তার হাত ধরেই জার্মানিতে পূর্ণজন্ম হয়েছিল বুরুসিয়া ডর্টমুন্ডের। বায়ার্ন মিউনিখ রাজত্বে ছেদ ঘটিয়ে  ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা দুইবার জার্মান বুন্দেস লিগা ঘরে তুলেছিল হলুদ শিবির ডর্টমুন্ড। শুধু কি বুন্দেস লিগা সেবার যে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস্ লিগের ফাইনালে গিয়েছিল বুরুসিয়া ডর্টমুন্ড। ইউরোপে তখন জার্মান ফুটবল আধিপত্য। ইংল্যান্ডের ওয়েম্বিলি স্টেডিয়ামে অল জার্মান ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ক্লপের বুরুসিয়া ডর্টমন্ড আর হেইপ হেইস্কের বায়ার্ন মিউনিখ। তারকায় ঢাসা আর অভিজ্ঞতায় ভরপুর বায়ার্নের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে শূণ্য হাতে ইংল্যান্ড থেকে ফিরতে হয়েছিল। তবে ডর্টমুন্ডের হয়ে জার্মানিতে জিতেছেন সব শিরোপা। তরুণদের নিয়ে গড়া দলটি দিয়ে দেশে ও বিদেশে ডর্টমুন্ডের সাফেল্যে তাঁর উপর মহাখুশি ছিলেন ক্লাব কর্তা ব্যাক্তিরা।

টানা ৫ মৌসুম ডর্টমুন্ডকে টেনে তুলার পর ২০১৪-১৫ মৌসুমে খেই হারিয়ে ফেললেন বস ইয়ুর্গেন ক্লপ। লিগে একের পর এক পরাজয় আর দলের খেলার ধরনে বড় ধরনের ধ্বস নামে ডর্টমুন্ড খেলোয়াড়দের। ক্লপের সব অস্ত্রই যেন বিফল হতে থাকে। ক্লপ যখন বুঝতে পারলেন ডর্টমুন্ডকে দেওয়ার মত তার কাছে আর কিছু নেই তখন ক্লাব কর্তাদের সাথে বসে আপোষে ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্লাবের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ক্লাব বোর্ডও তাকে ছেড়ে দিতে সম্মত হলো। বুরুসিয়া ডর্টমুন্ড মৌসুম শেষ করল ৭ম অবস্থানে থেকে। আর ডর্টমুন্ডকে বিদায় দিয়ে লম্বা অবকাশের জন্য আমেরিকা পাড়ি জমালেন ইয়ুর্গেন ক্লপ।

হতাশা ভুলে ও একগুয়েমি কাটাতে পরিবার নিয়ে লম্বা অবকাশের উদ্দেশ্যে আমেরিকা চলে যান ইয়ুর্গেন ক্লপ। ৬ অক্টোবর, ২০১৫। ক্লপ যখন তার  স্ত্রী উলা সান্ডরককে নিয়ে আমোদে ব্যাস্ত তখন হঠাৎ করেই তার এজেন্ট মার্ক কোসিকের ফোন। কসিকের সাথে কথা বলে ক্লপ জানতে পারলেন, ডাক এসেছে লিভারপুল থেকে। প্রিমিয়ার লিগের একসময়ের দাপুটে দল প্রায় তি দশক ধরে ধুঁকছে। ব্রেন্ডন রজার্স ২০১৪-১৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের স্বপ্ন দেখালেও অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ডের ’পিছলে যাওয়া’ কান্ডে শিরোপাও পিছলে গিয়েছিল অলরেডসদের। পরের মৌসুমে রজার্স আরো বাজে ভাবে লিগ শুরু করলে তার উপর আর আস্থা রাখতে পারছিলেন না লিভারপুল ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তাকে ছাঁটাই করে জার্মান বিগম্যান ইয়ুর্গেন ক্লপের হাতে তুলে দেওয়া হলো ইংল্যান্ডের একসময়ের সবচেয়ে সফল ক্লাবটির। 

লিভারপুলের সাথে তিন বছরের চুক্তি সই করে ক্লপ যখন লিভারপুলের মিডিয়া সেন্টারে আসলেন তখন সাংবাদিকেরা তাকে মজা করে জিজ্ঞেস করলেন- 

”জোসে মরিনিও চেলসির হেডকোচ হওয়ার পর নিজেকে ’স্পেশাল ওয়ান’ ঘোষণা করেছিলেন, আপনি নিজেকে কি ঘোষণা করতে চান? সদা হাস্যজ্জল ইয়ুর্গেন ক্লপ গাল ভরা হাসি নিয়ে ঘোষণা করলেন- ”আই এম এ নরমাল ওয়ান!!!”

সংবাদ সম্মেলনেই ক্লপ ঘোষণা করলেন- ৩/৪ বছরের মধ্যেই তিনি লিভারপুলকে লিগ শিরোপা এনে দিবেন। সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের বরুণা কথা না রাখলেও কথা রেখেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। 

২০১৫ সালের অক্টোবরে লিভারপুলের ডাগআউটে বসার পর লিভারপুলের খোলনাচল বদলে দেওয়া শুরু করেন তিঁনি। জার্মানির ‘হেভি মেটাল ফুটবল’ ধরন ইংল্যান্ডে প্রয়োগ করে দর্শকদের যেমন মন কাড়েন তেমনি সাফল্যও আসতে থাকে। প্রথম মৌসুমেই দলকে ইউরোপা লিগের ফাইনালে তুলতে সক্ষম হন তিনি। কিন্তু ফাইনাল ভাগ্য যে খুব একটা ভালো নয় ক্লপের । ইউরোপের মঞ্চে আরো একবার শিরোপ জলাঞ্জলি দিতে হয় তাকে। উনাই্ এমরির সেভিয়ার কাছে পরাজিত হয়ে আবার শূণ্য হাতে ফিরতে হয়। তবে শিরোপা হাত ছাড়া হলেও লিভারপুল যে ইউরোপে নিজেদেরে অবস্থান ফিরিয়ে আনবে সেই বার্তা দিয়ে আসে ক্লপের শিষ্যরা।

 

ক্লপের অধীনে লিভারপুল সমর্থকদের প্রথম বড় শিরোপা জয়ের সুযোগ আসে ২০১৭ সালে। উড়ন্ত লিভারপুলকে ক্লপ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে নিয়ে যান। কিন্তু ফাইনাল ফাঁড়া কোন ভাবেই তখনো কাটেনি ক্লপের। এবার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইউরোপের সবচেয় সফল দল রিয়াল মাদ্রিদ। মাদ্রিদকে পরাজিত করার অভিজ্ঞতা তার ছিল। ডর্টমুন্ডের হয়ে ২০১৫ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে পরাজিত করেছিলেন ক্লপ। কিন্তু তখন তাঁর দলে ছিল রবার্ট লেভান্ডভস্কির মত স্ট্রাইকার। কিন্তু তাতে কি? এখন তো তার দলে আছেন মোহাম্মদ সালাহ্, সাদিও মানের মত খেলোয়াড়। তবুও কাজ আর হলো কই? এবারও শিকে ছিড়তে পারলেন না ক্লপ। রিয়াল মাদ্রিদের কাছে পরাজিত হয়ে আবার শূণ্য হাতে ফিরতে হলো ক্লপ ও তার শিষ্যদের । 

এদিকে প্রিমিয়ার লিগে লিভাপুলের প্রাধান্য দিন দিন বাড়তে থাকে। কিন্তু একই সময়ে ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষক হয়ে এসেছেন তার পুরনো শত্রু পেপ গার্দিওলা । পেপ ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্ব নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ নিজেদের  সম্পত্তি ফেলার মন্ত্র শেখাচ্ছেন শিষ্যদের। সেখানে ভাগ বসানোর ফন্দি আঁটিছিলেন ক্লপ ও তার শিষ্যরা। কিন্তু পেপ গার্দিওলার ম্যানচে

স্টার সিটির সাথে খুব একটা কায়দা করে উঠতে পারছিলেন না ক্লপ।

 ২০১৮-১৯ মৌসুমে মৌসুমে লিগে মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে শিরোপা হাতছড়া হয় লিভারপুলের। ম্যানচেস্টার সিটির খেলোয়াড়দের শিরোপা উৎসব দূর থেকে দেখতে হয় আর আফসোস করতে হয়ে সালাহ, ফিরমিনো, ভ্যান ডাইকদের।  লিগ হাতছাড়া হয়ে গেলেও ক্লপের অধীনে দ্বিতীয় বারের ২০১৯ সালে আবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠে লিভারপুল। এবার আর কাঁদতে হয়নি লিভারপুল সমর্থকদের। ক্লপের ফাইনাল হতাশা কাটিয়ে অবশেষে শিরোপায় হাত রাখার সুযোগ পায় লিভারপুলের খেলোয়াড়েরা।অল ইংলিশ ফাইনালে টটেহাম হট্সপার্সের মুখোমুখি হয় লিভারপুল। স্পেনের ওয়ান্ডা মেট্রিপলিটনো স্টেডিয়ামে স্বদেশী টটেহামকে ২-০ গোলে পরাজিত করে প্রথম শিরোপা জেতে ক্লপের লিভারপুল। লিভারপুলের হয়ে ক্লপের প্রথম আর আর লিভারপুল জেতে ষষ্ঠ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ। 

চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা যেন লিভারপুল সমর্থকদের মন ভরতে পারছিল না। ৩০ বছরের লিগ শিরোপার আক্ষেপ তাদের কোন ভাবেই ঘুচছিল না। আগের মৌসুমে লিগ চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ১ পয়েন্ট পিাছিয়ে থেকে মৌসুম শেষ করে তাদের শিরোপা ছুঁয়ে দেখার কষ্ট যেন আরো বেড়ে যায়। পরের মৌসুমে যেন দাঁতে কামড় দিয়ে নামেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। তার মন্ত্র ভালই কাজে দেয়। মোহাম্মদ সালাহ, সাদিও মানে, নেবি কেইটা, এলেক্স অক্সলেট চেম্বারলেন, ভার্জিল ভ্যান  ডাইকরা জান-প্রাণ দিয়ে লড়তে থাকেন । অধরা প্রিমিয়ার লিগ শিরোপার তাদের চাই ই চাই। ক্লপের কৌশল আর তার শিষ্যদের শ্রম বিধা যায় নি। ম্যাঞ্চেস্টার সিটি আর চেলসিকে পিছনে ফেলে লিগ জেতে লিভারপুল।২০১৯-২০ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা লিভারপুল সমর্থকদের মনে হাজার বছর অপেক্ষার পর এক পসলা বৃষ্টির মত আনন্দ দেয়। ৩০ বছর বছর পর লিগ শিরোপা ঘরে তুলে লিভারপুল । এই সময়ে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দী ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যে স্যার এলক্স ফার্গুসনের হাত ধরে তাদের ছাড়িয়ে গেছে।

চলতি মৌসুমে ক্লপের লিভারপুল নতুন এক ইতিহাসের দাড় প্রান্তে। প্রথম ইংলিশ ক্লাব হিসেবে ৪টি শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা তাদের সামনে। কারাবাও কাপ যেটা ইংল্যান্ডে লিগ কাপ নামে পরিচিত; ইতিমধ্যে তারা ঘরে তুলেছে। এফএ কাপের ফাইনালিস্ট দল তারা। ভিয়ারিয়ালকে সেমিফাইনালে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল নিশ্চত হয়ে গেছে। প্রিমিয়ার লিগে শীর্ষ অবস্থান করা ম্যাঞ্চেস্টা সিটির সমান ম্যাচ খেলে ১ পিছিয়ে তারা।লিগে সিটির পা হড়কালেই লিগ শিরোপা জিতবে লিভারপুল।

 

লিভারপুল সমর্থকদের মনে শুধু অনন্দ আর সুখবরের সুবাতাস। এতকিছুর মধ্যে সবচেয়ে আনন্দের সংবাদটি আসে ৩০ মে। বস ইয়ুর্গেন ক্লপ  ক্লাবটির সাথে নতুন করে চুক্তি সাক্ষর করেছেন। চলতি বছরের মার্চে যখন তাকে নতুন  চুক্তির ব্যপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন ক্লপ চলতি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অর্থ্যাৎ ২০২৪ সালে ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে অবকাশে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিগম্যান তার সিদ্ধান্ত বদলে ক্লাবটির সাথে আরো দুই মৌসুম থাকার কাগজে সই করেছেন। আরো দুই বছর ক্লাবটির সাথে থাকার ব্যাপারে ক্লপ তার নিজের জবানিতে বলেন-

“নতুন চুক্তি সাক্ষর করতে পেরে আমি আনন্দি, উচ্ছসিত, উত্তেজিত ও নিজেকে আর্শীবাদপুষ্ট বলে মনে হচ্ছে।

ক্লাব কর্তৃপক্ষ যখন আমাকে নতুন চুক্তি সাক্ষরের কথা বললেন ,তখন আমি নতুন করে ভাবলাম। আমি  সমর্থকদের মনের সাথে মনে মনে আলোচনা করলাম। এই ক্লাব ও সমর্থকেরা কোচিং স্টাফ রুম থেকে যা চায়, তা দেওযার মত প্রাণশক্তি ও মনোবল কি আমার আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর ভাবতে আমার খুব বেশি সময় লাগে নি। আমার বিশ্বাস আমি এই যায়গাটির প্রেমে পরে গেছি ও এখানে আমি স্বচ্ছন্দ অনুভব করছি”।

 

লিভারপুলের সাথে ক্লপের নতুন চুক্তি সাক্ষর হয়ে গেছে। ক্লাটির সাথে তার বন্ধন এখন ২০২৬ সাল পর্যন্ত অটুট। ক্লাবটিকে এখনো আরো বেশ কিছু শিরোপা উপহার দিতে পারেন ক্লপ!!!

মতামত জানান