনের মেরামতের খরচ হয়েছিল ৬ মিলিয়ন ডলার।

আর সেই জন্যই ওর নাম সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান।

আমি দিনরাত হিসাব করে বের করলাম – সিক্স মিলিয়ন ডলার সব মিলিয়ে সাতশ বা আটশো টাকা হবে!

আমার অবশ্য টাকা পয়সার দরকার হয় না।

মাঝে মাঝে কমলা রঙের বিকেলগুলোতে কটকটি ওয়ালা আসে। রোগা-কালো একটা লোক। ওর কাছে কটকটি আর গাট্টা মেঠাই থাকে।

গাট্টা মেঠাই হচ্ছে গুড়ের শক্ত ঝোল। উপরে বাদাম দেয়া থাকে।

এখানেও টাকা পয়সা লাগে না। লোকটা খুব ভাল। আজকাল এমন ভাল মানুষ পাওয়া যায় না।

পুরানো শিশি- বোতল, বই খাতা এই সব দিলেই মুঠো

মুঠো গাট্টা আর কটকটি দেয়।

আমার কি ঐ সবের অভাব নাকি?

আমি চুপি চুপি রান্না ঘরে গিয়ে তেলের শিশির তেল কাঁসার বাউলে রেখে বা বাবার কাশির সিরাপের সব গোলাপি রঙের সিরাপ ফেলে দিয়ে বোতলটা আচ্ছা মত ধুয়ে লোকটাকে দিলে সে অতকিছু বুঝবে কি করে?

শুধু রাতের বেলা বাবা বলতেন-কাশির সিরাপ এত তারাতারি শেষ হয়ে গেল? অ্যাঁ?

আমি বলছিলাম প্রজাপতির কথা।

প্রজাপতি আসলে কতদিন বাঁচে? ওরা তো সব সময় দেখি কাঁটা ঘুড়ির মত উড়ে বেড়ায়। বাঁচে কতদিন?

শেষে জানলাম ওরা এক মাসের মত সময় পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। আর ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। মাত্র একমাস? খুব কম সময়।

কিন্তু কি আর করা? ভাল জিনিস তো বেশিদিন টেঁকে না। যেমন আমি ভাল । তাই হয়ত তারাতারি মারা যাব।

আরও শুনলাম বেশি বেশি কলকারখানা হলে প্রজাপতি হারিয়ে যাবে । আর পাওয়া যাবে না ওদের।

প্রজাপতি ফুলের মধু আর পাতার রস খায়। রাতের বেলা দালানের কার্নিশে বা গাছপালার ডালে ঘুমিয়ে থাকে।

বাংলার মাঠে এক বুড়া হাবড়াকে দেখতাম ছোট্ট একটা জাল আর কাঁচের বয়াম নিয়ে ঘুরে বেড়াত।

জালটা মজার। ব্যাট মিনটন খেলার ব্যাটের মত গোল। সাথে লম্বা হাতল সহ। মাঝ খানে জালটা।

উনি প্রজাপতি ধরত সেই জাল দিয়ে। পরে বয়ামে ভড়ে জমাত। পরে সেগুলো পিন দিয়ে কর্কের বোর্ডে গেথে উপরে কাঁচ দিয়ে বাঁধিয়ে রাখত।

খুব একটা মজার কিছু মনে হত না। খামখা সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি গুলো মারার দরকার কি?

তবে কয়েক জনকে পেতাম যারা পাখী দেখত ঘণটার পর ঘনটা ধরে। ওরা নাকি পাখী দেখার ক্লাবের সদস্য।

পাখী দেখার যে কোন ক্লাব আছে সেটা এই প্রথম জানলাম।

আমি ভেবেছি শুধু তিমি শিকারী আর দূর সমুদ্রের নাবিদের ক্লাব থাকে। যেখানে ওরা বসে তাস খেলে আর মদ তদ খায়। সাথে থাকে ঝলসানো মাছ। শ্যাওলার সালাদ।

পাখী দেখার ক্লাবের সদস্যরা সময় পেলেই পাখী দেখে। ওদের হাতে থাকে নোটবুক, কাঠ পেনসিল আর দূরবীন। দূরবীনকে অনেকে দেখি বাইনোকুলার বলে। বোধহয় ইংরেজি শব্দ। আর সবার কাছেই প্রচুর পাখীর ছবিওয়ালা একটা বই থাকে । ওটাকে ওরা গাইড বই বলে। নতুন ধরনের পাখী পেলেই গাইড বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখে নেয়।

এটা নাকি মজার শখ।

সালিম আলি নামে একজন নাকি সারা জীবন পাখী দেখে অনেক নতুন নতুন পাখী আবিস্কার করেছেন।

দারুন ব্যাপার তো।

আর পাখী দেখার নানান কায়দাও আছে।

পাখী দেখতে হলে বেশি হাউ কাঊ করা যাবে না। দলে বেশি লোক থাকলে চলবে না। সূযের উল্টে দিকে বসতে হবে। এমন ভাবে ঘাপটি মেরে বসতে হবে যাতে পাখী ভয় না পায়। আর পাখীর বাসায় হাত দিয়ে ডিম নাড়া- চাড়া করা যাবে না।

যারা পাখী দেখতে আসত সবাই বেশ তোম্বা চেহারার। মাথায় কাপড়ের গোল টুপি। টুপির চারিদিকে গোল বারান্দা। আর হাতা কাঁটা জ্যাকেট পরনের। জ্যাকেট ভর্তি পকেট।

ওরা খুব মনোযোগ দিয়েই পাখী দেখে।

যে জিনিসগুলো লক্ষ্য রাখতে হয় তা হলো-

পাখীটার রঙ কি? বুকে কোন ছোপ আছে কিনা? একা না দল বেঁধে থাকে? মাটিতে নেমে হাঁটাহাঁটি করে? না বেশির ভাগ সময় উড়ে বেড়ায়? কি খায়? ঝগড়াটে নাকি শান্ত? কর্কশ ভাবে ডাকে নাকি মিষ্টি শিষ দেয়? চোখের উপর দাগ বা রঙ আছে নাকি? মাথায় ঝুঁটি আছে কিনা? চোখ গোল্লা গোল্লা কিনা?

নাকি টানা টানা? চোখের চারপাশের রঙ কি পালকের মতই?

এ ভাবে কয়েক দিন দেখলেই হরেক পদের পাখী চেনা যাবে।

পুরো পৃথিবীতে নাকি ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির পাখী আছে। হায় হায়।

তবে আমাদের দেশে মাত্র ৭০০ প্রজাতির পাখী আছে।

যারা পাখী ক্লাবের সদস্য তারা আমাকে দেখলে ধমক দিয়ে বলে- এই পিচ্চি বেশি নড়াচড়া করবি না।

আমিও চুপ করে পক্ষীবিদদের পাশে মটকা মেরে বসে থাকি।

তবে সমস্যা হল আমি বেশিক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। আগেও দেখেছি যেখানে চুপ থাকে হয় সেখানে গেলে আমার সারা শরীরে চুলকানি হতে থাকে। এমন সব জায়গা চুলকাতে ইচ্ছা হয় যা বিরক্তকর।

আর হাসির গল্পগুলো মনে হতে থাকে।

পক্ষীবিদরা আমার উপর বিরক্ত।

অ্যাঁই তুই খামখাই নড়াচড়া করিস কেন? বিরক্ত হয়ে একজন বলে।

আমি মিথ্যা কথা বলি-পিপড়ায় কামড় দিয়েছে।

তুই কি কি পাখী চিনিস? জানতে চায়।

শুধু কাক আর মুরগি চিনি। জবাব দিই।

যারা পাখী দেখতে আসত তারা বেশ গম্ভীর কিসিমের মানুষ ছিল।

আমি কাক আর মুরগি ছাড়া আর কিছু চিনি না তাই ওদের কি রাগ।

আমি আসলে মিথ্যা বলেছিলাম। ময়ূর, চড়ুই, চিল কবুতর, প্যাঁচা টিয়া আরও নানান পাখীও চিনি। ঐ বুড়ো হাবড়াদের কেন বলতে যাব? ওরা যা খুশি করুক। এত বুড়ো হয়ে গেছে আর নতুন পাখী আবিষ্কার করতে পারেনি। কবে পারবে?

আর তিমি সম্পকে আমার মত জানে? মোটেই না।

যেমন তিমি মাছ যে আসলে মাছ না এটাই কয়জন জানে?

তিমি মাছ যে গান গায় কয়জন তা জানে?

নিউজিল্যান্ডে যে সাদা রঙের তিমি মাছ পাওয়া যায় তাই বা কে জানে। সাদা তিমির ব্যাপারটা অনেকে গালগল্প ভাবত। নাবির আর জেলেদের বদনাম আছে-ওরা প্রচুর গল্প বানায়। তবে হারমান মেলভিন নামে এক ভদ্রলোক ১৮৫১ সালেই মবিডিক নামে একটা দারুন বই লিখেছিলেন। ওখানে ক্যাপ্টেন আহাব আর ইসমাইল নামে একজন জাহাজে করে সাদা তিমি শিকার করতে গিয়েছিল।

আমি পিচ্চি হতে পারি কিন্তু যেহেতু তিমি শিকারি হব তাই সমুদ্র সম্পকে অনেক কিছু জানি। হু হু।

মতামত জানান